পিছে ফেলে যায় মিছে আশা
এক বছর আগের আর পরের ভেতর কী বিশাল পার্থক্য! কত যোজন যোজন মাইলের ব্যবধান, কী ভীষণ দূরত্বের মনপোড়া হাহাকার! কোনো কিছুর বিনিময়েই আর চলে যাওয়া জাদুময় সময়কে ফিরিয়ে আনা যাবে না। না, যাবে না, কিছুতেই না। এই সামান্য ক'টি নির্জলা শব্দেই একটি আপাত চমৎকার সম্পর্ক, অথবা হৃদয়হীন সম্পর্কহীনতার, বর্তমান সীমানা নির্ধারিত হয়ে গেছে। কেন? কারণ, নিদারুণ উপেক্ষা আর চূড়ান্ত অসম্মান ছুড়ে দিয়ে সে ছেড়ে চলে গেছে। তার সাথে আমার এতদিনের প্রেমময় যুগল অস্তিত্বের সবটুকু অস্বীকার করে।
ভালোবাসা বলি, মায়া বলি, জাদুটোনা অথবা এ-রকমই কিছু একটা বলি, পুরোটাই ছিল তার মিষ্টি মিথ্যে আর সুনিপুণ ছলচাতুরীর মোড়কে মোড়ানো। তাই কোনো কিছুই বুঝতে না দিয়ে, কোনোভাবেই ধরা পড়ার সুযোগ না রেখে তার নিজের হাতে বাঁধা কঠিন রাখিবন্ধন ছিঁড়ে সে যখন আমায় ছেড়ে চলে গেল, মেনে নিতে পারিনি আজতক। হয়তো কোনোদিনই পারব না। কোনো ভুলভুলাইয়া যুক্তি-তর্কের মারপ্যাঁচ দিয়েই হাত-পাঝাড়া তার এই জাস্ট ড্যাম শিট ছেড়ে চলে যাওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই হজম করা সম্ভব নয়।
বাকিটা জীবন আমায় এক চরম অস্বস্তির অনুভূতি নিয়ে কাটাতে হবে জানি। তবু, এভাবে এক ব্ল্যাকহোল শূন্যতায় আমাকে ফেলে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তাকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না। না, কোনোদিনই না। আমার ভালোবাসা পাবার জন্য তার অমন আকুলি-বিকুলিপনার পর এতটা হৃদয়হীন হয়ে, এতটা নিশ্চিত নির্ভার নির্বিকার চিত্তে সে ছেড়ে চলে যেতে পারে আজ অব্দি বিশ্বাস করতে পারিনি। তাই মুহুর্মুহু মনোযাতনা, অহর্নিশ অসংখ্য স্মৃতির বিষপানে ক্ষণে ক্ষণে নীল হয়ে ওঠা-নিঃসঙ্গ মনের চারপাশ, নীরব হৃদয়ের বন্দর। আর, বারবার মনের সেতারে বাজতে থাকে-কেন আসিলে, ভালোবাসিলে, দিলে না ধরা জীবনে যদি...

