পর্ব: ২

একাত্তরের জনযুদ্ধটা কত ব্যাপক ছিল তা এর সমগ্র পরিসরের দিকে তাকালে বোঝা যাবে। আজকের দিনে জনযুদ্ধ বলতে মানুষ কী বোঝায় ঠিক বলতে পারব না, তবে একাত্তরের জনযুদ্ধ মানে সকল মানুষের অংশগ্রহণ। সার্বিকভাবে, সামগ্রিকভাবে প্রতিটি পরিসরে অংশগ্রহণ।
খেয়াল করা দরকার যে, সেনাবাহিনীর কথা বা ইপিআরের কথা যখন আমরা বলি- তারা কাদের সাথে মিলে যুদ্ধ করেছে? তারা আনসারদের সাথে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করেছে, সাধারণ মানুষের সাথে মিলে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু আমরা বলতে গেলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর একটি নির্দিষ্ট অংশের কথাই শুধু বলছি, সবার কথা বলছি না। আর জনগণকে যেহেতু যুদ্ধের প্রধান নায়কের অবস্থান থেকে আমরা বাদ দিয়ে সেনাবাহিনী বা রাজনীতিবিদদের প্রধান নায়ক করি- এর ফলে যেটা হয়েছে, আমাদের দেশে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিসরে দেখা গেছে ধারণাটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রাষ্ট্র গঠনে জনগণের কোনো ভূমিকা নেই; জনগণের কোনো ভূমিকা নেই রাষ্ট্রকে লালনে এবং রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো তাই সেই নায়ক বা শাসক শ্রেণির। কিন্তু বস্তুতপক্ষে একাত্তরের ইতিহাস, বিশেষ করে একাত্তরের প্রতিরোধ পর্বের ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস। শত শত উদাহরণ রয়েছে, যেখানে মানুষ ভূমিকা পালন করেছে। এবং ভূমিকা বলতে আমি বলছি সশস্ত্র এবং নিরস্ত্র উভয়ই।
জনসমর্থন ছাড়া একটা যুদ্ধ কখনও সংগঠিত হতে পারে না। এটা আরও বিশেষভাবে বোঝা যায় প্রতিরোধ পর্বে পাকিস্তান আর্মির বিপদগ্রস্ততা দেখে। জনগণের প্রতিরোধপূর্ণ অবস্থাতেই পাকিস্তান আর্মি লুণ্ঠন-নির্যাতন করেছে সবচেয়ে বেশি। কারণ তারা তো বাংলাদেশের মানুষের এই প্রতিরোধ পর্বের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তারা ভাবতেই পারেনি বাংলাদেশের মানুষ এভাবে প্রতিরোধ করতে পারে।
তাদের খাবার শেষ হয়ে গেছে- তারা পাবলিকের কাছ থেকে লুট করেছে। বিষয়টি হামুদুর রহমান কমিশনেও ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে। আর পাকিস্তান আর্মি যখন কৃষক-শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের ঘর লুট করে খেয়েছে- তখন বোঝা যায় তারা কী পরিস্থিতিতে পড়েছে বা কতটা বিপদগ্রস্ত হয়েছে প্রতিরোধকালে। তাদের মেরুদণ্ড বলে যদি কিছু থাকে সেটা ভেঙেছে ওই প্রতিরোধের সময়েই। পরবর্তীকালে সে তুলনায় প্রতিরোধকালের মতো এত প্রবল ও ব্যাপক আকারে সারা বাংলাদেশে যুদ্ধ কখনও হয়নি। প্রতিরোধের সময়েই তারা পর্যুদস্ত হয়ে গেছে। যারা সশস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি- একপর্যায়ে তারা ভারতে চলে গেছে আশ্রয়ে কিন্তু বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষ কোথাও যায়নি, দেশেই থেকে গেছে। প্রতিরোধ যুদ্ধে তারা সবাই অংশগ্রহণ করেছে। পরবর্তী সময়ে একে একে তারাও প্রশিক্ষণ নিতে গেছে ওপারে। আমি একটা গ্রামের কথা বলছি- রাজশাহীর সেই গ্রাম থেকে ১৬ জন গেছে প্রশিক্ষণ নিতে। সেই ১৬ জনই পরে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে। তারা প্রথমে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছে, তারপর প্রশিক্ষণ নিতে গেছে, সেখান থেকে ফিরে আবার যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।
বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ একাত্তরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তাদের সবার ভূমিকা স্বীকার না করে কেবল একটি-দুটি অংশের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে আমাদের ইতিহাস চর্চায় যে সংকট হয়েছে তা হলো আমাদের একটি খণ্ডিত ইতিহাস তৈরি হয়েছে; যা অসম্পূর্ণ এবং সঠিক নয়। আমাদের ইতিহাসে সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধটা নেই।
আমি মনে করি, প্রতিরোধ যুদ্ধ হচ্ছে সামগ্রিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ তখন সবাই যুদ্ধ করেছে। ডিসেম্বর মাসে যখন ভারতীয় বাহিনী এসে যুদ্ধে অংশ নিল- সেখানে তো সিভিলিয়ান লোকজন এসে যুদ্ধ করেনি। কিন্তু এর আগের মধ্যবর্তী পর্যায়ে তো যুদ্ধ করেছে সিভিলিয়ান মুক্তিযোদ্ধারাই। তখন বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীর লোকজন এসে দেশের ভেতরে ঢুকে যুদ্ধ করেনি। তারা সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। তাহলে কে ছিল দেশে? দেশে ছিল বাংলাদেশের জনগণ। সে প্রতিরোধেও ছিল, প্রস্তুতিপর্বেও ছিল, সে মুক্তিযোদ্ধাও হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অংশ হয়ে দেশ স্বাধীন করেছে।
প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে- প্রতিরোধে ইপিআর, প্রতিরোধে পুলিশ ইত্যাদি। তবে সব গ্রন্থে যুদ্ধটা প্রতিরোধ থেকেই শুরু হয়েছে, কারণ সে অর্থে প্রতিরোধটাই হলো আমাদের জন্মের লগ্ন। তবে আমাদের প্রস্তুতিপর্বে যেমন আমরা শুধু রাজনীতিবিদদের দিকেই তাকাই জনগণকে বাদ দিই- প্রতিরোধ পর্বেও শুধু সশস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলোর কথাই বলি, জনগণের কথা বলি না। আমরা যুদ্ধের কথা বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের কথাই বলি, সাধারণ মানুষের কথা বলি না। এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে যৌথ বাহিনীর কথা বলি, জনগণের কথা বলি না। এর ফলে ইতিহাস চর্চায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা দূর হবে কিনা আমি জানি না। তবে আমার কাজে আমি সবাইকে পরিসর দেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ এটা তো দেশ- দেশ মানে সবাই। যতক্ষণ না আমরা এই 'সবাই'কে মেনে নিতে পারব, আমাদের ইতিহাস চর্চার সংকটের সমাধান হবে না।


প্রতিরোধ যুদ্ধটাই ছিল বাংলাদেশের। বিজয় বাংলাদেশের একার ছিল না। বিজয়টা ছিল ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ। প্রতিরোধটা ছিল একান্তই বাংলাদেশের মানুষের। প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের পর্যায়টা উঠে এসেছিল স্বতঃস্ম্ফূর্ত বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকে। এবং পরবর্তী যুদ্ধের সূত্রগুলো এখান থেকেই তৈরি হয়েছে। প্রতিরোধ পর্ব ছাড়া বিজয় সম্ভব হতো না, বিজয় দিবসও হতো না। আরেকটা বিষয় হলো, প্রতিরোধের কারণেই কিন্তু পাকিস্তান আর্মির দুর্বলতাটা প্রকাশ পেয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ যে প্রতিরোধ করল এবং মার্চের পর থেকে এই অসংগঠিত মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে একটা মাস সময় লাগল পাকিস্তান আর্মির- সেই সংবাদ ভারতসহ সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে চলে গেল। বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী কিন্তু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এই প্রতিরোধের মাধ্যমে। আর বিজয়টা হচ্ছে সেই প্রতিরোধের ফসল।
একাত্তরের প্রতিরোধ পর্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও গবেষণা উভয়ই সীমিত। কারণ আমরা এর তেমন একটা রাজনৈতিক অবয়ব দিতে পারি না। বেশিরভাগ মানুষের কাছে ৯ মাস পাকিস্তান আর্মির অধীনে থাকাটা এমনই নির্মম ছিল যে, বিজয় দিবস আমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তবে আমার কাছে তাকে বিজয় দিবসের চেয়ে বেশি মনে হয় মুক্তির দিবস। কারণ ৯ মাসের দখলাবস্থা থেকে সেদিন মুক্ত হয় দেশ।
পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিরোধ ছিল স্বতঃস্ম্ফূর্ত। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রস্তুতির প্রতিরোধ। হঠাৎ করে ২৫ মার্চ রাতে আক্রমণ হলো আর যুদ্ধটা শুরু হয়ে গেল- ব্যাপারটা এমন নয়। তেমন হলে এটা তো কেবল ঢাকার বিষয় হতে পারত। কিন্তু এটা তখন গোটা দেশের বিষয় হয়ে উঠেছিল। তার মানে প্রতীক হিসেবে ঢাকা তখন বাংলাদেশ। যে কারণে ঢাকায় আক্রমণের পরপরই সারাদেশ প্রতিরোধ করল। প্রতিরোধ করে রক্ষা করল একটি স্বাধীন দেশকে। দেশ তো ততদিনে স্বাধীন হয়ে গেছে। যাকে আমি বলছি অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা। সেই অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা যদি না হতো, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক দেশের জন্য যে লড়াই- সেটা এতটা ব্যাপক হতো না। মার্চ মাসটাও সে কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিভিন্ন প্রস্তুতির মাধ্যমে মানুষ তখন দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। তাই মার্চ ছাড়া ডিসেম্বর সম্ভব ছিল না। এটা ঐতিহাসিকভাবেই যুক্ত। কারণ মার্চের শেষে যখন পাকিস্তান আর্মি আক্রমণ করল, এই প্রস্তুতির কারণেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ লড়াই এত ব্যাপক আকার ধারণ করতে সক্ষম হলো। এই লড়াইটা কত ব্যাপক ছিল সেটা অনুধাবন করা আজকের দিনে বসে প্রায় অসম্ভব। লড়াইটা যে হচ্ছে- সেখানে সাধারণ মানুষ খাওয়াচ্ছে-দাওয়াচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে, অস্ত্র হাতে নিচ্ছে এবং যে ক'টি প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনী এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের নিজেদের চরিত্র এক না হওয়ার পরেও তারা একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হয়েছে। সেনাবাহিনী আর ইপিআরের সকল স্তরের সদস্য তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভেঙে নতুন একটা বাস্তবতায় যুক্ত হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তবে তৃতীয় যে বাহিনীটির কথা আমরা সবচেয়ে কম বলি- সেটি হলো আনসার বাহিনী। অথচ একাত্তরে এই আনসার বাহিনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আনসার বাহিনী পাকিস্তানের সঙ্গে না থাকার কারণেই তাদের রাজাকার বাহিনী তৈরি করতে হলো। আনসাররা বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি হয়ে যাওয়ায় সে ক্ষেত্রে যে শূন্যতা তৈরি হলো- তাকে তো নতুন সশস্ত্র মানুষ ছাড়া পূরণ করা সম্ভব না। তাই প্রয়োজন হলো রাজাকারের। একইভাবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি হিসেবে এলাকায় এলাকায় যে সংগ্রাম কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- তার বিপরীতে পাকিস্তান আর্মিকে তৈরি করতে হয়েছিল শান্তি কমিটির। অর্থাৎ প্রতিটা ক্ষেত্রেই পাকিস্তান আর্মির যে পদক্ষেপ, সেগুলো ছিল বাংলাদেশের এই প্রতিরোধ পর্বের একেকটি প্রতিক্রিয়া। প্রতিরোধ পর্বটা রাষ্ট্রটাকে এমনভাবে গড়ে দিয়েছিল যে, রাষ্ট্রটি তখন সশস্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত হলো। হয়তো খুব নিম্নমানের সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র, কিন্তু জনকল্পনাতে সেটিই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার প্রতীক। এই জনকল্পনাটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার- যখন একটি