এক.
'মরার ছাগলটা কোনতুন আইছে রে . . . ধুর-র, ধুর-ধুর-র-র-র-র. . .!'
এমন একটা অস্থির স্বরে গলা ছাড়তে ছাড়তে ঘরের দাওয়া থেকে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে ওঠেন ললিতা দেবী। উঠতে উঠতে হাতের কাছে কুড়িয়ে পাওয়া একটা পোড়া কাঠের টুকরো ছুড়ে মারেন। লাগেনি ঠিক- পেছনে লেজের ওপর একটুখানি ছাড়া।
'রাক্কুইস্যা ছাগল-ডা কিতা কোরল রে! ছই (শিম) গাছের মুড়া-ডা এক কামুড়ে দিল উ-ডাইয়া! তোরা কি আঁরে এক মুট ছই দিবি! ছইয়ের এককান পোকও তো মাঙনা দেচ্‌ না . . .।'
ললিতা দেবীর মুখের কথা মুখে থাকতেই কেউ একজন কর্কশ গলায় বলে উঠল-
'এই বুড়ি চেঁ-চাইতেছ কেন! বেয়ান বেলাই না তোয়ারে আলুপাতা দিলাম . . .।'
ঘাড় ঘুরিয়ে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকল ললিতা দেবী।
'তুই কি মাঙনা দিছত! এক বেলা তো আঁরে দিই আলু ক্ষেতের মাডির চাক ভাঙ্গাইলি। ভাঙ্গাস ন . . .!'
ললিতা দেবীর কথা শুনে মনু মেম্বারের কাজের ছেলেটা যেন গোখরা সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে। দু-কদম সামনে এসে মুখটা বড় কুৎসিত রকম বাঁকা করে বলে-
'এই হইল মালাউনের জাত। কইলজার ভিতর কোনো শুকর নাই . . .।'
বলতে বলতে ছেলেটা বাড়ির পথটা ধরে এগোচ্ছিল। হয়তো লজ্জায় অথবা কোনো এক অচেনা ব্যথায় ললিতা দেবীর ফর্সা মুখখান মুহূর্তেই বেশ কালো হয়ে গেল। হঠাৎ করে উঁচু করতে গিয়ে গলাটা যেমন আচমকাই ফেটে যায়। ঠিক তেমনই এক গলায় ললিতা দেবী চেঁচাল-
'হাড়ের চেলা কয় কি রে . . .।'
ফের পেছন ফিরে ছেলেটা। ফের বুড়ির দিকে এক পা এগিয়ে এসে হাওয়ার ওপর একটা লাথি মারে। তারপর অদ্ভুত রকম রক্তচোখে বারকয়েক চেয়ে থেকে নেমে গেল বাড়ির ও পথটা ধরে।
ললিতা দেবীর মুখে আর রা নাই। এক চিলতে উঠোনের কোণে একটা নারিকেল গাছ। গাছটার গোড়া ধরে বসে পড়ল। কানটা কেমন যেন ঝাঁ ঝাঁ করছে। খুব। কেউ যেন দু-মুঠো তুলোর দলা ঢিবে দিল। কী কাজে যেন উঠোনে বের হতে চেয়েছিল- তা আর এখন মনে পড়ছে না ললিতা দেবীর।
ললিতাদের এক টুকরোই বসত। চার কি পাঁচ গণ্ডা হবে হয়তো। পূর্ব দিকে পথের পাশটা ঘেঁষে দোচালা একখান থাকার ঘর। ললিতা দেবীর পীড়াপীড়িতে গেল বছরই অনেক ধারদেনা করে হরিদাস টিন লাগিয়েছে। ললিতা দেবীর শেষ সম্বল বলতে কানের একজোড়া জিনিস। সেই জিনিস জোড়াও বিক্রি করতে হয়েছিল সে সময়। উত্তরে একখান একচালা ঘর। বড় ছোট্ট করে এ ঘরে একসময় পূজা করত ললিতা দেবী। মূর্তিটূর্তিও ছিল। আজ মূর্তিও নেই, পূজাও নেই। সেসব কবেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে ওরা। বড় জীর্ণদশায় আজও পড়ে আছে ঘরটা। হরিদাস দু-একবার ভাঙতে গিয়েও শেষ অবধি কেন যেন ভাঙতে পারেনি। পশ্চিমে আর দক্ষিণে সুরত আলীদের আম-কাঁঠালের গাছগাছালি। একটা সময় এসব গাছগাছালি ছিল না। ছিল অনেকগুলি ঘরবাড়ি। ছিল শানবাঁধানো পুকুরপাড়, বৈঠকখানা, পূজামণ্ডপ, ছেলেপুলে, হইচই। এক-এক করে যেতে যেতে আজ আর কেউ নেই এখানে। থেকে গেল শুধু হরিদাস আর ললিতা দেবী।
