১৯৯৪ সালে প্রথম প্রকাশিত নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম বেদনার চিত্র তুলে ধরেছে। এ বইটি কোনো গল্প-উপন্যাস নয়, কোনো কল্পনাকে আশ্রয় করে তার সাথে সত্যের মিশেল ঘটিয়েও এটি লেখা হয়নি। বইয়ের প্রতিটি শব্দ সত্য, যা তুলে ধরেছে একটি নির্মম বাস্তবতাকে।
যুদ্ধের প্রথমদিকে পাকিস্তানিরা ভেবেছিল মানুষ হত্যার মধ্য দিয়েই তারা বাংলাদেশকে কোণঠাসা করতে পারবে। কিন্তু যুদ্ধের তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তখন তারা যুদ্ধের নীতি হিসেবে নারীদের ধর্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিদিন মানুষ হত্যা, গ্রামের পর গ্রাম আগুন লাগিয়ে শেষ করা যেমন পাকিস্তানিদের বর্বরতার প্রতিদিনকার অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি আরেকটি বর্বরতা ছিল নারীদের ধর্ষণ করা। বাংলাদেশকে জাতিগতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া, নারীদের ধর্ষণের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ধর্ষণ বেছে নেওয়া হয়। আর এ কারণেই পরিবারের সবার সামনেই নারীদের আক্রমণ করা হতো। পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্পে প্রতিদিন গাড়ি বোঝাই করে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। কমান্ডারদের জন্য নতুন নতুন মেয়ের ব্যবস্থা করা হতো। সাধারণ সৈনিকরা একই নারীকে ঢালাওভাবে ধর্ষণ করত। নানারকম নির্যাতনের পরেও তাদের বাঁচিয়ে রাখা হতো যেন তারা সন্তান জন্ম দিতে পারে।
৯ মাসের যুদ্ধে বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী দুই থেকে চার লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। সঠিক সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। যুদ্ধ শেষে এই নারীদের যখন ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন তাদের ধর্ষিতা নামে ডাকাসহ বিভিন্ন অপমান করা হতো। বঙ্গবন্ধু এই ভাগ্যহত নারীদের নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দেন এবং তাদের বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেন। বীরাঙ্গনা শব্দের অর্থ বীর নারী।
যুদ্ধ শেষে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের জন্য অনেকগুলো কেন্দ্র খোলা হয়। নীলিমা ইব্রাহিম বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র্রে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানেই তার আলাপ হয় ভাগ্যের পরিহাসে নির্মম নিয়তির শিকার হওয়া এসব নারীর সঙ্গে। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েই রচিত হয় এই বই। সাতজনের সাক্ষাৎকার কিংবা সাতজনের জীবনের ভাগ্যলিপি প্রথমে দুটি খে প্রকাশিত হয়। তৃতীয় খ প্রকাশ করার কথা থাকলেও লেখিকার শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণে অপ্রকাশিতই থেকে যায়।
বীরাঙ্গনাদের রাখা উচিত ছিল সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে, কিন্তু রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় আমরা তাদের পায়ে পিষে ফেলেছি। তাদের নূ্যনতম সম্মানটুকু দিইনি, তাদের থেকে কেড়ে নিয়েছি মানুষের মতো বাঁচার অধিকার। কত শত অপমানে জর্জরিত হয়ে তারা বেঁচে ছিলেন, সেই তীব্র দুঃখবোধের গভীরতা আমাদের বোঝার কথা না।
কী গভীর আঘাতে একজন নারী তারা থেকে মিসেস টি নিয়েলসন হয়ে যায়, আমাদের তা জানার কথা না। মেহেরজান, রীনা, শেফা, ময়না, ফাতেমা, মিনা তাদের মধ্য দিয়েই সেই সময়ে পাকিস্তানিদের বর্বরতা আর আমাদের রক্ষণশীলতা তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।
'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' আমাদের যুদ্ধের সময়কার নারীদের ওপর নির্যাতনের চিত্রের এক প্রতিচ্ছবি। যে ছবি পাকিস্তানি হানাদারদের জঘন্যতম বর্বরতার পাশাপাশি আমাদের সমাজের অযাচিত রক্ষণশীল মনোভাবকেও তুলে ধরে, যার পরিবর্তন এত বছর পরেও খুব একটা হয়নি।
প্রশ্ন

১। বইটিতে কতজন নারীর কথা বর্ণিত হয়েছে?
২। বইটির দ্বিতীয় খণ্ড কত সালে প্রকাশিত হয়?
৩। নীলিমা ইব্রাহিমের পিতা-মাতা কে ছিলেন?
কুইজ ৩৭-এর উত্তর
১। মিলু
২। 'ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা
আকাশ জুড়ে'
৩। উপন্যাস
কুইজ ৩৭-এর জয়ী
মোহাম্মদ সেলিম
কবি কাজী নজরুল রোড, কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম

নাফিস সাদিক
অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিয়ম
পাঠক, কুইজে অংশ নিতে আপনার উত্তর পাঠিয়ে দিন ২১ ডিসেম্বর মঙ্গলবারের মধ্যে কালের খেয়ার ঠিকানায়। পরবর্তী কুইজে প্রথম তিন বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে। বিজয়ীর ঠিকানায় পৌঁছে যাবে পুরস্কার।