আমাদের একটা গর্বের অনুষঙ্গ কামরুল হাসান। তার ছাত্রদের মধ্যে সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম এবং আমি; এই চারজন এখনও বেঁচে আছি। আমরা চারজনই গর্ব করেই বলি- আমি কামরুল হাসানের ছাত্র ছিলাম। তাকে, আমি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি দু'বছর। তারপর অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। উনি তৎকালীন কমার্শিয়াল বিভাগ অর্থাৎ গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। চারুকলায় ওই সময়ের লেখাপড়ার ধরন-ধারণ এখনকার সঙ্গে ঠিক মিলবে না। সব শিক্ষকই ঘুরেফিরে সবার ক্লাস নিতেন। আবার যে বিষয়ের শিক্ষক নিজ বিভাগে চলে যেতেন। আমার বেশ মনে আছে, কামরুল হাসান স্যার হঠাৎ হঠাৎ যখন আসতেন জলরঙের ক্লাসগুলো উনি খুব উৎসাহের সঙ্গে নিতেন। আমাদের বলতেন, আরে নেচারকে হুবহু তুলে আনার দরকার কী? হলুদকে হলুদ দাও, সবুজ দাও- একদম কাঁচা। উনি আমাদের কাগজ ভিজিয়ে হাতে-কলমে দেখাতেন। আমাদের মতো নবীন ছাত্রের জন্য তার কথা সঠিকভাবে পালন করা খুব সহজ ছিল না। বরং কঠিন একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু তিনি আমাদের সহজ করে দেখিয়ে দিতেন এবং সব সময় ছবি আঁকতেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন রাজনীতি-সচেতন একজন মানুষ। প্রগতিশীল ভাবনা তাকে সব সময় দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
কামরুল হাসানের ছবি আঁকার নেশাটা ছোটবেলা থেকেই ছিল। আমরা দেখি তিনি যখন কলকাতা মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন থেকেই পড়ালেখার চাইতে ছবি আঁকায় মেতে থাকতেন বেশি। সে মাতামাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পরীক্ষা দিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পরিবর্তে আর্ট স্কুলে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেন। পাস করে ভর্তির ফরম নিয়ে সোজা তার বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। বাবার প্রথমে অমত থাকলেও কামরুল হাসানের প্রবল আগ্রহের কারণে আর্ট স্কুলে পড়ার সম্মতি দেন। তবে শর্ত দেন, আর্ট স্কুলে পড়ার যাবতীয় খরচ কামরুল হাসানের নিজেকেই বহন করতে হবে। এজন্য তাকে কঠোর পরিশ্রমও করতে হয়েছে। উপার্জনের জন্য কামরুল হাসান পুতুল তৈরির একক কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে সেলুলয়েডের পুতুলে চোখ আঁকতে হতো তাকে। প্রখর আলোয় ওই চোখ আঁকতে গিয়ে কামরুল হাসানের নিজেরই দৃষ্টিশক্তি খানিকটা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। জীবনের এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরে তিনি 'চক্ষুদান' নামে একটি গল্পও লিখেছিলেন। এসব কাজের জন্য তার ঘরে ফিরতে অনেক রাত হতো। তবে রাত যতই হোক তার বাবা জেগে থাকতেন এবং নিজেই দরজা খুলে দিতেন।
এ সময় তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে বোমা আতঙ্কে কলকাতা শহর থেকে লোকজন ব্যাপকভাবে গ্রামমুখী হয়। স্কুল-কলেজ ও অফিস বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে সৃষ্টি হয় এ. আর. পি. (এয়ার রেইড প্রিকশন)। কলকাতা শহরে জাপানি বোমা হামলার বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সতর্ক করা এবং তাদের আত্মরক্ষার সাহায্যার্থে সরকার এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে। সরকারের আবেদনে অনেকেই এআরপির কর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এবং এই কর্মীদের ভিড়ে কামরুল হাসানও ছিলেন।