নারিকেল গাছটার গায়ে ভর দিয়ে উঠতে উঠতে ভুলে যাওয়া কাজের কথাটা হঠাৎই মনে পড়ল ললিতা দেবীর। তুলসী গাছ দুইটার গোড়ায় গেল দুই-তিন দিনেও জল ঢালা হয়নি তার। আজ বেলাটা ডুবে পড়ার আগে আগেই মনে করে জল ঢালতে বের হচ্ছিল ললিতা দেবী . . .। ঘরের পিঁড়ার ওপর থেকে জলের ঘটিখান হাতে নেয় ও। একচালা ঘরটার কোনায় গিয়ে মাথাখান নোয়াতেই ধ্যাত করে বসে পড়ল। এ কী, বড় যত্নে বড় করা গাছ দুইটা যে আর নেই গোড়ায়। উপড়ে দিছে কেউ! এ যেন মরা ললিতার বুকের ওপর বত্রিশ ঘা।
'না না, ছাগলের কামুড়ে ত গোড়া উদ্ধানি ওডার কথা না . . .।'

'চেরাগের সইলতিডারে একটু উঠান যা-না! এই আলোতে ভাত খাইতেছি না মাডি খাইতেছি কিছুই তো বুঝতেছি না।'
ললিতা দেবী থালায় ভাত নিতে নিতে বলে-
'ভাতই খাইতে-ছ! এত বুঝতে চাইলে কেরাসিন তেল যে নাই, কদিন ধইরা যে কইতেছি হেয়ান ত বুঝো না . . .।'
ভাতের মুখে হরিদাস বলে-
'কই মাছ কি শেষ-নি?'
ললিতা দেবী চুপচাপ। এক চিমটি নুন নিয়ে গরম গরম ভাতের সঙ্গে মেশাচ্ছে! এক নলা ভাত মুখে পুরতে পুরতেই একটু রাগত সুরেই যেন ললিতা দেবী বলে-
'আছে, রাইন্ধা দিমু কি দিয়া। পেয়াজ নিয়া আইছ কহন . . .।'
'কী হইছে তোয়ার- মন-ডা যে এত ভার ভার . . .!'
ললিতা উত্তর দেওয়ার চাপ নেয় না। চুপচাপ ভাত চিবোয়। একটা সাদা বিড়াল এসে হরিদাসের কোলে উঠে বসে। হরিদাস বাঁ-হাত দিয়ে আলতো করে আদর করতে করতে বলে-
'মিনি রে আইজ তোর মামানির মনদিল ভালো না-রে। বেজায় চড়া। মাছটাসও রান্ধে নাই। নে দুইডা ভাতই খা। দাঁড়া, কাইল আর রিকশা নিয়া বের হচ্ছি না। ছাঁট-টা (বড়শি) নিয়া বের হমু .. .।'
খানিক বাদেই হরিদাস বলে-
'ললি, কাইল দুপুরের পর তৈয়ার থাইক্কো।'
হরিদাস কথাটা বলে ললিতার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। না, ললিতা দেবীর যেন একটুও বিকার নেই সেদিকে। মনে মনে হরিদাস বলে- কারে কী কই।
হুট করে দু'জনেই নীরব হয়ে গেল। বেড়ার ওপর দিয়ে হেমন্তের একমুঠো শীতল হাওয়া টুক করে ঢুকে গা লেপ্টে চলে গেল ওদিকে। বিড়ালটা কেঁউমেঁউ করতে করতে দুয়ারের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে গেল। ললিতা দেবীর জবাবেই নীরবতার গায়ে আঁচড় ফোটে-
'বুইড়ার ফুডানি।'
মনে মনে খিকখিক করে হাসে হরিদাস। ললিতা দেবী বসার পিঁড়িটা চালের মটকার ওপর তুলে রাখতে রাখতে বলে-
'ফুডানি বাদ দিই কও-রিকশাডা কই রাইখা আইছ?'
হরিদাস চুপচাপ। বেড়ার গায়ে ভর দিয়ে উঠে চকিতে বসে। ললিতা দেবী এখনও জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে এদিকে। হরিদাস পরনের লুঙ্গিটা হাঁটু অবধি তুলে ধরে। এদিকে নজর পড়তেই ললিতা দেবীর হাত থেকে পিঁড়িটা পট করে পড়ে গেল। কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে ললিতা দেবী।
'কেমনে গো. . . ?'
