বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি, কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হকের এই গদ্য আর পদ্যগুলো বিভিন্ন সময়ে নানান কাগজের টুকরোর ওপরে লেখা। কিছুবা সিগারেটের কার্টনের ওপরে, খামের পেছনে, দেশলাইয়ের খোলের ভেতরে লেখা অথবা লাইন টানা বা লাইন ছাড়া খাতার ভেতরে লেখা।
আনোয়ারা সৈয়দ হকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে রচনাসমূহ পত্রস্থ হলো...
সেই উষাকালের কথা স্মরণ হয়- কবিতার জগতে, কিংবা তাকে সমুদ্র বলাই সংগত, জানি না সাঁতার, এবং নেই জাহাজ, ডুবছি, ভাসছি, শ্রান্ত হয়ে পড়ছি, কিন্তু বাস্তবতায় কোনো স্থলভাগ নেই যে লোকে যাকে বলে স্বাভাবিক জীবন সেই জীবনে স্থিত হই।
কৈশোর ও প্রথম যৌবনে কবিতায় পাওয়া সকলেরই বুঝি এই দশা।
অনেকেই পায় উদ্ধার এবং নিষ্ফ্ক্রান্ত হয়ে যায় নিমজ্জনের সম্ভাবনা থেকে, উঠে সে আসে এমন জীবনে যাকে বলা যেতে পারে ভারসাম্যসম্পন্ন এক গৃহস্থের জীবন। আর কেউ কেউ, শতেকে এক বা দুই, শিখে ওঠে সাঁতার ও সেই সমুদ্রেই সে পায় তার স্বাভাবিক বসবাস; স্বাভাবিক কিন্তু গার্হস্থ্য বিচারে ভারসাম্যহীন তার বাস্তবতা। আমার বিবেচনায় এই ভারসাম্যহীনতাই শেষ পর্যন্ত আমাদের কবি করে তোলে- যখন ভারসাম্যে ঘটে বদল, পাল্লা ঝুঁকে যায় একদিকে খুব- তখন কবিতার উচ্চারণে অনূদিত হয়ে যায় আমাদের বোধ, অনুভব, আবেগ আর অভিজ্ঞতা।
মূলে তো অভিজ্ঞতাই- এবং এর বাহন, যেমন লক্ষ্য করি কবিতা লেখার উষাকালে, ছন্নছাড়া, আবেগে প্রলাপের প্রায়, প্রায়শই পূর্বগত বা সমসাময়িক কবিদের অনুকরণে অনুসরণে অবিরাম শব্দ লেখন কেবলি। বস্তুত কবিতা এক প্রবন্ধ, কিংবা অঙ্কের সমীকরণ; এর শৃঙ্খলা ও শাসন অঙ্কের চেয়েও দুরূহতর, প্রবন্ধের চেয়েও গুরুতর। কবিতা লেখা শেখানো যায় না, কবিতার চাপে চূর্ণিত হয়ে যাবার পরই আমাদের কর্তব্য হয়, যদি কবিতাই লিখতে হয়, চূর্ণিত সকলকে আবার এক অখণ্ড শরীরে নির্মাণ করে তোলা।
আমার জন্য সেই নির্মাণের উপায় খুঁজে পেয়েছিলাম কবিতার অনুবাদে- ইংরেজি এবং ইংরেজির মাধ্যমে অন্য ভাষার কবিতা, যা যখনই কোনো না কোনোভাবে আমাকে স্পর্শ করেছে- এবং আরও, যে ভাষায় লিখছি সেই ভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষার কোনো কোনো কবিতাকে- অনুবাদ তো নয়- গদ্যে সজ্জিত করে নেওয়ায়। রবীন্দ্রনাথের 'শাজাহান' কবিতাকে এই মতো গদ্যে যেমন সাজিয়ে নিয়েছি, অনুভব করেছি যেন এটি আমার ভাষার মহত্তম কবিতা কতিপয়ের একটি- আবিস্কার করে উঠেছি, প্রথম স্তবকেই শেষ হতে পারত কবিতাটি- এবং তা হতো যে কোনো পরিশ্রমী কবির রচনা, দ্বিতীয় স্তবক যখন এর সঙ্গে যুক্ত তখন হতো ভালো একটি কবিতা, কিন্তু তৃতীয় স্তবক থেকে শেষ পর্যন্ত যে উক্তিসকল তা কেবল এক রবীন্দ্র্রনাথের পক্ষেই ... (অসমাপ্ত)

শিরোনামহীন
যদি যেতে হয়, যেতেই তো হবে
তবে এই পৃথিবীর স্মৃতি রেখে যাওয়া খুব ভালো হবে
ল্যাম্পোস্টের পাশে
পড়ে থাকা ফুলের তোড়ার কাছে
কলমের কালির দোয়াতে
খুব ভালো হয় যদি রেখে দেয়া যাফুলের পচন থেকে যদি মাছ খাদ্য কিছু পায়
সুন্দর কুটির ছাদে খড়ের গুছিতে
চৈত্রের আগুন লেগে যদি জ্বলে ওঠে খড়
ফুলের পচন থেকে
যদি মাছ খাদ্য কিছু পায়
যদি এই ল্যাম্পোস্ট থেকে কেউ
আলো দেখে বাড়ি ফিরে যেতে চায়
যদি যেতে হয়- এইসব রেখে যাওয়া
খুব ভালো হয়
গোরস্তান থেকে যথাস্থান খুব বেশি
দূরত্বে কি নয়?

