সি দ্য ডগ অ্যান্ড দ্য বাটারফ্লাই
আপ ইন দ্য এয়ার লাইক টু ফ্লাই...।
পাণ্ডুলিপি যখন শেষ হয়।
তখন কী হয়?
পিণ্ডিলিপি হয়। আর কী হবে?
মাহবুব আজীজ কল দিয়েছিলেন।
'দাদা পাণ্ডুলিপি যখন শেষ হয়। পনেরশ থেকে দুই হাজার শব্দ। সোমবারের মধ্যে হয়ে যাবে না দাদা?'
লেখা। মাহবুব আজীজ যখন বলছেন, হবে। হয়ে যাবে। লিখব। কিন্তু কী? পনেরোশ থেকে দুই হাজার শব্দ হিসাব করে না, দুই-আড়াই পৃষ্ঠার মতো লিখব। কত শব্দ হবে? হিসাব করি না। কিন্তু কী?
'ঠিক আছে মাহবুব। কিন্তু পাণ্ডুলিপি শেষ হলে কী হয়, এ তো লিখবেন লেখকরা-!'
'শুধু লেখাই কি পাণ্ডুলিপি দাদা? পেইন্টিং, সিনেমা, বছর- এই যে একটা বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে-।'
বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। বছর শেষ হলে বছর ছাড়া আর কিছু কি শেষ হয়? কোনো লেখা, কোনো আঁকা, কোনো সিনেমা, কোনো বেয়াদবি, কোনো অপমান?
পড়াশোনা এত কম, লেখা কঠিন। তবে দেখি। আকাট মূর্খের দেখাও দেখা। অং বং চং। কাজী আনোয়ার সম্পাদিত 'রহস্য পত্রিকা'য় বহু বছর আগে একটা অনুবাদ গল্প পড়েছিলাম। আইজাক বশেভিচ সিংগারের গল্প- 'বোকার স্বর্গ'। মনে থেকে গেছে।
বোকার স্বর্গ দেখি এবং বোকার স্বর্গে থাকি।
বেয়াদবি অপমান হেনস্তা ঘটবেই, বোকার স্বর্গের যত বোকা বোকা ঘটনা। মনে না রাখা মঙ্গলজনক। বিদ্বজ্জন মনে রাখেন না। মূর্খজনের মনে থেকে যায়। মূর্খতার অহমে। মাহবুব আজীজের তরিকামতো বছরকে যদি পাণ্ডুলিপি ধরি, কী কী জমেছে আমার পাণ্ডুলিপিতে? কাটাকুটি শুধু। বেয়াদবি অপমানের কাটাকুটি। পাণ্ডুলিপি পিণ্ডিলিপি হয়ে গেছে-।
ক্রোধ সংবরণ করো বালক।
করলাম।
বেয়াদবি অপমানের নমুনা পেশ করি কেবল একটা।
দুর!
বুলবুল ভাই নাই, হাকিম ভাই নাই, আমি বসে আছি নদীর পাড়ের ধুলায়, আমি এখন এর বেয়াদবি ওর অপমানের হিসাব করতে বসব? এরা কারা?
বুলবুল ভাই নাই? সত্যি কি নাই?
হাকিম ভাই?
মনে হয় নাই একবারও এখনও। দুই বন্ধু। একজন অসামান্য ছোটগল্পকার বুলবুল চৌধুরী, আরেকজন রহস্য সাহিত্যিক শেখ আবদুল হাকিম। আমি তাদের কে? তারা নাই মানে আমিও নাই। কিন্তু আমি আছি। এই দু'জন মানুষ কীভাবে তাহলে আমাকে এক পৃথিবীতে রেখে অন্যত্র থাকবেন?
আমার জন্য তারা আছেন। বুলবুল ভাই আছেন, হাকিম ভাই আছেন। এই শুক্রবারেও আমরা তাস খেলব সারাদিন। হাকিম ভাই নন্দিপাড়া থেকে আসবেন, বুলবুল ভাই সূত্রাপুর থেকে। মাহবুব রেজা শুক্রাবাদ থেকে। সাবেক পাক্কা জুয়াড়ি তিনজন। কাচ্চুর 'পিলিয়ার'। কাচ্চুর নিয়মকানুন আমি জানি না। সাবেকদের নানা কাহিনি শুনেছি। করুণ এবং হাসির। আমার মূর্খতার কারণে তাদের স্পেড-ট্রাম খেলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। বুলবুল ভাই অবশ্য সদা প্রস্তুত শিক্ষক।
'কাচ্চুটা শিখা লন মিয়া।'
'আমার কিছু শিখতে ইচ্ছা করে না।'
'সহজ খেলা মিয়া-।'
'সহজ খেলা, সহজ মানুষের। আমি কি সহজ মানুষ?'