কার ব্যাকুল প্রাণের সাধ এসেছ দলে
আমাকে ছেড়ে তোমার চলে যাওয়াটা হতে পারতো ভদ্রজনোচিত, হতে পারতো আরও ডিগনিফায়েড। তা না করে ভীরু কাপুরুষের মতো, চোরের মতো তুমি পালিয়ে গেলে। আমাকে বলে গেলে, যেভাবে বেশিরভাগ মানুষ যায় যেকোনো বিদায়ের মুহূর্তে, তোমার কী ক্ষতি হতো আজও আমি হাজার রকম হিসাব-নিকাশ করে বের করতে পারিনি। অথচ, তোমার দেওয়া ফর এভার ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত ঠকেই গেলাম। আমাকে এভাবে ধোঁকা দেওয়ার, বোকা বানানোর কী অর্থ হতে পারে, কী প্রয়োজনই বা ছিল এ বয়সে এই এক্কা-দোক্কা সম্পর্কের ছেলেমানুষি- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাই না আমি। আজ এতটা দিন-রাত্রি পার করেও আমি কোনোভাবেই, কিছুতেই নিজেকে বুঝিয়ে উঠতে পারছি না যে শেষ পর্যন্ত আমি আসলে প্রতারণার শিকার হয়েছি।
তোমার সুইট টক, নকল ভালোমানুষি, কারণে-অকারণে হেহে হ্যাঙলাপনা সবই ছিল তোমার একেকটি মুখোশ। যখন যেটা যেখানে দরকার, তোমার প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে গেছো। শুধু আমার সাথে নয়, আমরা যাদের সাথে উঠা-বসা করেছি তাদের প্রত্যেকের সাথে। কিন্তু এতো নিখুঁত মুনশিয়ানার সাথে যে মানুষকে বোকা বানানো যেতে পারে এবং অন্য সবার মধ্যে আমিই সেই বোকা মানুষটি ব্যাপারটা এ বয়সে, জীবনের এই পর্যায়ে এসে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমি একটু সুখী হতে চেয়েছিলাম
আমার মধ্যে সে কী দেখেছিল জানি না। তবে, যখন খেয়াল করলাম, দেখি, সে আমার পেছনে কাঁঠালের আঠার মতো লেগে আছে। জীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। বয়স এখন পঞ্চাশের দরজায় কড়া নাড়ছে। আর আমি ক্ষণে ক্ষণে ভাবছি, জীবনের যাত্রাপথে অর্ধেকটা পথ পার হয়ে এলাম তাহলে। অনেক কিছু দেখা হলো, অনেক মানুষ চেনা হলো, অনেক কিছু জানা হলো, ইত্যাদি। পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর বা আফসোসের হাহাকার জাতীয় অনুভূতির ব্যালান্সশিট তৈরির ঠিক প্রাথমিক মুহূর্তে তার আবির্ভাব আর আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়া।
তার অদ্ভুত আর নিরন্তর ভালোবাসার ডাক বারবার এড়িয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি আমার। এক ধারাবাহিক ঐন্দ্রজালিক মুগ্ধতায় আমাকে অবশ আর আবেশিত করেছিল সে। তার বলা প্রতিটি কথায়, প্রতিটি আশ্বাসে ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করেছিলাম। পরম পাওয়ার লোভে। আসলে, আমি একটু সুখী হতে চেয়েছিলাম। জানি না, সেটিই আমার কাল হলো কিনা।
আমি বারবার তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি গোটা ব্যাপারটাই অসম্ভব বলে। অথচ, একটিবারের জন্য সে হাল ছেড়ে দেয়নি। আর, সব বিবেচনা একপাশে সরিয়ে রেখে যখন সত্যি সত্যি তার ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দিলাম, সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল এমনভাবে, যেন আমরা কেউ কোনোদিন কাউকে চিনতাম না। যেন আমরা বাকি জীবনের জন্য পরস্পরের কাছে হয়ে গেলাম চির অচেনা আগুন্তক!

তুমি আছো জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে
তোমার ভালোবাসায় অভিভূত, বশীভূত হয়ে তোমায় ভালোবেসেছিলাম। অথচ, আমাকে ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে দিলে না, যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে পাশে থাকার ফর এভার, তা ছিল নিছকই কথার কথা। সেই ম্যাজিক মোমেন্টে প্রগাঢ় কণ্ঠস্বরে আমাকে দেওয়া তোমার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি।
ভীরু কম্পিত হৃদয়ে, নিদারুণ সংকোচ আর দ্বিধায় জর্জরিত হতে হতে সেদিন তোমার পাশে যখন বসলাম আশপাশের সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে, তোমাকে বলেছিলাম,-সবসময় মনে হয়েছে তুমি আমার সাথে ফ্লার্ট করছো।-কী অদ্ভুত সুন্দর করে মাথাটা ডান দিকে কাত করে আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিলে, 'না, ফ্লার্ট নয় একদম। দিস ফিলিং ইজ ফর ইউ ফর এভার!' কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করেই আমি তা বিশ্বাস করেছিলাম। কী বোকা আমি তাই না!
