জল ছিল, জল- যতদূর দৃষ্টি যায়। দৃষ্টির বাইরেও জল। আর ছিল আধামানব আধাঈশ্বর (ফবসরমড়ফ) 'মাউই'।
বৈচিত্র্যহীন জল দেখে দেখে তার একঘেয়ে লাগছিল জীবন। সে ছিল মহাজাদুকর এবং করতে না পারে এমন কিছুই তার সাধ্যের বাইরে ছিল না। সে তার ঝোলা থেকে খুঁজে বের করল একটি বিশাল বড়শি এবং তাই নামিয়ে দিল নিচ থেকে নিচে, গহিন থেকে গহিনে, তার ভালোবাসার নারী হিনার হৃদয়ের গভীরতার থেকেও গভীরে।
কথাটি ঠিক হলো না, হৃদয়ের গভীরতার তল নেই, সমুদ্রের আছে।
তাই যখন মাউই বুঝতে পারল যে তার বড়শি সমুদ্রের তলা বিদ্ধ করেছে, সে টেনে তুলতে শুরু করল। টানছে তো টানছেই। সে কি তার ওজন! সে ক্লান্ত ঘর্মাক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত তুলে আনল সমুদ্রের তলদেশ, গহিন জলের নিমজ্জন থেকে, আর তাই হলো হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।
আমি সেই হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ দেখতে এসেছি। সঙ্গে যে, সে ও আমি। সে আমার ছায়া, অথবা আমি তার।
তবে যারা হাওয়াইয়ের জন্মের আসল কথাটি জানে না তাদের জন্য মাউইর এই গল্প। যারা জানে, তারা কত কিছু জানে, মাউই নামে কোথাকার কোন 'না-ভগবান না-মানুষ'- এমন এক অর্ধসত্তার গাঁজার বেসাতি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কই? তা সত্ত্বেও জলের গর্ভ থেকেই জন্ম হলো স্থলের। সেই স্থলে দিনগুলো ছিল অতি আলোকিত, রৌদ্রময় কিন্তু ছোট। রাতগুলো ঘুটঘুটে অন্ধকার, অকাতর দীর্ঘ।
লোকজনকে পরিশ্রম করতে হয় প্রচুর! মাছ ধরতে হয়, শিকার করতে হয়। চাষবাস করা, আগাছা নিড়ানো, সমুদ্রে যেতে ছিপ নৌকা তৈরি করা, আরও কত কত কাজ। তারপরে হুলা নাচ, নারীর মুদ্রার দেহবল্লরি বৈভব, স্তনের নন্দন কম্পন আর যৌবনের মাদকতা।
আলো না হলে কী করে চলে ঘরসংসার?
দিন চাই, সুদীর্ঘ, আলোকিত দিন।
মাউই ছিল চালাক-চতুর শক্তসামর্থ্য ও বেঁটে, কিন্তু মানবের বান্ধব। সে মানুষের আকাঙ্ক্ষার খোঁজ পায়।
একটি জাদুর দড়ি দিয়ে বেঁধে সূর্যের গতি কমিয়ে দেয়, আর এই দড়ি যাতে ছিঁড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যে নারী, তার স্ত্রী, হিনা, তার চুলের বিনুনি দিয়ে পোক্ত করে দেয়। ভালোবাসার নারীর চুল হচ্ছে পৃথিবীর শক্ততম বন্ধন। মাউই সেটা জানত। সেই থেকে হাওয়াইয়ে রৌদ্র ঝলমল করে দিন, আর হাওয়াইয়ের নারী-পুরুষ সবাইকে অকৃত্রিম অভিবাদন জানায় : আলো-ও-ও-ও-হা!
