ফুল মানুষের ঘ্রাণ চুষে নেয়- এ কথা মনে হয়েছিল এক জাদুকরের মৃত্যুদিনে। হাতের ফুল তার কফিনে দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে যখন চলে এলাম মনে হয়েছিল, আমার আঙুলে আর কোনো ঘ্রাণ অবশিষ্ট নেই।
মেঘের ছায়ায় মানুষের মুখ ফুলের মতো মায়ায় ভরে ওঠে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে প্রিয় কোনো গানের সুর। এমন দিনেও রাজধানীর রাস্তায় লোকাল বাস আর ট্রাফিক লাইটগুলো একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী।
এমন মেঘের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম বাসের অপেক্ষায়, একা নই, আরও অনেকে ছিল। একটি বাস এসে থামল, ট্রাফিক পুলিশ বাসটিকে আর এগোতে দিল না। কাগজপত্র চেয়ে বসল। ফিটনেসহীন গাড়ি। ড্রাইভার বাস থেকে নেমে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন আর কনডাকটর বাসের যাত্রীদের নেমে পরের বাসে উঠে যেতে বললেন। একই কোম্পানির বাস। দুই বাসের যাত্রীতে গাড়িতে দাঁড়াবার তিল পরিমাণ ঠাঁই রইলো না। বৃষ্টি এলো।
কেউ একজন বললেন, 'বসুন'। কোনো কিছু বলে ওঠার আগেই জোরে একটি ধাক্কা খেলাম। অন্তত আরও কয়েক সিট পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলাম। ঝুমবৃষ্টিতে জানালার কাচ সাদা হয়ে গিয়েছিল। তবু স্টপেজে এসে গাড়ি থেমে গেলো, কিছু যাত্রী নেমে গেলো বাস থেকে। নতুন আর কেউ বাসে উঠল না। প্রাণ ভরে দম নিলাম। হঠাৎ ওই শব্দটা কানের কাছে প্রতিধ্বনি দিল- 'বসুন'। কে, বলল? কার স্বর? মনে মনে যার কথা ভাবছিলাম তাকে দেখলাম না। সেকি অচেনা কেউ- তার পরেই ভাবতে থাকলাম, এই স্বর আমার খুব চেনা। ধরা যাক তার নাম হিজল।
রাজধানী যতো চেনা হয়ে উঠেছে সে ততো অচেনা হয়ে গেছে। পরিচয়ের শুরু থেকে সে আমাকে 'আপনি' সম্বোধন করত। এই সম্বোধনের ভেতর থেকেই তাকে ভালোবাসার অজুহাত, আহদ্মাদ আর যৌক্তিকতা খুঁজেছি। যেদিন জানতে পেরেছি তার প্রেমিকা আছে, তীব্র অনুভূতিগুলোর প্রতি সাড়া দিয়ে 'তুমি' সম্বোধনের অনুমতি চেয়ে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বইয়ের ভাষা, মানুষের শব্দতরঙ্গে বেঁধে রাখা বৈজ্ঞানিক ভাষা পাশ কাটিয়ে শুধু নীরবতার মাধ্যমে বোঝাতে পারব 'ভালোবাসি'- এই ছিল বিশ্বাস। সেই সব শব্দহীন শব্দতরঙ্গ তৈরি থেকে মুক্তি মিলে গেলো, তারপর নিজেই মিলিয়ে যাবার পালা।
যেতে যদি হয় বলে যাব- না বলে পালাব না, আচমকাও নয়। হিজল জানত আমি গোলাপ ভয় পাই। তারপরেও বললো, তার প্রেমিকার গোলাপের খামারে আমাকে যেতে হবে। বন্ধুত্বের দায় মেটাবার সুযোগ, এবার যা ভয় পাই তার কাছে যেতে হবে। শুনতে হবে তার বয়ান।
হিজল আমাকে বলেছিল একটি ফুল যখন দেখবো, তার উল্টোপাশটা, তার গায়ে লেগে থাকা ঘা, আঘাত আর নিস্তব্ধতাও যেন বোঝার চেষ্টা করি। আমি সেই দেখার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দেখেছি- ফুল একটি বিন্দু ছাড়া কিছু নয়। যে মানুষের দিকে তাকিয়ে তার শরীরের ঘ্রাণ চুষে নেয়। আর বলে, এখানে এসো না।
নাগরিক নিয়ম, মৃতকে দেখতে গিয়ে কেউ গড়াগড়ি করে কাঁদে না। পরনে কালো পোশাক থাকে, মুখে মলিন মেকআপ থাকে আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দেখা যায় মেয়েদের। ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে, চুলগুলো একটু কম পরিপাটি থাকে। এই না হলে বেদনাঘন পরিবেশ তৈরি হয় না-বাকিটা তৈরি করে দেয় টিভি নিউজগুলো। স্লো মোশনের ভিডিও আর কষ্টের গানের অডিও মিশিয়ে যে নিউজ পরিবেশন হয় তাতে তরুণরা এমন মৃত্যুর স্বপ্টম্ন দেখলেও দেখতে পারে।
তখনও শহরে নতুন, জানি না কী করতে হবে। হিজল একটি চুপসে যাওয়া গোলাপ হাতে দিয়ে বলেছিল-কফিনে দিতে। ফুলটি হাতে নিলাম, হালকা করস্পর্শসহ। গোলাপটি যেন হাতের ভেতর নড়ে উঠলো। মনে হলো সেটি জীবিত!
