পর্ব: ১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে মোটা দাগে কয়েকটি পর্বের মধ্যে একটি হলো প্রতিরোধ পর্ব। প্রস্তুতি ও সরাসরি যুদ্ধের মাঝখানে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিরোধ পর্বটি মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। প্রস্তুতি পর্বটি নির্বাচনের পর থেকেই শুরু হয়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর আগেও শুরু হয়েছিল। তবে সে পর্বটা ছিলো নিরস্ত্র। সশস্ত্র পর্বটি শুরু হয় ২৫ মার্চের পর। নির্বাচনের পরে যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হলো না এবং গণহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল- তখন থেকেই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটা ছিল প্রস্তুতি পর্ব। একে প্রস্তুতি পর্ব বলছি এ কারণে যে, তখন চারদিকে বিভিন্ন ছোট ছোট সংগ্রাম কমিটি গঠিত হচ্ছে, ছাত্র এবং অন্য সক্রিয় রাজনীতিবিদরা সংগঠিত হচ্ছেন। এবং এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রস্তুতিটা চলে এসেছে।
মনে রাখা দরকার যে, হঠাৎ সংগঠিত কোনো রাষ্ট্র গঠনের যুদ্ধে সাধারণ মানুষ এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে না, তার জন্য দীর্ঘ একটা প্রস্তুতি লাগে। একে আমরা বলি ঐতিহাসিক প্রস্তুতি। যদিও আমাদের ইতিহাস চর্চাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক প্রস্তুতির বিষয়টি অনেক সময় খেয়াল থাকে না যে, জনগণ যদি অংশগ্রহণ না করে তাহলে এটা ঘটে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের এই প্রস্তুতি পর্বের কারণে বা অপ্রাতিষ্ঠানিক হলেও আমাদের রাষ্ট্র গঠন হয়ে যাওয়ার কারণে পাকিস্তান তাকে আর সামাল দিতে পারল না, তারা গণহত্যা শুরু করে দিল। কিন্তু পাকিস্তানের নিজেরও প্রস্তুতি ছিল না। ছিল না বলেই তারা দিশেহারা হয়ে গেছে। তারা যেটা ভেবেছিল এক রাতের ঘটনামাত্র- সেখানে উল্টো সেই ঘটনা থেকেই পাকিস্তানের মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গেল। জিন্নাহর পাকিস্তানের মৃত্যু ২৫ মার্চ রাতেই ঘটেছে। তারপর এ দেশে কিছুদিন তারা দখলদার হিসেবে থাকলেও নতুন করে তাদের পাকিস্তান গঠন করতে হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে পাকিস্তানের নতুন জন্ম হলো।
পাকিস্তানের প্রস্তুতির অভাব ছিল তাদের রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখায়। বাংলাদেশের ছিল না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক প্রস্তুতি ছিলো অনেক বেশি। যেহেতু এটি ঐতিহাসিক। তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এবং সাধারণ জনগোষ্ঠি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রস্তুতি সারা পৃথিবীতে এরকমই হয়। এ জন্যই মার্চ মাসের সময়টার যে প্রতিরোধের পর্যায়- সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়। এখানকার যারা অবাঙালি পাকিস্তানি ছিল, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের সংঘর্ষ হতে শুরু করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন গঠিত হয়ে যায় এবং সে রাষ্ট্রে অন্য রাষ্ট্রের মানুষ যখন জঙ্গি অবস্থান ধারণ করে, তখন এই পরিস্থিতি হতে বাধ্য। সেটা আমরা সাতচল্লিশেও দেখেছি, একাত্তরেও দেখেছি। এটা হলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা খেয়াল করলে বিষয়গুলো বোঝা যায় যে, কেন দুটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। অতীতেও ঘটেছে, নতুন রাষ্ট্র জন্মের সময় আবারও ঘটতে পারে। তবে এর দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের ওপরে। কারণ পাকিস্তান যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করতো, পাকিস্তান যদি গণহত্যা শুরু না করতো, তাহলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
