১ম পর্ব
স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার বা মুজিবনগর সরকারের শুরুটা আমরা সাধারণত ভাবি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বা ১০ এপ্রিল যেদিন সেটি গঠিত হয় বা ১৭ এপ্রিল যেদিন তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন-সেদিন থেকে। কিন্তু এটা হচ্ছে বাংলাদেশের সরকার গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়। কিন্তু রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায়, সেটি এর পূর্বেই বাংলাদেশের মানুষের হাতে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংগঠিত হচ্ছিল। প্রধানত যার পটভূমি সত্তরের নির্বাচন। সত্তরের নির্বাচন মানুষকে একটি আইনি এবং সামাজিক উভয় স্বীকৃতি দেয়। সত্তরের নির্বাচনে যে স্বীকৃতিটা ছিল বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। এই নির্বাচনের পর একাত্তরের ৩ মার্চ যে পার্লামেন্ট বসার কথা ছিল, ইয়াহিয়া খান সেটি ভেঙে দেন। ভুট্টো তথা পশ্চিম পাকিস্তানিরা আগেও চায়নি এবং নির্বাচনে জয়লাভের পরেও চাচ্ছে না যে, ক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে যাক। বাংলাদেশে তখন বিতর্কটা শুরু হয়ে যায় এবং স্বাধীনতা তখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর যেটি- অর্থাৎ, ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত, দোকান- কেবল ঢাকাতেই নয় আমরা যদি প্রাতিষ্ঠানিকতার মূল কেন্দ্রের কথাই ধরি, সেটার পরিচালনা কিন্তু আর পাকিস্তান সরকারের হাতে রইলো না। মূল ক্ষমতা তখন চলে গেছে আওয়ামী লীগের হাতে। আওয়ামী লীগ তখন বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছে। এখন থেকে এইভাবে ব্যাংক চলবে, দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য এইভাবে হবে ইত্যাদি সব নির্দেশ আসতে লাগলো তাদের কাছ থেকেই। সরকারি ক্ষমতা বা সেই অর্থে রাষ্ট্র ক্ষমতা বলতে যা বোঝায় সেটাও কিন্তু পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানিদের হাতে নেই। একাত্তরের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাই একে বলা যায় প্রাক্‌-মুজিবনগর সরকার গঠন পর্ব। ২৬ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। এই সময়টায় মূলত কেউ ক্ষমতায় ছিল না। আর তৃতীয় পর্যায়টি হলো মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পর্ব।

১৯৭১ সালে মার্চ মাসে প্রতিরোধের পাশাপাশি এখানে একটা রাষ্ট্র গঠনের পর্যায় বা সরকার গঠনের পর্যায় রয়েছে। আমাদের দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে কিন্তু এই মার্চের শুরু থেকেই। অর্থাৎ যদি পহেলা মার্চ থেকেই ধরি- বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন বা হস্তান্তর তখন থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। সেটা কিন্তু পাকিস্তানিদের ইচ্ছায় হচ্ছে না, সেটা হচ্ছে জনগণের ইচ্ছায়। এখানে পাকিস্তানিদের নানারকম বাধার মুখে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও ক্ষমতা নিচ্ছে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। অর্থাৎ যারা হতে যাচ্ছে এই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক।
৭ মার্চের ভাষণেও শেখ মুজিবুর রহমান যে কথাটা বলছেন যে, প্রস্তুত হয়ে নাও। এখানে প্রস্তুতিটা কোন পর্যায়ে? তখন কি স্বাধীন দেশ? না, সেই অর্থে স্বাধীন দেশ না। কিন্তু বাংলাদেশকে তো তখন পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে একটি রাজনৈতিক দল। যে দল নির্বাচনে জয়লাভ করে এসেছে। এখন এই যে বাস্তবতা- এই বাস্তবতাটা আমাদের ইতিহাস চর্চায় তেমনভাবে আসে না। আমরা সাধারণত মুজিবনগর সরকার থেকে শুরু করি। আমার মতে, মুজিবনগর সরকার থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও প্রক্রিয়াটা চালু হয়ে গেছে তার আগে থেকেই। আর সে প্রক্রিয়া চালু হবার ফলেই মূলত পাকিস্তানিদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে যে, অস্ত্র ছাড়া বাংলাদেশ সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পাকিস্তানিদের আর নেই। অতএব সেই চেষ্টাই তারা করেছিল। তবে সেই অস্ত্র প্রয়োগের আগেই ১ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমরা আর তোমাদের সঙ্গে নেই। ২ তারিখ থেকেই স্বাধীনতার কথা শুরু হয়ে গেল, পতাকা উঠল বাংলাদেশের। একে একে দেশের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি- রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠন, আমলা, প্রতিষ্ঠান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রের আনুগত্য ঘোষণা করছে। প্রতিদিন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশার মানুষ একত্র হয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে তাদের আনুগত্য প্রকাশ করছে। কে বা কারা আনুগত্য প্রকাশ করছে এখানে সেটা বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো এই আনুগত্য প্রকাশের প্রক্রিয়াটা দাঁড়ায় মূলত রাষ্ট্র গঠনের ফলেই। সেটা নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ। তখন সে নতুন সরকারের যে রাষ্ট্র-সেটা অপ্রাতিষ্ঠানিক, কিন্তু সেই রাষ্ট্র গঠিত হয়ে গেছে। কোনো বিশেষ একটি দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠিত হচ্ছে না, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াটিকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যে ধারাবাহিকতা, সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে আমাদের একাত্তরের মার্চ মাস থেকে দেখা উচিত। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে।