গোলাপের খামারে যাওয়া প্রসঙ্গে বললাম যে, তুমিতো জানো আমার ফোবিয়া আছে। সে এসব শুনতে রাজি ছিল না। প্রেমিকার ইচ্ছা পূরণ করতে যেখানে একশ একটি গোলাপ কেটে আনা অন্যায় নয়; সেখানে গোলাপে ফোবিয়া আছে এমন একজনকে দাঁড় করানো- কী আর কঠিন কাজ।
বাস্তববাদিতার প্রয়োজনীতা নিয়ে আলোচনা শুরু করল হিজল। এতো আলোচনার দরকার ছিল না, আমি রাজি। খামার দেখতে যাব। সেখানে কত প্রকার গোলাপের চাষ হয় দেখব। ফুলেরাও আমাকে দেখবে। শরীরের ঘ্রাণ চুষে নিতে থাকবে আর আমি ওজনশূন্য হতে থাকব। তার জন্য অপেক্ষা শুরু হলো। জানি না কবে-কখন যেতে হবে। আমাকে শুধু বলা হয়েছে, যেকোনো দিন ওরা আমাকে ডেকে নেবে।
অপেক্ষা। না-হওয়া প্রেমের প্রতি যে মোহ ঘনিয়েছিল, মনোযোগ আর যত্নের অভাবে একটু-একটু কেটে যেতে থাকল। একটি তীব্র চিৎকার কোনো প্রতিবাদের জন্ম দিতে না পেরে, একজন প্রসূতি মায়ের মতো মরে গেল।
হিজলের ফোনকল আবার যেদিন পেলাম, ভেবেছিলাম সেদিন খামারে যেতে হবে। কিন্তু না, ও জানতে চাইলো, শহরে একটি পাগলা হাতি ঢুকে পড়েছে আমি জানি কিনা, বললাম, না। দেবদারু চত্বরে চলে যেতে বললো, আর বললো সেখানে সেও থাকবে। গিয়ে দেখলাম কোনো হাতি নেই, দেবদারু গাছগুলো থমকে দাঁড়িয়ে আছে। পাশের টঙ দোকানগুলোতে সকালের নাশতার জন্য রুটি ভাজা হচ্ছিল। পরিচিত দোকানদার আমাদের দেখে হাসলো। হিজল জানালো, আমরা পরদিন দুপুরে গোলাপের খামারে যাচ্ছি...
রাতে খুব ভালো ঘুম হলো। ঘুম ভাঙার পর থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সব মেয়েই কথা বলে। আমিও কী যেন বিড়বিড় করছিলাম। আয়নার ছবিটি মনে হচ্ছিল হাসছে। ভেজা মুখ শিশিরস্নাত গোলাপের মতোই। চোখ বন্ধ করে- ফিরে আসার চেষ্টা করছিলাম নিজের কাছেই।
দুপুর মূলত দিনের খণ্ডনকাল। যতক্ষণে খামারে পৌঁছালাম মনে হলো দুপুর মানে ধারালো ছুরি। গিয়ে দেখি খামারের গাছে পানি দিচ্ছে একটি মেয়ে। হিজল পরিচয় করিয়ে দিল- 'আমার প্রেমিকা'। মেয়েটি হাতে থাকা ছুরিটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, 'এটা ধরো গাছগুলোতে একটু পানি দিই। তারপর তোমার সঙ্গে কথা হবে। অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে।'
শুনেছি ছুরি, কাঁচি, লোহা হাতে থাকলে ভয় লাগে না। সত্যিই যতক্ষণ আমার হাতে ছুরিটি ছিল ততক্ষণ কোনোরকম ভয় অনুভব করিনি। গোলাপের খামারের দিকে তাকিয়ে বোঝা গেলো গাছের গোড়াগুলো কিছু সময় আগে কুপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জাতের গোলাপ গাছ, ভিন্ন ভিন্ন ফুল, ফুল ফোটাতে পারার গৌরবে মেয়েটির মুখ জৌলুস ছড়াচ্ছিল। সেই জৌলুস দেখে ভাবলাম-একটি পরিপূর্ণ খামারের জন্য এর থেকে সুন্দর, বিশ্বস্ত আর অপরিহার্য কেউ হতে পারে না!