বাংলাদেশের এক ধরনের প্রস্তুতি হয়ে গেছে, কারণ মার্চ থেকেই এখানে রাষ্ট্র গঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান আর্মি যখন আক্রমণ করল, তখন পাকিস্তানিদের প্রস্তুতি কতটা কম ছিল, সেটা আমরা বিভিন্ন পাকিস্তানি দলিলেই দেখতে পাই। এবং সেখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয়ভাবে আসে, তা হলো পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চের পর ২৬ ও ২৭ তারিখ পর্যন্ত চেষ্টা করেছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে থাকা বাঙালি লোকদের নিরস্ত্র করতে। সেই সময় স্বাধীনতার বিষয়টি আর কোনো গোপন ব্যাপার নয়। বাংলাদেশে থাকা বাঙালি সৈনিকরা তখন যার যার মতো প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতাটি হলো তারা সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমিত। তারা তাই কেবল বাঙালি সৈনিক-কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি করছে। ইপিআরের যে ব্যাটালিয়ন ছিল সারা বাংলাদেশে- সেখানেও তারা একই জিনিস করার চেষ্টা করছে। কিন্তু যেহেতু সেখানে সৈন্যরা সংখ্যায় অনেক বেশি বাঙালি- তাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল সেখানে দুর্বল। পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ তারা সবাই বাঙালি। তাই পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন ছিল। আর বাংলাদেশের জনগণের কথা বলতে গেলে- তারা তো তখন রাষ্ট্র রক্ষার যুদ্ধে নেমে পড়েছে। তাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কাঠামোগত কোনো নিয়ন্ত্রণ খাটে না। তাই পাকিস্তানের পক্ষে কোনোভাবেই বাংলাদেশের প্রতিরোধ পর্বটা সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না।


আমাদের গবেষণা, বিশ্নেষণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আমরা অনেক বেশি আলোচনা করি, অন্য পরিসরগুলো নিয়ে আলোচনা হয় কম। করলেও আমরা ইপিআর, পুলিশ বা সশস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলো নিয়ে করি। কিন্তু জনগণের শক্তি নিয়ে আমরা কম আলোচনা করি। এর ফলে যা হয়েছে, আমাদের ইতিহাস চর্চায় স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিরোধে জনগণের ভূমিকাই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল- সেটা বাদ পড়ে গেছে। আর এখন এতদিন পর তথ্য পাওয়াটাও প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। রাজনৈতিক কারণে অনেকে হয়তো বলতেও চাইবে না।
এ রকম পরিস্থিতিতে কাঠামোগতভাবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াটা কী ছিল? পাকিস্তান বলছে যে, আমরা আক্রমণ করেছি কারণ অনেক পাকিস্তানি বা অবাঙালি, বিহারিদের হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু কতজন মারা গেছে আসলে? চট্টগ্রামে সংঘর্ষ হয়েছিল, ঢাকায় কিছু ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু তার বিপরীতে গণহত্যা চালানোর যুক্তিটা তারা দেখাচ্ছে- যেখানে পাকিস্তান এখানে গণহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূলত ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য।