আর তারপর-
''তুমি আছো জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে-অতীত আর
যেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম;
তাই শুধু কাটায়েছি।
কাটায়ে জেনেছি এই-ই শূন্যে, তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোনো নাম।
অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো
দ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চ'লে যাওয়া
শোককে স্বীকার ক'রে অবশেষে তবে
নিমেষের শরীরের উজ্জ্বলতায়-অনন্তের জ্ঞানপাপ মুছে দিতে হবে।''

ছেড়ে যাওয়ার পর যখন ফিরে এসেছিলে
তুমি কি সত্যি সত্যি ছেড়ে যেতে পেরেছিলে? এটিও আমার কাছে রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। না বলে চলে গেলে ঠিকই, কিন্তু এয়ারপোর্টে অথবা ঘরে পৌঁছেই একটার পর একটা মেসেজ। কেন? আমার মানসিক অবস্থা তখন তোমার কোনো মেসেজ গ্রহণ করতে অপারগ। একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে তোমার হরেক মেসেজের কোনো জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করিনি। অবলীলায় ছেড়ে গিয়ে এ তোমার কেমনতর ধরে রাখার অভিলাষ! তোমার অনেক মিস্টেরিয়াস আচরণের একটি।
আর, যখন-তখন স্বপ্টেম্নর বারান্দায় বা ব্যালকনিতে তোমার উঁকি-ঝুঁকি! যেন তোমাকে কিছুতেই ভুলতে দেবে না সে আমি যত প্রকারেই চেষ্টা করি না কেন। কতবার, কতভাবে এলে তুমি আমার ঘুমঘোরে, মায়াবী প্রবঞ্চক!
যখন নিজের সাথে এক ধরনের বোঝাপড়া সেরে তোমার মেসেজের জবাব দিতে শুরু করলাম, তখন তোমার আরেক রূপ। আসলে একই পুরোনো রূপ। বিশ্বাসের খেলায় আমার বারবার হেরে যাওয়া। এর মধ্যে কয়েকটি মেসেজে আমার বরাবরের তীব্র ভালোবাসার অনুভূতি জানিয়েছি। সে তুলনায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। যেন, আমার অনুভূতিগুলো নিয়ে খেলতেই সে ভীষণ মজা পেয়েছে। সবসময়।
একসময় মনে হলো, যথেষ্ট হয়েছে। এবার আমাকেই থামতে হবে। বরাবরের মতো চতুরতার সাথে সে খুব হালকাভাবে আমার সাথে যোগাযোগ রাখার ভান করে যাচ্ছে। যেহেতু ইতিমধ্যে তার চেহারা বা ব্যবহারের দুইরকম দেখে ফেলেছি তাই তা ধরতে সমস্যা হয়নি। সমস্যা হচ্ছে, আমার মনকে নিয়ে যাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না যে আমি এক নির্দয় প্রতারণার শিকার হয়েছি।
মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসার প্রতিদান, আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে হৃদয়হীন ছেলেখেলার বিভিন্ন কাহিনি বিভিন্ন সময় শুনেছি। একাধিকবার এরকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছি। তারপরও মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে পারিনি। সবসময় ভেবেছি, মানুষকে তো শেষ পর্যন্ত মানুষকেই বিশ্বাস করতে হয়। এতকিছু সত্ত্বেও, এত ধাক্কা খাওয়ার পরও এখনও তাই মনে করি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়তো এই বিশ্বাস নিয়েই চলতে চেষ্টা করব।
আধো আঁধার আধো আলোতে
মাঝেমধ্যে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ভাবি, সে যেন আমার স্বপ্টেম্নও ফিরে না আসে। অথচ, একটা সময়, স্বপ্টেম্নই তাকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি বারবার। আসলে, এখন আর তাকে স্বপ্টেম্ন দেখার ইচ্ছেটাও তেমনভাবে অনুভব করি না। সংগত কারণেই। একজন যধনরঃঁধষ মিথ্যাবাদী, প্রতারক, ভ কে নিয়ে কীইবা স্বপ্টম্ন দেখার থাকতে পারে।
তারপরও মানুষের মন যে কী এক রহস্যময় বস্তু! এতদিন হয়ে গেল সব মায়াজাল ছিন্ন করে সে ছেড়ে গেছে আমাকে, অথচ শত চেষ্টাতেও কিছুতেই পারছি না তাকে আমার মনের ভেতর থেকে সবটুকু সরিয়ে ফেলতে। নিদেনপক্ষে যতটুকু সরাতে পারলে কিছুটা মানসিক স্বস্তি পেতাম, কিছুটা মানসিক শান্তি। হচ্ছে না। অপেক্ষা করছি আরো কিছু সময় চলে যাবার জন্য।
এর আগে এমনটা খুব কমই হয়েছে যখন বয়ে যাওয়া সময়ের গতিকে এতটা ধীর মনে হয়েছে। অথচ, এর উল্টোটাই ঘটেছে, ঘটে। প্রায় সময় তাই বলা হয়, সময় কী দ্রুত চলে যায়! অথচ, সে চলে যাবার পর এখন আমার কাছে প্রতিটি লামহে যেন একেকটি বছর!