অপূর্ব একটি শব্দ, যা ধারণ করে হাওয়াই দ্বীপবাসীর শুভকামনা, লাস্যময়ী মুখ ও জীবনের স্পন্দন বহনকারী শ্বাস।
'হা' মানে শ্বাস।
হাওয়াইয়ের মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, বাতাস, আকাশ, জল, রোদ ও পাহাড় হাজার হাজার বছর ধরে ধারণ করে আছে এই 'হা'। মানুষ চলে যায় কিন্তু শ্বাস থাকে। এই শ্বাস হলো আত্মা। আর আত্মা অমর, এটা প্রায় সব জাতিরই বিশ্বাস।
কিন্তু সবাই সবকিছু বিশ্বাস করে না, বা করে অন্যরকম। সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে সামোয়া এবং টোঙ্গার লোকজন বিশ্বাস করত অন্যরকম। তাদের ঈশ্বর টাঙ্গালোয়া আদি-অন্তহীন মহাসমুদ্রের সৃষ্টি করেই সন্তুষ্ট ছিলেন এর বিশালত্ব ও ব্যাপ্তির অমেয়তায়। কিন্তু তার প্রিয় বিহঙ্গ-দূত 'তুলি' সেই মহাসমুদ্রে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, কোথাও স্থান পায়নি বসে একটু বিশ্রাম নেওয়ার।
টাঙ্গালোয়া তখন তার প্রিয় পাখির জন্য কয়েক খণ্ড পাথর ছুড়ে দেন মহাসমুদ্রে এবং তাই হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় পলিনেশিয়ান দ্বীপসমূহ। (হাওয়াই, সামোয়া, তাহিতি, ফিজি, টোঙ্গা, এওটিয়ারোয়া বা নিউজিল্যান্ড)
কিন্তু দ্বীপগুলো ছিল খাঁখাঁ শূন্য। কোনো ঘাস, গাছপালা, ছায়া ছিল না। তিনি তখন লতা দিয়ে ঢেকে দেন মাটি। লতা বেড়ে বেড়ে পৃথিবী সুন্দর করে তোলে। সবুজতা আসে, আসে ছায়া, কিন্তু কোনো পশু নেই, পাখি নেই, প্রাণী নেই, মানুষ নেই, নারী নেই।
নারী নেই! না, না, না।
নারী নেই মানে ভালোবাসা নেই। ভালোবাসা নেই মানে শিশু নেই। শিশু নেই মানে নারীকে ঠেঙানোর ভবিষ্যৎ পুরুষ নেই। তবে সবটাই এমন নয়, ভালোবাসারও পুরুষ হয়, সবাই নারীকে ঠ্যাঙায় না, কেউ কেউ ভালোওবাসে। তা নইলে এই বিশ্বসংসার হতো ক্যাকটাসের বন, ঠ্যাঙাড়েদের বসুন্ধরা।
রূপার চাকতির মতো চাঁদ ওঠে যখন, পুরুষ আজও সেই চাঁদে খুঁজে পায় তার প্রেয়সীর মুখ।
সুর বাঁধে, বাঁশী বাজায়, গান গায়। আর নদীর দিকে তাকিয়ে নদীকে ভাবে তার ভালোবাসার নারী, অনন্ত যৌবনা, অবিশ্রান্ত খেয়ালি অথচ আদ্যোপান্ত নিমজ্জনের আশ্রয়।
টাঙ্গালোয়ার তৈরি সেই লতাপাতা পচতে থাকে এবং সেই পচনের মধ্যে কিলবিল করে অর্বুত ছোট ছোট কৃমি। কৃমি আর কৃমি। কৃমিময় জগৎ। টাঙ্গালোয়া এই কৃমিগুলো ধরে ধরে মানুষের আকৃতি দেন এবং তাদের মধ্যে একটি করে হূৎপিণ্ড ও আত্মার স্থাপন করে জীবন্ত করে তোলেন।
এই হলো মানুষ। মানুষের আদিরূপ। আদতে কৃমি, কৃমি থেকে মানুষ। আমি, তুমি, সে, আর তারা। সবাই হাঁটে পৃথিবীতে। বাংলাদেশে, বার্মায়, ইউক্রেনে, সিরিয়ায়, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে, কোথায় নয়?
টাঙ্গালোয়া ঘুমাচ্ছেন।
ঘুমাচ্ছেন সশব্দে নাক ডেকে। তিনি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভোগেন। তার নাকে-মুখে 'সি-প্যাপ' মেশিন। তিনি কথা বলেন না, কেউ বললেও শোনেন না। আর মাউই তার প্রিয়তমা স্ত্রী হিনাকে নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে গেছে অন্য কোনো গ্রহে, যেখানে অন্ধেরা দেশপ্রেমে গদগদ হয়ে অন্যায়কে, মিথ্যাকে, কৌশলী প্রতারণাকে সমর্থন করে না কৃমিদের উত্তরপুরুষের মতো।

দুই.
