ঢাকা শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গাজর ও পাঙাশ সমাচার

অনুগল্প

গাজর ও পাঙাশ সমাচার

চিত্রকর্ম :: নাজিব তারেক

রোমেল রহমান

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১২:০৬ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ১২:৪৫

গাজরের হালুয়া

হাঁড়ির ভাতে কুকুর মুখ দেয়ায় ঘুম থেকে উঠে লক্ষ্মী হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকল স্থির। কুকুরটা আরাম করে খাচ্ছে, খাক; খেয়ে যখন ফেলেছেই তাড়া দিয়ে লাভ কী। তার এই এক মরার ঘুমের রোগ আছে, যখন-তখন নেতিয়ে যাওয়া। বিয়ের মণ্ডপেও এমন হলো, ঠাকুরমশাই মন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন আর চারদিকের জটলা, হল্লার মধ্যেও লক্ষ্মী হাই তুলতে লাগল।

কুকুর হাঁড়ির ভাত খেতে খেতে রতন এসে ঢুকল ঘরে। পুরো দৃশ্য দেখে লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খাব কী তালি? জম্মের খিদে লাগিল।’ 

লক্ষ্মীর আবার ঘুম ঘুম পায়। ফলে সে শান্ত স্বরে বলে, ‘গাজর খাও গ্যে।’ 

বউ পেটানো তরিকার মানুষ না হওয়ায় রতন খুব ভালো ছেলের মতন এক বালতি জল নিয়ে উঠোন-লাগোয়া গাজরের ক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেল। এ বচ্ছর ফুলকপি আর গাজর লাগিয়েছে রতন।

শহরের মেমসাহেবদের মধ্যে নাকি গাজরের হালুয়া বানানোর চল উঠেছে গেল বচ্ছর থেকে। বাজার থেকে এসব শুনে এসে এবার একক্ষেত গাজর লাগিয়েছে রতন। ফলে সেই ক্ষেতে নেমে গিয়ে একেকটা গাজর তুলে বালতির জলে ধুয়ে সে খেতে শুরু করে। কিন্তু তার পেট ভরে না, ফলে সে গাজর তুলে ধুয়ে খেতেই থাকে। অন্যদিকে লক্ষ্মী আবার ঘুমিয়ে গেছে। কুকুরটাও হাঁড়ির পাশেই তলিয়ে গেছে। ঘুমিয়ে লক্ষ্মী একটা স্বপ্ন দেখতে থাকে যেখানে, সে পুকুরের মতন বিরাট এক কড়াইয়ে গাজরের হালুয়া রান্না করছে আর তার চাকর হিসেবে ঘি, চিনি, গাজর কুচি এগিয়ে দিচ্ছে তার স্বামী রতন। এই পর্যন্ত দেখেই সে লাফিয়ে ওঠে। উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখে তার মানুষটা ঠিকই গাজর খেয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর মায়া মায়া লাগে। মনে মনে সে ঠিক করে লোকটাকে গাজরের হালুয়া বানিয়ে দেবে। সেদিন রাত্রে লোকটা জাপটাজাপটির মধ্যেই জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যে লক্ষ্মী গাজরের হাইলো বানায় খিরাম কইরে?’ বাপের জম্মে এই বস্তু না খাওয়ায় বিপাকে পড়েও লক্ষ্মী কায়দা করে রেসিপিটা না জানা কাটিয়ে যায় চোপা দিয়ে, ‘ক্যান খাতি ইচ্ছে হচ্ছে নিকি?’ রতন বলে, ‘টেঁস্‌ কইরে দ্যাখতাম কিরাম খাতি, তাই। হ্যো কি আমাগের খাবার?’ ফলে পরদিন গ্রামের নানা জনাকে জিজ্ঞেস করে গাজরের হালুয়া বানানোর ফর্মুলা বের করে লক্ষ্মী। কুকুরটা এসে লক্ষ্মীর পাশে দাঁড়ায়। সেও দেখতে থাকে ক্ষেতের মধ্যে রতনের গাজর খাওয়া। ফলে লক্ষ্মী আবার টের পায় তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। একবার ঠিক করে মানুষটাকে ডাকবে। পরে ভেবেচিন্তে দেখে, কাছে এলেই গায়ের মধ্যে ঢুকবে, তার চেয়ে গাজর খেতে থাকুক আপাতত। ফলে লক্ষ্মী ঘরে গিয়ে আরেকটা ঘুম দেয় এবং পরের দিন ভোরবেলা উঠে দেখে স্বামী রতন তার পাশে নেই। লক্ষ্মী ব্যস্ত পায়ে ক্ষেতে এসে দেখে, ক্ষেতের মধ্যে একটা মানুষের সাইজের গাজর চিত হয়ে পড়ে আছে, আর ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি গাজর নেই। ফলে লক্ষ্মী বিনবিন সুরে কাঁদতে থাকে, আর বিলাপের সুরে বলতে থাকে, ‘মনের দুক্ষি গাজর হইয়ে গেইল্যে ... তা আমারে নিইল্যে না ক্যান?।’ অনেকক্ষণ কান্নাকাটির পর, স্বামীর সঙ্গে গাজর হবার বাসনায়, লক্ষ্মী ক্ষেতের বাকি গাজরগুলো খেতে শুরু করে। পরদিন দেখা যায়, কুকুরটা দুটো মস্ত গাজর বা মানুষ সাইজ গাজর পাহারা দিচ্ছে ক্ষেতের ফাঁকা জমিনে বসে। কিন্তু পুলিশসহ কৃষি অধিদপ্তরের লোকজন এসে গাজর দুটিকে ট্রাকে তুলে রাজধানীর দিকে পাঠিয়ে দেয়। জানা যায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হালুয়ার জন্য গাজর দুটিকে কৃষি অধিদপ্তরের ‘চাষার কবজি, সতেজ সবজি’ শিরোনাম প্রকল্পের সাফল্য স্মারক উপহার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। কুকুরটাকে পাঠানো হচ্ছে  চিড়িয়াখানায় কৃষিবান্ধব কুকুর হিসেবে প্রদর্শন করার জন্য। 