সারারাত নিদ্রাহীন কাটানোর পর ভোর রাতের দিকে ঘুমানোর চেষ্টায় যখন চোখ বুজলাম, সে এলো তার মতো করে আরেক রূপে। বেশ একটা হট্টগোল চলছে চারপাশে। উঁচু একটা টিলার ওপরে একটা ভিলাতে মনে হচ্ছে আমরা। পরিচিত বেশ কিছু মুখ আশপাশে দেখতে পাচ্ছি। ছোট বাচ্চার কান্না ভেসে আসছে কোথাও থেকে। হঠাৎ দেখতে পেলাম তাকে। তার চিরাচরিত হাসি মুখ নিয়ে একটু দূরে ঘুরঘুর করছে আমার দিকে তাকিয়ে। স্বপ্টেম্নও আমি তাকে এড়িয়ে যেতে চাইলাম। নাকি উপেক্ষা?
মনে পড়ে, দিনের পর দিন যখন তার সবরকম প্রেমের পাগলামি উপেক্ষা করে গেছি, আমার পেছনে তখন সে লেগেছিল আঠার মতো, আক্ষরিক অর্থে। মাঝেমধ্যে নিরুৎসাহিত করতে বাজে ব্যবহারও করতে হয়েছে। কিছুতেই তাকে ফেরাতে পারিনি। আর যখন তার ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দিলাম মনপ্রাণ থেকে, সে আমাকে ছেড়ে গেলো অবলীলায়। আশ্চর্য!
তাকে এড়ানোর জন্য যেদিকেই দৃষ্টি ঘোরাই, সেদিকেই দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে মুখ করে। চোখেমুখে ভালোবাসার আহ্বান। আগে বুঝতাম না, এখন ভালো করেই জানি, কামার্ত চাহনির রূপ কেমন। সামনে কোথাও কিছু গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। তাকে এড়ানোর জন্যই কিনা জানি না, একটা টেবিলের সামনে মাটিতে বসে মাথা নিচু করে ছিলাম, যাতে সামনে থেকে আমাকে দেখা না যায়।
হঠাৎ দেখি আমার অবনত মুখের কাছে ম্যাজেন্টা রঙের বাগানবিলাস ফুল আর পাতাসহ কয়েকটা ডাল নাড়ছে কেউ। মাথা ওপরে তুলতেই দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সেই আবেগভরা দৃষ্টি নিয়ে, যেটাকে একসময় আমি ভালোবাসা বলে ভুল করেছিলাম। আকুল ইশারায় সে আমাকে ফুলগুলো নিতে অনুরোধ করল। স্বপ্টেম্নর সাদা-কালো ভুবনেও তার সবুজ রঙের পোশাক আমার চোখে বিশেষভাবে ধরা পড়ল।
শেষ দিন আমার শাড়ির রঙের সাথে তার এই পোশাকের রং মিলে গিয়েছিল। একসাথে আমরা বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম। সেদিনও তার প্রতিটা কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম, সে চলে যাবার আগে আমাদের আরও একবার নয়, একাধিকবার দেখা হবে। আমার সেই ভাবনাটা, সেই চাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল আমার দিক থেকে। সে যে অন্যরকম কিছু ভেবে রেখেছে তা আমার দূরবর্তী চিন্তাতেও আসেনি।
আমাদের আর দেখা হয়নি। এমনকি ফোনে কোনো কথাও নয়। যে দুয়েকটা মেসেজ বিনিময় হয়েছিল, তাতে তার গুলোতে বিদায়বেলার কোনো আবেগ ছিল না। শুধু কথার কথা। এক রাতে ফোন করেছিলাম। সে কলটাও রিসিভ করেনি। কেন আমি তখনও বুঝতে পারলাম না? আজও কি বুঝতে পেরেছি?

