শিল্পী কামরুল হাসান নিজেকে পটুয়া বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। কিন্তু তিনি নিজে পটুয়া ছিলেন না। পটুয়া শিল্পীরা আমাদের বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী শিল্পী, যারা প্রকৃতি থেকে রং ও উপাদান সংগ্রহ করে ছবি আঁকতেন। শিল্পী কামরুল হাসান যখন ১৯৩৮ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেন, ঠিক তার এক বছর পরে ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে এবং সেই সঙ্গে পটচিত্রীদের সাথে তার সম্পর্ক হলো। তাদের কাজের ধারা তিনি দেখলেন এবং গ্রামের মানুষের মাঝে যে এ রকম প্রতিভা আছে, তারা এ রকম নিজস্ব প্রক্রিয়ায় নিজস্ব ধরনে ছবি আঁকে, সেটি দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি পাশ্চাত্য যে রীতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তার সাথে তুলনা করে দেখলেন আমাদের দেশের ঐতিহ্য কম সমৃদ্ধ নয়; ফলে এর দিকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টি ফেরালেন। অর্থাৎ তিনি দেশের জন্য, মাটির জন্য, জাতিগত পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সম্মানজনক বোধ থেকে তিনি নিজেকে পটুয়া বলে পরিচয় দিতেন।
আমরা এখন কথা বলছি কামরুল হাসানের জন্মশতবর্ষ নিয়ে। কামরুল হাসান ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মারা যান। মাত্র ৬৭ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। এই ৬৭ বছরের যে জীবন, সে জীবনের এক অংশ কেটেছে কলকাতায়। তার জন্ম কলকাতা শহরে। অনেকেই জেনে বিস্মিত হবেন যে, কলকাতা শহরে তার বাবা কাজ করতেন একটি কবরস্থানে। এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার বাবা একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তার পরিবারের লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই কবরস্থান গড়ে উঠেছিল। তারা সেখানে বসবাস করতেন ও সেখানেই তার জন্ম। ১৯৪৮-এর শুরু পর্যন্ত প্রায় ২৬ বছর তিনি কলকাতায় ছিলেন। বাকি সময় অর্থাৎ ৪৮ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত তার ঢাকায় কেটেছে এবং তিনি তিনটি শাসনকাল দেখেছেন। তা হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল, পাকিস্তানের আধা ঔপনিবেশিক শাসনামল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনামল। এগুলোর মধ্য দিয়ে তার কেটেছে একটা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ জীবন।
আমরা যদি লক্ষ্য করি, যারা বাংলাদেশে আধুনিক চিত্রকলার সূচনা ঘটালেন, সেই আধুনিক চিত্রকলার তিন প্রধান স্তম্ভ হলেন- জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান এবং সফিউদ্দীন আহমেদ। জয়নুল আবেদিনের পরেই যে নামটি উচ্চারিত হয়- তিনি কামরুল হাসান।
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পী যারা আমাদের দেশের আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃৎ, তারা নিজেরা ছিলেন এতটাই সমৃদ্ধ, শক্তিমান ও সম্ভাবনাময় যে আমরা বিশ্বমানের শিল্পীদের সাথে তাদের তুলনা করতে পারি। জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন তিনজনকেই আমরা বিশ্বমানের শিল্পী হিসেবে দেখি। এবং তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে, চিত্রকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করে গেছেন। আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এবং এ দৃষ্টান্ত শুধু তাদের সাংগঠনিক শক্তি, মানে ছবি আঁকার যে রীতিগত শক্তি, সেটির ক্ষেত্রেই নয়, বিষয় অন্ব্বেষণের বৈভবের ক্ষেত্রেই নয়। সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তারা সমৃদ্ধ করে গেছেন, তারা শুধু চিত্রকর্মের মধ্যেই আবদ্ধ থাকেননি।
