ধানমন্ডির সরকারি কোয়ার্টারটি রুবীর হাজবেন্ডের নামে অ্যালট হবার পর থেকেই রুবী দারুণ খুশি। খবরটা পাবার পর সে বিশ্বাস করতে চাইল না। তার ৯ বছরের মেয়েটিও চোখে-মুখে অবিশ্বাস মেখে বাবার মুখের দিকে স্পষ্টভাবে তাকাল।
'সত্যিই বাবা! আমরা কি সত্যিই ধানমন্ডিতে যেতে পারব! আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত হবে না। কোনো একটা ঝামেলা হয়ে যাবে শেষে।'
ছোট্ট মানুষটিও এইভাবে গম্ভীর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করে। নানারকম অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনের একমুখী দুর্গম দিকগুলো দেখতে দেখতে মেয়ের ধারণাটা এমনই হয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে সে দেখেছে, বাবা ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে পারে না। বলতে গেলে বাবার স্নেহ ছাড়াই বড় হয়েছে সে। মায়ের অফুরান কষ্ট। যদিও কষ্টেসৃষ্টে বাবা একসময় ঢাকায় এলো, তখন ঢাকায় পোস্টিং হলো না। হলো ঢাকার কাছাকাছি পিএটিসিতে। তবু আখেরে লাভই হলো কিছুটা। সপ্তাহের দুটি বন্ধের দিন ছাড়াও বাবাকে মাঝে মাঝে একটু বেশি কাছে পাওয়া যাচ্ছে। বড় রকমের ট্রেনিংয়ের ঝামেলা না থাকলে বাবা অফিস শেষ করে বাসায় চলে আসে। তখন বাবা আর মেয়েতে মিলে দীর্ঘদিনের অভাবটা একটু পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করা হয়।
এখন জাপান গার্ডেন সিটির এক হাজার স্কয়ার ফিটের বাসাটা বদলাতেই হবে। এ বাসায় কোনো আলো ঢোকে না। বাচ্চাদের সর্দি-কাশি সব সময় লেগে আছে। শীতে তো একেবারেই বরফে জমে ঠান্ডা। তাছাড়া প্রতি বছরই ভাড়া বাড়ছে। এসব কথার জটলা মাথায় নিয়ে রুবী এবার বিশ্বস্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে-
সত্যিই বাসা পেয়েছ?
হ্যাঁ, সামনের মাসে ঢাকাতেই পোস্টিং হবে। বাসাটাও পাব। এ মাস তো প্রায় শেষ।
সত্যিই পাব!
বলল তো! কনফার্ম লেটার দিয়েছে। তবে এখন যিনি আছেন, তিনি তিন মাস পরে যাবেন। তুমি একদিন যেয়ে বাসাটা দেখে আসো। আমাদের এখানকার বাড়িওয়ালাকেও বলতে হবে দু'মাস আগে।
ডাইনিং টেবিলে চায়ের পেয়ালা সাজাতে গিয়ে টুংটাং বাজে তার সুর। সেই সুরে ছড়িয়ে থাকে মুগ্ধতা। রুবী মুহূর্তেই পরপর সুখবরের দোলায় কিছুটা ঘোরের মধ্যে থাকে। খুব বেশি উচ্ছ্বসিত না হয়ে, মুখে ছোট্ট একটি শব্দ করে-
হুম।
কারণ, এর আগেও অনেক হঠাৎ পাওয়া সুখবরে ওর মন উতলা হয়েছে, কিন্তু খানিক পরেই ভয়াবহ পতনের অভিজ্ঞতা। সেবার প্রমোশনের আগের দিনও সে জানত, জামিল নিশ্চিত প্রমোশন পাবে। মেরিট লিস্টে ও কাজের অভিজ্ঞতায় সে প্রথম দিকে আছে। খবরটা নিশ্চিত করেছিল জামিলের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পরে দেখা গেল, মেরিট লিস্টে যারা আগে, তাদেরকেই বাদ দেওয়া হয়েছে। ঘটনা ঘটার পর পুরো বাড়িতে যেন মৃত্যুশোক