ঢাকার গ্যালারি চিত্রকে চলছে সাত শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনী 'মনোমন্থন'। গত ১৪ মে এর উদ্বোধন হয়। চলবে আগামী ২৫ মে পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে এ প্রদর্শনী।
অনুকূল চন্দ্র মজুমদার, আশরাফুল হাসান, ফারজানা রহমান ববি, মাহমুদুর রহমান দীপন, সুলেখা চৌধুরী, এ এইচ ঢালী তমাল ও ইমরান হোসেন পিপলু- এ সাত শিল্পীর সাম্প্রতিককালের শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত হয়েছে এ প্রদর্শনী। কোন বিশেষ ভাবনা থেকে এ প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে, তা বলা যাবে না। শিল্পীবৃন্দ তাদের স্বকীয় ভাবনায় মনোমন্থন করেছেন নিজ নিজ পরিসরে। তবে কোথাও কোথাও অনেকের ভাবনা নানা পথ ঘুরে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্যের দেখাও মেলে এ যৌথ পরিসরে। কোনো বিশেষ ভাবনা থেকে উদ্ভূত না হওয়া যৌথ প্রদর্শনীর অন্যতম সম্ভাবনার দিক এটাই যে সেখানে নানা বৈচিত্র্যের অন্বেষণ করা যায়। প্রায় একই সময়ে নির্মিত নানাবিধ শিল্পকর্মের খোঁজ পাওয়া যায় একই পরিসরে। সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে সমকালীন চর্চা সম্পর্কে আপাত একটি ধারণাও লাভ করা সম্ভব হয়। গভীর উপলব্ধির বিষয়টি নির্ভর করে শিল্পী আর দর্শকের যোগাযোগের ওপর। এ যোগাযোগ নির্মাণে শিল্পকর্ম প্রধান সেতু, তবে এ প্রদর্শনীতে সরাসরি শিল্পীবৃন্দের সঙ্গেও কথোপকথনের সুযোগ থাকছে। কারণ প্রতিদিনই প্রদর্শনীর শিল্পীরা গ্যালারির বারান্দায় আড্ডায় হাজির থাকছেন।
শিল্পীবৃন্দের মধ্যে ছয়জনের জন্ম গত শতকের সত্তরের দশকে, আর একজনের আশির দশকে। তাই তারা তাদের কর্মযজ্ঞের মধ্য পর্যায়ে অবস্থান করছেন, এ কথা বলা যায়। শিল্পী হিসেবে তাদের পরিচিতি রয়েছে। অনেকেই দু'দশকের অধিককাল শিল্পচর্চায় নিয়োজিত। তাই প্রদর্শনীর অধিকাংশ শিল্পীর কাজেই তাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পভাষার খোঁজ পাওয়া যায়। নতুন শিল্পভাষার খোঁজ করেছেন দু'জন শিল্পী- মাহমুদুর রহমান দীপন আর ইমরান হোসেন পিপলু। প্রদর্শনীর সব কাজই দ্বিমাত্রিক। এর মাধ্যমে এখানে দৃশ্যগত ঐক্যের সন্ধান পাওয়া যায়।
অনুকূল চন্দ্র মজুমদারের কাজে অভিজ্ঞতার বয়ান বর্ণিত হয়েছে। মোট চারটি চিত্রকর্মের মধ্যে দুটি তার স্মৃতিবিজড়িত বাগেরহাট অঞ্চলকেন্দ্রিক আর একটি বর্তমান ঢাকার অভিজ্ঞতাকে চিত্রিত করে। অপর কাজটির বিষয় মা ও শিশু। অনুকূল তার চিত্র পরিসরে শূন্যতার গুরুত্ব হারাতে দেন না। তাই এই শূন্য স্পেসকে তিনি অধিক জোরালোভাবে উপস্থাপনে মনোযোগী হন বিষয় চিত্রণের সমান্তরালে। বিষয়ে প্রবেশের জন্য হয়তো তিনি দর্শকে কিছুটা দৃশ্যগত বিরাম দিতে চান। বাগেরহাটের