আমাদের সমগ্র রুচি নির্মাণ করে গেছেন। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে যে রুচি, আমাদের সাংস্কৃতিক অভিরুচি, তারা সমগ্র জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন। যার জন্য জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীনকে আমরা জাতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখি। সেই ব্যক্তিত্বের একজন কামরুল হাসানের আজ জন্মশতবর্ষ পূরণ হলো। এর মধ্যে ৬৭ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার শক্তিমত্তার প্রমাণ রেখে গেছেন এবং তার মনের উদারতা, মানবিকতার চিহ্ন রেখে গেছেন। তিনি অত্যন্ত উদার মনের মানুষ ছিলেন, কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের মধ্যে তিনি ছিলেন না। এবং তিনি যে কোনো ধরনের কূপমণ্ডূকতা, রক্ষণশীলতা, অগণতন্ত্র, অনাচার, স্বৈরাচার সবকিছুর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি শুধু স্টুডিওর মাঝে, শুধু ছবি আঁকার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি সব সময় যে কোনো ধরনের অন্যায়, অধর্ম ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তিনি মিছিলে অংশ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে কামরুল হাসান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন যে স্টুডিওর মাঝে আবদ্ধ থেকেই বড় শিল্পী হওয়া যায়, তা কিন্তু নয়। শিল্পীরা তো সৌন্দর্য নির্মাণ করেন। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান- তারা সব সময় সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন তাদের ক্যানভাসের মধ্যে, কাগজে, রংতুলি দিয়ে এবং একই সাথে সমাজকে সৌন্দর্যহানি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য, মুক্ত করার জন্য অবদান রেখে গেছেন।
এই সূত্রে আরেকটি কথা বলি, কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরেই তিনি যে ব্রতচারী শিবিরে যোগ দিলেন তা কিন্তু শুরু করেছিলেন গুরুসদয় দত্ত। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের জেলা পর্যায়ের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির যেসব লোকঐতিহ্য, সেগুলোকে সামনে নিয়ে এলেন। এর মাঝে একটি রাজনীতি আছে তা আমাদের বুঝতে হবে। যে রাজনীতির সাথে কামরুল হাসানও জড়িয়ে পড়লেন। সেটি হলো, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ আমাদের শাসন করেছে শোষণ করেছে কিন্তু তারা খুবই সুচতুরভাবে এই বিষয় অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, তারা আমাদের শাসন-শোষণের জন্য আসেনি, এসেছে আমাদের আলোকিত করার জন্য। তাদের হাতে আছে জ্ঞান, উন্নত সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবোধ। তারা বলেছে, তোমরা ভারতীয়, তোমাদের কোনো ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নেই, জ্ঞান নেই। আমরা এসেছি তোমাদের উদ্ধার করার জন্য, জ্ঞানের আলোয়, সংস্কৃতির আলোয়, শিল্পকলার আলোয় আলোকিত করার জন্য। এসব মিথ্যাচার উপনিবেশবাদের শাসনের চেয়েও বড় শোষণ। কারণ, এসব প্রচারণা আমাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। আমাদের একটা হীনম্মন্য ভারতবর্ষীয় হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। আমাদের মধ্যে যে একটা হীনম্মন্যতার বোধ প্রবেশ করিয়ে দিয়ে গেছে, সেটির বিরুদ্ধে ব্রতচারী আন্দোলন ছিল মস্ত বড় প্রতিবাদ। এটি ছিল মূলত বাঙালিত্বের সাধনা। বাঙালি সংস্কৃতির যে প্রকৃত ইতিহাস, তা ফুটে উঠেছে ব্রতচারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যার ফলে কামরুল হাসান যখন এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন, তখন তিনি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এই রাজনীতিটুকু উপলব্ধি করলেন যে ব্রিটিশরা আমাদের সাথে রাজনীতি করছে এবং এর বিরুদ্ধে আমাদের একটি পাল্টা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া দরকার। আর তা হলো এই উপলব্ধি যে, আমরা সাংস্কৃতিকভাবে অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের একটা ইতিহাস আছে। তোমরাই শুধু জ্ঞান নিয়ে আসোনি, জ্ঞানের চর্চা আমাদের এখানেও হয়েছে বা হচ্ছে। এই ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার ফলে তার ভেতরে অনেকগুলো জিনিস প্রবেশ করেছে। তন্মধ্যে অন্যতম বাঙালিত্বের বোধ।
