ব্যাক বেঞ্চ, তুমি আজও গুছিয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারো না। তোমার খাতায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সাদা, কলম পলাতক। সেই কবে থেকে তুমি ইতিহাসের সন-তারিখ তোমার শত্রু। জ্যামিতির বই হাতে তুমি কেঁপে ওঠো ফাঁসির আসামির মতো। অথচ আজও জীবনের এই ক্লাসঘরে পা রেখে দেখতে পাই হাওয়ায় উড়ছে চকের গুঁড়ো, ব্ল্যাকবোর্ডে হিজিবিজি লেখা; পেছনের সারিতে রাখা কয়েকটা বেঞ্চ থেকে শোনা যাচ্ছে কাদের নিচু গলায় কথাবার্তা! সেখানে রেসের ঘোড়ার অস্থির শরীরের মতো কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমার গল্প বলছে কেউ, বিনিময় হচ্ছে স্ট্যাম্প আর প্রাপ্তবয়স্কদের বই। জীবনের ক্লাসরুমে ব্যাক বেঞ্চ অথবা সেখানে বসে থাকা ব্যাকবেঞ্চারদের গল্পটাও কি এ রকম পিছিয়ে পড়ার? কখনও আটকে যাওয়া, কখনও নিজেকে আড়াল করে রাখা, কখনও পিছু হটে যাওয়া?
কবি আবুল হাসানের কবিতায় আছে- 'ক্লাসভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেপ সমস্ত কাগজ/ আমি বাজে ছেলে, আমি লাস্ট বেঞ্চি, আমি পারব না।' ব্যাকবেঞ্চারদের জীবনে লাস্ট বেঞ্চে বসে ক্ষয় হওয়া থাকে। আলোকিত, উজ্জ্বল সরণিতে তাদের হাঁটা হয় না। তারা হয়তো স্থানাঙ্ক বের করতে ভুল করে, বইয়ের ছেঁড়া পাতা উড়তে থাকে বাতাসে। কিন্তু জীবন কি তাদের কিছুই দেয় না? জীবনের খাতায় ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে নাম লেখানো কিছু মানুষের ভগ্ন মুখশ্রী কি অপার্থিব প্রাপ্তির আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না কোনো দিন?
এক তরুণের গল্প বলি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা সেই তরুণের চোখে অনেক স্বপ্নের সঙ্গে ছিল কবিতা লেখার স্বপ্ন। কবি সে হতে পেরেছে কিনা সেটা অন্য আলোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষকরা তাকে লেখাপড়ায় আরেকটু বেশি শ্রম বিনিয়োগ করতে অনুরোধ করেছিলেন। বলেছিলেন, তারা চান, সেই তরুণটি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিক। সেই তরুণটি তার শিক্ষকদের জানিয়েছিল, সে শিক্ষক হতে চায় না, কবি হতে চায়। সে বেছে নিয়েছিল প্রায় ভবঘুরে এক জীবন। স্থিতিশীল সম্ভাবনা দূরে ঠেলে দিয়ে বেছে নিয়েছিল অস্থিতি। একটা জীবন, সেই তরুণ ব্যাকবেঞ্চারই থেকে গেল। আয়নায় তাকালে মাঝে মাঝে তার সেই উদ্‌ভ্রান্ত মুখটা দেখতে পাই। কবি হতে চাওয়ার জীবন তাকে কতকিছু চিনিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। পৃথিবীর পথে পথে সেই ব্যাকবেঞ্চার তরুণটি চিনেছে সত্য, চিনেছে মিথ্যা। জেনেছে প্রতারণা, জেনেছে হৃদয়ের খুব কাছে থাকা মানুষ। এক জীবনের জন্য কম কী? ব্যাকবেঞ্চারদের জীবনে হয়তো সফলতা আসে না, কিন্তু সত্যটুকু ধরা দেয়। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি হয়ে জীবনের খাতায় ব্যাকবেঞ্চাররা থেকে যায় শুধু রোদ্দুর হতে চেয়ে।
ফজল নিজের গ্রামে ফিরে গিয়েছিল বহুদিন আগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃত অর্থে একেবারে শেষের সারিতে চুপচাপ বসে থাকা ফজলের লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। মনে পড়ে, অনার্স পাস করার পর ফজল আর এই শহরে বেশিদিন বসবাস করেনি। বাক্স গুছিয়ে নগরবাসের ইতিকথার ওপর দাঁড়ি টেনে দিয়েছিল। মাঝে পৃথিবীর অসংখ্য ক্যালেন্ডারের পাতায় পাল্টে গেছে একের পর এক তারিখ। ফজলের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। বহু বছর পর হঠাৎ এক জেলা শহরে আচমকা ফজলের সঙ্গে দেখা। আমরা দু'জনেই ঠিক চিনে ফেলেছিলাম একে-অপরকে। ফজল জানাল, পাশের জেলায় ওর গ্রাম। সেখানেই কেটে গেছে তার এতগুলো বছর। বিস্ময়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকে বের হয়ে এসে জানতে চেয়েছিলাম-
কী করো এখন?