শিরোনামহীন
একটি দুটি পদ্য লেখা তেমন কঠিন কর্ম নয়-
কিন্তু প্রকাশক খুঁজতে চটির চর্ম হলো ক্ষয়।
চোয়াল উৎকণ্ঠা ভরে মুহুর্মুহু উদ্গার হয়
কমতে কমতে মাথার চুল, অবশিষ্ট গুচ্ছ কয়,
বাড়তে বাড়তে অমাবস্যা ভবিষ্যৎ ফর্সা হয়-
সবার কাছেই জুটলো লাথি কারো কাছেই ভরসা নয়।

শিরোনামহীন
কবির বয়স বাড়ে কবিতার বয়স বাড়ে না-
কালের যোনি ও জঙ্ঘা থেকে যায়- জন্ম হয়ে থাকে-
কালের যাত্রার ধ্বনি যত ওঠে- ধার তো ধারে না-
বরং সে নিত্যকাল- তার ছন্দে শব্দে শব্দ আঁকে।

শিরোনামহীন
এখনও তো শেষ নয়, এখনো তো অবিরাম শ্রম
এখনো দিনের শেষ রাত্রি জাগা দেখা যায় তাকে-
দেখি তারপর অন্তর্গত বিথানের সব অনুক্রম
কাঁধে নিয়ে চলেছে সে পলিভূমে পথ প্রতি বাঁকে-
সে কোন্‌ অতীত থেকে। সেই রাঙা ভোরবেলাকার
এসব কাহিনী কথা- সেই দিন যাত্রা দেখি আজ
পশ্চিমে গড়ায় তবু শুরুটাই থেকে গেল বাকি-
তাঁত বস্ত্র পড়েই রইলো তার আজও তার ভাঁজ
খোলাই হলো না, কোনোদিন খোলা হবে নাকি!
প্রাচীন যে পিতামহী তাঁর লাল বিবাহের শাড়ি-
অযুত নক্ষত্র নিয়ে খুলে যেত, খোলা হতো যদি-
মেলে দেয়া যেত যদি- তবে এই বৃক্ষ ঘর বাড়ি
হলুদ জ্যোৎস্নার রাতে দিত ডাক তেরোশত নদী-
বিস্মৃতিপ্রবণ এই পৌত্র তবে কবেই কখন
বিশ্রামে নিলীন হতো- হয়নি তো - তাই জাগরণ।।
৩০/১/২০০৮
শিরোনামহীন
দর্শনীর বিনিময়ে কবিতার সন্ধ্যা শুরু হলো
সকলে দলে দলে এসেছেন বাংলার কবিরা
এখানেও প্রশ্ন আছে জীবিকার, রাজনীতি আছে-
তবুও উকিল ছাত্র মনোহারী দোকানের লোক
দু'দণ্ড সময় করে এসে গেছে মিলনায়তনে
ভিন্নতর আমাদের খোঁজে, তবে নিতান্ত রুটিতে
মানুষ বাঁচে না বুঝি, শাবানার ছবি যারা দ্যাখে
তারাও কবিতা শুনে আজ তাই নড়েচড়ে ওঠে।
কবি কি শোনায় আর শ্রোতাদের কানে কিবা পশে
সেটা কোনো ঘটনাই নয়, মঞ্চে আছে দর্শক সারিতে
যারাই এখন বসে - দূর বটে, অত্যন্ত সুদূর-
তবুও চেষ্টার শেষ নেই কোনো সেতু রচনার-
কবিরা হাত পা নেড়ে পড়ে চলে নিজস্ব কবিতা
শ্রোতারা হিসেব করে পরবর্তী দিনের বাজার।

শিরোনামহীন
তোমার চুমোর মতো মুষলধারার সব সম্ভাবনা নিয়ে
এখন অনেক মেঘ
রমণীর ছদ্মবেশে বুক পিঠ ধরে-
শহরের শেষপ্রান্ত থেকে বড় ধীরে এসে অত্যন্ত নীরবে-
দাঁড়িয়ে রয়েছে-
গাছ বহুকাল থেকে এই জনপদে আর
বাস করছে না, ইটের পাহাড় শুধু, অরণ্য রাতের
অসমাপ্ত আমার বাড়ির কোলে পাথরের বাগান করেছি
নিজেই এসেছে সাপ, শামুক ও মাকড়শা, হাতের তেলোয়
অকস্মাৎ ম্যাজিকের- প্রায় ভুলে যাওয়া এক রঙিন রুমাল-
মানুষ যে যার ঘরে খিল দিয়ে-
(অসমাপ্ত)

