ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি ধন্যবাদ জানাই ব্র্যাক ব্যাংক ও দৈনিক সমকাল-এর এই উদ্যোগকে। আমি ধন্যবাদ জানাই পুরস্কারটির জুরি বোর্ডের সবাইকে, যারা আমার এ বইটিকে মনোনীত করেছেন। সেই সঙ্গে আমি ধন্যবাদ জানাই আমার প্রকাশককে।
সাহিত্য মানুষকে মিলিত করে, সমৃদ্ধ করে। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে বিচ্ছিন্নতাই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য সাহিত্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। প্রযুক্তির ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি হয়েছে, সেখানে প্রযুক্তি সাহিত্য এবং বইকে সহায়তা দিয়েছে। কাগজের উদ্ভাবন, ছাপাখানা- এগুলো সাহায্য করেছিল। যখন রেডিও এলো তখন মনে হলো এখন মানুষ শুনবে, পড়বে না। কিন্তু দেখা গেল মানুষ রেডিওকে সাহিত্যে ব্যবহার করছে। যখন সিনেমা এলো তখন মনে হলো মানুষ এখন দেখবে এবং শুনবে, সুতরাং বই পড়বে না। কিন্তু দেখা গেল মানুষ বই পড়ছে। বই থাকল। বই মানুষের সঙ্গী। এই সঙ্গী কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না।
প্রযুক্তি যতই অগ্রসর হোক, যতদিন এ পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, ততদিন বই থাকবে। কারণ, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক যে অনুশীলন, হৃদয়বৃত্তিক যে চর্চা, এই বইয়ের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সম্ভবপর হবে। এখন সাহিত্যের আরও বেশি প্রয়োজন। বর্তমান যে যুগকে আমরা কম্পিউটারের যুগ ইন্টারনেটের যুগ বলছি, অনেকেই মনে করেন বইয়ের উপযোগিতা বুঝি হারিয়ে যাবে। ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে যে বই পড়া হয় তা আসল বই নয়। যে বই সারাদিন সঙ্গে থাকবে, অফিসে থাকবে, পাঠাগারে থাকবে, আমার শয্যার পাশে থাকবে সেটাই আসল বই। দেখা যাচ্ছে এই বইয়ের উপযোগিতা বাড়ছে। সাহিত্য প্রত্যেক যুগেই পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাশা করেছে। এককালে রাজা-বাদশাহরা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করত। এ কালে পাঠক সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তবে কেবল পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সাহিত্যের বিকাশ সম্ভব নয়। সেজন্যই এ যুগে সেই পৃষ্ঠপোষকতায় অংশ নিয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী দুটি প্রতিষ্ঠান। একটি গণমাধ্যম আরেকটি হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের অগ্রযাত্রায় একটি দৃষ্টান্ত। এ দৃষ্টান্তকে আমি অভিনন্দন জানাই। তবে কেবল এ পৃষ্ঠপোষকতা হলেই হবে না, আমাদের দেশে পাঠাগার গড়ে তোলা দরকার। পাঠাগার পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে হবে। পাঠাগারকে কেবল বইয়ের আদানপ্রদানের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ না রেখে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র করে তুলতে হবে। যেখানে বই নিয়ে আলোচনা হবে, বিতর্ক হবে, চলচ্চিত্রের প্রদর্শন হবে। যেখানে আমরা সব শ্রেণি-পেশার সবাইকে নিয়ে আসতে পারব। বাংলাদেশে খুব সাংস্কৃতিক জাগরণ প্রয়োজন। যেখানে বই ভূমিকা রাখতে পারবে।
কথাপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বই দীক্ষাগুরুর তৎপরতা। এখানে গুরু বলতে পুঁজিবাদকে বোঝানো হয়েছে। গুরুদের তৎপরতা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, আর সারা বিশ্বে সবচেয়ে বড় গুরু এখন পুঁজিবাদ; তার তৎপরতা ভয়ংকর পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। পুঁজিবাদ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই শুধু নয়, এখন এটি আবার একটি আদর্শও। ওই আদর্শে এখন বিশ্বের সব রাষ্ট্রই দীক্ষিত। সে জন্য বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য, শোষণ-নিপীড়ন সবকিছুই বাড়ছে। এ বইতে বিশেষভাবে ওই আদর্শিক তৎপরতার কথাটাই বলা হয়েছে। ওই আদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে উঠেছে; প্রতিরোধটা খুবই আবশ্যক। কিন্তু কেবল প্রতিরোধ তো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পুঁজিবাদের বিকল্প যে ব্যবস্থা, যার মূল সত্য সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা, তার প্রতিষ্ঠা। এই বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে পুঁজিবাদের তৎপরতা এবং তা থেকে ইতিহাসকে মুক্ত করার চেষ্টার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মূল ঘটনা পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য। পুঁজিবাদী তৎপরতা রূপ নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের; যা দেখা যাচ্ছে তা হলো পুঁজিবাদের চরম ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। পুঁজিবাদী যে আদর্শ তা ব্যক্তিমালিকানার ও অতি মুনাফার। এই আদর্শের তৎপরতার কয়েকটি দিক নিয়েই এই বইয়ের প্রবন্ধগুলো। মনুষ্যত্ববিদ্বেষী আদর্শকে বিদায় করা চাই; না হলে সংকট কমবে না বাড়তেই থাকবে। বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে এ কথাগুলো বিভিন্নভাবে এসেছে।
দীক্ষাগুরুর তৎপরতা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২০০, দাম: ৩০০ টাকা