হুসেইন ফজলুল বারীর 'বিলেতি সৌরভ' গ্রন্থটি শুধুই কোনো ভ্রমণকাহিনি নয়। লেখক বইটির ফ্ল্যাপে সে কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, 'এটি বিলেত নিয়ে নিছক কোনো ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং এক নিবিষ্ট পাঠক আর মননশীল মানুষের জবানিতে অপূর্ব এক আখ্যান।'
করোনাকালে মন খারাপের দাওয়াই হিসেবে কিছু একটা করতে ইচ্ছে হলো লেখকের। তারপর কোনো একদিন বিহানবেলায় ঘুম ভেঙে অতি সন্তর্পণে লেখা শুরু করলেন বিলেতি সৌরভ। বলা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রে সরকার প্রদত্ত শেভেনিং বৃত্তি পেয়ে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়েছিলেন তিনি। লন্ডনে লেখকের তিনশ ষাট দিনের যাপিত জীবনের খণ্ডচিত্র এই গ্রন্থ। একশ বায়ান্ন পৃষ্ঠার বইটি তিনি ভাগ করেছেন ষোলোটি পরিচ্ছেদে। পরিচ্ছেদের নামগুলোও বেশ রোমাঞ্চকর ও কৌতূহলী। যেমন- নিঃসঙ্গ সম্রাট, ফুলের জলসা ও দণ্ডিত মানুষ, সোনালুর পাপড়ি ও কুফাবাসী সাধক, গ্রিক দীপশিখা, শেভেনিং বৃত্তি, আইনের তপোবন, সেমিটিক ললনা, তীর্থ, আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, বিলেতি সারমেয়, সুরমার জল, কাটামুন্ড ও শ্বেতহংসী, বিচারিক খুন, কালো গাউনের বাসিন্দা, পশ্চিম আজ খুলিয়াছে দ্বার ও ফেরা। এভাবে পনেরোটি গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে বিলেতি সৌরভ। প্রতিটি পরিচ্ছেদের নামেই এক ধরনের আকর্ষণ রয়েছে। কী নেই বইটিতে? ভ্রমণকাহিনি যে শুধুই ভ্রমণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রয়েছে আরও নানা আলোচনা। সেটা পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবে।
রচয়িতার প্রেমের টুকরো টুকরো স্মৃতির ফাঁকে এতে আইনের ইতিহাস থেকে শুরু করে ব্র্রিটিশ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি আর স্বদেশি আন্দোলনের খণ্ডচিত্র বৈঠকি ঢঙে মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদে লেখক তুলে ধরেছেন প্রিয় কোনো কবির পঙ্‌ক্তিমালা। প্রেম-বিরহ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস, শাসন-শোষণ, দেশপ্রেম কোনোটাই বাদ যায়নি বইটিতে।
ব্রিটিশদের শঠতা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, সিপাহি বিদ্রোহ আইনের যূপকাষ্ঠে বলি হওয়া সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, ইমাম আবু হানিফা, রবার্ট ক্লাইভ, চার্চিল, শাসক ওয়ারেন হেস্টিংস, গান্ধী, কবি মির্জা গালিব, জিন্নাহ, আইনবিদ জেরিমি, বেন্থাম, খুশবন্ত সিং, মার্কস, বিচারপতি মঞ্জুর কাদির, বিচারপতি ইব্রাহিমসহ রাজনীতি ও আইন জগতের প্রখ্যাত সব কুশলীবিদদের কথা উঠে এসেছে বিলেতি সৌরভে। বইটির একেকটি গল্প একেকভাবে আলোড়ন তুলবে পাঠকমনে।