সাধারণ মানুষ কবে থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে গেছে সে বিষয়ে আমরা অতটা হিসাব না করলেও রাষ্ট্র যে আলাদা হয়ে গেছে সেটা পরিস্কার। রাষ্ট্র হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি ১৬ ডিসেম্বরের আগে, কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও গোটা ৯ মাস বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্রই ছিল। দখল হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র হলেও সেটি রাষ্ট্র ছিল। সেই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি রক্ষা কে করেছে? করেছে জনগণ। জনগণ প্রতিরোধ করেছে কারণ সে তো এই রাষ্ট্রে থাকে, খায়, জীবন-সংসার চালায় এখানকার রুটিরুজি থেকে। এ জন্য প্রতিরোধ পর্বে তার ভূমিকাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


২৫ মার্চ রাতের পর প্রতিরোধ অত বড় না হলেও হয়েছে। পাকিস্তানিরা সব সময় মিথ্যা কথাই বলেছে। আর বাংলাদেশিদের একটা অভ্যাস হলো, নিজেদের কথার চেয়ে তারা পাকিস্তানি দলিলকে বেশি বিশ্বাস করে। সেখানে যুদ্ধ বলেছে যে, আমরা খুনটুন করেছিলাম- সেটাকে আমরা খুব গ্রহণ করেছি। সে রকমই একটা হচ্ছে 'অপারেশন সার্চলাইট'। হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের মতো এই দলিলটারও উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা বলা যে, হ্যাঁ কিছু খুন আমরা করেছি, কিন্তু আসলে বাংলাদেশিরা প্রতিরোধ বা আক্রমণ করছিল। কিন্তু আমি নিজে মাঠ পর্যায়ে গিয়েও ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা কামান ব্যবহার করেছিল, এমন অদ্ভুত কথার সত্যতা পাইনি। পাকিস্তানিরা এসব দলিলে বলেছে যে, ইকবাল হলে নাকি আর্মির সঙ্গে বাঙালি ছাত্ররা গোলাগুলি করেছে। একেবারে মিথ্যা কথা। বাস্তবে একেবারে নিরস্ত্র অসহায় মানুষদের মেরেছে পাকিস্তান আর্মি। জগন্নাথ হলে তো চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও ধরে ধরে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছে। তাদের দিয়ে লাশ কবর দিয়েছে, তারপর তাদেরকেই গুলি করে মেরে রেখে গেছে।
এই বিষয়গুলো আমরা যতক্ষণ না নিজেদের তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তুলে ধরব- ততক্ষণ তো পাকিস্তানিদের দলিল থেকেই আমাদের দেখতে হবে গণহত্যা হয়েছে কি হয়নি। একদিকে পাকিস্তানি দলিলেই তো স্বীকার করছে যে তারা গণহত্যা চালিয়েছে। অন্যদিকে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, আর বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করছি যে, আমাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের দলিলের ওপর নির্ভর না করে আমরা যদি নিজেদের চর্চা থেকে এ বিষয়টি তৈরি করতাম, তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো। আমরা যেসব গ্রন্থের কথা বলি, সেই গ্রন্থগুলোর বদলে আমাদের যদি নিজেদের গবেষণা থাকত, তাহলে আমরা অনেক বেশি সবলভাবে কথাগুলো বলতে পারতাম। এর বদলে এখনও আমরা বলি যে, অমুক বলেছে গণহত্যা হয়েছে, পাকিস্তানিরাও অনেকে বলেছে গণহত্যা হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু পাকিস্তানিরা যে একাত্তরের লজ্জা ঢাকার জন্য কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলেছে, তা কল্পনা করা যায় না। এ কারণে পাকিস্তানি দলিল আমি খুব সাবধানে ব্যবহার করি। এর কারণ হচ্ছে মিথ্যা কথা বলাই হচ্ছে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য যে, আমাকে যতটা খারাপ বলা হচ্ছে আমি আসলে ততটা খারাপ না।
