বাংলা ভাষার অতুলনীয় কথাকার হাসান আজিজুল হক সমস্ত জীবনের সাহিত্য সাধনার ভেতর দিয়ে সমাজ, জীবন ও দর্শনের নানা বিষয় নিয়ে তাঁর চিন্তা ও সৃজনশৈলীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সেইসব সৃজনবীজের কিছু নমুনা পত্রস্থ হলো...
প্রায় সব বাঙালিই প্রথম জীবনে কবিতা লেখে। যে কবি, সে-তো লেখেই। যে কবি নয় সেও লেখে। আমিও তেমনি লিখেছি। তবে সিরিয়াসলি সাহিত্য করার চিন্তা যখন এলো তখন গদ্যেই বেশি মন দিই। আমি প্রথম উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছি ১৯৫৪ সালে; স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই। সেই অসমাপ্ত উপন্যাস এখনও খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। তারপর লেখার চেষ্টা করেছি ১৯৫৭ সালে। তখন আমার ১৮ বছর বয়স। 'শামুক' নামে একটা উপন্যাস লিখি তখন।
জীবন নিয়ে সব সময় তো আর এক ধরনের অনুভূতি হয় না। মানুষ একটা পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে ফুল স্টপ দিয়ে একবাক্যে কি বলতে পারে- 'জীবন সম্পর্কে আমার অনুভূতি হচ্ছে এই!' কখনও কখনও তা এক ধরনের, কখনও আবার আরেক ধরনের। তারাশঙ্করের 'কবি' উপন্যাসের নায়ক বলেছে, 'জীবন এত ছোট ক্যানে', এটা একটা মৌলিক কথা। আবার অনেক সময় মনে হয়, কেটেই তো গেল। যা হবার তা-ই তো হয়ে গেল।
রাজনীতিতে ভুল-শুদ্ধ থাকে এবং থাকবেও। কিন্তু তা তো স্থায়ী রূপ পেতে পারে না। অস্বচ্ছ রাজনীতির নিরসনে জরুরি হলো স্বচ্ছ রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার যদি আমাদের রাজনীতিকরা অন্তরের অন্তস্তলে ধারণ করে এখনও দৃঢ় অবস্থান নেন তাহলে নিশ্চয় সব অন্ধকার, সব নেতিবাচকতা দূর হবে, তা বিশ্বাস করতে চাই। শুধু দরকার নির্মোহ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদি সব ব্যাধির সৃষ্টি অস্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধহীন রাজনীতি থেকেই!
পুতুলনাচ পৃথিবীজুড়েই হচ্ছে। মানুষ এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে। সকাল বেলায় থাকছে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে লন্ডন শহরে, বিকেলেই চলে আসছে প্রচণ্ড গরমের শহর কলকাতা বা ঢাকায়। রেল হওয়ার পর মনে হয়েছিল গতি অনেক বাড়ল কিন্তু বিমান আবিস্কারের পর কি গতির সংজ্ঞাই পাল্টে গেল। বোমারু বিমান নিয়ে মানুষ যা খুশি তাই করছে। মানুষ একেকটা নগর ধ্বংস করে ফেলছে। জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমায় যে দুটো আণবিক বোমা পড়েছিল, দুটো শহরই সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। তখন মানুষকে তো পুতুল না বলেও উপায় থাকছে না। পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে, প্রকৃতি বদলাচ্ছে, মানুষের পরিবর্তন হচ্ছে, মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। একদিক থেকে তো আমরা পুতুলই। মানবভাগ্য এক বিরাট পুতুলের খেলা বৈ আর কী। কে যে খেলাচ্ছে তাকে দেখতে পাচ্ছি না। কার নির্দেশে খেলছি, ভালো খেলছি না মন্দ খেলছি, সেটিও জানার জন্য কেউ নেই।
সারা পৃথিবী আজ ঠিকানাবিহীন মানুষে ভরে গেছে। কেউ গুম হয়েছে, কেউ খুন হয়েছে, এ রকম মানুষের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। রাষ্ট্র কারও ঠিকানা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ কারও ঠিকানা কেড়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশের কেউ কি জরিপ করে দেখবেন, কত মানুষের ঠিকানা নেই? লাতিন আমেরিকার বহু দেশে মানুষ হঠাৎ হঠাৎ ঠিকানাহীন হয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ, তাদের ঠিকানা নেই। স্থায়ী ঠিকানা থেকে তাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ঠিকানাবিহীন মানুষ আজকের পৃথিবীতে অসংখ্য। দারিদ্র্যের কারণে, মতবিরোধিতার কারণে এরা হারিয়ে গিয়েছে। এদের স্থায়ী-অস্থায়ী কোনো ঠিকানাই নেই।
আমার শৈশব জীবনটা, এই জীবনটার কথা বলতে গেলে সাধারণ, খুবই তুচ্ছ সাধারণ; আধুনিক জীবনের কিছুই ছিল না সেখানে। কিছুই আনন্দের নেই। অথচ অভাব তো ছিল না আনন্দের। বিকেলটা হলেই মহারাজার স্কুলের মাঠে ফুটবল নিয়ে নেমে পড়তাম। সেখানে নিয়মিত ফুটবল খেলা হতো। আমি তো খেলবই প্রতিদিন, একদিন খেলা না হলে আফসোস হতো। আমার বাবা সন্ধ্যার ট্রেনে বাড়ি ফিরতেন। বাবাকে নিয়ে আসতে যেতে হতো আমাকে। এটা না করে কোনো উপায় নেই। এখনকার বাবা-মায়েদের মতো তখনকার বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের অত যত্নও করতেন না, অত আদরও করতেন না। তবে গভীর ভালোবাসা ছিল। এদিকে বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, আমি ফুটবল খেলছি, আবার বাবাকেও আনতে যেতে হবে। আফসোস হতো- ইশ্‌, খেলাও শেষ হলো না!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে চিনি-জানি বহু আগ থেকেই। আজ যখন তাকে নিয়ে বলছি, তখন অতীতকে ফিরে দেখতে গিয়ে কিছু স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠছে। তিনি আমাদের জাতির জনক। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম যে দেশটির আমরা নাগরিক, সেই দেশটি তারই নেতৃত্বে জন্ম নেওয়া। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তমূল্যে অর্জিত এই দেশটির অভ্যুদয়ের জন্যই হয়তো তার মতো প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী, দুঃসাহসী মানুষটির জন্ম হয়েছিল। ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায় বঙ্গবন্ধু ও তার নেতৃত্বের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা।