ঢুক গিলতে গিলতে হরিদাস বলে-
'এই তো দুপুর বেলা একটা সিএনজি এসে লাগাই দিতেছিল। রিকশাটা বাচাইতে গিয়াই ...।'
'বেশি ছিঁড়েনি তো . . .।'
দুই.
রাত কয়টা বাজে কে জানে? ওপাশ ফিরতে খুব ইচ্ছে করছে হরিদাসের। কিন্তু বুকের ওপর ললিতার মাথা। ছিঁড়ে যাওয়া পা'টাতেও শিনশিন করে টানছে খুব। হরিদাস মনে মনে ভাবে ও কি ঘুমাইয়া গেল!
'ললি, ঘুমাইছ?'
ললিতা দেবী বড় ঘুমকাতুরে গলায় বলে-
'না। ঘুমে যে মর মর অবস্থা হোদাই কেন কও-না।' ললিতা দেবী একটু মাথা নেড়ে বলে-
'কিছু কইবানি?'
'হুম, একটু সরো- ওপাশে ফিরমু।'
একটু কেমন যেন শীত শীত লালছে ললিতার। পা জোড়া একটুখানি গুটিয়ে নেয় ও। তারপর নাকের ডগা দিয়ে হরিদাসের পিঠে ঘষতে ঘষতে বলে-
'কাইল দুপুরে তৈয়ার থাকতে বললে . . .।'
হরিদাস গলাটা টেনে বলে-
'হুম, দুপুরেরটা দুপুরে দেখা যাইব . . .।'
ঘরের কোণে জোড়া কড়ই গাছ। রোজ রাত্রিরে পাখি উড়ে যায় আবার ফিরে আসে। এখনই দুইটা পাখি শোঁ শোঁ শব্দে উড়ে গেল। এমন সময় হঠাৎই যেন হরিদাসের কথাটা মনে হলো।
'খবরটবর কিছু জানো-নি?'
ললিতা দেবী বুকের ওপর কাঁথাটা টেনে নিতে নিতে বলে-
'কিসের খবর . . .।'
বালিশের গায়ে নাক গুঁজে আর উত্তর খুঁজে না হরিদাস। কোথাও কোনো শব্দও নেই। শুধু রাত্রির গায়ে নাক ডাকার একটা মৃদু শব্দ ছাড়া। হরিদাস মনে মনে ভাবে- 'বরং স্যাঁতব্যাত থাকাটাই জীবনের বড় অশান্তি . . .।'
এমন মাঝ রাত্রিরে তো হরিদাসের ঘুম ভাঙে না। আজ কেমন করে যে ঘুম ভেঙে গেল মনে নেই তার। ঘুম ভাঙতেই হরিদাস দেখে- দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে ঘরের চালে, চার দেয়ালে, কাঠের দুয়ারে, চালের মটকায়, জিয়ানো কই মাছের হাঁড়িতে, ভাতের শানকিতে . . .।
সে ভাবে এ কি ঘুমের ঘোরে কোনো দুঃস্বপ্ন।
'না না, এ-তো সবই বাস্তব। সবই সত্য।'
'ললি, এই ললি! কী আজব মানুষ- কেমনে ঘুমায় এখনও।'
হরিদাস তার প্রিয় ললিকে ডাকে না আর। বরং বুকের ওপর থেকে পাতলা কাঁথাট সরিয়ে দেয়। চিবুকে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম!
'আশ্চর্য, ললিকে এত সুন্দর লাগছে কেন আজ।'
হরিদাসের খুব ইচ্ছে করছে একটুখানি লাল সিঁদুর লেপ্টে দিতে ললিতা দেবীর কপালে!
'না, না, ও ঘুমুক না আরও একটু। এই তো শেষ . . .।'
হরিদাসের মনে এ কথা ও কথা মিলে কত কথার ভিড়।
'হায় হায় ললিকে বুঝি শেষবারের মতো শহরে নেওয়া হলো না আর।'
ললির কত দিনের ইচ্ছে ছিল। অন্তত একবার শহরে যাবে, পূজা দেখবে। হরিদাসের আফসোস হয়-
'হায় রে নতুন নীল পাড়ের শাড়িটাও যে ললিকে দেওয়া হলো না আর।'
ফের ভাবে হরিদাস। ভেবেই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ভালোই হলো-
'ললি, তোমারে আর হরিদাসের শবদাহ নিয়ে ভাবতে হবে না। আশপাশের দশ গ্রামে যে একখান চিতাখোলাও নেই- সে চিন্তায়ও তোমারে আর ভেঙে পড়তে হবে না। ললি, দেখ- তোমার ভগবান কত উদার . . .!'