নেমে এসেছিল। সরকারের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত শুষে নিয়েছিল তাদের ছোট্ট পরিবারের সবটুকু জীবনীশক্তি। ভয়ানক নিয়তি যেন নিমেষেই নিয়ে গিয়েছিল নির্মম অনিবার্য সময়ে। প্রায় একটি বছর জামিল শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। ঘুমের ট্যাবলেট ছাড়া ঘুমাতে পারত না। রুবী একা হাতেই সামলে নিয়েছে বাচ্চার স্কুল, সংসার, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। ভীষণ কষ্ট বুকে নিয়ে একটি একটি করে দিন পার করেছে। জামিলের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই।
২. মেয়েকে নিয়ে স্কুল শেষে ফেরার পথে রুবী ধানমন্ডির নির্দিষ্ট বাসাটির বিষয়ে খোঁজ নিতে যায়। গেটের দারোয়ানকে বিস্তারিত জানিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দারুণ ভালো লাগে তার। গেটেই লাল কৃষ্ণচূড়া। বেশ কয়েকটি পাঁচতলা বিল্ডিং আছে। সামনে সুন্দর মাঠ। নির্ধারিত বাসাটির সামনেই বিশাল মাপের কদমগাছ, নিমগাছ, আরও অনেক নাম না জানা গাছ। বাড়িটার পিছনেও খালি জায়গায় অনেক বড় বড় গাছ। লিফট নেই। পাঁচতলায় উঠতে রুবী ও তার মেয়ে হাঁপাচ্ছিল। দরজায় বেল চাপার পর অনেকক্ষণ অপেক্ষায় ছিল ওরা। তখন দুপুর একটার আজান হয়েছে। রুবী ভেবে নিল, বাড়িতে একজন মহিলা ছাড়া আর কেউ নেই। তাই বেল চাপার পর এত দেরি হচ্ছে। ততক্ষণে ওরা মা-মেয়েতে খুব অবাক চোখে দেখছিল বিস্তৃত অবারিত আকাশ। জাপান গার্ডেনের বাসায় বিশাল উঁচু বিল্ডিংগুলোর ফাঁক দিয়ে সরু নদীর মতো লাগত আকাশটাকে। এখানে আকাশের গায়ে শরতের সাদা সাদা স্তূপাকৃতি মেঘ। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েই মনটা ভরে গেল মা-মেয়ের। দুজনের টুকটাক কথাও হচ্ছিল।
মা, এখানে আমি আমার সাইকেল চালাতে পারব!
অবশ্যই পারবে।
মা, এখানে শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলা যাবে!
যাবে।
মা, এখানে আমার ফ্রেন্ড হবে!
হতে পারে। তবে তোমার বয়সী না হলেও একটু বড় বা ছোট বয়সের হতে পারে।
মা, তুমি কি একটা জিনিস দেখেছ?
কী!
খুব লজ্জার। ওই বিড়ালটা ঘাসের ওপর টয়লেট করে মাটি দিয়ে চাপা দিল। এইমাত্র দেখলাম! মা বিড়ালকে তো এভাবে টয়লেট করতে কখনও দেখিনি।
এবার দুজনেরই মিলিত হাসি। সামনের নিমগাছের পাতাগুলি থেকে স্নিগ্ধ বাতাস ভেসে এলো। মুহূর্তেই শরীর আর মনের ওপর স্নিগ্ধতার প্রলেপ দুজনকেই নীরব স্তব্ধতায় মাখিয়ে দিল।
রুবী ভাবল, অনেকদিন পর এমন নীরব সুন্দর দেখলাম। ব্যস্ততায় কখন যেন সব সুন্দর ম্লান হয়ে যায়। আচ্ছা জাপান গার্ডেনের অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনিতে সব সময় কাপড় শুকাতে দিয়ে রাখে কেন! কখনও দেখলাম না, কোনো একটি ব্যালকনি ফুলে আর সবুজে ভরা। একটা তীব্র দীর্ঘশ্বাসের সাথে শরতের হলুদ রোদের দিকে তাকিয়ে, নীরব শরৎ প্রকৃতির সম্মিলিত স্নিগ্ধ রূপটিকে সে নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নিল। যেন সে তীব্রভাবে চেয়েছিল, যা কিছু হতাশার মানচিত্র, তা ঢাকা পড়ে যাক অনন্ত অসীম আকাশের নিচে।