মেয়েটি আমার হাতের ছুরিটি নিয়ে হিজলের হাতে দিয়ে বললো- দাঁড়িয়ে থাকো। তারপর সে আমাকে এক একটি গাছের কাছে নিয়ে পরিচয় করাতে থাকল।
বললো- 'শুনেছি তুমি গোলাপ দেখে ভয় পাও'।
-তার অর্থ, সে জানে। জেনেও আমাকে এখানে নিমন্ত্রণ করেছে। এরপর জানালো, আর কিছুদিন পরেই ওদের বিয়ে, আর বিয়েতে আমাকে থাকতে হবে। একটি সাদা গোলাপের কাছে দাঁড় করিয়ে বললো, 'এই যে দেখছো সাদা গোলাপ, এটি আমাদের প্রেমের সাক্ষী। ওর বয়স পাঁচ বছর'।
-এই পাঁচ বছর কি তোমরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকোনি?
-গত দুই বছর আমাদের মধ্যে তেমন যোগাযোগ ছিল না।-এ কথা জানিয়ে নিয়ে গেলো একটি নীল গোলাপের কাছে। বললো, এটি তাদের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা অর্জনের সমান বয়সী। এরপর হাজারি গোলাপের কাছে নিয়ে গেলো। ততক্ষণে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে হিজল। ওর ছায়া মাটিতে। ওই মাটিতে আমার পা।
হাজারি গোলাপ, এটি কোথা থেকে এসেছে জানে না হিজল। মেয়েটি বললো- তোমার মনে নেই? তুমিই তো দিয়েছিলে। -ও বললো না, কিছুতেই না।
তার কারণ, হাজারি গোলাপ হিজলের পছন্দ নয়, আর যাই হোক পছন্দের মানুষকে অপছন্দের ফুল সে দিতে পারে না। এক কথায়-দুই কথায় ওদের মধ্যে কথাকাটাকাটি চরমে পৌঁছল। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আমার কিছু বলার ছিল না। মেয়েটি চুপসে গেলো। সে হয়তো মনে করতে পেরেছিল-এই গাছটি কোথা থেকে এসেছে। স্বীকার করল যে, হিজলের দেওয়া নয়। তাহলে কে দিয়েছে?-আমার সামনে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে উভয়ের জন্য অপমানের সেটা দুজনেই বুঝতে পারল। তখন আমার ফেরার মোক্ষম সময়। বিদায় চাইলাম। হিজল কিছু বললো না। মেয়েটি বলেছিল আমাকে নাকি তার আরও অনেক কিছু বলার ছিল। শুধু বলেছিলাম যে, আর কিছু বলতে হবে না। তুমি অনেক বলেছো অল্প বলেই।
মেয়েটি হিজলের হাত ধরলো, ওর বুকের দিকে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে বললো, আবার দেখা হবে। হিজল মেয়েটির হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো। এত দূরে চলে গেল যে, আয়নার ওপারে ঠিক যত দূরে নিজের ছবি। ফিরেও তাকিয়েছিল একবার। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার তাকিয়েছিল কি না জানি না। নীরবতা নেমে এলে বুঝি কোথাও মেঘ জমেছে। মনে হয় বৃষ্টি হবে।
সেই থেকে আমি নো-ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা স্বীকৃতিহীন এক খণ্ড দেশ, বাতাসে পতপত করে উড়তে থাকা এক খণ্ড প্রশস্ত কাপড়-কিন্তু পতাকা নই, মুক্তি নই; আমার মুক্তি নাই।
আমি জানি সে ফিরে তাকিয়েছিল, চোখে চক্‌ চক্‌ করছিল জল। আমাদের তো কোথাও না কোথাও চলে যেতেই হয়, চাইলেই সবকিছু নিতে পারি না। মানবসমাজের সীমাবদ্ধতার সৌন্দর্য আমাদের দিয়েছে ভালো না বাসার উর্বর অধিকার।

বিষয় : প্রচ্ছদ স্বরলিপি

মন্তব্য করুন