জন্ম সার্থক হয়েছে- এমন খেঁদো কথা বলব না। আমি তো কিছু করতে পারিনি। যদি আমার কাজ দিয়ে কোথাও কিছুমাত্র ভালোর দিকে পরিবর্তন হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন হয়, তবেই নিজেকে কৃতার্থ মনে করব এবং বলব, আমার যাপিত জীবন সার্থক হয়েছে। মানুষের জন্ম হয়। কেউ ঠিকরে পড়ে আবার কেউ মাটি ধরে দাঁড়ায়। এভাবেই তো মানুষের জীবন চলে। জন্ম মানুষের সাধারণ একটি ব্যাপার। আমারও সে রকমই মনে হয়। কোথায় কীভাবে জন্মগ্রহণ করেছি, শেষ কবে মায়ের কোলে বসেছি; এখন আর মনে পড়ে না। এখন এগিয়ে পড়েছি জীবনের রাস্তায়। অনেকটা দূর চলে এসেছি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, অযথা দীর্ঘ সময় মানুষের বাঁচার প্রয়োজন নেই। সে জন্য যেদিন আমাকে আর কোনো কাজেই আসবে না, সেদিন যেন আমি উপস্থিত না থাকি- সেটাই চাইব।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকার ছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর আরও কিছু নতুন প্রত্যয়ও যুক্ত হয়। স্বাধীনতা অর্জনের আজ প্রায় পাঁচ দশক পর প্রিয় স্বদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের রাজনীতিক ও রাষ্ট্র পরিচালকদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, ভুল কিংবা হীনস্বার্থের কারণে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, মৌলবাদীরা নানা ক্ষেত্রে সুযোগ নেয়। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক অধ্যায়ের পর দীর্ঘদিন যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা নিজেদের দিকটাই বড় করে দেখেছেন দেশ-জাতির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে। স্বাধীন দেশে এই উল্টো যাত্রায় অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষত সৃষ্টি হয়। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষত সৃষ্টি হয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এবং এর বিরূপ মূল্য এখনও দিতে হচ্ছে।
সংস্কৃতি বৈচিত্র্যকে বাদ দেয় না। বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই একেকটা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সেজন্য কোনো সংস্কৃতিই একরঙা নয়। যে সংস্কৃতির মাঝে বৈচিত্র্য আছে সে সংস্কৃতি বিলীন হয় না। কাজেই পশ্চিমবাংলার যে সংস্কৃতি সেটাও যেমন একরকম নয়। ঠিক তেমনি আমাদের দেশেও উত্তরবঙ্গের সাথে পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতি মিলবে না। সেজন্যই আমি মানুষকে বলি, বৃত্ত ছোট নয়। বড় করো। বৃত্তকে আরও বড় করো।
সমাজের একজন মানুষ হিসেবে আমি প্রফুল্ল চিত্তের। তাই ইচ্ছা করে সবার সামনে আমি দুঃখবিলাস করি না। সমাজের একজন হিসেবে আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু গভীর অনেক দুঃখের ব্যাপার তো আমার মনের মধ্যে আছে; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু সামাজিক জীবনে আমাকে সদা হাসিখুশি, প্রফুল্ল দেখতে পাওয়া যায়। কারণ, কথা বলা আর বক্তৃতা করার মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য করি না। কিন্তু গুছিয়ে যখন লিখতে যাই, তখন অতলের ভেতর থেকে অনেক জিনিস উঠে আসে। গল্প লিখতে গেলেও সেটা হয়। তাই বলে কোথাও আমি অশ্রুপাত করি না। যত কষ্টের গল্প লিখি না কেন, যত যা-ই লিখি না কেন, তা নিরশ্রু। জীবনের মূল চেহারাটা আমি দেখি বলেই নিস্পৃহ থাকি। সামাজিক জীবনে, পারিবারিক জীবনে যতটুকু পারি, আমি সবটুকু নিংড়ে নিই জীবন থেকে। কেউ যদি বলে, আপনার দুঃখ নেই? আমি তাকে অনেক গভীর দুঃখের কথা বলতে পারব, তাতে সন্দেহ নেই।
আমি আমার শেষ নিয়ে ভাবছি না। শেষ হয়ে যাওয়াটা আমার ভাবনার মধ্যে নেই। আমার মনে হয়েছিল, স্মৃতিকথাটা হচ্ছে আমার ব্যক্তিত্বের, আমার মানুষ হয়ে ওঠার আকর; সেটা সবাইকে জানানো দরকার। আমি সেটা লিখে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, উপভোগ করেছি। আর সহজে আমি স্মৃতিকথা লিখব না। তবে গল্প, উপন্যাস লিখব কি না ... হ্যাঁ, গল্প লিখতেও পারি। আমার পাঠকেরা আরও অনেক কিছু মনে করতে পারেন। সেটা নিয়ে আমার আর কিছু বলার নেই।