আমরা হাওয়াইয়ের ওয়াহু দ্বীপে এসে নেমেছি ফেব্রুয়ারি ১৮ তারিখে (২০১৮)।
হনলুলু শহর।
যে কোনো বড় শহরের মতোই বড়। ইমারত আর ইমারত, পিচ এসফাল্টের পথ, গাড়ি আর গাড়ি, আলো আর আলো। ১৯ তারিখে বাসে চড়ে শহর ঘুরে দেখেছি।
গিয়েছি পার্ল হারবরে। পুয়োলোয়া ছিল পার্ল হারবারের নাম, বিশেষ এক ধরনের ঝিনুকে মুক্তা পাওয়া যেত বলেই সেই থেকে এর নাম। 'কাআহুপাহায়ু' নামে এক নারী-হাঙর ছিল পুয়োলোয়ার মঙ্গলময়ী সত্তা। বিশ্বাস করা হয়, সে এবং তার ভাই প্রথমে মানুষ হয়েই জন্মেছিল কিন্তু কোনো কারণে অখুশি হয়ে দেবতারা তাদের হাঙরে পরিণত করে দেয়। স্থানীয় লোকজন তাদের খাদ্য দিত এবং তারাও মানবখেকো হাঙরের আক্রমণ থেকে এই স্থানের জেলেদের রক্ষা করত। সেই থেকে তাকে মঙ্গলের দেবী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার একটি মন্যুমেন্টও স্থাপন করা হয়েছে (যা আমার দেখা হয়নি)।
আমরা পার্ল হারবারের তীরে ঘুরে ঘুরে দেখেছি, তথ্য পড়েছি। দূর থেকে দেখেছি যুদ্ধজাহাজ অ্যারিজোনা, মিসৌরিসহ মিউজিয়মসমূহ। সময়ের অপ্রতুলতার কারণে কোনো মিউজিয়মে ঢুকতে পারিনি। খুব যে ইচ্ছা ছিল তাও নয়। যুদ্ধ ও যুদ্ধ-মিউজিয়ম কম দেখিনি। সব কলাই মানুষের সৃষ্টি। যুদ্ধকলায় মানুষ যত মৌলিকত্ব দেখিয়েছে অন্য কিছুতে ততটা পেরেছে কিনা সন্দেহ। মানবজাতি যতদিন থাকবে ততদিন এর উত্তরোত্তর উন্নতি হবেই। যত এর উন্নতি হবে, মানুষ ততই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হবে এবং এ নিয়ে আফসোস করারও কিছু নেই। মুনাফাই ঈশ্বর এবং ঈশ্বরই মুনাফা। যুদ্ধবাজরা ঈশ্বরের ডান-বাম হাত।
যারা আমার মতো একেবারেই অজ্ঞ, তাদের জন্য সংক্ষেপে পার্ল হারবারের ইতিহাস বর্ণনা করা যায়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান হঠাৎ বিমান হামলা করে পার্ল হারবারে। চারটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং আরও চারটি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তিনটি ক্রুজার, তিনটি ডেস্ট্রয়ারসহ আরও কিছু যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৪৪টি যুদ্ধ-উড়োজাহাজ ধ্বংস এবং আরও ১৫৯টি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২৪০৩ জন সৈন্য নিহত হয় এবং ১১৭৪ জন আহত হয়। সংক্ষেপে এই হলো তথ্য, বিশাল কিছু নয়; কিন্তু এরপরেও বিশাল, কারণ ওটা আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান। আমেরিকা অন্যদেশ আক্রমণ করে, অন্যের ক্ষতি করেই অভ্যস্ত, আক্রান্ত হওয়া তাদের অভিধান বহির্ভূত বিষয়। জাপানি এই আক্রমণের পরে যুক্তরাষ্ট্র অফিসিয়ালি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এর পরের ইতিহাস সবার জানা। আমেরিকায় জাপানি বংশোদ্ভূত জনগণের ওপর তীব্র নিপীড়ন নেমে আসে। তারপরে আসে পারমাণবিক বোমা, হিরোশিমা নাগাসাকি শহর ধ্বংস করে দেওয়া হয়, সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে নতুন যুগ। বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়, একদিকে সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন, অন্যদিকে সমাজবাদী প্রতারণা। সে কাহিনি ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিকদের জন্য।
ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে আমরা গিয়েছিলাম হনুলুলুর পলিনেশিয়ান কালচারাল সেন্টারে। বাস চলেছিল প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ধরে। ডানদিকে ছিল জল, ঢেউ, দ্বীপ আর জলের মধ্য থেকে উঠে আসা এক নিঃশঙ্গ শৈল-পাহাড়। দেখতে সে মহিলাদের হ্যাট বা টুপির মতো।
যেন কোনো নারী জলে নেমে নিমজ্জিত করেছে দেহ, টুপিটি না খুলেই।
কী ছিল তার গায়ে? লিবিডোর বৃশ্চিক দংশিত কামনার জ্বর? কে দেবে তার উত্তর?
