'প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকস'-এর অধ্যাপক টমাস পিকেটির লেখা 'ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি' বইটি প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। অনেকেই মনে করেন, এ বইটি গত দশকের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনার বাংলায় অনুবাদকৃত সংক্ষিপ্ত ভাষ্য তুলে ধরেছেন লেখক মোহাম্মদ মাসুম। প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার এ গুরুত্বপূর্ণ বইটিকে ১৬৮ পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলা রূপ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসুম। বাংলা নামকরণ করা হয়েছে 'টমাস পিকেটির একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি : একটি সংক্ষিপ্ত ভাষ্য'। বিশ্বময় ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদ বৈষম্যের প্রকৃত কারণ খুঁজে তার বাস্তব সমাধান বের করার লক্ষ্যে, বিশটি দেশ থেকে সংগৃহীত যাবতীয় ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত, যার কোনো কোনোটি অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত, বিশ্নেষণ করে, প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক টমাস পিকেটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পুঁজিলব্ধ আয়ের বার্ষিক হার যদি জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়, যে প্রবণতা সাম্প্রতিককালে লক্ষণীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রয়োগযোগ্য বিশেষ কিছু নীতিমালা ব্যতিরেকে বৈষম্য বৃদ্ধি অনিবার্য।
বিশাল ঐতিহাসিক ক্যানভাসে রচিত, অনবদ্য বিশ্নেষণসমৃদ্ধ, ২০১৩ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত টমাস পিকেটি রচিত বইটির ইংরেজি অনুবাদ ঈধঢ়রঃধষ রহ ঞযব ঞবিহঃু ঋরৎংঃ ঈবহঃঁৎু পরের বছর ২০১৪ সালে প্রকাশিত হলে বইটি পড়ে লেখক মোহাম্মদ মাসুম তার সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে এই বইটি নিয়ে বলেন, 'অসাধারণ এই বইয়ের, যাকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পল ক্রুগম্যান আখ্যায়িত করেছেন চলতি দশকের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পাঠ বাঞ্ছনীয়। সে উদ্দেশ্যেই, প্রায় সাতশ পৃষ্ঠার বিশাল এই বইটির একটি সংক্ষিপ্ত বাংলা ভাষ্য প্রণয়নে আমার এই উদ্যোগ।' অধ্যাপক মাসুম ৩০ বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করার পর এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে অবসর জীবনযাপন করছেন। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
অধ্যাপক মাসুম তার অনুবাদকৃত সংক্ষিপ্ত ভাষ্যটিকে ১৪টি অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। প্রথম খণ্ডে দুটি অধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ডে চারটি, তৃতীয় খণ্ডে ছয়টি এবং চতুর্থ খণ্ডে দুটি অধ্যায় সংযোজিত করে উপসংহার দিয়ে সমাপ্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে উপস্থাপন করেছেন আয় ও উৎপাদন। দীর্ঘকাল পর্যন্ত অর্থনীতিবিদরা ভেবেছেন, শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার উৎপাদনের বিভাজন মোটামুটি স্থির। যার শ্রম সে পাবে দুই-তৃতীয়াংশ এবং যার পুঁজি সে পাবে এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত অনেক ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বলে যে, অতীতে অনেক সময়েই শ্রম ও পুঁজির বিভাজন মোটেই স্থির ছিল না। ১৯১৪-৪৫ সালে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, তিরিশের দশকের মহামন্দা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং গৃহীত নতুন করনীতি, ১৯৫০-এর দশকে পুঁজির মাঝে উৎপাদনের অংশ ঐতিহাসিকভাবে নিম্নস্তরে নেমে গেলেও অতি অল্প সময়েই পুঁজি তার শক্তি বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়। ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে মার্গারেট থ্যাচার এবং ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগ্যানের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পুঁজির অগ্রযাত্রা শুরু হয়, যা আরও বেগবান হয় ১৯৮৯ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ১৯৯০-এর দশকে গৃহীত পুঁজিবাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী বিধিমালার শিথিলীকরণ এবং পুঁজির বিশ্বায়নের মাধ্যমে। বর্তমানে পুঁজির অবস্থান ১৯১৩ সালের পরবর্তী যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। অধ্যাপক মাসুম এ অধ্যায়টিতে জাতীয় আয়, পুঁজি ও সম্পদ, জাতীয় হিসাবের ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে উপস্থাপন করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়টিতে পুঁজির রূপান্তর নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সপ্তম থেকে দ্বাদশ অধ্যায়গুলো সাজানো হয়েছে বৈষম্য নিয়ে। যেখানে বৈষম্য নিয়ে প্রাথমিক ধারণা, শ্রমলব্ধ আয়ে বৈষম্য, পুঁজির মালিকানায় বৈষম্যসহ বিবিধ বৈষম্যের কথা উল্লেখ করেছেন। একবিংশ শতাব্দীতে একটি সামাজিক রাষ্ট্র কীভাবে গঠিত হবে তার আলোকপাত করা হয়েছে ত্রয়োদশ অধ্যায়ে। এ বইটির অধ্যায়গুলো শেষ হয়েছে চতুর্দশ অধ্যায়ের 'একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজি নিয়ন্ত্রণ কৌশলের রূপরেখা' শিরোনামের মধ্য দিয়ে।
বইটি পড়ে পাঠক অর্থনীতি সম্পর্কিত অনেক অজানা অধ্যায় জানতে পারবে নিঃসন্দেহে। অর্থনীতির ঐতিহাসিক দিক যেমন পাঠকের সামনে উঠে আসবে, তেমনি বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কেও ধারণা করতে পারবেন পাঠক। অবসর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটি সুপাঠ্য হিসেবে সব ধরনের পাঠক উপযোগী হয়ে উঠেছে।