শূন্য অর্থনীতির পাঠচক্র
শাহাবুদ্দীন নাগরী

‘The same thing can be ZERO and INFINITE at the same time, depending on the context, or matrix of comparison.’
যোগ-বিয়োগ শেখাব বলে যার জন্য ধারাপাত
কিনে আনলাম, সে-ই আমার চোখে আঙুল ঢুকিয়ে
ফ্ল্যাশবাতির মতো জ্বালিয়ে দিয়ে পণ্ডিতের মতো বলল,
শূন্য আসলে শূন্য নয়, শূন্যেরও একটা মান আছে,
ওজন আছে, সেও দখল করে জায়গা, যেমন মহাশূন্য।

সংখ্যাতত্ত্বের হিসেব নিয়ে কখনও এভাবে ভাবিনি,
ক্যালকুলেটর টিপেই পেয়ে যাই গাণিতিক হাইওয়ে,
সুপারসনিক জেট প্লেনের ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে আসে
ফর্দ ফর্দ প্রিন্টআউট, মুগ্ধ হয় অর্থনীতির চালকেরা।
কিন্তু গ্রামের বকলম লোকটাকে বোঝাতে পারিনি
প্রবৃদ্ধি আর জিডিপির ম্যাজিক অর্থনীতি। তার কাছে
এক মানে এক লক্ষ এক হাজার, হাজারকে সে
আঙুলের ইশারায় নামিয়ে আনতে পারে শূন্যতে।

সে তর্জনী নাড়িয়ে আমাকে বলল, প্রতিদিন ঘুম থেকে
উঠে দেখি আমার শূন্য ট্রাঙ্কে জমা হচ্ছে অজস্র শূন্য,
মাথাপিছু আয় যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে তাতে ট্রাউজারে
লাগাতে হবে বাড়তি পকেট, কিনতে হবে সিন্দুক,
আপনিও অসংখ্য শূন্য পাচ্ছেন, কাঁধটা আগের চেয়ে
ভারী মনে হচ্ছে না? বিদ্রুপ করেই হয়তো বলল,
মাথাপিছু আয় কারও মাথায় বসে না, কাঁধেই বসে।
পরীক্ষার খাতায় শূন্য পাবারও একটা গভীর অর্থ আছে,
মাস্টারমশাইকেও বসাতে হয় একটা উজ্জ্বল সংখ্যা।

লোকটার কথা শুনে আমার হাত থেকে ঝরাপাতার মতো
উড়ে গেল সদ্য কেনা ধারাপাত, খোলাবাজার আর
মুক্তবাজার অর্থনীতি গোল পাকিয়ে গেল, বিশ্বব্যাংক আর
এডিবির প্রতিবেদনগুলো ঝাপসা হয়ে গেল কম্পিউটারে,
বকলম লোকটার 'শূন্য অর্থনীতির পাঠচক্রে' গোপন মুদ্রার
মতো অচল হয়ে পড়ে থাকলাম আমি। আমার ক্ল্যাসিক
জালিয়াতি ক্রমশ ফাঁস হতে শুরু করল হ্যাকারদের হাতে।


বালি ও কাঁকর
মোহাম্মদ হোসাইন

যাকে ডেকে আনি তার সাথেই মিশে যায়
স্তব্ধতাকে খুন করব বলে আরও স্তব্ধ হয়ে যেতে যেতে
দেখি বিষম মেঘ পড়েছে
পাহাড়ের গায়ে ঢলে পড়েছে বিষণ্ণ দেয়াল

যাকে কাছে ডাকব বলে কাছে এসেছি সেইই
মার্বেল পাথর ... সেইই বিহঙ্গ বিলাপ ...!

অথচ, সংহত, স্থিতধী গাছটিকে মনে হয় অরূপ বাউল
শাঁখে শাঁখে লিখে রাখা অপ্রেম আশ্নেষ!
যমুনাকে ভেঙে যেতে দেখি
গতরে তার অসংলগ্ন যৌবন
চাঁদ যতটা চাঁদ বুকে তার অজস্র ফাটল
আমার কোনো কাজ নেই, মৃতদের নাম লেখা ছাড়া ...

বালি ও কাঁকর মিশে না কোনো দিন
আজ তার অদ্বৈত মল্ল ...!


দুঃখনদীর ওপার থেকে
অতনু তিয়াস


দুঃখনদীর ওপার থেকে ...
আমাকে শুধালে তুমি ডেকে
ভালোবেসে তুলে নিতে দেহের তরীতে।
আমি তো বসেই ছিলাম
বহুদিন বহুযুগ কর্মহীন মাঝি
কেন এলে এতটা দেরিতে?

