১৯৪৩ সালের ২৮ অক্টোবর ফিলাডেলফিয়ার নেভি ইয়ার্ডে কিছু একটা ঘটল- নাবিকসহ ইউএসএস এলড্রিজ জাহাজটি সবুজ কুয়াশার মধ্যে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভার্জিনিয়ার নরফোক বন্দরে উদয় হয়ে আবার ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে এলো!
ছত্রিশ বছর ধরে সরকারি মহল বিষয়টি অস্বীকার করে এসেছে, কোনো বস্তুকে অদৃশ্য করার ব্যাপারে পরীক্ষানিরীক্ষা করার কথাও সরাসরি অস্বীকার করেছেন, এমনকি দ্য ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের বাস্তবতাকেও ওরা অস্বীকার করেছেন।
যদি তাই হয়, তাহলে- জাহাজে যে নাবিকরা ছিলেন, তাদেরকে কেন মানসিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো? ওই প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানীর কি রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল? এর সঙ্গে জড়িত লোকজনের পরিচয় লুকানো হয়েছিল, বহু দলিল হারিয়ে গিয়েছিল।
বছরের পর বছর ধরে আলোচিত সেই রহস্যের প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ- চার্লস বেরলিজ এবং উইলিয়াম মুরের দ্য ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট। এতে সরকারি দলিল এবং প্রত্যক্ষসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে যে সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে, তা এমনই আলোড়ন জাগানো যে, বিষয়টিকে আর কল্পকাহিনি বলা যায় না।
লেখকদ্বয় এই বইটিতে যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা সত্য হলে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট এমন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, যা খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পারে। এটা মানবজাতির জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
ওই ঘটনায় যারা বেঁচেছিলেন, তারা জানান, 'এলড্রিজ' জাহাজটিকে ফিলাডেলফিয়া ড্রাইডক থেকে ৪০০ মাইল দূরে ভার্জিনিয়ার নরফোকে টেলিপোর্ট করা হয়েছিল। রণতরীটি সময় ও স্থানের বাধা ডিঙিয়ে অন্য একটি ডাইমেনশনে চলে গিয়েছিল। তারপর আবার যখন জাহাজটি ফিরে এসেছিল, তখন নাবিকদের কারও কারও শরীরে আগুন ধরে গিয়েছিল, কেউ কেউ বদ্ধ উন্মাদ কিংবা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ওদের আর কখনও দেখা যায়নি।
মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত গোপনীয় একটি এক্সপেরিমেন্ট কি আসলেই একটি ডেস্ট্রয়ার অদৃশ্য করতে পেরেছিল? এত বছর এই কাহিনিটা নিয়ে জল্পনাকল্পনা চললেও, আজও এর সত্যাসত্য সঠিকভাবে প্রতিপাদন করা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে এ রকম একটি অসাধারণ ফলাফল যদি অর্জিত হয়েই থাকে, তাহলে সেই প্রজেক্ট কেন হঠাৎ বাতিল করা হলো আর সমস্ত বিবরণ সরকারি নথি থেকে মুছে ফেলা হলো?
চার্লস বেরলিজ এবং উইলিয়াম মুরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিরন্তর প্রচেষ্টার কারণে কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গিয়েছিল। তারা জানিয়েছেন, এলড্রিজ জাহাজটির চারদিকে একটি ফোর্স ফিল্ড প্রয়োগ করে মার্কিন নৌবাহিনী অদৃশ্যতার একটি এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল। সম্ভবত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি কাজে লাগিয়ে নৌবাহিনী অকল্পনীয় সাফল্য অর্জন করেছিল। তবে কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় এটা নিয়ে অধিক পরীক্ষানিরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়।
বারবার অচলাবস্থা সৃষ্টি, আমেরিকান অফিস অব নেভাল ইনফরমেশন থেকে অস্বীকার করা এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাব হলেও ব্যাপারটি একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। যেভাবেই হোক, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং এর সম্ভাব্য সপ্রমাণতার যথেষ্ট বিশ্বাস থেকে লেখকরা ধারণা করেন যে ঘটনাটি হয়তো আসলেই ঘটেছিল। প্রচুর গবেষণা থেকে যতটুকু প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা থেকেই ওরা মনে করেন এর সত্যাসত্য বিচার করা যাবে। তবে এটা সত্য যে ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরির গবেষণায় আইনস্টাইন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। কোনো কিছু বা কাউকে অদৃশ্য করার সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না; আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে সমমাপের বহু অসম্ভব মর্যাদাসম্পন্ন তত্ত্ব অর্জিত হয়েছে। ফলে আমরা জানতে পেরেছি যে, আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ঘিরে এমন অনেক অদ্ভুত বিষয় রয়েছে, যার কেবল শুরুতে আমরা রয়েছি।
অদ্ভুত এই ঘটনাটি গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার নিরিখে প্রায় অসম্ভব বলা চলে। আগেকার দিনে হলে হয়তো একজন জাদুকরের স্রেফ জাদুর খেলা হিসেবে ব্যাপারটি সহজেই বিশ্বাস করা যেত। কেননা কথিত ঘটনাটি একটি অদৃশ্যতার সফল এক্সপেরিমেন্টের চেয়ে কম ছিল না। আর এটা হয়েছিল ফিলাডেলফিয়ায় নৌবাহিনীর একটি ইয়ার্ডে, যেখানে সুস্পষ্টভাবে কোনো জাদুমন্ত্রের পরিবেশ ছিল না।
ঘটনাটির একটি ভাষ্য থেকে জানা যায়, একের পর এক কতগুলো ম্যাগনেটিক ম্যানিফেস্টেশনের ফলে নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায় এবং একটু পরই জাহাজটি অন্য আরেক জায়গায় আবির্ভূত হয়েছিল। ওই ভাষ্যটির বিশদ বিবরণ থেকে জানা যায়, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া জাহাজটিতে যেসব নাবিক ছিল, তাদের শরীর ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। পরে তাদের অনেকের মানসিক সমস্যা দেখা দেয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ফলে বিষয়টি নিয়ে এরপর সব ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল।
চার্ল বেরলিজ বলেন, কোনো বস্তুর ওপর তীব্র এবং অনুনাদী চৌম্বকত্ব সঞ্চারিত হলে বস্তুটির আণবিক গঠন পরিবর্তনের ফলে বস্তুটি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। বইটি গবেষণাধর্মী হওয়ায়, এতে প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে। তাই বোঝার সুবিধার জন্য বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ইংরেজিতেই রেখে দেওয়া হয়েছে। অনুবাদক যতদূর সম্ভব সাবলীল ভাষায় বইটি অনুবাদ করেছেন, যা যে কোনো পাঠকের কাছে সহজবোধ্য মনে হবে। বিজ্ঞান বা অজানা বিষয়ের প্রতি যারা আগ্রহী, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।