কয় লক্ষ বছর সে নেমে আছে জলে এবং কয় লক্ষ বছর পরে হবে তার প্রেমিকের প্রত্যাবর্তন, কেউ জানে না। না-আমি, না-তুমি। আমাদের লক্ষ বছর সময় নেই, পাথরের আছে।
বামপাশে পর্বতমালা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে নিশ্চুপ, মুখে তাদের নৈঃশব্দ্যের অর্গল। চিল উড়ছে সেই পর্বতরাজির মাথার ঠিক তালুর ওপরে, চক্রাকারে, যেমন লের্মন্তভের জাদুবদ্ধ 'ডেমন' উড়ছিল রূপসী তামারার বাড়ির ওপর। দিন দাঁড়িয়ে আছে থম করে।
আমি হাত ধরে বসে আছি যার, সে আমার আপন। নারিকেল গাছের পাতাগুলো নড়েনড়ে বাতাস দিচ্ছে, আকাশে নীলের মাঝে সাদা মেঘের বায়োস্কোপ। দৃশ্যের পরে দৃশ্য।
পলিনেশিয়ান সেন্টার হলো এক চমৎকার আনন্দ মেলা। সেখানে ছোট ছোট খাল কেটে তৈরি করা হয়েছে ছয়টি দ্বীপপুঞ্জ। এদের নিজস্ব ঘরবাড়ি, মন্দির, গুল্ম, বৃক্ষ ও ফুল-ফল। সারা বিশ্ব থেকে পড়তে আসা হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এর প্রাণস্পন্দন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তারা এখানে কাজ করে। বিভিন্ন প্যাভিলিয়নের সঙ্গে পরিচিত করাসহ জাতিসমূহের ইতিহাস, সংস্কৃতি, গান-বাজনা-নাচ সবকিছুর পরিবেশক তারাই।
হেঁটে হেঁটে দেখা যায়, আবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যায় নৌকায় চড়ে। আছে পাহাড়ি ঝরনা, আছে জলপ্রপাত, সবটাই মনুষ্য নির্মিত। প্রত্যেক প্যাভিলিয়নে আছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করার ২০-২৫ মিনিটের অনুষ্ঠান। নাচ, গান, জীবনযাপন প্রণালি।
সামোয়ানদের ঘরগুলো বিশাল গাজিবোর মতো গোল, মাথার ওপরে শুধু চাল, বাকি সব উন্মুক্ত, কোনো দেয়াল বা দরজা-জানালা নেই। সেখানে মুক্ত হাওয়া খেলে সারা ঘরে। সেখানে চন্দ্রালোকে নারী উন্মুক্ত হয় তার প্রেমিক পুরুষের সামনে এবং সমস্ত আকাশ, নক্ষত্রের আলো, রাতজাগা খেচর, জোনাকি পোকা, ও পাদপ-পুত্রিরা দেখে ভালোবাসার মন্থন। কত সহজ জীবন তাদের। দৃষ্টির আড়ালের জীবন দৃষ্টির সামনে।
পলিনেশিয়ান ছয়টি দ্বীপের প্রতিনিধিত্ব আছে এখানে। এবং তাদের প্রীতি অভিবাদনগুলো বেশ সুন্দর।
হাওয়াই দ্বীপে ওরা বলে- 'আলোহা', আর সামোয়া দ্বীপে- 'টালোফা'। তাহিতি দ্বীপের মেয়েরা আগুনের মতো, ওরা ফিক করে হাসে আর কোমর দুলিয়ে বলে- 'লা অরানা'।
ফিজিয়ানরা গম্ভীর, বলে- 'বুলা ভিনাকা'। টোঙ্গার ওরা বলে কবিতার ভাষায়- 'মালোয়ে লেলে'।
আর এওটিয়ারোয়া বা নিউজিল্যান্ডের দ্বীপে বলে- 'কিয়া অরা'।
ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, প্রেম-ভালোবাসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও দ্রোহের জগৎ। কত নাচ, কত গান, ঢোল ও ড্রামের দ্রুত তাল। নারীরা নিজ নিজ লোকজ স্কার্ট পরে নাচছে। তাদের মাথায় পত্রপল্লবের চক্র, গলায় ফুলেল বর্ণ বৈচিত্র্যের মালা, আর চোখে বনহরিণীর চকিত চাহনি। তাদের ঊরু ও শ্রোণিতে অসামান্য গতি ও দ্রুতির হুলা-ঝরনা। তাদের বুকে কালবৈশাখীর নর্তন। এত গতি কোত্থেকে? এত যৌবন? এত ঢেউ?