মুজিব নগর সরকার যখন গঠিত হচ্ছে, তখন তার মধ্যেও কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিকতার একটি অংশ ছিল। সে বিষয়টিও কিছুটা বলে নেব। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের আক্রমণের পর সাংবাদিক আতাউস সামাদ ভাই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। চারদিকে পাকিস্তান আর্মির গাড়ি। তার মধ্যে সামাদ ভাই শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন। সামাদ ভাই বলছেন যে, শেখ মুজিব তখন একাই ছিলেন। এবং তাকে খুব বেশি দুশ্চিন্তিত মনে হয়নি। ইতিহাসের একটা পর্যায় ঘটে যাচ্ছে- এটা তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন। শেখ মুজিব সামাদ ভাইকে বললেন, আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডিপেন্ডেন্ট। নাও গো অ্যান্ড প্রিজার্ভ ইট। অর্থাৎ, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিয়েছি। যাও এবার সেটা রক্ষা কর। দেখা যাচ্ছে যে, সংগ্রামের যে বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করি, সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের কথায়, সুরে সব সময় ছিল। সেটি ৭ মার্চে প্রস্তুত হবার কথায় এবং ২৫ মার্চ রাতেও তিনি একই কথা বলছেন। আমি মনে করি এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, স্বাধীনতার বিষয়টা ইতিহাসের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে, স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে আসেনি। ২৫ মার্চ রাতে দেশ স্বাধীন হয়েই গেছে, তার জন্য কোনো ঘোষণার দরকার হয় না। দেশের এই স্বাধীন অবস্থাতে যারা নেতৃত্বে রয়েছেন, তারাতো অপ্রাতিষ্ঠানিক। তাদের প্রস্তুতি কেমন ছিল?
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সাক্ষাৎকারে দেখা যায় যে, কেউই তেমন প্রস্তুত ছিলেন না। তাজউদ্দীন আহমদ সাহেব বাসা থেকে বের হচ্ছেন, তার হাতে একটা বন্দুক ছিল, কোথায় যাবেন-না যাবেন কিচ্ছু জানেন না। শেষ পর্যন্ত গিয়ে তারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতীয় বিএসএফের সঙ্গে দেখা করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তখন কী করল? বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্রতো তখন তৈরি হয়ে গেছে। আর জনগণের যে প্রতিরোধ পর্বের কথা বলি- তারা আসলে কী প্রতিরোধ করছে? তারা প্রতিরোধ করছে তাদের রাষ্ট্রকে। যে রাষ্ট্রের চরিত্র তখনও অপ্রাতিষ্ঠানিক। সেখানে কেউ তাদের অর্ডার দিচ্ছে না। বিভিন্ন দিকে যেসব আমলা যুক্ত হচ্ছেন, তারা কেউ অর্ডার পেয়ে যুক্ত হননি। সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা এতে যুক্ত হচ্ছেন তারাও কেউ অর্ডার পেয়ে যুক্ত হননি। এবং সবচেয়ে স্বতঃস্ম্ফূর্ত যাদের অংশগ্রহণ এবং যাদের কথা আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে কম আসে, সেটা হচ্ছে জনগণের অংশগ্রহণ। জনগণ কী কারণে গিয়ে এত কষ্ট সহ্য করল? কারণ জনগণের রাষ্ট্রভাবনা ততদিনে পরিস্কার হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে আমলাদের নাম শোনা যায়, সেনাবাহিনীর নাম শোনা যায়, একটাও সাধারণ মানুষের নাম শোনা যায় না। সাধারণ মানুষের বয়ানগুলো হারিয়েই গেছে প্রায়।
তাজউদ্দীন আহমদ সাহেবরা ভারতে ঢুকে ভারতীয় বিএসএফ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় দিল্লিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করলেন। ফিরে এসে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া করতে লাগলেন। ঘোষণা হয়ে গেল যে সরকার গঠিত হবে। ১০ এপ্রিল সরকার গঠিত হলো। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলো কুষ্টিয়াতে। কুষ্টিয়া তখনও দখল হয়নি। এই মুজিবনগর সরকার গঠনের যে প্রক্রিয়াটি, সেটি অনেকটা মুক্ত অবস্থাতেই হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত হলো। হঠাৎ করে ঘোষণা করে ভারত-পাকিস্তান যেভাবে গঠিত হয়েছিল, সেইভাবে বাংলাদেশের জন্মটি হয়নি। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার এই ধাপগুলো বুঝতে না পারলে বাংলাদেশের ইতিহাসও বোঝা যাবে না, বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্কও বোঝা যাবে না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের তৃতীয় খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের বিভিন্ন দলিলপত্র দেখলে বোঝা যায় যে, কী কষ্টকর একটা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অত্যন্ত নিবিষ্টতার সঙ্গে এ সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল। যে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে এর আগের পাকিস্তান বা ব্রিটিশ আমলের সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে এসেছে, অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের কাঠামো তার থেকে খুব একটা ভিন্নতা নিয়ে কাজ শুরু করেনি। অর্থাৎ, এটা নতুন কোনো বিপ্লবী রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রেরই পর্যায়। সেখানে যেভাবে দলিলপত্র তৈরি হচ্ছে, যেভাবে এর বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় সাধিত হচ্ছে সেটা পুরোটাই সেক্রেটারিয়েট ধাঁচের। এবং সেখানে সরকারের যে টাকা-পয়সার প্রচণ্ড সংকট- সে সংকট মেটাবার চেষ্টা করা হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকতার যে বিষয়টা মুজিবনগর সরকারের মধ্যে আছে, সে সম্পর্কে আলোচনা হওয়া উচিত। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থ কোথা থেকে আসছে? বিভিন্ন মানুষ চাঁদা তুলছে। ভারত সরকার হয়তো কিছু অর্থ সহায়তা দিয়েছে, যদিও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না মুজিবনগর সরকারের দলিলপত্রে। দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা একটা অফিস করেছেন। একজনের কাছে আমি শুনেছিলাম তাজউদ্দীন সাহেব ওখানে থাকতেন, নিজে তার কাপড় কাঁচতেন। তিনি নাকি বলতেন যে, মানুষ এত কষ্ট করছে, মানুষের মতো আমারও একটু কষ্ট হওয়া দরকার। আমি পরিবারের সঙ্গে থেকে আরাম করে এখানে সরকার চালাবো না।

সামরিক-বেসামরিক, আধাসামরিক সব ধরনের মানুষ এই সরকারের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় নিয়োজিত কূটনীতিকরা, আমলারা এই সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এ থেকেও বোঝা যায় যে, এই গঠনটাই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এ সরকারের সঙ্গে যে সকল শক্তি জড়িত হচ্ছে, তারমধ্যে একটি হচ্ছে সেনাবাহিনী, একটি হচ্ছে আমলা, আর রাজনীতিবিদ। এই তিন শক্তি দিয়েই কিন্তু মুজিবনগর সরকার গঠিত। যেহেতু বাংলাদেশ বলতে যে ভূমি পাকিস্তানিদের হাতে দখলকৃত, কিছু কিছু ছিটেফোঁটা জায়গা ছাড়া তার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের এই অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের হাতে তখনও নেই। পাকিস্তানি সেই দখলের বিরুদ্ধে কারা লড়ছে? মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং শেষ করে মে-জুন মাসের দিকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করা শুরু করল। বাঙালি সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যে লড়াই শুরু করেছে। কিন্তু লড়াইটা বড়ভাবে শুরু হলো যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে, হ্যাঁ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বা তার সরকারের প্রতিনিধিত্ব কারা করছে? বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে, আপনি কি জানতেন কারা পরিচালনা করছিলেন? সবাই বলেছেন- হ্যাঁ আমরা জানতাম। আমি জিজ্ঞেস করতাম, কারা? তারা বলতেন, মুজিবনগর সরকার। কিন্তু আপনি বুঝলেন কীভাবে? তাদের উত্তর থাকত- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
তাহলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যে ভূমিকা- তাকে হয়তো নানা কারণে আমরা বড় করে দেখি; কিন্তু একটা জিনিস হয়তো খেয়াল করি না যে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রই ছিল মুজিবনগর সরকারের প্রতীক। যে সরকার মুক্তিযুদ্ধটি পরিচালনা করছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমেই মানুষ জানছে সরকারের কথা। তারা জানতে পারছে কী ঘটছে সরকারে, আন্তর্জাতিক দুনিয়ায়ই বা কী ঘটছে। শেখ মুজিবুর রহমানের যে বিচার চলছে, সেই কথাটাও তারা জানছে এর মাধ্যমেই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য নিচ্ছে, সে খবরগুলো প্রচার করছে। সেখানে যারা জড়িত রয়েছেন, তার প্রধান যিনি তিনি হচ্ছেন এম এ মান্নান, নড়াইলের এমপি। তিনি কিন্তু মন্ত্রী ছিলেন না। এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাকে একজন বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী নাকি মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার ব্যাপারে বলে দিয়েছিলেন- এই যে ৫ জনের মন্ত্রিসভা হচ্ছে, এর বাইরে যাতে আর কোনো নতুন মন্ত্রী না হয়। তিনি রাজনীতিবিদ, নিশ্চয়ই জানতেন মন্ত্রিত্ব নিয়ে অনেক ঝুট-ঝামেলা হয়। সেসব বিষয় এড়াতেই এই পরামর্শ দিয়ে থাকবেন তিনি। তাই এই এম এ মান্নান সাহেবকে যদিও মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়, কিন্তু তার নামের পাশে লেখা হতো এমএনএ, ইনচার্জ অব ইনফরমেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং।
[ক্রমশ]