রাজধানী ঢাকা ঘিরেই আমাদের অনেকের পথচলা, স্বপ্টম্ন দেখা। অথচ এ নগরীর ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কতটুকুইবা জানি! ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অজানা কাহিনি। সেই ইতিহাস নিয়ে অনেক লেখা থাকলেও সব লেখাই তথ্যবহুল বা সব তথ্যই নির্ভরযোগ্য নয়। যে কারণে পাঠক তেমন উপকৃত হয় না।
লেখক এবং গবেষক মুনতাসীর মামুন ঢাকাকে নিয়ে তথ্যানুসন্ধান করেছেন 'স্মৃতিময় ঢাকা' গ্রন্থটিতে। যেখানে আবার তৎকালীন অনেক দুর্লভ আলোকচিত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে।
মুনতাসীর মামুন তাঁর লেখায় ঢাকার নানান বৈচিত্র্যময়তা তুলে ধরেছেন। স্মৃতিময় ঢাকা গ্রন্থটি দুই দশক আগে প্রথম প্রকাশিত হয়, তা পুনর্মুদ্রণ করেছে কথাপ্রকাশ। এরপরও লেখকের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে 'ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী'। সে বইটিও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
স্মৃতিময় ঢাকা গ্রন্থটি মোট তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত- রমনার স্মৃতি, ঢাকার পঞ্চায়েত এবং গনিউর রাজার ঢাকা ভ্রমণ। তিনটি আলাদা লেখার সংকলন এই গ্রন্থ। রমনার স্মৃতি ও ঢাকার পঞ্চায়েত লেখা দুটো গবেষণাধর্মী। শেষ লেখাটি হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র গনিউর রাজার ঢাকা ভ্রমণকে কেন্দ্র করে। যে লেখাগুলোতে হারানো দিনের ঢাকার স্মৃতি রয়েছে; যা ভাবায়। আর তা স্মৃতিকাতর করে তুলতে সক্ষম পাঠককে। আবার কখনও আপ্লুত করে তোলে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে সুনামগঞ্জের জমিদারপুত্র গনিউর রাজা বেশ কয়েকবার ঢাকায় গিয়েছেন; কখনও কোনো কাজে বা কখনও স্রেফ বেড়াতে। তবে খুব দীর্ঘ সময় অবস্থান করেননি ঢাকায়।
গনিউর রাজা বারবার ঢাকা গেলেও ঢাকা শহরের বা এর মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তিনি প্রায় কিছুই লিখেননি। ঢাকায় গিয়ে মেতে উঠতেন নানা আমোদে। বিভিন্ন বাইজির বাড়ির বর্ণনা আর কত খরচ করে কী কী নেশা করেছেন- এগুলোই তার ভ্রমণকাহিনিজুড়ে আছে। এসব তিনি বেশ বিশদেই লিখেছেন কোনো রাখঢাক না রেখেই।
'রমনার স্মৃতি' প্রবন্ধটি পড়লে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বর্তমানে ঢাকা শহরের প্রকৃতিঘেরা এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া দুস্কর। যার ঐতিহাসিক ভিত্তিও রয়েছে। এর আশপাশে অবস্থান করে অভিজাত, সংস্কৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ। তৎকালীন সময়ে এটি ছিল অভিজাতদের বিনোদন কেন্দ্র; যা এ প্রবন্ধে বারবার উঠে এসেছে। সবুজের সমারোহ এ পার্ক নানা অজানা গাছে ভরপুর।
হাইকোর্টের মাজার থেকে শাহবাগের মোড় পর্যন্ত জায়গাটি ছিল ঝোপঝাড়, জলাজঙ্গল, তার মাঝে উঁকি দিচ্ছে হাজী শাহবাজের মসজিদ, কালীবাড়ি। এর উল্টোদিকে গ্রিকদের কবরস্থান। তারপর জঙ্গল আর জঙ্গল। এর মাঝে হয়তো সরু চলার পথ। শুজাতপুর আর চিশতিয়া তখন স্মৃতি।
ইংরেজ আমলে রমনা পুনরুদ্ধারে প্রথম হাত দিয়েছিলেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড'স। ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট তো বটেই, ঢাকা শহর উন্নয়নের জন্য গঠিত ঢাকা কমিটিরও তিনি ছিলেন একজন সদস্য। সর্বশক্তি নিয়ে তিনি মেতে উঠেছিলেন ঢাকা শহর পরিস্কার করার জন্য। এ কারণে তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল 'একসেনট্রিক সিভিলিয়ান'। এসব নানা অজানা ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে গ্রন্থটিতে।
রমনার স্মৃতি এবং ঢাকার পঞ্চায়েত লেখা দুটোতে মোগল ও নবাবি আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত এ দুটো আলাদা বিষয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন; যা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং ঐতিহাসিক।
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রভাব ফেলেছিল ঢাকাবাসীর ওপর। বিভিন্ন মহল্লায় প্রধানত নিজেদের বিরোধ মেটানোর জন্য তারা সৃষ্টি করেছিলেন পঞ্চায়েতের এবং ক্রমে তা পরিব্যপ্ত করে নিয়েছিল মহল্লাবাসীর জীবন। তবে পঞ্চায়েত মুসলমানদের হলেও তা ধর্মীয় কোনো সংগঠন ছিল না, বিশেষ করে বিচার-আচারের জন্য প্রয়োজন ছিল বিচক্ষণ উপদেশ। তাই মহল্লার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, হিন্দু বা মুসলমান সদস্য হতেন পঞ্চায়েতের।
মুসলমানদের মধ্যেও পেশাগত কিছু পঞ্চায়েত ছিল যেমন, ভিস্তিদের। ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লায় বসবাসকারী ভিস্তিদের নিয়ে ছিল এ পঞ্চায়েত। মহররমের সময় তাদের পঞ্চায়েত প্রধানকে বলা হতো নওয়াব ভিস্তি। কারণ মহররম মিছিলে ভিস্তিদের ছিল বিশেষ ভূমিকা এবং এ পদ ছিল বংশানুক্রমিক। কিন্তু এ ছিল পেশাগত ব্যাপার। মহল্লায় থাকলে তাকে মানতে হতো নিজ মহল্লা পঞ্চায়েতের নির্দেশ। এদিক থেকেও ঢাকার পঞ্চায়েত ছিল অন্যসব পঞ্চায়েত থেকে আলাদা। এসব নানা অজানা ইতিহাস রয়েছে গ্রন্থটিতে।
এ গ্রন্থে ঢাকায় অভ্যন্তরীণ পঞ্চায়েত শাসনব্যবস্থা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি রমনার স্মৃতি প্রবন্ধটি সবুজের ছায়াঘেরা বর্ণনায় ভরপুর। আবার অপরদিকে গনিউর রাজার ঢাকা ভ্রমণে এ নগরীর ধূসর এক চিত্র উঠে এসেছে। সে সময়কার ঢাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। া