ব্রতচারী শিবিরে রায়বেশী নৃত্য নামে একটি নৃত্য পরিবেশিত হতো, এখানে আমাদের শক্তিমত্তা উপস্থাপন করা হতো। ব্রিটিশরা যে আমাদের দেখিয়েছে আমরা শক্তিহীন, তার বিপরীতে আমাদের ভেতরে যে শক্তি ছিল, তা দেখানো হয়েছে। আর পটুয়াদের কথা আগেই বললাম, যে পটুয়াদের সাথে কামরুল হাসান সম্পর্কিত হলেন, দেখলেন তাদের ছবি আঁকার উন্নত রূপ। এই যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি, যেটাকে কালচারাল পলিটিকস বলে, শাসকরা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করে আরেকটা জাতিকে দমন করে, শাসন-শোষণ করে। অর্থনৈতিক শাসন-শোষণের চেয়ে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মধ্য দিয়ে যে শাসন সেটা আরও ভয়াবহ এবং এর রেশ দীর্ঘমেয়াদি হয়। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন কামরুল হাসান। যার ফলে তার কাছে স্পষ্ট ছিল জীবন ও সমাজ সম্পর্কিত চেতনা।
এরই প্রভাবে সে সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লেখক ও শিল্পীদের সাথে, গণনাট্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছেন, এআরপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র হলেও সমস্ত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি আর্ট স্কুলের ছাত্র, অথচ তিনি বডিবিল্ডার হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। শিশুদের সংগঠন মণিমেলা, মুকুলফৌজ এসবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি যখন বাংলাদেশে ৪৮-এ এলেন, তার জন্মভূমি ছেড়ে তাকে আসতে হলো এখানে, ঢাকাতে। তার চিন্তার জায়গাটা পরিস্কার ছিল বলে ভাষা আন্দোলনে খাজা নাজিমুদ্দিন যখন উর্দুর পক্ষে কথা বললেন, তখন তিনি তাকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র আঁকলেন। তিনি এখানকার যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, তাতে কলকাতার মতো যুক্ত হয়ে পড়লেন। এখানে ৫১, ৫২, ৫৩-তে যেসব সাংস্কৃতিক সম্মেলন হয়েছে কোনোটা ঢাকায়, কোনোটা কুমিল্লায়, কোনোটা চট্টগ্রামে, তিনি তাতে যোগ দিয়েছেন, ছবি প্রদর্শন করেছেন। '৫৭-তে কাগমারীতে মওলানা ভাসানীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন। পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে একটা রেনেসাঁ বা নবজাগরণ তৈরি হলো দেশে, শিল্পী-সাহিত্যিক সবার মধ্যে নতুন চেতনার জাগরণ ঘটল। তাতে সৃষ্টি হলো একটি নতুন দেশ। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে, নাম তার পাকিস্তান, কিন্তু সে পাকিস্তান প্রগতিশীলদের কাছে ৪৭-এই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি সত্তার একটা নবজাগরণের সৃষ্টি হলো। আমরা উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক যে রেনেসাঁ দেখি, তার বিপরীতে বিশ শতকে ঢাকাকেন্দ্রিক ভাষা আন্দোলনের সময় যে রেনেসাঁটি সৃষ্টি হলো, তা অনেক শক্তিশালী। এটি সম্পূূর্ণ অসাস্প্রদায়িক, ভাষাভিত্তিক। এখানে কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাই বাঙালি। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আরও প্রবল হয়েছে ষাটের দশকে।
এসব আন্দোলন সংগ্রামে কামরুল হাসান নিবিষ্টভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। আমরা দেখি, ৬০-এর দশকে নিউমার্কেটে রূপায়ণ নামে একটি দোকান দিয়েছিলেন তার মিসেস, যেখানে শাড়িতে বাংলা বর্ণমালা দিয়ে ডিজাইন করে জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির বটগাছকে অক্ষর দিয়ে সাজিয়ে অক্ষরবৃক্ষ করলেন। এগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে ভাষার চেতনা বিস্তৃত হয়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ৭১-এর মার্চ মাসে যে অসহযোগ আন্দোলন হলো, তাতেও তিনি প্রবলভাবে সক্রিয় ছিলেন। কামরুল হাসান সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত থেকেছেন।