৩. যিনি বাসাটি ছেড়ে যাচ্ছেন তার সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো, তিন মাসের মধ্যেই নতুন বাসাটায় উঠে পড়বে ওরা। সিদ্ধান্ত পাকা হলো। যিনি ছেড়ে যাচ্ছেন তিনিও গ্রিন রোডের নিজস্ব ফ্ল্যাটে উঠে পড়বেন। দু'পক্ষেরই তাড়া ছিল, তাই বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হলো না রুবীকে। প্রায়ই মেয়েকে স্কুলে দিয়ে সে নতুন বাসার কাজকর্ম দেখতে আসে। সরকারি কাজ বলে কথা! নিজে দাঁড়িয়ে থেকে না করালে কাজের ফিনিশিং মোটেই ভালো হবে না। ছয় মাস পরেই বাড়ির সব পলেস্তারা ঝুরঝুর করে ঝরতে থাকবে।
কিন্তু এখানে সপ্তাহে যে ক'দিনই রুবী এসেছে, সে অবাক হয়েছে একটি চমৎকার স্মার্ট যুবককে দেখে। সে যখন গেটের ভিতরে ঢোকে, ছেলেটি সাইকেল নিয়ে বের হয়। অবরুদ্ধ শান্তভাবে কাটানো এতদিনের সময়গুলো কোনো এক অজানা কারণে যেন নতুনরূপে হাজির হচ্ছে। ছেলেটি দেখতে মডেলদের মতোই সুদর্শন ও স্মার্ট। কিন্তু চেহারায় কোমল ভাবটি রয়েছে। কারণ বয়স দেখে মনে হয় বিশ থেকে বাইশের মধ্যে। কোয়ার্টারে আসা-যাওয়ার পথে একমাত্র এখানকার দারোয়ান, সুইপার ছাড়া শুধু এই ছেলেটির সাথেই ওর পরিচয় হয়েছে। মাঝে মাঝে কথাও হয়েছে। ছেলেটির নাম রেদোয়ান, পাশের বিল্ডিংয়ে থাকে। বাবা-মা দুজনেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ছোট বোনটি ভিকারুননিসা স্কুলে পড়ে।
রুবী একদিন ব্যাকুলভাবে কাজের লোকের খোঁজ করতে থাকলে রেদোয়ান নিজ থেকেই তাদের বাসায় রান্না করার ঠিকা বুয়াটিকে পাঠিয়ে দেয়। নতুন বাসায় ওঠার পর, দুয়েকজনের সাথে হাই-হ্যালো হলেও রেদোয়ানের বাবা-মায়ের সাথে রুবীর আলাপ হয়ে ওঠে না। নিজের নানারকম ব্যস্ততা, মেয়ের স্কুল, অপার আকাশ, নীরবতা, শান্তি- সব মিলিয়ে সময় দ্রুত গড়িয়ে যায়। রেদোয়ানের সাথে প্রায়ই দেখা হয় রুবীর। সন্ধ্যার পরপরই বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে রুবী প্রায়ই রেদোয়ানকে আবিস্কার করে কদমগাছের তলায় নীল অন্ধকারে। কখনও সে মগ্ন হয়ে মোবাইলে কথা বলে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সন্ধ্যার পর কখনও কখনও রুবীর মেয়ে তার ছোট্ট সাইকেলটি নিয়ে বের হলে রুবীকেও মেয়ের সঙ্গে নিচের মাঠে নামতে হয়। মেয়েটা এখানে সাইকেল চালাবার সুযোগ পাচ্ছে ভেবে রুবীর খুবই আনন্দ হয়। তবে এখনও কারও সঙ্গে তেমন বন্ধুত্ব হয়নি। খাঁচাবন্দি জীবনের মানুষেরা আজকাল কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও করতে চায় না। সবাই কেমন যেন একা। অফিস-বাসা-মোবাইল ফোন-টিভি। তাই মেয়েকে নিয়ে রুবীকেই নামতে হয়। মেয়ের সমবয়সী কাউকে দেখলে রুবী নিজ থেকেই আলাপ জমাতে চায়। তবে সে এও বোঝে, তার শৈশব আর মেয়ের শৈশবে বিস্তর ফারাক। চারপাশে ভীষণ রকমের একাকিত্ব। সে হাজার চেষ্টা করেও মেয়ে লামিয়াকে তার শৈশবটি উপহার দিতে পারবে না। এই শিশুটি এভাবেই বড় হবে। মাকেই একমাত্র বন্ধু ভেবে।
