কবিতা সাহিত্য জগতের সবচেয়ে প্রাচীন ক্ষেত্র। অথচ এর আবেদন কখনোই এতটুকু কমেনি। একজন কবির আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তার সংক্ষিপ্ত রূপ তাঁর কবিতা। আর যুগে যুগে তা আপামর জনসাধারণকে আন্দোলিত করেছে। তাঁদের অনেকেই 'জাতীয় কবি'র সম্মান পেয়েছেন। 'জাতীয় কবি' শব্দযুগল নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো কাজী নজরুল ইসলাম।
বিদ্রোহ আর প্রেমের কবি কাজী নজরুলকে কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেওয়া হলো, এ স্বীকৃতি কাদের দেওয়া হয়? এর উত্তরেই অনেক বিষয় পরিস্কার হয়ে পড়বে। জাতীয় কবি তিনিই হতে পারেন, যার কাব্যে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা, সংগ্রাম-সাধনা, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সামগ্রিক আত্মপরিচয় উঠে আসে। যে কাব্য শুধু জাতীয় সাহিত্যের ভান্ডার ও ভাষাকেই সমৃদ্ধ করে না; দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি এবং আপামর জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। জাতীয় কবির কাব্যসমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। যে কারণে জাতি গঠনে জাতীয় কবি ও তাঁর কাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। অপরদিকে, যে কবির রচনা হয়তো বিশ্বমানের; কিন্তু তা নির্দিষ্ট জাতির মানুষের আত্মপরিচয়, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করে না, তিনি কিন্তু জাতীয় কবি হতে পারেন না। আর এ কারণেই কাজী নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি; অথচ আমাদের জাতীয় সংগীত রচনাসহ বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদান সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জাতীয় কবি নন।
বিংশ শতাব্দীতে দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব দেখেছে বিশ্ববাসী। উপনিবেশগুলো থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় দেশে দেশে জাতীয় মুক্তির যে গণজোয়ার দেখা গেছে, তার পেছনে বহু কলাকুশলীর হাত খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি-সাহিত্যিকগণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাজী নজরুলের কাব্যের বিদ্রোহী চেতনা যুগে যুগে মুক্তিকামী বাঙালিদের লড়াই-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা দিয়ে এসেছে। যা অন্য কোনো কবির কাব্য দিতে পারেনি। যে চেতনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও ছিল অটুট। একইভাবে বিভিন্ন দেশের জাতীয় কবিদের ইতিহাস ঘাটলে এ ধরনের ভূমিকা পাওয়া যাবে, যা আমাদের চিন্তাগত বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমরা সাধারণত গোটাকয়েক কবির নাম জানি। এর বাইরে যে বা যাঁরা নিজ নিজ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের কবিতার মাধ্যমে, সেটি এক কথায় অজানা। সেই অজানা ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে 'দেশে দেশে জাতীয় কবি' বইয়ে। বইটি লিখেছেন শাহাজাদা বসুনিয়া। এতে তিনি সত্তরেরও বেশি দেশের জাতীয় কবির পরিচয় তুলে ধরেছেন। কোনো কোনো লেখায় কবি পরিচিতির পাশাপাশি কবিতা সম্পর্কিত আলোচনাও আছে, আছে কবিতা। এমন অনেক জাতীয় কবি রয়েছেন, যাদের সম্পর্কে পাঠক হয়তো জানেন না; তাদের পরিচয় এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে শ্রমসাধ্য কাজ। শাহাজাদা বসুনিয়া একজন সব্যসাচী লেখক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখেন। একইসঙ্গে প্রবন্ধ, অনুবাদ ও গবেষণামূলক বইও রচনা করেন। এ সব্যসাচী চরিত্রের জন্যই তিনি তথ্যবহুল এ বইটিতে সাবলীল ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন এক ভিন্ন ইতিহাস। উল্লেখ্য, সাহিত্যিক হায়দার বসুনিয়া তার বাবা। পারিবারিকভাবে সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি হয়তো এ জগতে বিচরণের ক্ষেত্রে বাড়তি প্রেরণা পেয়েছেন।
২৮০ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে গিয়ে পাঠককে বেগ পেতে হবে না। জানার আগ্রহ ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠবে। যেমন- ইউক্রেনের জাতীয় কবি 'তারাস শেভেনকো'র নাম জানা ছিল না। এ বইটি পড়ে তাঁর সম্পর্কে বিস্তর ধারণা হলো।
তিনি একজন কবি ও আর্টিস্ট। সাহিত্যকর্মের অন্যতম রচনা হচ্ছে 'কোবজার'। তাঁর রচিত সাহিত্যসম্ভারকে আধুনিক ইউক্রেনিয়ান সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর কবিতায় বিধৃত বৈপ্লবিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলি বন্দি কয়েদিদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ফলে জীবিতাবস্থায় তাঁর কবিতা পোলিশ, রাশিয়ান ও জার্মান ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। কোবজারের অনেক অংশ শতাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি ইউক্রেনের প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রকাশে অনেক পাহাড়-পর্বত ও বনাঞ্চলের ছবি এঁকেছেন। এই মহান কবি মাত্র ৪৭ বছর বেঁচেছিলেন। এ রকম একটি বইয়ের সন্ধান না পেলে হয়তো এ ইতিহাসটিও অজানা থেকে যেত।
এদিকে, থাইল্যান্ডের জাতীয় কবি 'সানথর্ন ফু'; যে নামটির সঙ্গে বর্তমান সময়ের অনেকেই পরিচিত নয়। ঝধিংফর জধশংধ (ঞযব ঝধভবমঁধৎফরহম ড়ভ ডবষভধৎব) রচনা করেন। এই অসাধারণ রচনাটি থাই-সাহিত্যের অন্যতম সৃষ্টি। তাঁর রচনাবলিতে সুন্দর সুন্দর শব্দগুচ্ছ ও পুরাতন পাহাড়-পর্বতের বর্ণনা পাওয়া যায়। থাইল্যান্ডে তিনি মহাকবি শেক্সপিয়রসম প্রশংসিত।
এ ছাড়াও যারা নিজ জাতিসত্তা বিকাশে তাদের শিল্প-সাহিত্য দ্বারা মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইয়েমেনের আবদুল্লাহ আল-বারাদুনি, সিরিয়ার নাইজার কাব্বানি, কিউবার জোঁসে মার্তি, মেক্সিকোর অক্টাভিও পাজ, আর্জেন্টিনার জোঁসে হার্নান্দেজসহ অনেকেই।
দেশে দেশে যুগে যুগে কবিরা কাব্যের মধ্য দিয়ে যে মুক্তির বাণী ছড়িয়েছেন, তা ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে রয়ে গেছে। সমসাময়িক অনেক কবি হারিয়ে গেছেন সময়ের স্রোতে; কিন্তু যারা জনগণকে দ্রোহে উজ্জীবিত করে জাতীয় মুক্তির বার্তা দিয়েছেন, তাঁরা জীবিত না থাকলে মানুষের মনে, দ্রোহের তেজে তারা আজও বেঁচে আছেন, হয়ে রয়েছেন স্মরণীয়।