শিরোনামহীন
এখন তাহলে তুমি দাঁত মাজো, করে নাও শেভ,
গোসলের পরে গালে আফটার শেভের প্রলেপ;
সেটা খুব মন্দ নয়- দিন যায় সুগন্ধের সাথে,
এখন দিন মুখ থুবড়ে থাকে নর্দমাতে,
এসবের বিপরীত সূচনাটি যদি ভালো হয়,
তবেই দাবার চালে জিতে নেবে তুমিও নিশ্চয়।
তোমার অক্ষর সাধা কলমের সোনালি নিবেই,
যা কিছু রচিত হয়, অসামান্য জানি সামান্যই।
থাকুক এসব কথা, আপাতত ভোরের পাখিটি
ওই যে পুলিশ হেন, চঞ্চুপুটে শুনছো যে সিটি-
ওতেই তো বোঝা যাচ্ছে, সময়টা তত ভালো নয়
যখন গানের পাখি তারও গান মনে লাগে ভয়,
দিবাকালে যেমন পড়েছে কবি, কথা কম বলা,
চোখ বন্ধ রাখা আর সাবধানেই রেখে দেয়া গলা
একটি শব্দ নয় উল্লাসের কিংবা ক্রন্দনের-
এসবের জন্য কাল পাবে তুমি অতঃপর ঢের।

শিরোনামহীন
আষাঢ়ের আকাশের নিচে তুমি অনেক লিখেছো
অনেক শব্দের কাঠি ঠুকে ঠুকে ঠুকে জ্বালিয়েছো
তামাকের মতো তীব্র রচনার শলা
যাকে পদ্য বলে ভুল করে এতকাল সড়কে সড়কে
এত পথ এই যে হেঁটেছো তুমি
আজ সেই আকাশে তাকিয়ে দেখো শারদীয় শুভ্রতার ছটা
দূর ধরলার চরে কাশবনে শব্দ পাও নাকি
সর সর ধ্বনিতে শোণিতে শব্দ,
কাশের নরম ফুল যেন নারী স্পর্শ তার-
কতদূর থেকে এসে হাত রাখে তোমার কপোলে।
জেগে ওঠো এইবার, এইবার নদীটির দিকে
যাত্রা করো হে চিরকুমার তুমি, টেনে নাও বুকে
সিগারেট দগ্ধ ঠোঁটে এবার চুম্বন দাও
কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো পুরে দাও প্রিয়তম মুখের গহ্বরে।
আবার ভিজেছো তুমি, স্নান শেষ- দাঁড়াও শরতে।।

শিরোনামহীন
একটি কলম যদি পেয়ে যাই নিরক্ষর রাতে
এমন কলম যার নিবে শান কঠিন হীরায়
তবে এই নক্ষত্রের নিচে যারা মূর্খতার পাড়া
দারুণ জমিয়ে ঘুমে, পারি খুব তাদের চাবকাতে।

শিরোনামহীন
ভুলে যাও সন্ধ্যে বলে কিছু আছে
একটি তারার ফুল অন্ধকার গাছে
ভুলে যাও লকেটের মতো চাঁদ
মনে রেখো একখানি হাত
কেবল তোমার দিকে, আর কিছু নয়-
এভাবেই থমকে থাকে যখন সময়
তুমি আর আমি বসে মুখোমুখি
ব্যস, শুধু এইটুকুই
এতেই দিনের আলো মরে যায় যাক-
এই হাতখানি থাক
সন্ধ্যার গভীরে যাক রাতের গভীরে
ভিজে যাক হৃদয় শিশিরে
সারারাত সারারাত
তোমার হাতের দিকে একভানি হাত।।
১০/১০/২০১৪
লন্ডন
রাত সাড়ে দশটা
শিরোনামহীন
ধ্বংসের মোটেই কোনো পদ্যরূপ নেই-
কেবল তা গদ্যেই
দৈনিক পত্রিকার পৃষ্ঠায়
ধ্বংস তার ভস্ম রেখে যায়
কেবল নির্মাণ থাকে
যদি শেষ পর্যন্তই থাকে
কবির কলম থেকে উৎসারিত কালির
কালোয়,
আমি মুখ ধুয়ে নিচ্ছি- সন্ধ্যার প্রথম
ওই তারাটির প্রথম আলোয়।।

১৭/১০/২০১৪
লন্ডন
সকাল দশটা

শিরোনামহীন
কিছু পাথর এমন আছে
কোনো কোনো রাতে
তারা ফুল হয়ে যায়
ফুল হয়ে ফোটে তারা-
সুগন্ধ ছড়ায়

সুগন্ধ শর্করা যেন
আলো তীব্র শাদা
তীক্ষষ্ট দাঁত
অন্ধকার ঘাড় থেকে রক্ত খায়-
ভোরে লাল গোলাপের ভিড়ে
পৃথিবীর বুক ঢেকে যায়।
কিছু কিছু ফুল আছে
কোনো কোনো কালে
তারা পাথরের মতো হয়ে যায়।
ঘণ্টার চিৎকার যেন
অন্ধকার কালো
(অসমাপ্ত)