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কামরুল হাসান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর 'ফরোয়ার্ড ব্লক'-এ যোগ দেন। সুভাষচন্দ্র বসুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েই তিনি এই দলের সঙ্গে যুক্ত হন। শুরু হয় ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে চিত্রশিল্পীরা ছবি আঁকেন। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ-বিষয়ক ছবিই সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করে। এসব ছবি কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা 'Peoples war'এবং 'জনযুদ্ধ'তে ছাপা হয়। কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টি দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঁকা চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কামরুল হাসানের ছবিও এই প্রদর্শনীতে ছিল। 'মণিমেলা' ও 'মুকুল ফৌজ' এই দুই শিশু কিশোর সংগঠনের সঙ্গে কামরুল হাসান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। 'মুকুল ফৌজ'-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। তার সাংগঠনিক দক্ষতায় মুকুল ফৌজের কার্যক্রম দ্রুত প্রসার লাভ করে।
কামরুল হাসান অনবরত কাজ করতেন। কখনোই বসে থাকতে পারতেন না। গল্প করছেন, হাতের কাছে যা থাকত তার ওপর ড্রয়িং করতেই থাকতেন। সিগারেটের প্যাকেট থেকে শুরু করে ছোট কাগজ, বড় কাগজ, হাতের কাছে যা পেতেন তাতে আঁকতেন। সারা জীবন তাকে দেখেছি একইভাবে কাজ করে যেতে। শেষ বয়সে এসে খেরো খাতা লিখতে শুরু করেছেন। ডায়েরি লেখা তো, সেটা যে তিনি খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখতে তা না কিন্তু লেখার ওপরে নিচে ফাঁকে একটু ড্রয়িং করা, কোথাও একটু ইলাসট্রেট করে দেওয়া, এ রকম একটা ব্যাপার ছিল। যখন ছবি আঁকতেন না, তখন খেরো খাতা লিখতেন।
একই সঙ্গে তিনি দারুণভাবে রাজনীতি-সচেতন ছিলেন। ষাটের দশকের শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ, যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন, দাবি আদায়ের সংগ্রাম শিল্পীদের পক্ষ থেকে তিনি সব সময় আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তার রাজনৈতিক ভাবনা একদম স্বচ্ছ ছিল। কী করছেন, কেন করছেন সে বিষয়টি পরিস্কার ছিল।


তার ভাবনার ক্ষেত্র ছিল প্রগতিশীলতা। ১৯৪৭-এর পর থেকে পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়ার মনোভাব এবং তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আন্দোলন করা। ওদের সঙ্গে যে থাকা যাবে না তার কারণ ইত্যাদি বিষয়ে তার পরিস্কার একটা ধারণা ছিল এবং সেই মতো তিনি কাজও করেছেন। যেদিন তিনি চলে গেলেন সেদিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রতিবাদী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি সেটাকে তার দায়িত্ব মনে করেছেন। তার শেষ ড্রয়িংটা 'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে'। ছোট্ট একটা কাজ। একটা অটোগ্রাফ। কিন্তু, এর যে মেসেজ, তা এক বিরাট ঘটনা।
মুক্তিযুদ্ধে ইয়াহিয়াকে নিয়ে যে ছবিটা- আমি একে কার্টুনও বলি না। বোল্ড একটা ছবি। খুব কম কাজের মধ্য দিয়ে বোল্ড লেখা দিয়ে ছবিটা তিনি এঁকে ছিলেন- এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে। যেটা দেখলেই ইহাহিয়ার প্রতি মানুষের ঘৃণার উদ্রেগ হবে। শিল্পকর্ম হিসেবে এর যেমন বিশালত্ব রয়েছে, অন্য দিকে আছে তার আঁকার দক্ষতা, প্রতিবাদী প্রকাশ ক্ষমতা। কামরুল হাসানের জীবনের একটা দিক।