আবার ভাবে হরিদাস-
'না না এ কী ভাবছি আমি। ললি কি একাই বেঁচে গেল? আমি নিজে কি বাঁচি-নি?'
দাউদাউ আগুনেরা কিলবিল করছে ঘরের চালে, দেয়ালে, মেঝেতে ...।
'এ বুঝি ললিতা জেগে উঠল।'
মনে মনে ভগবানকে ডাকে হরিদাস-
'আর একটু দয়া করো, ভগবান। ঠিক এখনই ললিকে জাগাইয়া তুইল না। ভগবান, সব দায় থেকে তোমাকে মুক্তি দিলাম আজ। সব দায়। যে নিঃসন্তান জীবনের দায়ভার তোমার কাঁধে তুলে রেখেছি, তাও তুলে নিলাম আজ। তুমি তো ভালোই করেছ, ভগবান। না হলে . . .।'
না হরিদাস আর ভাবতে পারে না। এমনটা ভাবতেই যেন সে টের পেল- তার ভাবনাগুলো কেমন যেন শহুরে শহুরে! হরি যেন একটু লজ্জাই পেল। এমনি সময় আবারও ফিরে এলো শব্দ জোড়া। এবার পরিস্কার, 'মর হরি, মর . . .।'
গলাটা চেনা চেনা।
'হুম, ওই লোকটাই তো। যে ভিটেবাড়িটার জন্য . . .।'
বেশ কটা মাস কেটে গেল। দ্রুতই। তারপর এমনই এক সন্ধ্যের মুখে অনুষ্ঠানটা শেষ হয় রাশেদের। হাতে অ্যাওয়ার্ড। বর্ষসেরা ফটোগ্রাফি!
অনেক দিনের চেনা এ পথটা আজ কেমন যেন বেশ ফাঁকা ফাঁকা। মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি হুতোম পেঁচার মতো আলো জ্বেলে হুসহাস চলে যাচ্ছে- এদিক থেকে ওদিকে। রাশেদের আজ এমন কোনো তাড়া নেই। এমন নির্ভার হেঁয়ালি মনে হঠাৎই কবিতার দুটি লাইন বিড়বিড় করে ওঠে।
'যেন রেলের চাকায় বেঁধেছিল কেউ দিন ঘড়িটার কাঁটা। অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি তোর ঠিকানাটা . . .।'
কী আশ্চর্য! কবি আর কবিতার নামটা বারবার চেষ্টা করেও মনে পড়ছে না তার। তখনই বৃষ্টিটা নেমে এলো। ঝিরঝিরে। রাশেদ মনে মনে বলে-
'এ কী, এমন শুকনোর দিনে বৃষ্টি এলো কোত্থেকে . . .।'
সামনের মোড়েই এ পথের শেষ। দূরের নিস্তেজ আলোটা দেখতে দেখতে হেঁটে চলে রাশেদ। এর মধ্যেই সরু নাকটার ফাঁকফোকর দিয়ে হুহু করে বের হয়ে গেল গোটা কয়েক দীর্ঘশ্বাস। ও যেন ভেতরে ভেতরে থমকে গেল।
'অন্তত আজকের দিনে এমনটা হওয়ার কোনো কারণ আছে কী!'
এমনটা ভাবতেই রাশেদের চোখে ভেসে ওঠে কঙ্কাল দুটি। কঙ্কাল দুটি কী মায়ায়, কী মমতায় আঁকড়ে আছে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে আলাদা করার সাধ্যি কার! রাশেদ একটুখানি কল্পনা করে। একটুখানি তুলি মাখে . . .। আর তাতেই যেন জেগে ওঠে মুখ দুটি। কী স্নিগ্ধ, কী করুণ! কী নির্মোহ চাহনি। কী যেন বলতে চায় . . .!
রাশেদ ফের ফিরে পথে। ফিরে বাস্তবে। তবু পেছন থেকে কে যেন ডাকে। কে যেন বলে-
'আবার কখনও যদি দেখা হয় অচেনা পথে-
থেমে দুটো কথা বলব, ফের চলে যাব অন্য দিকে-
তুমি সাবধানে যাও, মেঘেরা যেভাবে যায় চলে-
একটু তো বৃষ্টি হবেই আজ . . . !'

বিষয় : গল্প

মন্তব্য করুন