কাজী আনোয়ার হোসেন সেই কবে থেকেই আমাদের নায়ক! ঠিক কবে থেকে, আমরা ভুলেই গেছি! ভুলে যাওয়াই ভালো, কারণ সন-তারিখের প্রসঙ্গ এলেই মনে আসবে যে তিনি আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন আজ, ১৯ জানুয়ারি ২০২২। কাজী আনোয়ার হোসেন, মানে আমাদের কাজীদা- নেই, এটা ভাবতে আমাদের একটুও ভালো লাগবে না। শুধু এইটুকু আমরা মনে রাখব যে তার কলম, ছাপাখানা, আর প্রকাশনা আমাদের কয়েকটা প্রজন্মকে রীতিমতো আলোড়িত করে রেখেছিল। বিশ্বায়ন আর তথ্যপ্রযুক্তি কী, যখন আমরা বুঝেই উঠিনি, সবকিছুই বড় ওহ, বড় দূরের, বড্ড রহস্যময় ... সেই এক সময়ে, তিনি হাজির আমাদের সামনে এক দুনিয়াভর্তি ঝুড়ি হাতে হাজির হয়েছিলেন। লেখক হতেই চাননি, চেয়েছিলেন একটা পয়েন্ট টু টু বোরের রাইফেল কিনতে- তাই প্রথম 'কুয়াশা' লেখা!
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তার বাবা, মা সাজেদা খাতুন, বোন সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, ভাই কাজী মাহবুব হোসেনসহ কয়েকজন- সব মিলিয়ে পরিবারের মধ্যে তিনি যেন উড়নচণ্ডী; গোয়েন্দা গল্প লিখছেন, ছাপাখানা বসিয়েছেন, শিকারের নেশা ঘুরছে রক্তে। ভাগ্যিস এমনটাই হয়েছিল! নইলে কোথায় পেতাম মাসুদ রানাকে? বিদেশি কাহিনি নিয়ে লেখা? ওসব আমরা থোড়াই কেয়ার করেছি- কারণ আমাদের কাছে অমন মেদহীন গদ্য, বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা, টানটান উত্তেজনা, আধুনিকতা আর কখনোই এমন করে কেউ হাজির করেননি। শুধু লেখা তো নয়, আমাদের পুরো প্রকাশনা জগতেই একটা নবযৌবন নিয়ে আসেন তিনি। যেসব ক্ল্যাসিক, বিদেশি সাহিত্য আমাদের অধরা ছিল ... আমরা তা পেতে থাকলাম নিয়মিত, সহজ ভাষায়; তার অনবদ্য সম্পাদনায় রীতিমতো 'সেবা রীতি' বলে একটা ভাষা ভঙ্গিই দাঁড়িয়ে গেল এই বাংলায়। তার আইডিয়ায়-নির্দেশনায় বেরোতে লাগল একের পর এক সিরিজ : তিন গোয়েন্দা, ওয়েস্টার্ন কত কত, কত কী! যদি মাসুদ রানার স্রষ্টা, লেখক- এসব পরিচয় ভুলেও যাই, তার হাতে গড়া সেবা প্রকাশনী আমাদের পুরো প্রকাশনা জগতের ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায় হয়েই থাকবে, সগর্বে!
আমাদের মানসকাঠামোই যেন বদলে দেন এই মানুষটির লেখা আর তার প্রকাশনীর বিস্ময়কর সব সৃষ্টি। আমরা সবাই জানতাম যে বিদেশি কাহিনিই আসল পুঁজি, বেশ ক'জন ছায়া-সহযোগী-গোস্ট লেখকের হাতে তৈরি 'সিন্ডিকেটেড' সব সিরিজ। তাই মহৎ সাহিত্যিকের কোনো তকমা তাকে আমরা দিইনি কোনোকালে, দিতে চাইওনি। আমরা তাকে বুকে করেই রেখেছি। আধুনিকতা, নীতিবোধ, দুরন্ত প্রেম, টানটান লড়াই, খুদে খুদে বাক্যের অমোঘ টান, বুনো পশ্চিমের মাদকতা, আফ্রিকার গহন অরণ্য, নিউইয়র্কের তপ্ত দুপুর, গিলটি মিয়া, সোহানা- এমন এক অদেখা বিশাল পাত্রের মধ্যে তিনি আমাদের ছেড়ে দিলেন; তপ্ত দুপুরে-তৃষ্ণার্ত আমরা তাতেই বুঁদ হলাম! বুঁদ হয়েই আছি! থাকব-ও!