'গ্রামে ছোট বাচ্চাদের জন্য একটা ফ্রি স্কুল করেছি। ওদের বইপত্র আমিই কিনে দিই। আমার তো ভালো করে লেখাপড়া হয়নি। তাই গ্রামের বাচ্চাদের পড়ার ব্যবস্থা করেছি কোনোরকমে। কৃষিকাজ করে নিজে খাই, ওদেরও দিই।'
জীবনের গল্পে ব্যাকবেঞ্চার ফজলের দেওয়া-নেওয়ার হিসাব পৃথিবী কি জানে? নিজের গল্প শোনাতে শোনাতে ফজলের মুখে যে রোদ ফুটে উঠেছিল; সেটুকুই বোধ হয় অমলকান্তি দেখতে চাইত অন্ধকার এক ছাপাখানায় বসে।
আসলে কারা ব্যাকবেঞ্চার হয়? ক্লাসভর্তি উজ্জ্বল সন্তানদের মাঝে কারা পিছিয়ে পড়ে? তারা কি আক্ষরিক অর্থে দৌড়ে পিছিয়ে থাকে, নাকি নিজেদের আড়াল করে রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা শক্ত। জীবন তো আসলে এক রেস ট্র্যাক। পিছিয়ে পড়ার কোনো জো নেই। যে পিছিয়ে পড়বে তার ডাকনাম হয় ব্যাকবেঞ্চার। বাংলা ভাষায় তাদের বলা যেতে পারে পরাস্ত সহিস। কিন্তু এই পরাস্ত সহিসের দলে যারা থাকে, জীবনের মারগুলো তাদের অনেক কিছু শেখায়। গোছানো জীবনের বাইরে, একটি পরিকল্পিত বিজয়ী জীবনের পরিবর্তে বেঁচে থাকার কৌশল তারা শিখে যায়। সে জীবনে হয়তো দুঃখ থাকে, নিজের আত্মাকে প্রকাশ করতে না পারার বেদনা থাকে, কিন্তু এসবের পাশ ঘেঁষে এক ধরনের মুক্তিও মিলে যায়। পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারেন, কেমন সে মুক্তি? পিছিয়ে পড়া, জীবনের পথে অকৃতকার্য একজন মানুষের মুক্তি কেমন হয়? আমার কখনও মনে হয়, এই যে আমাদের চারপাশে পরিকল্পিত সাজানো জীবন দেখি, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দৌড় দেখি, ক্লান্তিহীন প্রতিযোগিতা দেখি; তার বাইরে একজন ব্যাকবেঞ্চারের প্রতিদিনের রুটিন তৈরি হয়। সেখানে কোনো তাড়া নেই, সেখানে লক্ষ্যে পৌঁছাতেই হবে- এমন ছক করে দেওয়া নেই। ফজলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে গ্রামের হাওয়া, পড়তে আসা কয়েকটি শিশুর হাসি। ফজল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চূড়ান্ত ডিগ্রি নিয়ে পাস করে বেরিয়ে কী করত? চাকরি, সংসার? তারপর একদিন টুপ করে ডুবে যাওয়া- এই তো? এখন তো ফজলের জীবনের গল্পটাই পাল্টে গেছে। ফজল ওই পড়তে আসা শিশুদের ভেতর দিয়ে অন্যভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নটা কি ব্যাকবেঞ্চার না হলে ফজল দেখতে পারত? ফজলের স্বপ্ন সফল হবে কিনা জানি না, কিন্তু নিজের মতো করে একটা স্বপ্ন তো ফজল দেখতে পেরেছে। আমার বিবেচনায় ওটুকুই তো মুক্তি।
আমি চিরকালই ক্লাসে ব্যাকবেঞ্চার ছিলাম। কখনও প্রথম সারিতে বসার আগ্রহ জাগেনি মনে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শ্রেণিকক্ষে সর্বদাই পেছনের দরজার কাছাকাছি ছিল আমার বসার জায়গা। মাঝে মাঝেই সেই দরজা দিয়ে আমি ক্লাস থেকে প্রস্থান করতাম। আমার তখন মনে হতো, বাইরের পৃথিবীতে আমাকে ছাড়া বহু কিছু ঘটে যাচ্ছে। আমার এখনই সেই বিপুল স্রোতে ভেসে যাওয়া উচিত। আমাকে ভালোবাসতেন এমন একজন শিক্ষক বিষয়টা লক্ষ্য করলেন। তারপর ক্লাসে ঢুকেই তিনি পেছনের দরজাটি বন্ধ করে দিতেন, যাতে আমার মতো অমনোযোগী ছাত্রটি