একটি পরিচ্ছেদে তিনি আইন বিভাগে তার শিক্ষকদের স্মরণ করেছেন। শেভেনিং বৃত্তি পরিচ্ছেদে লেখক তুলে ধরেন আইনজীবীর জীবন ও অভিজ্ঞতার গল্প। আবার আরেকটি পরিচ্ছেদে উঠে এসেছে শিল্পী নাহিদ নিয়াজির কথা। তরুণ প্রজন্ম হয়তো তাকে চেনেই না। 'আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা' গানটি সবারই পরিচিত কিন্তু শিল্পীকে ভুলতে বসেছেন সবাই। এই অধ্যায়ে তিনি বিস্মৃতপ্রায় এই সংগীতশিল্পীর কথা তুলে ধরেছেন। যিনি বাংলায় কথাও বলতে পারেন না। তিনি একজন উর্দুভাষী।
বইটিতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিচ্ছেদ বলা যায় 'বিলেতি সারমেয়'। বিলেতি কুকুরদের নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ অধ্যায়টি পাঠকদের ভালো লাগতে বাধ্য। এভাবে গ্রিক দীপশিখা, সেমিটিক ললনা, তীর্থ থেকে শুরু করে সবগুলো পরিচ্ছেদই দুর্দান্তভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
গ্রিক দীপশিখা পরিচ্ছেদে এথেন্সবাসী এক অধ্যাপকের বয়ানে সক্রেটিস বইয়ের ভাঁজে যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দেন। মৃত্যুর সম্মুখে দাঁড়িয়েও সত্যের প্রতি সক্রেটিসের অবিচলতা ও তার করুণ মৃত্যু পাঠকমনকে তোলপাড় করে দেবে। মনে হবে, এ যেন স্বজন হারানোর শোক।
সর্বশেষ পরিচ্ছেদ ফেরা। এখানে তিনি নিজের ঘরে, বাবার বুকে ফেরার কথা বলেছেন। বিলেতে বসে মায়ের হাতের ইলিশের ঝোল আর সঙ্গে গরম ভাত খাওয়ার ইচ্ছের কথাও বাদ পড়েনি বইটিতে।
পাঠক পাঠভ্রমণরত অবস্থাতে লন্ডনের পাশাপাশি চকিতেই ঘুরতে আসবেন এথেন্স, লাহোর, কুফা, দিল্লি, ঢাকা, সিলেট, কোনো এক নিঝুম গাঁয়ে অথবা সোনালু-জারুল-কৃষ্ণচূড়া শোভিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখকের রঙিন তুলির আঁচড়ে তার সহপাঠীরা হাজির হয়েছে বইয়ের পরতে পরতে।
বইটির ফ্ল্যাপে চোখ রাখলেই পাঠক বুঝে যাবে লেখক পেশাগত দিক থেকে একজন বিচারক। আইন নিয়ে পড়া একজন মানুষের লেখনীতে এত রস, সাহিত্য, সমৃদ্ধ শব্দগাঁথুনি ও তথ্যের সম্ভারে ঠাসা তা বিলেতি সৌরভ বইটি না পড়লে বোঝা যাবে না। লেখনীতে তিনি কেবল বিচারিক গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকেননি বরং সাহিত্য ও ইতিহাসের অনবদ্য রূপও তুলে ধরেছেন। উঠে এসেছে ব্রিটিশদের প্রথম বিচারিক খুনে বলি হওয়া ব্রাহ্মণ নন্দকুমারের কথা। নিজের চেহারা না ধুয়ে সারাজীবন শুধু আয়না পরিস্কার করে যাওয়া মির্জা গালিবকেও লেখক তার কাহিনিতে উপস্থাপন করেছেন পরম মমতায়। বাদ যায়নি সিপাহি বিদ্রোহের প্রসঙ্গও।
আত্মকথন আকারে কাহিনিগুলো কী সুন্দরভাবে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য নতুন যারা লন্ডনে যাবেন, তাদের জন্য এই বইটি সহায়ক হিসেবে দারুণ কাজে আসবে। ইতিহাস-ঐতিহ্য, আদব কেতা ও সাহিত্য সংস্কৃতির অমরাবতী লন্ডনের সৌরভমাখা রচনাটি ভ্রমণসাহিত্যে এক অনবদ্য সংযোজন বলা যায়।