মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক
আমি এ গলির লোক-
মজা করে কবিতার লাইন মনে মনে সামান্য পাল্টে নিতেই একটা গলি এঁকেবেঁকে দৃষ্টির সামনে ফুটে ওঠে। সে গলি কোথাও শেষ হয় না। দুই পাশে দেয়ালের গায়ে বাড়ি আর বাড়ির গায়ে দেয়াল। কোথাও ড্রেনের পাশে ভাঙা কলের লাইন থেকে পানি ছিটকে বের হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে রোদ, রিকশার চাকা, ঝাড়ূদারদের সামগ্রী। জানালা খুললেই প্রতিবেশী বাড়ির উঠান, যত্ন আর অযত্নে বেড়ে ওঠা দু'একটা চেনা গাছ, বাড়িগুলোর কোনোটার দরজায় ঝুলে থাকা নিঃসঙ্গ লেটার বক্স। গলি বেয়ে সকালবেলা কেউ বাজারে যাচ্ছে অথবা ফিরে আসছে। সেখানে সময়ের শরীরে তেমন তাড়াহুড়োর চিহ্ন নেই। প্রতিদিন পুরোনো খবরের কাগজ কিনতে আসে যে লোকটা, সে-ও ঝুড়ি মাথায় বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গলির পেটের ভিতরে; ডাকতেও ভুলে গেছে যেন-
এই ... কাগজ।
এই যে এখন সকালবেলা উদ্‌ভ্রান্তের মতো শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ব্রেকফাস্ট, দ্রুত পথে বের হয়ে যাওয়া, যানবাহনের খোঁজ, অফিস, সিঁড়ি ভাঙার অঙ্ক শেখা প্রতিদিন, এইসব অসংখ্য দাগ আর ডেরায় লাঞ্ছিত জীবনের সঙ্গে গলির জীবনটাকে বদলে নিলে কেমন হয়? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন তার কবিতায় নিখিলেশের সঙ্গে জীবন বদল করতে চেয়েছিলেন, অনেকটা সে রকম! নিজের এই জীবনের ঘেরাওয়ের সীমানাটা টপকে আরেকটা জীবনে ঢুকে পড়া। ঢুকে পড়া বলব না ফিরে যাওয়া লিখব? হাতের কাছে টাইমমেশিন নেই। তবুও একদিন মনে মনে পাল্টে নেওয়া যেতে পারে ছোটবেলায় বন্ধুর সঙ্গে স্ট্যাম্প অদলবদল করার মতো। এক জীবনের পকেটে অন্য এক জীবনের বাদাম ঢেলে নেওয়ার মতো হতে পারে ব্যাপারটা। কিন্তু জীবন বদল করে নেওয়া তো শিশুর হাতে খেলনাটা পাল্টে দেওয়ার মতো নয়। আর পাল্টে নিতে চাইছিইবা কেন! এই জীবনের ছুট দেখতে দেখতে ক্লান্ত? প্রতিদিন একই শার্ট গায়ে দেওয়ার মতো সব একঘেয়ে? এখন যে জীবনের ঝান্ডার তলায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি সেখানে দিনের বেলা অফিসের বসের তাড়ায় পাশের গলিতে গরম চায়ে ডুবিয়ে পাউরুটি খেতে গিয়ে মুখ পোড়ানো থেকে শুরু করে বাইকে চেপে পথে মহাভারতের গল্পের অভিমন্যুর মতো ট্রাফিক জটের বূ্যহ ভেদ করা, ব্যাংক থেকে টাকা লোপাটের ধান্দা, শেয়ার বাজারে নজর রাখা, ক্রিকেট ম্যাচের স্কোর, রাতে বিছানায় শুয়ে গোপনে 'পাবজি' খেলা- সব আছে। অথচ একদিন মনে মনে জীবনটা পাল্টে নিয়ে দেখি গলির মুখে গার্লস স্কুলের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাবলুর জীবনে এসবের বালাই নেই। সে বহু বছর আগেই মানসিক স্থিতিশীলতা হারিয়েছে। মাঝে মাঝে ভাত খাওয়ার জন্য এর-ওর কাছে পয়সা চাওয়া ছাড়া আর কোনো চাওয়া নেই সেই জীবনে। পাল্টে নেওয়া জীবনে ঢুকে পড়ি। কোনো এক ছুটির দিনের সকালে চুল কাটতে সেলুনে গিয়ে দেখি দেয়ালে ঝোলানো সস্তা অসমান আয়নায় আমাকে আবার দেখা যাচ্ছে। কাঠের চেয়ারে বসে কেউ খবরের কাগজ মুখস্থ করছে, রেডিওতে চলছে ক্রিকেট খেলার রিলে। ধারাভাষ্যকারের গলা ভেসে আসছে- ব্যাটসম্যান বলটা ফাইন লেগ অঞ্চলে ঠেলে দিয়েই তুলে নিলেন একটা রান। ভাবছেন আমি জীবনটাকে কোন অঞ্চলে ঠেলে দিলাম? আপাতত আয়নার সামনে। আমাকে আবার দেখা যাচ্ছে সেই আয়নায়।
তাহলে এখন দেখা যায় না?