এক সন্ধ্যায় সে দেখে রেদোয়ান মাঠের এক কোণে বসে খুব বিষণ্ণ মনে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে। কেমন যেন অন্যমনস্ক। যেন সে চিনতে পারছে না রুবীকে বা রুবীর ছোট্ট মেয়েটিকেও। মেয়েটা সাইকেল নিয়ে একটু দূরে চলে গেলে রুবী চারপাশ ছাপিয়ে মেয়েকে ডেকে আনতে যায়। আর ঠিক তখনই রেদোয়ানের চোখে চোখ আটকে যায়। কী যেন ছিল রেদোয়ানের চোখে! খুবই গোপন, অজানা আর ভয়ার্ত, জটিল। রেদোয়ানের চোখের ভাষাটি যেন আগের মতো নেই। কোথাও যেন নীরবে বদলে গেছে উচ্ছল ছেলেটি। সে যেন নিজের নামটিও মনে করতে পারছে না, এমনই অদ্ভুত বোবা দৃষ্টি। রুবী ওর সাদা টি-শার্টের হাফ হাতার একটু নিচেই দেখল, সাদা পেশল হাতের শরীরে রক্তাক্ত ট্যাটু, 'মুখোশ'। বিদেশি সিনেমায় শরীরে ট্যাটু করা অনেক নারী-পুরুষকে রুবী দেখেছে। তারা শরীরে সুন্দর নকশা আঁকিয়েছে, কিন্তু এই প্রথম একজন বাঙালি যুবককে সে ট্যাটু করতে দেখল। তাও অদ্ভুত ক্ষতচিহ্নে! অদ্ভুত শব্দ! 'মুখোশ'। ট্যাটু সে করিয়েছে সম্ভবত দু-একদিন আগে। হুম, তাই হবে। ওই যে চামড়ার ওপরে সুঁই ঠোকার চিহ্ন! মাংসের মখমলে এখনও জানান দিচ্ছে। সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলোতে খুব অস্বস্তি লাগছিল রুবীর। ঠিক এ রকমটি যেন হওয়ার কথা নয়। রুবী মৃদু হেসে দ্রুত জায়গাটি থেকে সরে পড়তে চায়। রাতের আকাশে সাদা মেঘের ভিতর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে রহস্যময় চাঁদ। ঠিক সেই সময়, রেদোয়ান পিছন থেকে মৃদু গলায় ডাকল-
আন্টি!
একটা ঝিম ধরা কণ্ঠস্বর যেন ভেসে এল বাতাসে। রেদোয়ান! কিন্তু ওর স্বরটি এমন অচেনা লাগছে কেন! যেন কোনো দুঃস্বপ্টেম্নর তলদেশ থেকে ওই ডাক! গাছের ওপরে একটা লক্ষ্মীপ্যাঁচা ডানা ঝাপটাল যেন! বাতাসটাও যেন ঝাপটা মেরে গেল। মাঠের ওপরে একটা বিড়ালছানা পড়ে আছে মড়ার মতো।

৪. কোরবানি ঈদের এক সপ্তাহ বাকি। অনেকদিন বগুড়ায় শ্বশুরবাড়িতে ঈদ উৎসবে যাওয়া হয় না রুবীর। এবার জামিলের ছোট ভাইটিও অনেকদিন পর বিদেশ থেকে ফিরেছে। রুবীদেরও সিদ্ধান্ত হলো বগুড়া যাবার। ভিতরে ভিতরে সবাই খুশি। রুবীর মেয়ে লামিয়া মুখের ভিতর চ্যাটচেটে ক্যাডবেরির স্বাদ নিতে নিতে তার প্রিয় বারবি পুতুলগুলো আর দাবার বোর্ডটি গুছিয়ে নিল। সাথে ছবি আঁকার রং, তুলি, খাতা নিতেও ভুলল না। ঈদের দু'দিন আগে ধানমন্ডি ছেড়ে যাবার সময় পুরো এলাকাটাই ফাঁকা লাগছিল। রুবীর কাজের বুয়া আরও দু'দিন আগেই ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে গেছে।