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি সংবলিত পোস্টার এঁকে কামরুল হাসান বিশেষভাবে খ্যাতি অর্জন করেন। পোস্টারটির ভাষা ছিল এইরূপ- (বাংলায়) এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই পোস্টারটি যেন সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে তিনি পোস্টারের জন্য ইয়াহিয়ার অনেক স্কেচ করেন এবং ২৩ মার্চ ওই সব স্কেচসংবলিত অনেক পোস্টার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে টাঙিয়ে দেন। ২৫ মার্চে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হানাদার বাহিনী হামলা করল। বহু মানুষের প্রাণ গেল। কামরুল হাসান ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কলকাতায় গেলেন। শিল্পী-সংস্কৃতির কর্মীদের সংগঠিত করলেন। প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন। এসব কিছু দিয়ে দেশের জন্য তিনি নিজেকে নিবেদন করলেন। যখন দেশে ফিরলেন তখন বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত হলেন। কামরুল হাসান সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারি প্রতীকেরও ডিজাইন করেন। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতীক অঙ্কন। অথচ ৭৪ সালে যখন দেশে আমলা-রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা দুর্নীতি বেড়ে গেল তার সমালোচনা করে সিরিজ আঁকলেন ইমেজ '৭৪ নামে। আবার ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো তার মাধ্যমে যে সামরিক শাসক আসল তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে তিনি প্রতীকী অর্থে শেয়ালের ছবি আঁকলেন। তার শেষ রেখাচিত্রতে তিনি স্বৈরাচার এরশাদকে কটাক্ষ করে আঁকলেন- 'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে'। এভাবে আমরা লক্ষ্য করি, কামরুল হাসান জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক ছিলেন, ছিলেন দেশাত্মবোধে পুরোপুরিভাবে উদ্বুদ্ধ। এ কারণে প্রগতিশীল সব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। সব ধরনের ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং মুক্তবুদ্ধি ও গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। মানবকল্যাণই ছিল তার আদর্শ। ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের অন্যতম। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই ১৯৫০ সালে বাংলার শিল্পীরা আর্ট ইনস্টিটিউটের বাইরে শিল্প আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে গড়ে তোলেন 'ঢাকা আর্ট গ্রুপ'; তার সঙ্গেও তিনি ছিলেন। 'গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস'-এ কামরুল হাসান এগারো বছরেরও বেশি সময় শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন।
তিনি বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে ছবি এঁকেছেন। তেলরঙে, জলরঙে তার অসাধারণ চিত্রকর্ম আমরা দেখতে পাই। এ ছাড়া প্যাস্টেল, পোস্টার রং, টেমপারা, গোয়াশ প্রভৃতি মাধ্যমে তিনি ছবি এঁকেছেন। প্রিন্ট মিডিয়তেও, যেমন লিথোগ্রাফ, এচিং, লিনোকাট পদ্ধতিতে তিনি চিত্র এঁকেছেন। আর তিনি নিজে ছিলেন গ্রাফিক ডিজাইনের শিক্ষক। ফলে এই ব্যবহারিক শিল্পেও ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। এর আগে কাজী আবুল কাশেম এঁকেছেন, জয়নুল আবেদিনও কিছু প্রচ্ছদ করেছেন। কিন্তু কামরুল হাসান প্রচ্ছদ শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, কী রকম সাহসী ও রাজনীতি সচেতন লোক ছিলেন, ৭৫-এর পরে ঘাতক দালালদের সুবিধাজনক অবস্থা, তখন কেউ সাহস পায় না; 'একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়' এই বইয়ের প্রচ্ছদ কিন্তু তিনিই করেছেন।
এর বাইরে আমরা বলতে পারি, লোকশিল্পের সাথে তার সংযুক্ততার নতুন মাত্রা সম্পর্কে। আধুনিকতা তার কাছে শুধু পাশ্চাত্য আধুনিকতা নয়। ব্রতচারী শিবিরে যোগ দিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে পাশ্চাত্য যে আধুনিকতা নিয়ে এসেছে ওটাই শুধু আধুনিকতার একমাত্র চিত্র নয়। আমাদেরও রয়েছে আধুনিকতার চেতনা। আমরা যে ভারতবর্ষীয়, বাংলাদেশীয়, আমাদের দেশের মাটি, দেশের মানুষের মানসিক গড়ন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি- এর সঙ্গে মেলবন্ধন বা সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃত আধুনিকতা চিনতে পারব।