যায়। কিন্তু সেটা পুরো আমি নই। যা দেখা যায় সেটা পিথাগোরাসের সূত্র। আট দিয়ে ভাগ করে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর ভাগ শেষ।
জীবন পাল্টে নিলে সেই গলির জীবনে কি ভাগ শেষ থাকে? ছিল না কোনোদিন? নিজেকেই প্রশ্ন করি। চোখ বন্ধ করে কান পাতলে মসলা বাটার আওয়াজ, লম্বা করে শ্বাস নিলে পেষা মসলার গন্ধ সব ফিরে আসে ছায়াছবির মতো দেখতে পাই, বিকেলে গোসল শেষে আসা কারও সাবান-স্নিগ্ধ চুড়িতে ঝুলছে অপেক্ষার সেফটিপিন। অফিস থেকে ফিরবে তার কেউ। হয়তো ভাত খাবে, হয়তো খাবে না। মুখ-হাত ধুয়ে চায়ের কাপের সঙ্গে আধা দিনের বাসি খবরের কাগজ পড়বে, সারাদিন একা একা ঘর আর বারান্দায় পায়চারি করে জন্মাবে ছোট ছোট গল্প, রাতে বিছানায় অলস মশারি আর অভ্যস্ত আদরের সবটাই জানবে চুড়িতে অপেক্ষার সেই সেফটিপিন।
জীবনের খোঁজ করতে গিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে চমকে উঠি। টের পাই, মোবাইল ফোনটা নেই। নেই তো! চার্জে বসানো আছে? নাহ, ফোন উধাও। ওহো, জীবনের পাল্টে নেওয়া গল্পে মোবাইল ফোনের তো কোনো জায়গা নেই। ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়া ঘর, বিছানা, বালিশের পাশে অথবা পকেটের অন্তরালে আচমকা হরর ফিল্মের কোনো চরিত্রের মতো যখন-তখন ফোন বেজে ওঠার কোনো সিকোয়েন্স নেই এই নাটকে। এখানে ছুটতে ছুটতে ট্রেন ধরা নেই, বাস ধরা নেই। প্রতিদিন এক ধারায় বয়ে চলা জীবন। দু'একটা শার্ট, কয়েকটা প্যান্ট, ক্যারম খেলা, ছাদের রেলিংয়ে সন্ধ্যাবেলা বসে থাকা।
একটা জীবনের সঙ্গে আরেকটা জীবন বদলে নিতেই সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' সিনেমার সেই জাদুকরী সংলাপ 'যেমন ছিল তেমন'-এর মতো সবকিছু যেন আগের মতো। কোনটা আসল জীবন? প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাকে আসলে কী বলে? এত মুখস্থ প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ, দিন যাপনের ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তবুও গলিত স্থবির ব্যাঙ আর কয়েক মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে। হ্যাঁ, মাগেই তো। জীবনেরে কে ছুটি চায়? প্রতিদিনের চেনা ছবিগুলোকেই আবার ফিরে ফিরে দেখতে চাই। মুখ গুঁজে প্রতিদিন দৌড় আর দৌড়ের ভিতরে হয়তো আরেকটু কিছু রয়ে গেছে। সেই আশায় রেসের মাঠের ঘোড়ার মতো সবটুকু উজাড় করে দেওয়া। ওই 'হয়তো' শব্দটার মাঝেই বেঁচে থাকার ঘাস, লতাগুল্ম জন্ম নেয়! তাহলে কি সাদা কাগজে বড় করে লেখা হয়তো শব্দটার জন্য আমরা লড়ছি প্রতিদিন। শেষ মানে খুঁজে পেতে এতটাই প্রাণান্তকর অবস্থা?