তুমি জানো, আমি জানি, আর কেহ জানে না
রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমের জন্য অপেক্ষা করার সময় ঘুম এলো না সহজে। এলো চোখ উপচে চেপে রাখা সিক্ত দীর্ঘশ্বাস। অনেক চেষ্টা করেও তার গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলো না।
বেশ কিছুদিনের বিরতিতে স্বপ্টেম্ন তার স্বল্প সময়ের অস্পষ্ট উপস্থিতি। এখন বুঝে গেছি তার পরিকল্পিত দুরভিসন্ধি বিষয়ে। শুধু মনকে বোঝানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। মানুষের মন যে কত দুর্বল তা এ মধ্য বয়সে এসেও মর্মে মর্মে টের পাচ্ছি।
বেশ কিছু মানুষের জটলা। সবাই সারিবদ্ধভাবে লাইন করে সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে। সেই দলে আমিও আছি। হঠাৎ মনে হলো, এই ভিড়ের মধ্যে কোথাও সে মিশে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। প্রথমবার ঠিকমতো দেখা গেলো না। একসময় খেয়াল করলাম, সে কিছুটা আড়ালে থেকে একজনের পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু তার কথা, হাসি বা এরকম কোনো সশব্দ উচ্চারণ তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে।
এখন সে যেভাবে আমার কাছ থেকে চোরের মতো পালিয়ে থাকার চেষ্টা করে, এখানেও তার আচরণ সেরকম। যতই তার বিভিন্ন কর্মকা বা বলা কথা নিয়ে ভাবি, ততই অবাক হই। দিনের পর দিন মানুষ কত সাবলীলভাবে মিথ্যা কথা বলে যেতে পারে। তারপর একদিন হুট করে তার মুখ থেকে মুখোশটা খসে পড়লে ভেতরের কুৎসিত চেহারা বেরিয়ে পড়ে। তখন সেই কুৎসিত চেহারা মেনে নেয়া অসহ্য রকম কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সে ঠিকই আমাকে দেখেছে। কিন্তু ভয়ে হোক, লজ্জায় হোক, আমার সামনে এসে দাঁড়াতে সাহস করছে না। অথচ, যখনই বুঝলাম, সে আশপাশে কোথাও আছে, আমার চোখ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেছে। তার পুরো শরীর বা মুখ কিছুই দেখা গেলো না। শুধু বোঝা গেলো, একটা ঢোলা টাইপের ক্যাজুয়াল প্যান্ট আর সম্ভবত টি-শার্ট পরে আছে। তার শরীরের ডান দিকটা অস্পষ্ট চোখে পড়ল। আমি একপাশে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছি। তাকে দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি? কে জানে!
আমার সাথে তার আচরণ শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোকসুলভ নয়। আমাকে মানতেই হবে, সে যা করেছে পুরোটাই তার সময় পার করার কৌশল, সোজা ভাষায় অভিনয়। এর মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো অনুভূতির স্থান ছিল না। আর আমার কথা বলব না। কেবল দেখতে চাই, এভাবে সে কতদূর যেতে পারে।
সারা জীবন মানুষের সাথে আন্তরিকভাবে মিশেছি, যতটুকুই মিশে থাকি। কখনও মিথ্যা বা অভিনয় বা চাতুরির আশ্রয় নেয়ার কথা মাথায় আসেনি, যেহেতু এগুলো চরিত্রের মধ্যে নেই। সবসময় ভালো মানুষির চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি করেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবধারিতভাবে ঠকে গেছি, প্রতারিত হয়েছি। সময়, অর্থ, আত্মসম্মান এর বারোটা বেজেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
শুধু ভাবছি, আর কতবার, আর কত স্থূলভাবে ঠকে যাবার পর আমার শিক্ষা হবে, যে শিক্ষা পাবার পর আমাকে আর মিথ্যা মানুষকে ভালোবেসে চোখের পানি ফেলতে হবে না! অথচ, এতো ভন্ডামির পরও আমার তৃষ্ণার্ত চোখ কেবল তাকেই খুঁজে ফিরছে?