সহজ মানুষ বুলবুল ভাই, হাকিম ভাই। সাঁইজি যে সহজ মানুষের কথা বলেছেন। ভজে দেখেছি। ভজনা করি।
ফি-শুক্রবারে আমাদের টুর্নামেন্ট যেমন হয়, আজ কি এর অন্যথা ঘটবে? তা কেন? বুলবুল ভাই জিতলে এক কথা, না জিতলে সেই পুরোনো মাতম, 'আমি আর নাই। জীবনে আর তাস খেলুম নারে মিয়া।'
হাকিম ভাই উত্তপ্ত হবেন। তুমুল ঝগড়া হবে মাহবুব রেজার সঙ্গে। কিছু শুক্রবারের মতো আজ মিটমাট হবে না। হাকিম ভাই, বুলবুল ভাই নেমে যাবেন। মাহবুব রেজা বসে সিগারেট ধরাবে। কিছু বিষোদ্গার করে নামবে। আমি বসে থাকব। বিষাদগ্রস্ত? একদম না। আধঘণ্টা-চল্লিশ মিনিট পর কল দেব বুলবুল ভাইকে।
'বুলবুল ভাই, বাসায় পৌঁছাইছেন?'
'হ রে মিয়া। মাত্র নামলাম।'
বুলবুল কখনোই উঠেন না, নামেন।
'ধ্রুব-ও-ও।'
'বলেন।'
'দেশি হাঁস রানতাছি মিয়া। নিয়া আমু?'
'আপনি রানতেছেন?'
'ওই তো রে মিয়া। বউ রানতাছে। আমি আগায়া দিতাছি।'
'আগায়া দিতেছেন না ভাবিরে যন্ত্রণা দিতেছেন? শোনেন, এই শীতের রাতে আর আসার দরকার নাই। কাল আসেন।'
'হইল রে মিয়া।'
আহারে আমার পাখি-মা বুলবুল ভাই। এ পৃথিবী একবার পায় তারে- তাদের। বুলবুল ভাই, হাকিম ভাইকে।
আমি ফোন বন্ধ করে আবার ফোন খুলব হয়তো নয়টা কি সাড়ে ৯টায়। কূটনামির একটা সেশন হয় এ সময়। ঢাকা টু সুনামগঞ্জ। মান্না তুষার ফরিদ খোকনের সঙ্গে। মুস্তফা, লিখনের সঙ্গে ধোঁয়ার অন্তর্গত কথা।
ফোনে দুটো মেসেজ আসবে এসবের মধ্যে। একটা এক অতি মূল্যবান পাথরের। আর একটা?
অচেনা নাম্বার।
টিউটর নিচ্ছি/দিচ্ছি মার্কা কিছু? চালডাল আটা কাঁচা মরিচের দাম?
না।
অদ্ভুত মেসেজ। ইংলিশে লেখা।
: মাহবুব রেজা : মোবাইল নং : এত এত.
আই হ্যাভ রিজন টু বিলিভ দিস
ম্যান ইজ ইনডাইরেক্টলি ট্রায়িং টু কিল
অর সিরিয়াসলি ইনজুর মি।
প্লিজ সেভ দিস মেসেজ অ্যান্ড সেন্ট টু
পুলিশ ইফ এনিথিং হ্যাপেন টু মি.
থ্যাংক ইউ!
মানে কী এর?
হুবহু এই মেসেজটাই আরেকদিন আমার ফোনে ডেলিভারড হয়েছিল।
১৮.০৬.২০১৯
০২.০২.০১ পিএম।
এ রকম একটা গুরুতর ব্যাপার।
আমি কল দিয়েছিলাম, 'হ্যালো?'
'ধ্রুব।'
'হাকিম ভাই! এইটা কী? এই মেসেজ কি আপনি পাঠাইছেন?'
'পেয়েছেন? হ্যাঁ। আমিই পাঠিয়েছি।'
'কেন হাকিম ভাই? কী হইছে?'
'আমি এই ব্যাপারে শিওর বুঝেছেন। দুরভিসন্ধি আছে ওর মাথায়।'
'আপনারে খুন করাবে ও?'