আমরা যদি শুধু পাশ্চাত্য আধুনিকতা অনুসরণ করি, সেই অনুসরণের মধ্যে কোনো গর্ব নেই। আমার অহংকার তখনই হবে যদি আমার দেশের মতো করে আমরা আধুনিকতাকে সামনে নিয়ে যেতে পারি। এটিই তিনি প্রথম লক্ষ্য করলেন যামিনী রায়ের মধ্যে। সর্বশেষ তিনি লক্ষ্য করলেন, পঞ্চাশের দশকে জয়নুল আবেদিন যখন লন্ডনে গেলেন এবং এক বছর সেখানে থেকে ফিরে এসে বললেন আমাদের আধুনিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে লোকশিল্পের দিকে তাকাতে হবে এবং এর সাথে আধুনিকতার একটা সমন্বয়সাধন করতে হবে। তখন তিনি ওই বোধগুলোকে, ব্রতচারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উত্থিত বোধ, যামিনী রায়ের চিত্রসূত্রে গঠিত বোধ, এবং সর্বশেষ জয়নুলের কথার মধ্য দিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপে দেখতে পেলেন এবং সবটার প্রতি তিনি আরও বেশি মনোযোগী হলেন। এই মনোযোগটা ব্যাপক বিস্তৃত হলো যখন ১৯৬০ সালে চারুকলার শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে ডিজাইন সেন্টারে যোগ দিলেন, যা সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা, এখন যেটা বিসিক। এখানে কাজ করতে করতে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে তিনি লোকশিল্পকে আরও গভীরভাবে নিবিড়ভাবে চেনার সুযোগ পেলেন। ফলে তার শিল্প আরও বেশি সমৃদ্ধ হতে লাগল।
লোকশিল্পীরা মৌলিক রং ব্যবহার করেন যেমন লাল, নীল, হলুদ। কিন্তু আধুনিক শিল্পীরা ওভাবে ব্যবহার করেন না। কিন্তু কামরুল হাসান লোকশিল্পীদের মতো ব্যবহার করেছেন মৌলিক রং। পার্থক্যটা হলো, পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্পীদের মতো তিনি মৌলিক রং ব্যবহার করে তাদের ছবিতে কাছে-দূরের একটা পরিপ্রেক্ষিতের বোধ তৈরি করেন। আমাদের পটচিত্রীরা এটা জানত না। কামরুল হাসানের ছবিতে আমরা দেখি যে দ্বিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও ছবিকে ত্রিমাত্রিক করে তোলা হয়েছে। এটাও আধুনিকতার লক্ষণ। এগুলো তিনি এত অসাধারণভাবে করেছেন যে, এটা তার ভেতরেই ছিল, ভেতর থেকে এসেছে।
তিনি প্রতিনিয়ত ছবি আঁকতেন। শুধু স্টুডিওতে ছবি এঁকেছেন তা না; যেখানেই বসেছেন, বাসে যাচ্ছেন ছবি আঁকতেন। যে কোনো কিছুর ওপর, কাগজ বা সিগারেটের প্যাকেট যেখানে একটু সাদা পেয়েছেন আঁকতেন। তার বহু ছবি তিনি উপহার হিসেবে দিয়ে দিতেন। তার মেয়ের বিয়েতে দেখা গেল যে, যত অতিথি এসেছেন, প্রত্যেককে একটা করে ড্রয়িং দিয়েছেন। কামরুল হাসানের মনটা ছিল উদার। শিল্পী হয়েছি বলে ছবি আঁকব, বিক্রি করে টাকা উপার্জন করব, এগুলো তার ভেতরে ছিল না। একবার বাংলা একাডেমিতে একটা স্টলে ছবি রাখলেন, তিনি স্টলের লোকদের বলে দিলেন যদি দেখ কোনো ছাত্র এসেছে তার কাছ থেকে রাখবে ২০০ টাকা, যদি দেখ মধ্যবিত্ত, তার কাছ থেকে রাখবে ৪০০ টাকা। মানে ছবি বিক্রির ব্যাপারেও অর্থ থাকা-না থাকার ওপর দাম নির্ধারণ করে দিতেন। তার এই সচেতনতা বা মূল্যবোধগুলো ছিল অসাধারণ। তিনি সব সময় চেষ্টা করেছেন যেন চিত্রকলা সর্বসাধারণের কাছে যায়। এটা যেন বিত্তবানদের গৃহ সাজানোর ব্যাপার শুধু না থাকে। এই বোধটা উপনিবেশবাদ বিরোধী একটা বোধ। কামরুল হাসান ১৯৭৭ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত ৪২টি খেরোখাতায় দিনলিপি লিখেছেন। এগুলো ছিল অসাধারণ শৈল্পিক সৃষ্টি। দেখা গেল, প্রতিটা লাইন একেক রকম কালির কলম দিয়ে লিখছেন। লাল, নীল, সবুজ। আবার প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে বিভিন্ন নকশা, শিল্পকর্ম। প্রতিটি পৃষ্ঠাই হয়ে উঠেছে একেকটি আর্ট।
এই হলো কামরুল হাসান। আমাদের পথিকৃৎ শিল্পীদের অন্যতম। যাকে আমরা বলতে পারি প্রাতঃস্মরণীয়। তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন যে, কোন পথে গেলে আমাদের শিল্পের মুক্তি মিলবে, আমাদের সৌন্দর্যের মুক্তি মিলবে। তার দৃষ্টান্ত যদি আমরা অনুসরণ করতে পারি, তাহলে আমরা জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ হব; শিল্পের সৌন্দর্যকে আমরা জীবনে সফলভাবে যুক্ত করতে পারব। সেটাই হবে আমাদের সার্থকতা। কামরুল হাসানকে যদি আমরা প্রকৃত অর্থে স্মরণ করতে চাই তার এই জন্মশতবার্ষিকীতে, তাহলে তার সমগ্র জীবন এবং সমগ্র শিল্পকর্ম দুটিকেই অনুসরণ করতে হবে। এই দুয়ের নির্যাসকে বোধের গভীরে নিতে হবে। তাহলেই তাকে স্মরণ করা আমাদের সার্থক হবে।