ভালোবাসার মতো ভুল আমাদের হয়নি কখনও
পাতা ঝরে যাচ্ছে, শীত শেষের লাল হলুদ পাতাগুলো, গাড়ির জানালা থেকে ডান দিকে তাকাতেই দেখলাম লাল লাল জারুলের পাতাগুলো ফাল্কগ্দুনের মায়াবী বাতাসে ভেসে ঝরে পড়ছে প্রশস্ত রাস্তার খোলা বুকে। আর তার কথা মনে পড়ছে, যাকে ভাবলেই ভীষণ অস্বস্তিতে কুঁচকে ওঠে সমস্ত হৃদয়-চরাচর।
অনেকদিন পর আজ পুরোনো জায়গাটায় গেলাম। ডানদিকে তাকানোর কথা ভুলে থাকলাম অবচেতন মনের আন্তরিক বিবেচনায়। ডানদিকে তাকালেই দেখতে পেতাম তাকে, নিদারুণ উপেক্ষায় ফেলে যাওয়া তার অস্পষ্ট ছায়া, তার মিথ্যে মায়া। তাকাইনি আমি সেদিকে।
কে যেন তাকাতে দেয়নি আমাকে, আমার দয়ালু হৃদয় বুঝি যে আমাকে ভালোবাসে সবটুকু মমতায়। জানে সে, তাকালেই ভেতরটা আমার মুচড়ে যেত অসম্ভব যন্ত্রণায়, চেয়ে নেওয়া ভালোবাসার নিদারুণ অপমানে। হৃদয় তো মেনে নেয় না কখনও ভালোবাসার অসহ্য অপমান।
তারপর আমি শীত শেষের ঝরে যাওয়া পাতাগুলোর দিকে তাকালাম, ডানদিকে। তাদের দিকে তাকিয়ে আমি তার কথাই মনে করলাম যে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে নিরুদ্দেশে! যোগাযোগের কোনো সূত্র পেছনে না রেখে। যেন, আমাকে সে দেখেনি কোনোদিন, চেনেনি কখনও। ভালোবাসার মতো ভুল আমাদের ভেতরে ঘটেনি কখনও ভুল করেও!
সে চলে যাবার প্রায় তিন মাস পর ঢুকলাম সেই চিরচেনা অঙ্গনে। একটি কাজে এসেছিলাম। ড্রাইভারকে পাঠিয়ে গাড়িতে বসে থাকলাম। আমি কি কিছুক্ষণের জন্য একেবারেই অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম? নাকি আমার অবচেতন মনই আমাকে এভাবে বাঁচিয়ে দিল? গেট দিয়ে ঢোকার পর মাথাটা নিচের দিকে ছিল। সম্ভবত মোবাইলের পর্দায়। কী অদ্ভুত! একবার মাথা তুলে ডান দিকে তাকালে আমার ভেতরে কালবৈশাখী শুরু হয়ে যেত। যখন চোখ মেলে সামনে তাকালাম অফিস ভবনটার সামনে, পরিচিত একজনকে দেখতে পেলাম। ফিরে আসার সময় অবশ্য ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে পার্কিংয়ে রাখা গাড়িগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। সেই গাড়িগুলো! হয়তো এখানে আর কখনও আসা হবে না। এখানেই তার সাথে পরিচয়। এখানেই শেষ দেখা। গাড়ি থেকে কিছুতেই নামার সাহস পাচ্ছিলাম না। নামলেই যদি তাকে দেখতে ইচ্ছে করে, আমার পিপাসারত চোখ যদি আকুল হয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করে যে আমাকে কিছুই না বলে ছেড়ে চলে গেছে কোথায় জানি না...।

বিষয় : প্রচ্ছদ মালেকা পারভীন

মন্তব্য করুন