পাঙাশ মাছের তরকারি

রাত্রিবেলা একটা পাঙাশ মাছ নিয়ে আসে সুধাম। অঞ্জলি নিয়মিত বিরক্তি উপচে দিয়ে লেজ ঝাপটাতে থাকা মাছটাকে নিয়ে বারান্দার এক কোনায় ছুড়ে দিয়ে বঁটি আনতে যায়। একটা পিঁড়ি পেতে সুধাম তার অভ্যাসমতো বসে। অঞ্জলি মাছটাকে ধরে বঁটিতে ঘ্যাঁচ করে কাটতেই গলগলে রক্তে ভেসে যায় অঞ্জলির হাত। সুধাম মরা মাছের মতো চোখ করে তাকিয়ে থাকে ভাবলেশহীন। অঞ্জলি বিনবিন সুরে বলে, পাঙাশ মাছের রক্ত মানুষের মতন। সুধাম অঞ্জলির মুখের দিকে তাকায়। অঞ্জলি খণ্ডিত মাছের এক অংশ তুলে নিয়ে কাটতে গিয়ে বলে ওঠে, ধুর। সুধাম আরও মনোযোগী হয়ে তাকায় অঞ্জলির দিকে। অঞ্জলি নিচে পড়ে থাকা রক্তের মধ্য থেকে তার কাটা আঙুল তুলে সুধামের হাতে দিতে দিতে বলে– নেও জল দিয়া ধুইয়া রাখো, মাছটা কাটা শেষ কইরা নিই। সুধাম রক্তমাখা কাটা আঙুলটা হাতে নিয়ে ভাবলেশহীন হয়ে তাকিয়ে থাকে অঞ্জলির হাতের দিকে। দেখে একটা আঙুল নেই, সেখান দিয়ে রক্ত ঝরছে, কিন্তু পাঙাশ মাছের রক্তের সাথে সেটা একাকার হয়ে গেছে। ফলে সুধাম অনুভব করে তার চারপাশের আলো কমে আসছে, এবং সে মাথা ঘুরে পড়ে যায় হয়তো।