গান গাইতেন, রেডিও-টিভিতে গেয়েছেন, হিজ মাস্টার্স ভয়েস থেকে গ্রামোফোন রেকর্ডও বেরিয়েছিল। বাংলায় এমএ করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনও নামি সংগীতশিল্পী। ছবি তুলতেন, মাছ মারতেন, শিকারের নেশা ছিল রক্তে; সব প্রায় ছেড়েছুড়ে তিনি লেখক হলেন। প্রকাশনা শুরু করলেন মূলত নিজের লেখা বই প্রকাশে সুবিধার জন্যই, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। উপার্জনের জন্যই লেখা, প্রকাশনা, প্রেস; তারপর? তারপর দিন-তারিখ ধরে মনে রাখবেন সমাজবিজ্ঞানীরা, আমরা শুধু এটুকু বুঝি যে এই যে আমরা বই পড়ছি সেটাই রসদ জুগিয়েছিল এই সেবা প্রকাশনী, মানে আমাদের কাজীদাই!
জন্ম ১৯ জুলাই, ১৯৩৬ সালে; চলে গেলেন ১৯ জানুয়ারি, ২০২২। সব মিলিয়ে, বাঙালির হিসেবে পরিণত বয়সেই, যদিও শেষ কটা দিন কেটেছে বেশ অসুস্থতার মধ্য দিয়েই। তার বার্ধক্যের ছবি আমরা মনে রাখব না, রাখতে চাইও না; আমরা তাকে মনে রাখব ওই চিরযুবা মাসুদ রানার মধ্যেই। যদিও কাজীদা নিজের মুখেই বলেছেন- 'আমি যা হতে পারিনি তাই মাসুদ রানা।' কিন্তু আমাদের কাছে তো তিনিই রানা : টানে সবাইকে, বাঁধনে জড়ায় না!
ডাক নাম নবাব। কিন্তু নবাবি চালে নয়, বাবা মোতাহার হোসেনের দেওয়া দশ হাজার টাকা ও দু'জন মাত্র কর্মচারী নিয়ে প্রেসের ব্যবসা শুরু করেন সেগুনবাগিচায়, ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৪ সালে সেবা প্রকাশনীর যাত্রা। তার দুই পুত্র কাজী শাহনুর হোসেন আর কাজী মায়মুর হোসেন দু'জনেই সুলেখক-সুঅনুবাদক, সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশনীর নানান বইপত্রের মধ্যে তার আরেকটি অনবদ্য সংযোজন 'রহস্যপত্রিকা'- কী এক স্মার্ট পত্রিকা, মাসিক। রহস্য-রোমাঞ্চ বিষয়ে এমন পত্রিকা এতদিন ধরে বেরোনো, সগৌরবে : আমাদের এখানে রীতিমতো রোমাঞ্চযাত্রাই বটে। আমি নিজে একসময় নামে-বেনামে লিখেছি এই পত্রিকায়; তার সম্পাদনা অনবদ্য- আধুনিক চিন্তায় কোনো চার সহ্য করতেন না, গদ্যের দুর্বলতা ঠিক করতেন ধরে ধরে; মন্দ লেখাকে মন্দ বলতেন, কিন্তু কীভাবে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায় সেটা ধরে ধরে দেখিয়ে দিতে কখনও কসুর করেননি।