ঈদের দু'দিন পর রুবী সপরিবারে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে বেড়াতে গেল। জামিলের ছোট ভাই ও তার স্ত্রী সঙ্গী হিসেবে ছিল। ওদের একমাত্র মেয়ে লতা যেতে চাইল না। লামিয়া আর লতা কাছাকাছি বয়সের। তাছাড়া লতা বিদেশে বড় হওয়ায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। সেই তুলনায় লামিয়া কিছুটা সরল মনের; বয়সটা খুবই কম। ওরা দুজনেই বগুড়ায় দাদির কাছেই থাকতে চাইল। জামিল একটু আপত্তি করলেও রুবী খুশিই হয়েছিল। লামিয়া আর লতা একটি রাত দাদির সঙ্গেই থাকুক। বগুড়া থেকে পাহাড়পুর যেতে কিছুটা সময়ও লাগবে। দরকার কী! এখানে এসে আবার জার্নি করার! এমনিতেই ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বগুড়া আসতেই শরীরের ওপর একরাশ ধকল! থাক্‌, দরকার নেই। ওরা দাদির সঙ্গেই একটা রাত থাকুক।
নিজেদেরও একান্ত হবার সুযোগ থাকা দরকার। দীর্ঘদিন নিজেদের দাম্পত্যের দিকে ফিরে তাকানোও হয় না। নতুন জায়গায় নিজেদের দাম্পত্যকে নতুনভাবে আবিস্কারের একটা সুযোগ ও আনন্দ আছে। তাছাড়া পাহাড়পুরের বাংলোতে একটা নিরিবিলি রাত কাটাবার সুযোগও কম লোভনীয় নয় রুবীর কাছে। যদিও জামিল খুব সাদাসিধে, রোমান্টিক ধরনের নয়। তবু রুবী ভাবল, সে তার দেবর আর জায়ের সাথে মিলে সারা রাত মজার সব গল্প করেই না হয় কাটিয়ে দেবে! আর সবাই যদি ঘুমিয়েও থাকে, তাতেও রুবীর অসুবিধা নেই। একটা স্বপ্টম্ন-স্বপ্টম্ন নীরব রাত, দীর্ঘ দিনযাপনের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিতে পারে। সময় ও স্পেসের মাঝখানে এক রসায়ন আছে, তখন নিজেকে নিয়ে যা ইচ্ছে করা যায়। উড়িয়ে নেওয়া যায়, লুটিয়ে দেওয়া যায়। অনেকেই এসব টের পায় না। কোনো অনুভব ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দেয়।
৫. রাজা ধর্মপালের সময়ের এই বৌদ্ধবিহার। এটি নালন্দার মতোই বিখ্যাত ছিল অষ্টম শতাব্দীতে। এখন ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ এত বিস্তৃত আর এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায় না। বাংলোর বারান্দায় বসে দেখা যায়, সবুজ মাঠের ভিতর সবুজ রেইনট্রির সারি। বিকেলের দিকে একপশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল। আর সেই মনোমুগ্ধকর শান্ত পরিবেশে ওরা চারজন মিলে ঘুরে দেখছিল বৌদ্ধবিহারের চারপাশের সুন্দর শান্ত পরিবেশ। সবুজের গালিচার ভিতর ইটবাঁধানো লাল বেঞ্চিতে বসে ওরা দেখেছিল গোধূলিবেলার সূর্যাস্ত। বৃষ্টিতে বিহারের ভিতর পিছলে পড়ে যাবার আশঙ্কায় সেদিন আর বিহারের ভিতরটা দেখা হয়নি। একজন আরদালি রান্না চড়িয়েছিল বাংলোর ভিতর। রুবীর খুব বেশি ঘুরে দেখার ইচ্ছে দেখে সে বলল-
'কাল ভোরে আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব বিহারের ভিতরটা। এখন পানি হইয়ে পিছল হয়ে গিয়েচে। পরি যাবার ভয় আচে।'