অঞ্জলির ধাক্কায় জেগে উঠে সুধাম দেখে এক গামলা ধোঁয়া ওঠা ভাতের গামলার পাশে লাল টকটকে ঝোলের তরকারি, আলু, টমেটো আর ধনেপাতা দিয়ে পাঙাশ মাছের ঝোল। ফলে সুধাম বউয়ের হাতের দিকে তাকায় এবং দেখে আঙুল নাই। এবং সে বলে ফেলে– আঙুল কই? অঞ্জলি বলে, আঙুল তো রান্না কইরা ফেলছি, খায়া দেখো মজা হইসে তরকারি। ফলে মাথার মধ্যে একটা হিজিবিজি লেগে যায় সুধামের। তারপর অঞ্জলি আঙুল গুনে দেখায় যে তার হাতে দশটা আঙুল আছে কিন্তু তাকালে দেখা যায় নয়টা কিংবা আটটা। ফলে সুধামের পাতে যখন মাছ তুলে দেয় অঞ্জলি তখন সুধাম দেখে পাতে টমেটো আলুর ঝোলের সঙ্গে আঙুল। সুধাম থাল সরিয়ে দিয়ে বলে– ভাত খাব না, ঘুম লাগে, এবং সে ঘুমিয়ে যায়। যখন ফজরের আজান হয় তার একটু আগে সুধামের ঘুম ভাঙে এবং সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আর ঝিমায় কিংবা অনুভব করার চেষ্টা করে পুরো ব্যাপারটা। আর ঠিক তখন চারজন কালো পোশাক পরা আজরাইল টাইপ ফেরেশতা কিংবা বন্দুকবাহী মানুষ এসে বলে– আমাদের একজন এক্সটা প্লেয়ার দরকার, যারে আমরা মিডিয়ায় বন্দিদস্যু হিসেবে দেখাব, তারপর পেমেন্ট দিয়া খালাস দিয়া দিব। তুমি কি রাজি আছো খেলতে? সুধাম তাদের চারজনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে একই রকমের চেহারা। ফলে বলে, আপ্নাগোর কি এই আঙুলটা আছে? কালো প্রাণীরা বলে, কোন আঙুল? সুধাম বলে, আপনারা যেই আঙুল দিয়া গুল্লি করেন, সেই আঙুল। প্রত্যেকে তারা বলে, আছে তো। ফলে, সুধাম বলে, আমার বউয়ের গুনলে আছে কিন্তু তাকাইলে নাই। 

সবাই ভিরমি খেয়ে বলে, ব্যাপারটা আসলে কী? তখন সুধাম বলে, ঘরে পাঙাশ মাছের তরকারি রান্না আছে, পৌষ মাসের ঠান্ডায় তরকারি এখন খাইতে হেভি টেঁস। খাইবেন? কালো জন্তুরা বলে, রিজিকের মালিক আল্লা, আপনে উছিলা হইলে আমাগোর না নাই। ফলে তারা পেট ভরে ভাত খায় আঙুল দিয়ে ফালি ফালি আলু টমেটো ধনেপাতার লালচে তরকারি মেখে। এবং অঞ্জলি খুব যত্নের হাতে তাদেরকে তরকারি তুলে দেয়। এবং খাওয়াদাওয়া শেষে সুধাম বলে, এইবার গুইনা দেখেন তো আপনাগোর হাতে আঙুল কয়টা? ফলে তারা প্রত্যেকে গুনে দেখে হাতে আটটা আঙুল। দুই হাতের তর্জনী নাই। কিন্তু তাকিয়ে দেখলে দেখা যায় আঙুল দশটা। সুধাম বলে, এইবার বন্দুক চালাবেন কেম্নে? তারা চারকজন বলে, পাঙাশ মাছের পেটের মধ্যে কি আঙুলগুলান পাওয়া যাবে? অঞ্জলি বলে– মাছটা তো খায়া ফেললেন, তার পেট পাবেন কই? তখন তারা চারজন বলে– তাইলে বন্দুক দিয়াই-বা কাজ কি, আঙুল যখন নাই? তখন সুধাম বলে, চলেন তাইলে ভাঙারির দোকানে বিক্কির কইরা দেই সের দরে? তারপর সেই টাকায় জিলাপি কিংবা দেলবাহার কিন্যা খাই? চারজনের একজন বলে, কিন্তু আমার তো বহুমূত্র। আমি বরং জিলাপি না কিন্যা একটা পাঙাশ মাছের ছাউ কিন্যা খাই? তখন অন্য সবাই বলে– তাইলে এক কাজ করি, সবার বন্দুক বিক্কিরের টাকা দিয়া একটা বড় সাইজের নদীর পাঙাশ কিন্যা আনি, সেইটা আরাম কইরা খাই? সবাই রাজি হয়ে বলে– উত্তম প্রস্তাব, খাইতে খাইতে পাঙাশ মাছের পেটের মইদ্দে একটা সমাধান পাওয়া যাইতে পারে, যেইটা এখনও আমরা পাই নাই। 

আরও পড়ুন

×