টিপটিপ করে একটু বৃষ্টির পরে রোদ ঝলমল করে। বিশাল এক রামধনু জুড়ে দিয়েছে আকাশের এপাশ-ওপাশ। এমনি এক রামধনু বেয়ে হাওয়াইয়ের 'বোরো বোরো' দ্বীপের মহাপর্বত 'পাহিয়া' থেকে নেমে আসত যুদ্ধদেব 'ওরো' (Oro)। সে 'ভাইট্যাপি' গ্রামের এক মানবীকে ভালোবেসেছিল।
বৈরামতি ছিল তার নাম। 'ওরো' তাকে হ্রদের জলে স্নানরত দেখেছিল। আর যোদ্ধার সাজে তার সুদর্শন রূপ দেখে বৈরামতিও ভালোবেসে নিজেকে সমর্পণ না করে পারেনি। কী হয় এই রূপযৌবন দিয়ে, যদি তার মধু পান না করে ভালোবাসার মধুকর?
এরপর থেকে প্রতিদিন প্রত্যুষে সে নেমে আসত রামধনুর সিঁড়ি বেয়ে, সারাদিন কাটাত বৈরামতির সঙ্গে, তারপর সন্ধ্যায় চলে যেত 'পাহিয়া' পর্বতে। কতটুকু দূর 'ভাইট্যাপি' গ্রামের সেই গ্রাম থেকে, যেখানে কী যেন নাম তার, মিশনপাড়া?
সেখানেও তো প্রতিদিন ছুটে যেত একতাল অনুভূতির এক স্কেলেটন।
বিগত হয়ে যাওয়া ভালোবাসা ও প্রেমের উঠানে এখন উন্নতির বহুতল ইমারত। শুধু আগাছা, ছত্রাক আর শূন্য হাওয়া হুহু করে স্মৃতির গুদামে।
মিশনপাড়ার সেই উঠান ছিল সংকীর্ণ, কিন্তু ভালোবাসা ছিল বিরাট।
টিনের ঘরের দরজা খুলত অপ্রশস্ত রাস্তায়, দরজার পরে সিমেন্টের সরু 'ওটা', তার মাত্র দেড় হাত দূরে পাষাণের দেয়াল। এত সরু যে মুখোমুখি দাঁড়ালে পিঠ ঠেকে যেত দেয়ালে, আর বুকে বুকে।
যেমন বৈরামতির বুকের স্তন ঠেকত ওরোর বুকে আর ওরোর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত। হতো অসম্ভবের অবাস্তব শিহরণের বিকার।
দৈব দুর্ঘটনার সেই সব দিন। হাওয়াই দ্বীপের চেয়েও কত দূরে এখন।
'এই, আমার চোখের দিকে তাকাও না।'
ওরো ঠিকই তাকিয়েছিল, কী যেন ছিল সেখানে, কী যেন, ভীষণ জটিল, সে বুঝতে পারেনি। নিষাদের ব্যাধ। সে তার চোখে তাকিয়ে ব্যাবিলনের আকাশের হাজারো কবুতরের একজন হয়ে গিয়েছিল, যারা ধুপ ধুপ করে মরে পড়ছিল আলেক্সান্দারের পায়ের সামনে।
মৃত কবুতর! অর্নিটোজ রোগে নয়, ভালোবাসার রক্তক্ষরণে।
আচার্য বলেছিল, 'ও শহরে যেও না, নির্ঘাত মারা যাবে'। আলেক্সান্দার শোনেনি।
জেদি ও আত্মম্ভরি। শোনেনি বলেই .... সে মৃত, ওরো নয়, আর আমি ... পৃথিবীর পথে।
'ওরো' কি এখনও আসা-যাওয়া করে বৈরামতির কাছে?
রামধনু এখনও ওঠে। এখনও বুকের এক পাশ চিরে অন্য পাশে জোরা লাগিয়ে যায়।

বিষয় : হাওয়াই ভ্রমণকথা

মন্তব্য করুন