ভোরে আরদালি আসার আগেই রুবী উঠে পড়ল। একাই এগিয়ে গেল বিহারের দিকে। ভোরের বেলাতেই সূর্য আজ গনগনে। তাই সে পাতলা চপ্পল পরেই বের হলো। মধুর লাগছিল সবকিছুই। বড় করে শ্বাস নিচ্ছিল সে শান্ত নিবিড় প্রকৃতির ভিতর। বিহারের ভিতরে সে নিমগ্ন হয়ে পড়ল, নিজস্ব ভাবনায়। কত শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুমিয়ে আছে পায়ের তলায়! বদলেছে পৃথিবী। সংখ্যায় বেড়েছে মানুষ, কিন্তু শ্রেষ্ঠতায়! এক অদ্ভুত মায়াবী শূন্যতার ভিতর রুবী দোল খায়। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ একটি গভীর খাদের দিকে ওর চোখ আটকে থাকে। সেখানে উপুড় হয়ে একটি ছেলে পড়ে আছে। তার বাম হাতে রক্তাক্ত ট্যাটুতে লেখা 'মুখোশ'। রুবী নিজেকে ছুঁয়ে দেখল! স্বপ্টম্ন না সত্যি! রেদোয়ান এখানে কেন! কিন্তু সে আর নড়তে পারল না। যেন অনন্তকাল ধরে সে এই খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। ওর পা-টা ভীষণ অসাড় লাগছিল, যেন আর নাড়াতে পারবে না। হঠাৎ রেদোয়ান যেন ফিসফিস স্বরে বলে উঠল-
'আন্টি বাংলোতে যান, আপনাকে সবাই খুঁজছে।'
ঠিক সেই মুহূর্তেই একঝাঁক পায়রা উড়ে গেল মাথার ওপর। রুবীর লম্বা কালো ছায়াটা যেন নিকষ কালো আর ভারী হয়ে উঠল অদ্ভুতভাবে। রুবীর মনে হলো তার লম্বা ছায়ার নিচে কেউ একজন চাপা পড়ে আছে। একটা গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে সে টালমাটাল অবস্থায় অতি কষ্টে বাংলোর দিকে এগোতে থাকল। দূর থেকে আরদালি তাকে দেখে দৌড়ে এলো। রুবীর শরীরটা যেন ভয়ে আর স্তব্ধতায় সাদা স্ট্যাচু।
এর পরের সময়টায় রুবী আর একমুহূর্ত থাকতে চাইল না। জামিল খুব আশ্চর্য হলো ওর ব্যবহারে। যার এত উচ্ছ্বাস, তা হঠাৎ মিলিয়ে গেল কেন! কিন্তু রুবী বারবারই বলছিল লামিয়া আর লতার কথা। যাই হোক, রুবীর তাড়নায় ওরা সেদিন বিকেলেই বগুড়ায় ফিরে গেল।
৬. ঈদের ছুটি শেষ হবার পর কেটে গেল, একটা পুরো সপ্তাহ। বুয়ার দেখা নেই। ভাগ্যিস কিছু কষানো কোরবানির মাংস বাড়ি থেকে আনা হয়েছিল! সব সময়ই ঈদের পরে এ ব্যাপারগুলো ঘটতেই থাকে! সাত দিন ধরে হাটবাজার বন্ধ। বাসাবাড়িতে লোকজন না ফেরায় এই সময় কিছুটা শান্ত লাগে ঢাকা শহর। রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা। কিন্তু কাজের বুয়াদের ছাড়া সংসারের হ্যাপা সামলানো! রান্নার পরেও কত কাজ বাকি থাকে! সব কাজ একা হাতে সামলিয়ে সে একেবারেই ক্লান্ত আর দিশেহারা! যাই হোক, এমন বিরক্তিকর সময়ে যখন দিনরাত কাজ করে করে রুবী দারুণ খারাপ মুডে টিভির টক শোতে চোখ রেখে নানা কিছু ভাবছে, হঠাৎ এক সন্ধ্যায় বুয়ার আবির্ভাব। মনের ভিতর বুয়ার ওপর রাগ পুষে পুষে কথা আগাচ্ছিল না রুবীর। তবু সে একটু তিক্ততা নিয়েই বলল-
'বুয়া এতদিন বেড়ানো লাগে?'
