একাত্তরের বীভৎস গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানবতার ইতিহাসেও একটি কালো অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণহত্যার নৃশংসতার দাগ এখনও মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর করা সেই ভয়াবহ গণহত্যা নিয়ে গবেষণামূলক বই বলতে গেলে যৎসামান্য। সম্প্রতি প্রকাশিত 'মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ : ১৯৭১' বইটি এ ক্ষেত্রকে ঋদ্ধ করল। লেখক আহম্মেদ শরীফের গবেষণা ও বিশ্নেষণে একাত্তরের গণহত্যার বহুমাত্রিক চরিত্র ও বাস্তবতা উঠে এসেছে বইটিতে।
তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার গবেষণার বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস। তিনি নিষ্ঠা ও আগ্রহ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ে কাজ করে চলেছেন। গণহত্যা বিষয়ে তার নীলফামারী ১৯৭১ : গণহত্যা ও নির্যাতন, কালীগঞ্জ গণহত্যা, গোলাহাট গণহত্যা, ঝাড়ুয়ার বিল গণহত্যা ও বালারখাইল গণহত্যা, গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ : নীলফামারী জেলা, গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ : বগুড়া জেলা, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ : ১৯৭১ এবং বাংলাদেশের গণহত্যা-নির্যাতন ১৯৭১ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত গ্রন্থ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। তার এমফিল অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ বাংলাদেশ : নির্বাচন ও গণতন্ত্র।
'মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ : ১৯৭১' বইটিতে গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি, নির্যাতন- শিরোনামে অধ্যায় রয়েছে; যা থেকে পাঠক সহজেই উপলব্ধি করতে পারবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী বিশাল প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে নিরীহ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর লেলিয়ে দিয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবে তারা এই গণহত্যার জন্য দায়ী। বইয়ের গবেষণালব্ধ তথ্য পাঠকের সামনে উপস্থাপন করবে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা। আলোকচিত্র অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকালে সংগঠিত গণহত্যার ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
লেখক গবেষণাকর্মটি সম্পন্ন করার জন্য মাঠ সমীক্ষা করেছেন বগুড়া ও নীলফামারী জেলায়। ২০১১ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গণহত্যা নিয়ে কাজ করছেন লেখক। বইয়ে গণহত্যার ভয়াবহতা, পরিকল্পনা ও যারা সহায়তা করেছেন তাদের সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন লেখক। সেই সঙ্গে মেধাশূন্য জাতি সৃষ্টি করার যে নৃশংস পরিকল্পনা করেছিল দোসর বাহিনী, তার তথ্যও থাকছে বইয়ে।
মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে গবেষণার অভাবে খুব বেশি জানা যায় না। একই কারণে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বদ্ধভূমিগুলো সম্পর্কে জানা জায় না সঠিক হিসাব। আহম্মেদ শরীফ তার পাঠ পর্যায়ের কাজ ও গবেষণার মাধ্যমে দেশের বধ্যভূমিগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। সংখ্যা ও ধরণভেদে বধ্যভূমিগুলোকে নির্দিষ্ট করে তুলে ধরেছেন তার বইটিতে। একইভাবে তুলে ধরেছেন পাকিস্তানিদের নির্যাতন কেন্দ্রগুলোর বিবরণও। মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক তার বলছেন, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের বেশিরভাগের নাম জানা যায় না। কারণ তাদের অন্য জায়গা থেকে ধরে এনে বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলা হতো।' তিনি পাকিস্তানি বাহিনী সাধারণত যে স্থানগুলোকে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে তাদের বেশ কিছু শ্রেণিতে ভাগ করে দেখিয়েছেন। যেমন- বিভিন্ন সেতু বধ্যভূমি, শিল্প-কারখানায় বধ্যভূমি, বিভিন্ন বাড়িতে বধ্যভূমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বধ্যভূমি, ওয়াপদা বধ্যভূমি, উপজেলা পরিষদ বধ্যভূমি, নদী-বন্দর ও ঘাট বধ্যভূমি, ডাকবাংলো ও সার্কিট হাউস বধ্যভূমি, হাসপাতালের পাশে বধ্যভূমি, কুয়ো/দিঘি ও জলাশয় বধ্যভূমি, জেলখানা, বধ্যভূমি ইত্যাদি। এসব বধ্যভূমিগুলো তৈরির কারণ নিয়েও লেখক বেশকিছু পর্যালোচনা ব্যক্ত করেছেন। তিনি দেশব্যাপি বধ্যভূমির ঘণত্ব নিয়ে বিশ্নেষণ তুলে দরেছেন বইটিতে।
প্রস্তাবনা অংশে আমরা উল্লেখ পাই মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষ (২০১৩) প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার তথ্য পূর্বের তুলনায় নতুন গবেষণায় বেশি পাওয়া যায়।
'মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ : ১৯৭১' বইটির প্রকাশক গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০১৭ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করা হয়। যদিও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২০০৫ সাল থেকে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
১৯৬৯ সালের ২৩ মে ভিয়েনায় গৃহীত 'ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল অব ট্রিটিজ'-এ কতগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের উল্লেখ করে বলা হয়েছে এগুলো এমন ভয়ংকর অপরাধ যে কোনো রাষ্ট্র বা কোনো সরকার কখনও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা অভ্যন্তরীণভাবেও ক্ষমা করতে পারবে না। এটিকে বলা হয়েছে 'জুস কজেনস' বা সর্বমান্য আইন, যা সব দেশের প্রতি প্রযোজ্য। জুস কজেনস-এর বিধান অনুযায়ী 'গণহত্যা', 'যুদ্ধাপরাধ' ও 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' কোনো রাষ্ট্র বা সরকার কখনও ক্ষমা করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশনে এভাবেই গণহত্যাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং গণহত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের বিচার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী করার সুযোগ রয়েছে।