দেশের জন্য মানুষ অস্ত্র হাতে নেয়, এর চেয়ে চরম মুহূর্ত আর হয় না। যখন পাকিস্তান পরিণত হলো দখলদারে, আর বাংলাদেশের মানুষ পরিণত হলো রাষ্ট্রের নাগরিকে, যাদের রাষ্ট্রকে দখল করা হয়েছে। কিন্তু সারাদেশের বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলো আর সেই গ্রামের মানুষেরা একই সময়ে কী করে সবাই একই কথা ভাবল? এক কথা ভাবল রাজনৈতিক সংগঠনের কারণে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের জনকল্পনায় তখন একই চিন্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমরা আমাদের আলোচনায় এবং আমাদের ইতিহাস চর্চায় কখনও এই গ্রামের মানুষের ভূমিকার কথা বলি না। একাত্তরে প্রতিরোধ পর্বে এবং পরবর্তী পর্বে তারা যদি আশ্রয় না দিত, তারা যদি ধারণ না করত, তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হতো না। তাই সেদিনের সেই গ্রামের মানুষের প্রতি আমাদের একটু হলেও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, তাদের সালাম জানানো উচিত- তারা তো এর চেয়ে বেশি কিছু চায়ওনি। প্রতিরোধ পর্বে এই গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের শক্তিটা দেখিয়েছে। একাত্তরের এমন পরিস্থিতির ভেতরে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে তারা জীবনযাপন করেছে। এপ্রিল মাসের পর যখন পাকিস্তান আর্মি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখনও তারা যে প্রতিরোধ করেছে সেখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।


পাকিস্তান আর্মি এই প্রতিরোধ পর্বেই বুঝতে পেরেছিল যে তাদের নিজেদের শক্তি নেই। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হয়ে গেছে- ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটে তো কোথাও বলা ছিল না যে, এরপর তাদের গ্রামে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ পাকিস্তান আর্মির গ্রামে যুদ্ধ করার কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। তারা বাধ্য হয়েছে গ্রামে যেতে। কারণ গ্রামের মানুষ যদি প্রতিরোধ না করত, তাহলে তো পাকিস্তান আর্মির গ্রামে যেতে হতো না। ঢাকা আক্রমণের পর তাদের তাই গ্রামে যেতে হলো এবং সেখান থেকে তারা কোনোদিন আর সফল হয়ে আসতে পারেনি।
একাত্তরে কাঠামোগতভাবে পাকিস্তান কতটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল সেটা পাকিস্তানিরাই নানা দলিলে প্রকাশ করেছে যে আমরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম, আমাদের গ্রামে-গঞ্জে যাওয়ার কথা তো ছিল না।
রাজাকাররা কেন এত লুট করত? শুধু যে নিজের পকেট ভরার জন্য তা না- তাদের লুট করতে হতো পাকিস্তান আর্মির জন্যই। কারণ তাদের খাবার ছিল না। তাই হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল যেখানে যা পেত তারা লুট করত।
খন্দকার আসাদুজ্জামানের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি মুজিবনগর সরকারের সচিব ছিলেন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিরোধ পর্বে টাঙ্গাইলের যুদ্ধে তিনি ভারতের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন অস্ত্রের জন্য। এ সময় অনেকেই ভারতে গেছেন অস্ত্র সংগ্রহ করতে। কিন্তু ভারত তখন তাদেরকে অস্ত্র দেয়নি। ভারত অস্ত্র কেন দেয়নি? কারণ ভারত তখনও জানে না যুদ্ধ কতদূর যাবে, বাংলাদেশ কতদূর যেতে পারবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধকালীন পর্বে ভারত তখন অনেকটাই ধোঁয়াশার মধ্যে, কারণ তখনও তারা কোনো খবরাখবর পাচ্ছে না। তারা খবর পাওয়া শুরু করেছে যখন- তখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু ভারত কী দেখতে পেয়েছে তখন? দেখতে পেয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, বাংলাদেশের মানুষ প্রতিরোধ করছে। এই প্রতিরোধ যদি না হতো, ভারত কি পারত বাংলাদেশকে সহায়তা করতে? খন্দকার আসাদুজ্জামানের সাক্ষাৎকার থেকেও বোঝা যায় যে, ভারত অপেক্ষা করছিল একটা সঠিক সময়ের জন্য।
বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে এই যে সূত্রটা দিল; যে, এখন তোমার জন্য ক্ষেত্রটা প্রস্তুত হয়ে গেছে, এখন মাঠে নামা যায়- এই সংকেতটা তারা দিতে পেরেছে তাদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিরোধের মাধ্যমেই। ভারতকে সে ইঙ্গিতটা আমাদের রাজনীতিবিদরা দেয়নি। দিয়েছিল আমাদের এই প্রতিরোধ। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় বাহিনী দেশে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত প্রধান ভূমিকায় ছিল কিন্তু সাধারণ মানুষ। মুক্তিযোদ্ধারা পথ দেখিয়ে গেছে- আর চূড়ান্ত সশস্ত্র যুদ্ধটা করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। তবে ভারতের প্রতিরক্ষা সচিবের কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি যে, ভারত এপ্রিল থেকেই সমরাস্ত্রের প্রস্তুতিটা নিতে শুরু করে দিয়েছিল।
একাত্তরে লুটতরাজ, ডাকাতি হয়েছে- সেসব পেশাদার চোর-ডাকাতই করেছে। আর করেছে রাজাকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রাজাকাররা হচ্ছে সবচেয়ে গরিব শ্রেণি। গ্রামের সবচেয়ে গরিব না হলে কেউ রাজাকার হয়? এরা রাজাকার হয়ে লুট, খুন করেছে। খুনখারাবি থেকে শুরু করে লুটতরাজ বা এই জঘন্য প্রকৃতিটা কমবেশি সবার মধ্যেই তো থাকে। সবচেয়ে বেশি যাদের মধ্যে ছিল তারাই রাজাকার হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় বোঝা দরকার যে, প্রতিরোধকালীন সময়ে কেউ রাজাকার হয়নি। রাজাকার, আলবদর সব হয়েছে প্রতিরোধ পর্বের পরে। অর্থাৎ প্রতিরোধ পর্বে পাকিস্তানের পক্ষে কেউ ছিল না। প্রতিরোধ পর্ব মানেই হচ্ছে বাংলাদেশের পর্ব। এবং এই জন্য এটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ বিজয় সম্ভব হতো না প্রতিরোধ পর্ব ছাড়া। মুক্তিযুদ্ধটা সৃষ্টিই হতো না প্রতিরোধ পর্ব ছাড়া। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেটা তৈরি হয়েছে প্রতিরোধ পর্ব থেকেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত সূত্র হচ্ছে প্রতিরোধ পর্ব। তাই একে নিয়ে আলাদা বিদ্যাচর্চা হওয়া উচিত। আমরা মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর কথা বলি, রাজনীতিবিদদের কথা বলি; কিন্তু তাদের কথা বলতে গিয়ে ভুলে গেছি জনগণ যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পক্ষ এককভাবে কখনও বলতে পারে না, আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। দেশ স্বাধীন করেছে সবাই মিলে। একাত্তরটা সবার। মুক্তিযুদ্ধটা সবার যুদ্ধ।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন দেশে প্রবেশ করল, এমন অনেক ঘটনা আছে তারা গরিব মানুষের বাড়িতে থেকেছে। সেইসব মানুষ আত্মাহুতি দেওয়ার মতো করে তাদের খাইয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে।
বাংলাদেশের গরিব কৃষক সাধারণ মানুষ এটা কেন করেছে? তাদের মধ্যে কাজ করেছে একটা জনভাবনা। এই বিশাল জনভাবনাটা সৃষ্টি হয়েছে একটা সংগ্রামের মাধ্যমে। আমি যখন লড়াই করি আমার ধারণা, আমার বিশ্বাস, আমার আত্মা ও মুক্তির জন্য। তখন এর চেয়ে সবল ও শুদ্ধতম প্রক্রিয়া আর হতে পারে না।
প্রতিরোধ পর্বটাই হচ্ছে আমাদের প্রধান ইতিহাস। বাকিটা হচ্ছে অন্য ইতিহাসের সঙ্গে মিলে কীভাবে সেটি সম্পূর্ণ হচ্ছে। এভাবেই আমি প্রতিরোধ পর্বটাকে দেখি। 

[সমাপ্ত]