পালিয়ে যেতে না পারে। সেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার কারণে আমার ব্যাকবেঞ্চার জীবনের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তবে আমি কিছুদিন ক্লাসে আটক থেকে সেই শিক্ষকের কাছ থেকে বিশুদ্ধ জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছিলাম। ব্যাকবেঞ্চারদের ভালোবাসে এমন মানুষ আছেন। আমার সেই শিক্ষকের মতো একজন ব্যাকবেঞ্চারের অস্থির মনের লাগাম তারা খানিকটা ধরতে পারেন হয়তো।
ব্যাকবেঞ্চাররা যেসব সময় নতমুখ আর ঘা-খাওয়া মানুষ হয়, এমন নয়। স্কুলে ছোটবেলায় লাস্ট বেঞ্চে যারা আমার সঙ্গী ছিল তাদের প্রকৃতি ছিল অ্যাডভেঞ্চারিস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেছনের সারির বন্ধুদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। জীবনের ক্ষেত্রেও সেই লাস্ট বেঞ্চে বসে থাকা মানুষরা মুখস্থ জীবন পাঠ করে বেঁচে থাকে না। মুখস্থ জীবন আমারও কখনও ভালো লাগেনি। জীবনের ব্যাক বেঞ্চে ভালো ছাত্র হয়ে টিকে থাকার কোনো দায় নেই। আমার কাছে ব্যাকবেঞ্চার শব্দটার মেজাজটাই আলাদা। সেখানে ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগটা থাবা পেতে বসে থাকে। চেনা পথ, জানা ঠিকানার বাইরে গিয়ে অচেনা মানুষ আর জীবন মুখস্থ করার সম্ভাবনা থাকে। সম্ভাবনাই লিখলাম শব্দটা। তাহলে কি আমি বলতে চাইছি সামনের সারির উজ্জ্বল সন্তানদের জীবনে সম্ভাবনা নেই? একেবারেই না। জীবনের মানে তো একভাবে ব্যাখ্যা করলে চলে না। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে হয়। আমার একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনার ওপরেই এখানে হয়তো জোর পড়ল বেশি। ব্যাক বেঞ্চে বসে কাটাকুটি খেলার বয়সটা ফুরিয়েছে, টের পাই। কিন্তু জীবনের পকেটে আর কী কী আছে সেটা হাতড়ে দেখার ইচ্ছেটা তো শেষ হয়ে যায়নি। জীবনে প্রকৃত ব্যাকবেঞ্চার হওয়া হয়নি আমার। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া সেই তরুণটির মতো কবি হয়ে ওঠাও হয়নি। কিন্তু অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হতে চেয়েছি আমিও। সেই রোদে চোখ পুড়ে যায়। সাজানো জীবনের ছক নষ্ট হয়ে ধূলোর ঝড় ওঠে। কিন্তু তারপর তো জীবন হিসাব মেলাতে বসে। কী পাওয়া হলো জীবনে? কী পাওয়া হলো না? ব্যাকবেঞ্চারদের হিসাবটা সব সময়ই গোলমেলে। কার অঙ্ক কখন মিলে যায় অথবা কোনোদিন মিলতে চায় না, কেউ জানে না। আজও আমি গুছিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। শূন্য ক্লাসঘরে চকের গুঁড়ো উড়তে থাকে। ব্ল্যাকবোর্ডে কত হিজিবিজি লেখা। সব লেখার পাঠোদ্ধারও সম্ভব হলো না। তবু পেছনের বেঞ্চে বসে সামনের জীবনটাকে তো দেখা হলো। জানা হলো, কত কাটাকুটি খেলার রহস্য। ইতিহাসের বই আজও আমার শত্রুপক্ষ; জ্যামিতির সূত্র মুখস্থ হয় না। কালিঝুলি মাখা কোনো প্রেস আমার শেষ ঠিকানা হয়নি। কিন্তু সেই জীবনের গল্পগুলো অবিরাম আমাকে টেনেছে তাদের কক্ষপথে। এক অমলকান্তি গোটা জীবন আমার বন্ধু হয়ে থেকে গেছে। আমরা দু'জনেই হয়তো ব্যাক বেঞ্চে বসে আছি আজও।