গল্প (Story of Bagerhat) শিরোনামের কাজ দুটিতে একই প্রকৃতির দুই রূপকে দেখা যায়। উষ্ণ আর শীতল বর্ণের ব্যবহারে শিল্পী দুই ভিন্ন সময়ের ভিন্ন ভিন্ন আবহ উপস্থাপন করেছেন। কাঠকয়লার সংবেদনশীল উপাদান গুণ তিনি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন। বিষয়বস্তুর মেজাজ বুঝে তিনি রেখার চরিত্র নির্মাণ করেন। বিশেষভাবে প্রকৃতিনির্ভর কাজ দুটিতে কাঠকয়লার নানা গতিপথে অনায়াস বিচরণ যেন তার আবহের আলো-হাওয়ার পরিপূরক হয়ে ওঠে। অপরদিকে নগর চিত্রণে তিনি ব্যবহার করেন অধিকতর দৃঢ় আর রুক্ষ রেখার।
আশরাফুল হাসানের চিত্রকর্মে বৃক্ষ আর মানব অবয়ব একাকার হয়ে এক নব অস্তিত্বের সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি প্রকৃতি আর পরিবেশের নানা সংকটকে বৃক্ষমানবের প্রতীক মূর্ত করে তুলেছেন। এবারের প্রদর্শনীতেও এ ধরনের চারটি কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে যেখানে সরাসরি অস্তিত্ব সংকটে কাতর বৃক্ষের আহাজারি চিত্রতল ছাড়িয়ে দর্শকের কান অবধি পৌঁছে যায় হয়তো। অসাধারণ অঙ্কন দক্ষতায় তিনি দর্শককে এক রূঢ় বাস্তবের জগতে নিয়ে যান; যা দৈনন্দিন বাস্তবকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ জানায়। প্রকৃতি (ঘধঃঁৎব) শীর্ষক দুটি কাজে আমরা নির্মল প্রকৃতিকেই অবলোকন করি। আর এ ধরনের কাজের মধ্যে শেষ কাজটি শেকড়-৭ (The Roots-7) ঐতিহ্যের শিল্পীর চেতনার জানান দেয়। লাল ফিতা-৯ (Red Ribbon-9) আর কথোপকথন-৩ (Conversation-3) চিত্রকর্ম দুটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সংবাদপত্র। সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- এ স্বাধীনতার নানা স্তর, তা নিয়ে দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব, তর্কবিতর্ককে এক দৃশ্যগত ভিন্নমাত্রায় অনুধাবনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে এ চিত্রকর্ম দুটি।
ফারজানা রহমান ববির কাজেও প্রকৃতিই প্রধান উপজীব্য, তবে তা আশরাফুল হাসানের চিত্রকর্মের মতো কোনো সরাসরি সংকটের বয়ান উপস্থাপন করে না। বরং প্রকৃতির বিমূর্ত সত্যকেই ববি মূর্ত করতে চান তার মিশ্র মাধ্যমের কাজগুলোতে। ববির চিত্রকর্মগুলোর নির্মিত হয়ে ওঠার গল্পটিও যেন তার চিত্রকর্মে উপস্থিতি থাকে। মাটি, হাওয়া, জলকে যেমন শুধু দৃশ্যগত উপাদান দ্বারা অনুভব করা সম্ভব না, তেমনি এ চিত্রকর্মগুলোও অনুভূতির এক বিশেষ চাহিদার দাবি জানায়। মিশ্র মাধ্যম অপেক্ষা ছাপচিত্রগুলোর গড়ন বেশ সুদৃঢ় আর সুস্পষ্ট। মিশ্র মাধ্যমের কাজগুলোতে নানা ধরনের করণকৌশলের সমাহার ঘটেছে। মাটির গভীরে যেমন বৃক্ষ তার শেকড় বিস্তার করি, ববির অনেক কাজেই এ বিস্তারের অনুভূমিক রূপ পরিলক্ষিত হয়।