বলিয়াছি ভালোবাসি
বলিয়াছি সব দেব যা আছে আমার
আসলে কিছুই নেই
পারবে কি বইতে তুমি
ভরশূন্য পাগলের প্রলাপের ভার?
নিজেকে অস্পৃশ্য ভেবে
অলিন্দে রেখেছ যত্নে রক্তজবা ক্ষত
আমার কি সাধ্য আছে
ধুয়ে দেব মুছে দেব বেদনার ব্রত?!


এই শীত ভূমিকাপ্রধান
মতিন রায়হান

জাঁকিয়ে বসেছে শীত
শীত এলেই মনে পড়ে তার কথা
কার কথা?
আপাতত উহ্য রাখি নামধাম
ঠিকানা-ঠিকুজি
এই শীত ভূমিকাপ্রধান
সার কথা পরে হবে
আপাতত ভূমিকাতেই বেঁধে রাখি
হূৎকথন
সময়-সুযোগ পেলে
হয়তো ঘটবে তার
যথা বিস্তারণ
তবে কথা আর কাজকে যারা
একসুতোয় গাঁথে
তেমন মানুষের বিপ্রতীপে দাঁড়াল সে
তাই শীত আরও জেঁকে বসল
হৃদয়ে, অন্তঃপুরে
দুঁদে মন
না পায় স্থিতি
ঘর-গেরস্তি
ঘুরে মরে আদাড়ে-পাঁদাড়ে!
শীত এলো, তার কথা পড়ে মনে, নিরজনে
ভূমিকাতেই বলে রাখি
এই শীত বিঁধে খুব তার বুকে!


অন্য জন্মের কথা
হাসিবুল আলম


স্মৃতিভ্রংশ হবার দশম বছরে আমার মনে পড়ল-
আমি জন্ম নিয়েছিলাম একটা জাদুর থলেতে।
থলে ভর্তি জমানো ছিল অজস্র সময়। পাল-তোলা
মানুষের দেশে আমি 'সময়' জমাতাম। হলুদ খামে ভরে
রেখে দিতাম সমস্ত 'হাহাহিহি'।
প্লুটো গ্রহ থেকে পালিয়ে আসা একটা বেড়ালের সাথে সন্ধ্যায়
আড্ডা বসত আমার- নাম রেখেছিলাম প্লুটোই।
ছুটির দিনগুলোতে সমুদ্রের পাড়ে উপচে পড়া ভিড় থাকত
ওখানে। চাঁদের দিকে পা ঝুলিয়ে বসে থাকত কেউ কেউ।
ভিড়ের মধ্যে ভিড়তাম কম বলে, আমি আর প্লুটো
পাঁচ টাকার মচমচে দীর্ঘশ্বাস কিনে
একটু দূরে গিয়ে বসতাম।

জাদুর থলেতে আকাশ ভর্তি কিচিরমিচিরও থাকত- আমরা
দেখেশুনে কিছু কিচিরমিচির কিনে বাসায় ফিরতাম। বাসা ভর্তি
ঘুরে বেড়াত প্রকাণ্ড এক রাত।
ব্যাকগ্রাউন্ডে কিচিরমিচির ছেড়ে দিয়ে আমরা ঘুমানোর চেষ্টা
করতাম। আমাদের ঔপনিবেশিক শহরে সারারাত সাইরেন
বাজিয়ে দাপিয়ে বেড়াত, নিয়ত হারিয়ে যেতে থাকা-
উপকথার মানুষেরা।



যাদের কোনো ঘর নেই
অভিজিৎ চক্রবর্তী

হেঁটে যেতে যেতে যখন পথের শেষ
তারপর আর ফেরা হয় না
সন্ধ্যায় ঘরমুখী হাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা
মাথার ভেতরে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে।
তারে দুধ-কলা দিয়ে বলি,
পরের বসন্তে একটা ঘর বেঁধে দিব।
ঘুঘুদের প্রশ্নবাহী চোখে মিথ্যা বলা যায় না,
ঘর হোক সে তো সবাই চায়!
তবুও কিছু লোকের কোনো ঘর হয় না,
যাযাবর বাদুড়ের মতো
অন্ধকার কামড়ে থাকে তিতিশূন্যতায়

যাদের কোনো ঘর নেই,
কোনো শোক নেই, মৃত্যু নেই
পুরোটা জুড়ে কেবল পড়ে থাকে স্মৃতির কড়া নাড়া।


বিষয় : পদাবলি

মন্তব্য করুন