ভিড়ের ভিতরে পা চালাতে চালাতে ভাবছি, বেঁচে আছি, কাজে ডুবে যেতে যেতে ভাবছি, বেঁচে আছি, কফি অথবা চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলতে ভাবছি, এই তো বেঁচে আছি। কিন্তু যে মানুষটা সুনীলের কবিতায় জীবন পাল্টে নিতে চাইল নিখিলেশের সঙ্গে, সে কি বেঁচে থাকল না তাহলে! সে তো কখনও নিশ্চয়ই মুখোমুখি হয়েছে প্রতিদিনের জীবনে মুখ গুঁজে থাকা অর্থহীনতার। তাইতো সে পাল্টে নিতে চেয়েছে জীবন। কী অসহায়! একসঙ্গে অনেকগুলো ঘোড়া ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে ঝুঁকে আছে সওয়ারিরা। বাতাসের পাতলা স্তরের মতো সময়কে ভেদ করতে চাইছে তারা একসঙ্গে। কিন্তু তারা জানেই না কখন নিজের ঘোড়ার পিঠে বসেই গুটিয়ে গেছে নিজের প্রাত্যহিক জীবনের গণ্ডিতে। ঘোড়সওয়ার তখন একা এবং বিচ্ছিন্ন।
পদার্থবিজ্ঞান বলে, মানুষ আসলে সময়ের একটা ফাংশন। সত্যিই কি তাই! এক্স অক্ষ বরাবর সময়কে বসিয়ে প্রাচীন জ্যামিতির মতো মানুষের জীবনের গ্রাফ তৈরি করে ফেলা যায়? পদার্থবিজ্ঞান অথবা জ্যামিতির জটিলতা সমাধানযোগ্য। কিন্তু মানুষের জীবন একদিন সহজ হয়ে আসে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নেই বোধ হয়। একদিন কবিতা লিখবে বলে যে মানুষটা ছুটি চেয়েছিল, সে আজকে ভাড়া বাড়িতে অথবা নিজের ফ্ল্যাটে শুয়ে শুয়ে ব্যাংক লোনের হিসাব গোছায়। কবিতার লাইন হঠাৎ পাওয়ার অফ হয়ে যাওয়া লিফটের মতো শূন্যতায় আটকে যায়। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে চিৎকার ভেসে আসে- দরজা খোলো, আমি আটকে গেছি। খোলা যায় শেষমেশ সেই দরজা? কোথায় আটকে যায় মানুষ? নৈমিত্তিক জীবনের চাওয়ার ভিতরে, পাওয়ার ভিতরেও? যাপিত জীবন ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ভালোবাসাহীন অশ্নীল কৌশলের এক সমন্বয়।
লেখাটা শুরু হয়েছিল একটা গলির গল্প দিয়ে। বাবলুর উদাস চোখে চাহিদাহীন আকাশের ছায়া দিয়ে। গলিটা আসলে ফেলে আসা অথবা হারিয়ে যাওয়া এক জীবনের ছবি হয়তো। গলির জীবনের সঙ্গে রুদ্ধশ্বাস জীবনকে পাল্টে নেওয়ার চিন্তাটা হয়তো মাথায় এসেছে এক ধরনের পলায়নপ্রবণতা থেকে। মধ্যবিত্ত জীবন তো বিপ্লব করতে চায় না, পালাতে চায় বরাবর। তাই গলিটাকেই মনে হয়েছে লুকিয়ে পড়ার একটা টানেল। সেই টানেলের ভিতরে প্রতিযোগিতা আর দৌড়ের বাইরে একটা নিস্তরঙ্গ জীবন আছে- এমন অলীক ভাবনাকে মন সমর্থন জানায়। 'জীবন বদল করে কী লাভ হলো আমাদের?' কবিতায় এমন লাইন আবার হাহাকার আর ক্লান্তিকেও টেনে আনে। অর্থহীনতার ভেতরে নিক্ষেপ করে সবকিছু। কিন্তু বুকে হাত রেখে বলুন তো, সবটাই কি অর্থহীন? চোখ বন্ধ করলে কখনও দেখতে পাই, আধা শহর মতো একটা জায়গা। এক ধরনের হলদেটে রং করা সরকারি কোয়ার্টার। বারান্দার তারে শুকায় তোয়ালে, নিরীহ লুঙ্গি অথবা কখনও সলজ্জ অন্তর্বাস। ঘরে মৃদু শব্দ তুলে টেলিভিশন চলে। দুপুরে সাইকেলে চেপে ভাত খেতে আসে কেউ। খাওয়া শেষ করে বারান্দায় হাত ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত মোছে। পুরুষটির সঙ্গিনী প্লেট-বাটি ধুয়ে রাখে। মাছের কাঁটা থাকলে বিড়ালকে খেতে দেয় বারান্দার এক কোণে। শুকিয়ে আসা অন্তর্বাস ঝটিতি হাতে ঘরে নিয়ে যায়। প্রতিদিন একই ছবি। পুরুষটি সকালে বের হয়ে যায় অফিসে। আবার দুপুরের বিরতিতে বাড়ি ফেরে খেতে। আবার অফিসে যায়। টেনে দেওয়া একটা দাগের ওপর দিয়ে বয়ে চলে জীবন এমাথা-ওমাথা। এই পুরুষটির কি মরিবার সাধ হয় এই মুখস্থ জীবনে? এই জীবনেরও একটা অর্থ আছে। মানুষ নিজেই খুঁজে নেয় খুব সাধারণভাবে বেঁচে থাকার ভেতরগত মানে। জীবনের প্রতিদিনের আগুনে হয়তো খুন হতে হয় না তাদের।

বিষয় : প্রতিদিনের আগুনে

মন্তব্য করুন