এ প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ মাহমুদুর রহমান দীপনের কাজ। কারণ নব্বইয়ের দশকের চারুকলা অনুষদের বিখ্যাত ছাত্র দীপন দীর্ঘদিন পর তার নতুন কাজ নিয়ে হাজির হয়েছেন দর্শকের সামনে। 'বিখ্যাত' এ অর্থে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ছোট পুকুরটির মাঝে যে 'ত্রিভু' শীর্ষক ভাস্কর্যটি রয়েছে তার নির্মাতা মাহমুদুর রহমান দীপন। 'ত্রিভু' নির্মাতা দীপন সম্ভবত এবার তার চারকোলে করা নতুন চিত্রকর্মের জন্যও আলোচিত হবেন। দীপন এক অস্থির আঁধারের গল্প বলেন আমাদের। এ অস্থিরতা তার অঙ্কনশৈলীর গুণে আরও তীব্রতা পেয়েছে। দীপনের চারকোলের ব্যবহার অনুকূলের মতো কাব্যিক নয়। তিনি অনুসন্ধান করেন কাঠকয়লার নিকষ কালো সম্ভাবনার। এ প্রদর্শনীর অন্যতম শক্তিশালী কাজ দীপনের ভয় (Fear)। নিকষ কালো এক বাক্সবন্দি অবয়ব যেন নিজের জালে নিজেই বন্দি। বন্দির চোখ দুটো দেখে আমরা চমকে উঠতে বাধ্য- ভয়, অস্তিত্ব সংকট, আজাহারি, আর্তি, আহ্বান বা অন্য কোনো অবর্ণনীয় বার্তা বাহক যেন ঐ দুটি চোখ। নানাবিধ ব্যক্তিগত, সামাজিক, বৈশ্বিক সংকটের জালে আবদ্ধ যে কেউ হয়তো এ নিকষ আঁধারেও নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আঁতকে উঠতে পারেন। রসগোল্লা আর ভন ভন করা মাছি (Rasgolla and Buzzing Flies) কাজটিও প্রতীকের গুণে সমকালীন বাস্তবতাকে শক্তিশালীরূপে উপস্থাপন করে। যশোর রোড (Jessore Road) কাজটিও এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার খোঁজ দেয়। তবে এতসব শক্তিশালী চিত্রকর্মের পাশে দুইটি/তিনটি চিত্রকর্ম কম প্রদর্শিত হলে হয়তো তা শিল্পীর সার্বিক উপস্থাপনকে অধিক পরিশীলিত রূপ দান করত।
সুলেখা চৌধুরীর চিত্রকর্ম বরাবরের মতো এ প্রদর্শনীতেও আখ্যানধর্মী বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। এ আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। পাশাপাশি প্রকৃতির সহাবস্থানও ঘটেছে শিল্পীর উপস্থাপনে। তবে প্রতীকায়নে তথাকথিত 'ঋণাত্মক অর্থদ্যোতক' উপাদানসমূহ গতানুগতিক আরোপিত অর্থে ব্যবহূত হয়নি এখানে। দর্শকের গভীর পর্যবেক্ষণ এ নতুন সত্য উন্মোচিত হবে হয়তো। কারণ কাক, সাপ এসব তথাকথিত অলক্ষণে, দুষ্ট প্রাণীকে তিনি প্রকৃতির অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন, তাইতো সাপের মুখেও আমরা ফুল কিংবা দেয়াশলাইয়ের কাঠি দেখতে পাই।
