লেখক ও গবেষক সালেক খোকন দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন আদিবাসী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয় নিয়ে। তার লেখা 'যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য' বইটি ২০১৫ সালে 'কালি ও কলম' পুরস্কার পায়। প্রকাশিত বই ২২টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- '১৯৭১ : রক্ত, মাটি ও বীরের গদ্য', 'দেশে বেড়াই', 'বিদ্রোহ-সংগ্রামে আদিবাসী', '১৯৭১ : যাদের ত্যাগে এলো স্বাধীনতা', 'আদিবাসী বিয়েকথা', '১৯৭১ : রক্তমাখা যুদ্ধকথা', 'আদিবাসী জীবনগাথা', '১৯৭১ : যাদের রক্তে সিক্ত এই মাটি', 'কালপ্রবাহে আদিবাসী' এবং 'রক্তে রাঙা একাত্তর'।
আদিবাসী ও নৃগোষ্ঠী নিয়ে অনেকেই কাজ করেন। তবে ওই জনপদের সাধারণের জীবনের কথা উঠে আসে গুটিকয়েকের লেখাতেই। বিভিন্ন সময় বইমেলাকেন্দ্রিক বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক এ সম্পর্কিত বই নিয়ে আলাদা আগ্রহ তৈরি হয় সাধারণ পাঠকের মধ্যে। দেখা যায়, সচেতন পাঠকদের মধ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়ছে। তবে এ সম্পর্কিত বই, বিশেষত গবেষণাধর্মী বই খুব সামান্যই রয়েছে।
যে কোনো সমাজের বিকাশের মাধ্যম সংস্কৃতি চর্চা এবং সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লড়াই। বাংলাদেশে শুধু বাঙালিদেরই আবাসভূমি নয়। এ ভূখণ্ড আরও অন্তত ২৪টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বাড়ি। তাই ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন ও তার বিকাশে বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে আচার-আচরণ, রীতি ও সংস্কৃতি চর্চা আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা অনস্বীকার্য। আর এজন্য গবেষণামূলক বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
'আদিবাসী বিয়েকথা' গ্রন্থটি পড়ার পর থেকেই উল্লিখিত কথাগুলো মনের ভেতর আরও শক্তভাবে গেঁথে যাচ্ছিল। আমাদের সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার সাংস্কৃতিক লেনদেন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর তাই এমন বই, যেখানে আমাদের সমাজেরই এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে আমরা পরিচিত হই, তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচ্য বইটিতে আলোচনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে আদিবাসীদের রীতি-আচার এবং প্রকৃতিনির্ভর সংস্কৃতি। যদিও গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে 'আদিবাসী বিয়েকথা'; তবুও এতে পাওয়া যাবে সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা-উপধারা; যা পাঠকমনের আগ্রহ আরও বাড়াবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে- 'সাঁওতাল আদিবাসীদের অধিকাংশই এখন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিয়েকেন্দ্র্রিক উৎসবের আচার ও বিশ্বাসগুলো আজ লুপ্ত হয়ে গেছে। ধর্মান্তরিত সাঁওতালদের কাছে সাঁওতাল বিয়ের আদি রীতিগুলো আজ কুসংস্কারমাত্র। কিন্তু আদি রীতিগুলো আঁকড়ে-থাকা সাঁওতালদের কাছে বিয়ের আদি রূপটিই তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।'
'আদিবাসী বিয়েকথা' গ্রন্থটি গবেষণামূলক। লেখক তার লেখনীতে আদিবাসীদের সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। যেখানে আদিবাসী সমাজে বিয়ের উৎসব, বিয়ের লোকাচারগুলো কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ, বিয়ের গান-নাচ, বিয়ে নিয়ে লোকবিশ্বাস ও মিথ, বিয়ের পোশাক, অলংকার, খাবার এবং বিয়ে বিচ্ছেদের রীতিগুলো কেমন- এসব তথ্য সংগ্রহ করতে লেখক আদিবাসী গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যে কারণেই এটি একটি গবেষণাগ্রন্থ হয়ে উঠেছে।
গারো সমাজ সম্পর্কে বইটির ৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, 'গারো সমাজ মাতৃপ্রধান। সন্তানের বংশধারা মায়ের দিক থেকে গণনা করা হয় এবং মেয়েরাই পরিবারের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হয়। ছেলেরা সম্পত্তির আপনজন হিসেবে ওই পরিবারের একজন হয়ে যায়। একটি গারো পরিবারে যদি পাঁচটি মেয়ে থাকে, তবে সবাই সমভাবে পারিবারিক সম্পত্তির অধিকারিণী হয় না। পরিবারের একটি মেয়ে মাত্র সমুদয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হয়। এদের সমাজে পরিবারের উত্তরাধিকার লাভকারী নির্বাচিত মেয়েকে 'নকনা' বলা হয়। পরিবারের প্রথমজন বা সবার ছোট মেয়েকে নকনা নির্বাচন করা হয়।'
এভাবেই আদিবাসীদের জীবনেতিহাস তুলে ধরা হয়েছে গ্রন্থটিতে। যেখানে হাজার হাজার অজানা তথ্য রয়েছে। আদিবাসীদের জীবন সম্পর্কে যারা জানতে বা গবেষণা করতে চান, এ বই তাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
গ্রন্থটির প্রতিটি ঘটনা মৌখিক বিবরণ থেকে নেওয়া। যে কারণেই এটি একটি মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে। এই গ্রন্থটিতে মোট ১৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির কথা রয়েছে। গারো, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ম্রো, মণিপুরি, ওরাওঁ, হাজং, তুরিসহ ১৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিয়ে, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য বিষয়-আশয় এক মলাটে পাওয়াটা খুবই আনন্দের বিষয়।
বইটির 'হাজং বিয়ে : ধর্ম মা-বাবা দাম্পত্য জীবনের ধারক-বাহক' অধ্যায়টি রীতিমতো অবাক করেছে। অধ্যায়টিতে রাজার ছেলের তার বোনের প্রেমে পড়েন, বিয়ে করবেন বলে জেদ ধরেন। রাজা তার জন্য অন্যত্র পাত্রী ঠিক করেন এবং বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়। কিন্তু রাজার ছেলে সে বিয়েতে রাজি নয়। বোন অঝোরে কাঁদতে থাকে। অশ্রুসজল চোখে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে। পুকুরের জল থেকে সে আশীর্বাদের শক্তিতে আকাশের দিকে উঠতে থাকে। আকাশের মাঝে একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।
এটি হাজং জাতিগোষ্ঠীর একটি রূপকথা। আকাশ থেকে মাঝে মাঝে স্নানের দৃশ্য মনে হলে জলকণার স্মৃতিতে রাজার মেয়ে রংধনু তৈরি করে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে যা অনেকটাই মিলে। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকেরই বিয়ের রীতিনীতি পাল্টে গেছে; কিন্তু এখনও আগলে রেখেছেন হাজং জাতিগোষ্ঠী পূর্বপুরুষদের জাতধর্মকে।
এভাবেই মানুষের জানার পরিধি বাড়ে। একজন আরেকজনকে জানানোর দায়ভার নেন। 'আদিবাসী বিয়েকথা' গ্রন্থটি পড়ে বারবার মনে হয়েছে কত অজানা, কতকিছুই না রয়েছে জানার! গ্রন্থটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পাঠকের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক বই হিসেবে স্থান করে নেবে বলে আশা করা যায়।