'নাও করাতে পারে। কিন্তু তার মাথায় এটা আছে। আমি প্রমাণ করতে পারব। আপনি তাকে পছন্দ করেন কিন্তু সে সহজ কেউ না-।'
'আরে না হাকিম ভাই। কী বলেন? আমরা একটা কথা বলি 'জানগাড়া'। আপনার জন্য মাহবুবের জানগাড়া বুঝছেন? সে আপনারে খুন করাবে কেন বলেন?'
'শত্রুতাবশত।'
'আপনি কি তার শত্রু?'
মুশকিল। কে বোঝাবে এই ডিফারেন্ট হেডকে?
'বুলবুল ভাই?'
'হ রে মিয়া। কন।'
'হাকিম ভাইয়ের মেসেজ পাইছেন?'
'পাইছি ধ্রুব। আগামাথা কিছু বুঝলাম না।'
'এইসব কী বলেন তো? তার লগে কী শত্রুতা মাহবুবের? শত্রুতাবশত মাহবুব খুন করাবে তারে? আমি কথা বলে বোঝাতে পারলাম না।'
'বাদ দেন ধ্রুব। হাকিম ভাইয়ের মাথামুথা গেছে। মাহবুব পাগলটা ফোন দিছিল আমারে। তারেও বাদ দিতে বলছি। হেয় তো আরেক জিনিস রে মিয়া।'
'হাকিম ভাইয়ের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে নাই?'
'করছে।'
'সামনের শুক্রবারেই দেখবেন মাতম। মাহবুব যদি আসতে আঠারো মিনিট দেরি করে হাকিম ভাই আঠারোবার কল দিব তারে।'
'দিবো।'
'আসলে কী হইছে বুলবুল ভাই, এত ওষুধ পড়ছে হাকিম ভাইয়ের শরীরে, পাওয়ারফুল ওষুধ, আমার মনে হয় এইসব ওষুধের রিয়্যাকশন। না হলে মাহবুব, চিন্তা করে দেখেন, সে খুন করার প্ল্যান করব? তা আবার হাকিম ভাইরে! এর চেয়ে হাসির কথা আর হয়?'
মাহবুবের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা আছে। আমি তার মামা। ২০১৯-এর ১৮ জুন থেকে 'সন্দেহভাজন খুনি' হয়ে গেল সে। কাণ্ড-!
একই রকম ঘটবে এইবারেও। সামনের শুক্রবার মধুরেণ।
এ এক চক্র!
আমি কি এই চক্র থেকে বের হতে চাই?
বেয়াদবি অপমান তাচ্ছিল্য কিছু নাই এই চক্রে। যা আছে সব অং বং চং। শেষ হয় না, শেষ হবে না। পাণ্ডুলিপি হোক কি পিণ্ডিলিপি।
'চলন্তিকা বাংলা অভিধান' এখনও কী সুন্দর! মুদ্রণ পরিপাট্য সামান্যতম পীড়িত করে না চোখকে। অন্তর্ভুক্তি আছে পিণ্ডি শব্দটার। পিণ্ড বা পিণ্ডি। অর্থ : মৃতের উদ্দেশে প্রদত্ত খাদ্য। পিণ্ডিলিপি সেই খাদ্যতালিকা। নিবেদন ইতি বা এই পাণ্ডুলিপি শেষ। বাবু কম্পিউটারে কম্পোজ করে দেবে। বিপ্লব পাঠিয়ে দেবে মাহবুব আজীজকে। বুলবুল ভাই, হাকিম ভাই পড়বেন। তাস খেলতে আসার পাঁয়তারা তারা গত শুক্রবারে বাসায় ফিরে গিয়েই শুরু করে দিয়েছেন। সকালে ফোনালাপ হবে দুই বন্ধুর।
'হাকিম ভাই, সমকালের কালের খেয়ায় পাগলায় কী লেখছে দেখছেন?'
'পড়েছি বুলু।'
আর একটা কথা বলবেন হাকিম ভাই। সব সময় বলেন। আমার সম্পর্কে। কী কথা?
'গোপনো' কথাটি রবে না গোপনে?
রবে।
পাণ্ডুলিপি শেষ হোক না হোক। সে যখন আর তখন।
গান শুনি 'হার্ট'-এর।
যখন তখন।
'ডগ অ্যান্ড বাটারফ্লাই।'
যখন তখন।
সি দ্য ডগ অ্যান্ড বাটারফ্লাই
আপ ইন দ্য এয়ার লাইক টু ফ্লাই...
যখন তখন।