কিয়ের বেড়ানি! ছেড়াডারে ছোডুবেইলতুন পালছি, হের লাশ লইয়া গেরামে গেলাম, ম্যাডামের লগে। হায়রে হক্কলডি মিল্লা কান্দন!
কার কথা, কিসের কথা বুয়া! বুঝতে পারছি না। কার লাশ!
'আপনেরা তো গেলেন গা।
হুম।
ঈদের আগে আগেই গ্যালেন আপনেরা!
হুম্‌।
ম্যাডামে আর স্যারে মিল্লা গরু কিনল। হেইদিন থেইকাই ম্যাডামের লগে কী লইয়া গণ্ডগোল হইল, মায়ে-পুতে তরকাতরকি।
কার কথা বলেন!
রেদোয়ান ছেড়াডার কথা কই! হায় আল্লা! কুরবানির দিনডা ভালই ছিল্‌। ওমা পরের দিন সকালে ভিতর তুন দরজা খোলে না। বাগানের পিছন দিয়া যাইয়া জানালা ভাইঙ্গা দেহি রাইতেই সুইসাইড খাইছে। যক্ষনতক্ষন হাসপাতাল নিয়াও কাম হইল না। ঘুমের বড়ির লগে আরও কি যেন্‌ মিশাইছিল। কী কমু আফা! রেদোয়ানরে আমি পাঁচ বছর থেইক্যা পালছি। হেরা দুজনে অফিস করছে, আমি খিলাইছি, স্কুল থেইক্কা বাসায় আনছি। হের বাড়িত গিয়া কবরেও মাডি দিলাম।
কথা বলা শেষ করে বুয়া চোখ মুছতে মুছতে ঘর ঝাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে এগুলো।
যেন একটা টাইম বোমা বিস্টেম্ফারিত হলো কোথাও! রুবীর মনে হলো পৃথিবীজুড়ে এত কান্না লুকাবার কোনো জায়গা নেই। সে থপ করে সোফায় এলিয়ে পড়ল। ফর্সা মুখটা হঠাৎ যন্ত্রণায় যেন রক্তশূন্য হয়ে উঠল। গায়ের গোলাপি ওড়নাটা কখন খসে পড়ল গা থেকে। লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে রইল নিথরভাবে। রুবী নিশ্চলভাবে তাকিয়ে রইল বুয়ার ঘর ঝাড়ার দৃশ্যের দিকে। কবে যেন বিকেলের সোনালি রোদে, কাঁঠাল পাতার ঘূর্ণির ভিতর সে দেখেছিল এক সুন্দর যুবকের মুখ! এত সুন্দর! আবার পাহাড়পুরের গভীর খাদের, কালো ছায়ার ভিতর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা সেই ছেলেটি! ছেলেটা! শেষ পর্যন্ত! সুইসাইড! কী করে সম্ভব! রেদোয়ান বলেছিল, একদিন সে, তার মা আর বোনকে নিয়ে রুবীদের বাসায় বেড়াতে আসবে। প্রত্যাশা ছিল, সে আসবে। সে কি আর আসবে না! আসবে না! আসবে!
রেদোয়ানের নামটি কানে যাওয়া মাত্রই লামিয়া দৌড়ে এসে বলল-
মা, রেদোয়ান ভাইয়া আমার আর লতা আপুর সাথে চেজবোর্ড খেলেছিল। খেলেছিল তো! দাদির বাসায়। কী হলো মা! ওই যে দাদির বাড়িতে! রেদোয়ান ভাইয়ার সাথে আমি আর লতা আপা অনেক গল্প করেছি। সে বলেছিল ওখানেই তার বাড়ি। আমরা আরেকদিন চেজবোর্ড খেলব! খেলব তো মা!
লামিয়া বলছিল আরও অনেক কিছু ...। দাদির বাড়ি, পুকুরপাড়, বারবি পুতুল, চেজবোর্ড ...
রুবীর কানে কিছুই ঢুকছিল না। কে যেন অনেকক্ষণ ধরে ডোরবেল বাজিয়ে চলেছে। কেবলই বাজছে ডোরবেলটা। রুবী ছাড়া আর কেউ শুনতে পাচ্ছে না কেন!

বিষয় : নিঃসঙ্গ চেজবোর্ড মণিকা চক্রবর্তী

মন্তব্য করুন