দ্বিতীয় ভাগ হলো, চিত্রকলার ধরন এবং চর্চা। লোকশিল্প ছিল কামরুল হাসানের শিল্পকলার কাজের ক্ষেত্র। বিশেষ করে আমাদের পটচিত্রের প্রতি ছিল তার ভালোবাসা। এগুলো থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে, উজ্জীবিত হয়ে, অনুকরণ বা অনুসরণ নয়; এগুলো থেকে তিনি রসদ নিয়েছেন, রস নিয়েছেন। আর এই সব মিলিয়ে তিনি তার চিত্রকলার ধরন তৈরি করেছেন। যামিনী রায় যেভাবে লোকশিল্পকে ধারণ করে কাজ করেছিলেন সে রকমও নয়। তিনি খুব সিমপ্লিসিটির মধ্য দিয়ে নিজস্ব ধরন তৈরি করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যারও লোকশিল্প নিয়ে কাজ করেছেন। তিনিও নিজস্ব একটা ধরন তৈরি করে কাজ করেছিলেন। পটুয়াদের যে পটচিত্র সেখান থেকে কামরুল হাসান ধারণা নিয়েছিলেন, রসদ ও রস নিয়েছিলেন। এর ভেতরের যে নির্যাস ছিল তা দিয়ে নিজের মতো করে নিজস্ব ধরন তৈরি করে সে অনুযায়ী কাজ করেছেন। কামরুল হাসান যে কাজগুলো করেছিলেন তার বড় দিক হচ্ছে, আধুনিক শিল্পকলার যে ধরন-ধারণ আমাদের আছে শিল্পীরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেদিকে যেতে পারেন। উনি খুব সহজেই ফোক ও আধুনিকতা মিলিয়ে নতুন একটি ধরন তৈরি করেছিলেন। আমি বলব এটি ছিল একটি অসাধারণ ঘটনা। তার কাজের যে ধরন এবং মান মূল্যায়নে যদি যাই, সেদিক থেকে আমি বলব বিশ্বে শিল্পকলার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় যারা আছেন অর্থাৎ ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, জাপানি ইত্যাদি দেশের বহুল প্রচারিত শিল্পী ও শিল্পকমের্র চেয়ে কামরুল হাসান কোনো অংশে কম নয়। অন্যান্য যারাই সমসাময়িক ছিলেন, তাদের চেয়ে অনেক উত্তরণ ঘটিয়ে কাজ করেছিলেন কামরুল হাসান। একদিকে লোকশিল্পের ছোটখাটো সব উপাদান, অন্যদিকে আধুনিকতাকে সংমিশ্রণ- যা তিনি সাবলীলভাবে করতেন। মোটেও বানোয়াট মনে হয় না। অন্যরা অনেক কষ্ট করে এটা তৈরি করতেন। কামরুল হাসান স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি ঘটাতেন। কামরুল হাসানকে নিয়ে তাই আমরা এত গর্ব করতে পারি। তার সামগ্রিক কাজ নিয়ে, তার অবস্থান নিয়ে যা করা উচিত ছিল আমরা তা করতে পারিনি। মূল্যায়নটা শ্রদ্ধা-ভক্তির। শিল্পকলা নিয়ে যারা ভাবে, শিল্পকলা চত্বরে যাদের পদচারণা আছে, শিল্পীদের প্রতি যারা শুভানুধ্যায়ী, শিল্পকলার কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে, সারা বিশ্বে দেশের সর্বত্র এগুলো নিয়ে যাদের জ্ঞানগরিমা আছে, তাদের কাছে কামরুল হাসান বিশাল একজন শিল্পী হিসেবে স্বীকৃত, গৃহীত এবং শ্রদ্ধেয়। কিন্তু, আমজনতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে যে ধরনের কাজ করা প্রয়োজন, তা এখনও হয়নি।
আমরা জানি কামরুল হাসান কিংবদন্তি শিল্পী কিন্তু এটা বললেই হবে না। তাকে নিয়ে, তার কাজ নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। গবেষণা থেকে শুরু করে তার কাজের প্রচার করার জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন; মোট কথা কামরুল হাসানকে নিয়ে আমাদের যে খামতিগুলো রয়ে গেছে, এটা আমরা ছাড়া- এ দেশের জনগণ ছাড়া কে করবে? কামরুল হাসানকে বাইরের পৃথিবী পর্যন্ত যেতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা না হলে কামরুল হাসান কখনোই সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবেন না। শতবর্ষে তার প্রতি আবারও শ্রদ্ধা।