কাজীদার অনুবাদের হাত যেন সোনায় মুড়োনো : না ঠিক অনুবাদ নয়, বরঞ্চ পছন্দের কোনো একটা গল্পকে নিজের মতো করে বলায় তিনি এক জাদুকর বটে! আমার স্মৃতিশক্তি বড্ড দুর্বল, কিচ্ছু মনে থাকে না। কিন্তু তার এক একটা তীক্ষষ্ট বাক্য আমি ভুলতে পারি না। কী করে ভুলি তার 'ছায়া অরণ্য' বইয়ের 'ঠিক দুপুরবেলা' গল্পের শেষটুকু, বইয়ের দিকে না তাকিয়েই : 'ঘাড় কাত করে নিচের দিকে চাইল তোতাপাখি। পালিশে করা পাথরের মতো চোখ দিয়ে দেখল কমরেড ফাজেল আহমেদকে। 'খিদে! খোরাক দে!' বলল পাখিটা! বাতি থেকে তাজা আইডিয়ার মতো একটা ভাব নিয়ে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে মাঠের ওপর হাত তোলেন কমরেড, কিন্তু খাঁচা পর্যন্ত পৌঁছল না হাতটা, বাকি রয়ে গেল দেড় ফুট। ঠিক সেই সময়ে পিচিক করে কিঞ্চিৎ মল ত্যাগ করল তোতাপাখিটা, টুপ করে পড়ল সেটা কমরেডের চট্ট, চকচকে টাকার ওপর।' মনে আছে প্রতিটা শব্দ! না থেকে উপায় কী, এমন নির্মেদ-শানিত গদ্য ভোলা যায়? এই পাঠ, বিরল অভিজ্ঞতাই তো বটে! সেই শক্তিতেই আমার মতো দুর্বল স্মৃতির মানুষকেও মনে রাখতে বাধ্য করেছে, যে কেউ বই খুলে দেখুন- মিল পাবেন নির্ঘাত!
এই থ্রিলার জগতের মানুষের কি প্রেম ছিল না? মনের খবর কে পড়তে পারে! তবে, আমরা শুধু মনে করতে পারি মাসুদ রানার পাতায় তার লেখা অমর গান :

যখন থামবে কোলাহল
ঘুমে নিঝুম চারিদিক
আকাশের উজ্জ্বল তারাটা
মিটমিট করে শুধু জ্বলছে
বুঝে নিও তোমাকে আমি ভাবছি
তোমাকে কাছে ডাকছি
ঘুমিয়ে পড়ো না বন্ধু আমার
জেগে থেকো সেই রাতে

এই আজ যেটুকু লিখছি, তার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা তো ওই রহস্যপত্রিকার হাত ধরেই : কাজীদার সম্পাদনায়। আমার মতো এমন কতজন। আমরা তো এই 'ক্যাপ্টেন'কে মনে রাখবই! স্যালুট জানাব মিলিটারি কায়দায়! আর এ-ও জানি, যারা তার কাছে আসেননি সশরীরে, এমন লক্ষ-লক্ষ পাঠক আমাদের চেয়েও তার কাছেই ছিলেন : বুকে করেই রেখেছিলেন, রাখবেন। সেবা প্রকাশনীর বইয়ের শেষে আলোচনা পাতায় পাঠকের সেই সব উষ্ণ চিঠি, আর তার উত্তরে কাজীদার বুদ্ধিদীপ্ত-রসসিক্ত সব উত্তর ভোলা যাবে কখনও?
বিদ্যুৎ মিত্র, শামসুদ্দিন নওয়াব ছদ্মনামে লিখতেন কাজী আনোয়ার হোসেন। ছদ্মনামের মতোই তার নানান ধারায় নানান লেখা। তিনি থাকুন কি না থাকুন; ঢাকার সেগুনবাগিচায় তার অফিস, বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আমার মতো হাজারো জন শিউরে উঠবে- এই সেই জায়গা, যেখানে তৈরি হয়েছিল তাদের জগৎ, দুনিয়া, স্বপ্ন, প্রেম, পাঠের চর্চা!
আমার একটা বই উৎসর্গ করতে পেরেছিলাম তাকে, তুলে দিতে পেরেছিলাম তার হাতে। ওতে লেখা ছিল : 'বাংলা ভাষায় পরিণত থ্রিলারের জনক, ঝরঝরে-ছোট ছোট বাক্যের বুদ্ধিদীপ্ত গদ্যের জাদুকর কাজী আনোয়ার হোসেন, শ্রদ্ধাস্পদেষু।'
এটুকুই।
ভেজা চোখে, বিক্ষিপ্ত মনে আর লিখব না আজ!

বিষয় : কাজীদা আসমার ওসমান

মন্তব্য করুন