ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার আয়োজনে, অতীতের বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমার থাকার সুযোগ হয়েছে। সম্ভবত সব অনুষ্ঠানই আমি দেখেছি। জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কয়েকবার ছিলাম। কিন্তু এবার অনুষ্ঠান এত সুপরিকল্পিত ও নান্দনিক, এমন সুনিপণ এবং সময়ানুবর্তী যে, শুধু ব্র্যাক ব্যাংক-সমকালই না; দেশের কোনো সাহিত্য অনুষ্ঠানই আমি এতটা পরিপাটি এর আগে দেখিনি। এমনকি প্রধান অতিথির জন্যও অপেক্ষা না করেই অনুষ্ঠান শুরু করে দেওয়া, প্রধান অতিথি এসে সরাসরি মঞ্চে আসন গ্রহণ করেছেন -এই সময়ানুবর্তিতা আমাকে অভিভূত করেছে। সেই সঙ্গে ছিল মাহবুব আজীজের প্রাঞ্জল সঞ্চালনা। করোনাকালে দুই বছরের অনুষ্ঠান একসঙ্গে হয়েছে একটু কাটছাঁট করে, কিন্তু কোথাও কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। বরং আরও নান্দনিক হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে, আমার তো আনন্দের আর অবধি নাই। আমার খুব প্রিয় দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ, 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না' পুরস্কৃত হয়েছে। এটি প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে একেবারে ভিন্ন মেজাজের, ভিন্ন চরিত্রের। প্রথম বই 'যে জলে আগুন জ্বলে'র প্রথম কবিতা ছিল- 'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়' [কবিতা :নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়]। কিন্তু দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের পুরো চরিত্র আলাদা। এ গ্রন্থের সূচনা করেছি- 'এক জীবনের সব হাহাকার বুকে নিয়ে/ অভিশাপ তোমাকে দিলাম,-/তুমি সুখী হবে, খুব সুখী হবে' [কবিতা : ব্রহ্মপুত্রের মেয়ে]। একদমই ভিন্ন বক্তব্য, ভিন্ন আমেজে। আমি চেষ্টা করেছি- প্রেম, ভালোবাসা, বিবাহ, বিচ্ছেদ, বেদনা এইগুলি দিয়েও মানুষকে সুপথে আনা যায় এই মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কারণ এইগুলিও দ্রোহেরই অংশ। দ্রোহ ছাড়া যেমন প্রেম হয় না, প্রেম ছাড়া তেমনি কেউ দ্রোহী হতে পারে না। দ্রোহী হতে হলে প্রেমিক হতে হবে আগে। এই দর্শনটাই আমি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'য় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছি। এটা অবশ্যই আমার একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা। আমার এই ভাবনার সঙ্গে কেউ ভিন্নমত পোষণ করতেই পারেন।
'আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে,/মানুষের কাছে এও তো আমার একধরনের ঋণ।/এমনই কপাল আমার/অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।' [কবিতা :কবিসূত্র]
আমার যাপিত জীবনে বেদনা অক্সিজেনের মতো কাজ করে। ভালোবাসাহীন সমাজ, চারদিকে মাতাল হাওয়া, খুন, ধর্ষণ, নৃশংসতা। উল্টো স্রোতে দাঁড়িয়ে আমি ভালোবাসার কথা বলেছি। এটাও তো একধরনের প্রতিবাদ।
৩৪ বছরের প্রায় দুইশ কবিতা থেকে শেষাবধি ৩৪টি কবিতা বাছাই করি এই বইয়ের জন্য। বাকি কবিতাগুলো আর আলোর মুখ দেখবে না। কয়েকটি কবিতা আছে বেশ আগের। ১৯৬৯-৭০ সালের কবিতাও আছে। 'বুকের দোকান' নামে একটা কবিতা আছে। এই কবিতার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। কয়েক বছর আগে একটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গেলে, গবেষক আফসান চৌধুরী আমাকে এই কবিতার কথা মনে করিয়ে দেন। পরে খোঁজা শুরু করি এবং পেয়েও যাই। নারায়ণগঞ্জ থেকে একজন 'ভালোবাসার খালা' নামের একটা কবিতা পাঠিয়ে দেন, সেটাও এই বইয়ে রয়েছে।
এবারের পুরস্কার প্রদানের জুরি বোর্ডে যারা ছিলেন, তারা নিশ্চয়ই বেশ কয়েকটি বই বিবেচনায় রেখে আমার বইটিকে পুরস্কৃত করেছেন। তাদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা। আর ব্র্যাক-ব্যাংক সমকালের নান্দনিক এ অনুষ্ঠান- এটা শুধু আমার কথা নয়, আমি ফেসবুকে দেখলাম সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমার বন্ধু, পরিচিত জন প্রতিটি মানুষ এই অনুষ্ঠানের প্রশংসা করছেন এবারের এই আয়োজনের। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকালের এই পুরস্কার এরই মধ্যে দেশের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কারে উন্নীত হয়েছে। কাজেই যারা এই পুরস্কার দিচ্ছেন সেই কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এবার যে অনুষ্ঠান হলো এর চেয়ে খারাপ অনুষ্ঠান আর করা যাবে না। উত্তরোত্তর ভালোই করতে হবে। সেদিক থেকেও আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টা নজরে রাখবে। আমার সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা রইল একদিন এই দেশের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন সাহিত্য পুরস্কারে অভিষিক্ত হবে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার। আমাদের সাহিত্যের জন্য এটি খুব আনন্দের একটি সংবাদ বলে আমি মনে করি।
বেদনাকে বলেছি কেঁদো না
হেলাল হাফিজ
প্রকাশক: দিব্যপ্রকাশ
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৮০, দাম: ২০০ টাকা

বিষয় : হেলাল হাফিজ

মন্তব্য করুন