এই হচ্ছে প্রথম পর্যায়। তারপরই প্রতিরোধ পর্বটা শুরু হলো। কিন্তু পাকিস্তান গণহত্যা চালিয়েছে বলে প্রতিরোধ শুরু হয়নি। যে কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রতিরোধ পর্বটা থাকতে বাধ্য। পাকিস্তানিরা সেটাকে গণহত্যার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিরোধটা নিজেদের জন্য বড় করে তুলল। প্রতিরোধ হয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে, প্রতিরোধ হয়েছে পুলিশের কাছ থেকে, ইপিআরের কাছ থেকে। ইপিআরের প্রতিরোধটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ইপিআরে যাদের কথা আমরা উল্লেখ পাই তারা কিন্তু অনেকেই অফিসার না। তারা কিন্তু হাবিলদার-মেজর, সুবেদার ইত্যাদি। অর্থাৎ আমরা যাদের নন-কমিশন্ড অফিসার বলি, তাদের নাম একাধিকবার এসেছে। আমরা কিন্তু ইতিহাসে তাদেরকে অতটা জায়গা দিইনি। তাদের খুব কম নামই আমরা জানি। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠসহ আর কয়েকজনের নাম হয়তো আমরা জানি। কিন্তু এ ছাড়া সাধারণভাবে এই হাবিলদার, সুবেদাররা মুক্তিযুদ্ধে কী ভূমিকা পালন করেছিল- সে সম্পর্কে আমাদের জানা খুব কম। আমরা জানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতিরোধের কথা। সেনাবাহিনী হচ্ছে যে কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক সৈন্যবাহিনী। সেই সৈন্যবাহিনীর প্রতিরোধের কথা আমরা বেশি জেনেছি এবং পরবর্তীকালে যেহেতু তারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে- বিষয়টা তাই আরও বেশি চর্চিতও হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় ইতিহাস চর্চায় আমাদের সবার দিকেই তাকানো উচিত।


সেসব জায়গায় প্রস্তুতি বেশি হয়েছে, যেমন উত্তরবঙ্গে- সেখানে অনেক বেশি প্রস্তুতি থাকার ফলে এলাকাগুলো স্বাধীন ছিল এপ্রিল মাস পর্যন্ত। মার্চের ২৬ তারিখ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত প্রায় সব জেলাতেই এই ঘটনা ঘটেছে। এসব জায়গায় সাধারণ মানুষ কী করেছে? আমরা জিয়াউর রহমানের কথা জানি, খালেদ মোশাররফের কথা জানি, সফিউল্লাহর কথা জানি এবং আবু ওসমান চৌধুরী থেকে আরম্ভ করে অন্য সবার কথা শুনেছি আমরা। সিলেটে জনগণের সঙ্গে একত্রিত হয়ে রব এবং সি আর দত্ত রাস্তায় মিছিল করেছে সেটা জানি, কুমিল্লার কথা জানি। সকল জায়গায় সেনাবাহিনী প্রতিরোধ করেছে। এসব ঘটনার কথা ইতিহাসে দেখতে পাই। পাকিস্তান আর্মির পরিকল্পনা ছিল, যেখানে যেখানে তাদের পাবে হত্যা করবে। যেখানে সুযোগ পেয়েছে হত্যা করেছে। আক্রান্ত করার আগেই।
কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এটা একটা সশস্ত্র জন-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। শত শত মানুষ স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসছে- তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র। দুটি ঘটনার কথা বলি- চাঁপাইনবাবগঞ্জে যখন আক্রমণ শুরু হয়েছে, সেখানে শত শত মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। হাতে সাধারণ লাঠি, বল্লম। পাকিস্তান আর্মি ভেবেছে বাংলাদেশের সৈন্যবাহিনী সংখ্যায় অনেক- তারা পিছু হটতে শুরু করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সংখ্যায় যত না ছিল, এর চেয়েও বেশি ছিল তাদের কণ্ঠস্বরের প্রাবল্য। পাকিস্তান আর্মি সেই প্রকম্পিত করা স্লোগানের শব্দে আশ্চর্য হয়ে গেছে। অন্য ঘটনাটি হলো, তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি বাচ্চা ছেলে তার বাবার পিস্তল চুরি করে নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাকে সবাই নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলেও সে শোনেনি। সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং শহীদ হয়েছে। তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলে যুদ্ধে গেছে- এটা আমাদের মনে রাখা দরকার। বাচ্চাদের তো যুদ্ধ করার কথা না, কিন্তু মানুষের যে পরিস্থিতি আর মানসিক অবস্থাটা তখন ছিল- সেটা কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু না। এসব ঘটনা থেকে মূলত বোঝা যায় জনযুদ্ধ বলতে আমরা যেমনটা বুঝি- আমাদের সেই জনযুদ্ধটা কত ব্যাপক ছিল।