ঘাসফুল (Ghasful) আর সূর্য কন্যা (Surjo Konna) চিত্রকর্ম দুটিতে সুলেখার প্রিয় হলুদ বর্ণের ছটা। নারী জীবনের উদ্‌যাপনের আলোয় উদ্ভাসিত সুলেখার এ দুটি চিত্রতল। শান্তি (চবধপব) শীর্ষক চিত্রকর্মটি সম্ভবত সাম্প্রতিক যুদ্ধের দামামাকে উপস্থাপন করে। তবে সূক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে শিল্পীর শ্নেষাত্মক সোনালি বুলেটের আর অস্ত্রের গায়ে শান্তিকামী যুদ্ধবাজ পরাশক্তিসমূহের নাম উপস্থাপনকে ভিন্নমাত্রা দেয়। যুবরাজ (The Prince) সুলেখার স্বপ্টেম্নর ছবি-প্রকৃতি আর মানবের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক ম্যানিফেস্টো তিনি রচনা করেছেন চিত্রপটে। শুধু সুলেখা নয়, এমন যুবরাজের জন্য গোটা পৃথিবীই হয়তো তাকিয়ে আছে আগামীর পানে।
এ এইচ ঢালী তমালের শিল্পকর্মে প্রকৃতি আর প্রাণীর উপস্থাপন হয়েছে বিচিত্ররূপে। প্রাণী বলতে ছাগলই প্রধান চরিত্র তার কাজে। চারণভূমিতে ছাগলের পাল যেন প্রাণী আর প্রকৃতির এক নান্দনিক 'ইকো ব্যালেন্সের' (Eco Balance) কথা বলে। শিল্পীর বাল্যস্মৃতিমাখা দুটো কাজ আমখোলা বিলের গল্প (Story of Amkhola Bill)। এ ছাড়া ছাগলের নানা ভঙ্গির জ্যামিতি উপস্থাপিত হয়েছে তার রিলিফ প্রসেসের ছাপচিত্রগুলোতে। মিশ্র মাধ্যমের কাজগুলোতে রিলিফ প্রসেস আর কালি কলমের সমন্বয় ঘটেছে। কালি কলমের অসাধারণ দক্ষতায় তমালের ভূদৃশ্যাবলি তার বাহ্যিক আকারের সীমা ছাড়িয়ে অসীম দিগন্তের হাতছানি দেয়।
যারা ইমরান হোসেন পিপলুর কাজের সঙ্গে পূর্বপরিচিত তাদের কাছে শিল্পীর নতুন কাজের আবেদন অধিক তীব্রতর হবে বলে মনে হয়। 'মনোমন্থনে' এসে এক নতুন পিপলুর খোঁজ পাওয়া যায়। করোনাকালীন সময় সবার জীবনে যে অপ্রত্যাশিত নানা পরিবর্তন এনে দিয়েছে তা দৃশ্যগত দলিল পিপলুর কাজ। ভাস্কর্য, স্থাপনা কিংবা পারফরম্যান্স এ প্রকাশ ভঙ্গিগুলোর মাধ্যমেই তিনি শিল্পপরিসরে অধিক পরিচিত ছিলেন। কিন্তু লকডাউনে প্রত্যাশিত শিল্প উপকরণের দুর্লভ্যতা তাকে ধাবিত করেছে গৃহ অভ্যন্তরে সহজলভ্য ক্যানভাস আর গ্রাফাইট ব্যবহারে। লকডাউনে বিলাসিতা (Luxury in Lockdown) শীর্ষক পাঁচটি চিত্রকর্মে নানা প্রতীকের সমারোহে তিনি নতুন বাস্তবতা হাজির করেছেন। বৈশ্বিক মহামারিতে চারপাশের অন্যদের তুলনায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধই শিল্পীর কাছে বিলাসিতার রূপক হিসেবে অনুভূত হয়েছে হয়তো। বিশেষ করে চটকদার কাচপাত্রে মোরগ, কাক এদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীকী উপস্থাপনে নিজেকেই হয়তো হাজির করেছেন দর্শকের সামনে। ধূসর সময়ে বসন্ত (Spring in Grey Time) শীর্ষক কাজটি পিপলুর নিয়মিত চর্চার একটি আংশিক উপস্থাপন।
যারা এ লেখাটি এতক্ষণ পড়েছেন তাকে তাদের প্রদর্শনীটি দেখতে আমন্ত্রণ জানাই। কারণ দৃশ্যশিল্প প্রত্যবেক্ষণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হওয়াই সর্বাধিক শ্রেয়। তাই আমার কথা অবিশ্বাস করুন আর শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে কিংবা একা কিংবা যৌথভাবে প্রদর্শনী ভ্রমণ করুন আলোচনা করুন মতামত প্রকাশ করুন।