ছাপচিত্র, সাধারণত কাগজের ওপর মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় শিল্পকর্ম তৈরির কৌশল। সাধারণভাবে এমন এক মুদ্রণ তৈরির প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে মৌলিক শিল্পকর্মটির উপাদান বিদ্যমান থাকে, এমনকি এটিকে ওই চিত্রকর্মের আলোকচিত্রের প্রতিভাষও বলা যায়। শুধু স্বতন্ত্রছাপের ক্ষেত্র ছাড়া প্রক্রিয়াটি একই সঙ্গে একাধিক সংস্করণ তৈরি করতে সমর্থ, এবং এই বিষয়টিকে মুদ্রণ বা ছাপ বলা হয়। যদিও সকল ছাপচিত্র হুবহু বা 'অনুলিপি' হিসেবে বিবেচনার পরিবর্তে 'মূল' কর্ম হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে।
এই ছাপচিত্র নির্মাণে রং-তুলির মাধ্যমে চিত্রাঙ্কনের চিরাচরিত প্রকাশচর্চার বাইরে নতুন কোনো অর্থ, আনন্দ বা অভিজ্ঞান দান করতে পারে শিল্পী ও শিল্পপ্রেমিককে? কাঠ বা বস্তু খোদাই-সংক্রান্ত ছাপচিত্রের তুলনামূলক সীমাবদ্ধতাকে উত্তরণে শিল্পীর খোদাই দক্ষতা, তাঁর ছাপকরণ পরিকল্পনা ও প্রক্ষেপণের কৌশলে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এই ছাপচিত্রে বহুশিল্পীর সম্মিলনে একটিমাত্র বিষয়কে বিচিত্রভাবে উপস্থাপিত হতে দেখলে সেই শিল্পমুগ্ধতা নিঃসন্দেহে আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ১/১১ ইকবাল রোডের কলাকেন্দ্রে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে 'রবীন্দ্রনামা' শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিকৃতি চিত্রপ্রদর্শনী। শুধু ছাপচিত্র মাধ্যমকে নির্দিষ্ট করে শিল্পীরা তাঁদের ভাবনার রবীন্দ্রনাথকে আবির্ভূত করেছেন তাঁদের চিত্রপটে। কলাকেন্দ্রের কিবরিয়া প্রিন্ট মেকিং স্টুডিওর আয়োজনে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই প্রদর্শনী উৎসর্গীকৃত।
দেশের খ্যাতিমান ৬৭জন চিত্রশিল্পী তাঁদের শৈল্পিক মননে রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন ছাপচিত্রের এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে। প্রদর্শনীতে মোট ৭১টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, আবুল বারক আলভী, হামিদুজ্জামান খান, শহীদ কবির, বীরেন সোম, নিসার হোসেন, জামাল আহমেদ, শেখ আফজাল, শিশির ভট্টাচার্য্য, ওয়াকিলুর রহমান, রনজিৎ দাস, ঢালি আল মামুন, আইভি জামান, দিলারা বেগম, ফারেহা জেবা, আতিয়া ইসলামসহ আরও অনেকে।
সাধারণত প্রতিকৃতি চিত্র বলতে এমন চিত্র বা ভাস্কর্য বোঝায় যেখানে ব্যক্তির মুখাবয়বের শৈল্পিক উপস্থাপনসহ অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। প্রতিকৃতি চিত্র আঁকতে গিয়ে কোনো শিল্পী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলেন, আবার কোনো শিল্পী বাস্তবতার ধারেকাছে না গিয়ে এক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ব্যক্তিত্বের আভাস ফুটিয়ে তোলেন। বর্তমানকালে প্রতিকৃতি চিত্র তার প্রচলিত গৎবাঁধা আদর্শিক নিয়মনীতি ভেঙেচুরে আরও তাৎপর্যপূর্ণ শিল্পমাধ্যম রূপে চর্চিত হচ্ছে। 'রবীন্দ্রনামা' এমনই একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিকৃতি চিত্র প্রদর্শনীর সাক্ষ্য বহন করছে। শুধু বাহ্যিক অভিব্যক্তিই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিসত্তা, ভাব, মেজাজ সব মিলিয়ে ব্যক্তি সম্পর্কিত সামগ্রিক অনুধাবন প্রকাশ পেয়েছে প্রতিটি প্রতিকৃতি চিত্রে। বাস্তবতার গণ্ডি পেরিয়ে অভিব্যক্তিক শৈলীতে শিল্পীরা তাঁদের মননে গাঁথা রবীন্দ্রনাথকে তুলে এনেছেন এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে। ব্যক্তিসত্তার একেবারে গভীরে প্রোথিত ভাব, দর্শনের সাথে শিল্পীর অন্তর্নিহিত রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত অনুরাগ মিলেমিশে একাকার হয়ে নবরূপে রবীন্দ্রনাথ আবির্ভূত হয়েছেন প্রতিটি ছাপচিত্রে। রবীন্দ্রনাথকে কেবলই দর্শন নয়, আপাত বাস্তবতার নেপথ্যে তাঁর আদর্শ, ভাবধারা, সাহিত্যের রসবোধ প্রভৃতি অনুভবে ধারণ করে আপন মনের স্বতঃস্ম্ফূর্ত ব্যক্তি মানসের আবির্ভাব ঘটেছে প্রত্যেক শিল্পীর চিত্রপটে। রবীন্দ্র অনুরাগী এবং শিল্প অনুরাগী ব্যক্তিমাত্রই তা অনুধাবন করবেন এবং নিজ মানসে লালিত রবীন্দ্র আদর্শের সাথে প্রতিকৃতিগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন।
প্রদর্শনীতে আরও বিশেষ আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই প্রদর্শনী কেন্দ্রের একটি কক্ষে রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। এতে শিল্প অনুরাগী ব্যক্তিবর্গ রবীন্দ্রনাথ নিজেই কীভাবে চিত্রের গতানুগতিকতাকে ভেঙেছেন তার ওপর একটি সম্যক ধারণা করতে পারবেন। সমসাময়িক চিত্রশিল্পীদের শিল্পচর্চার সাথে শিল্পী রবীন্দ্রনাথের শিল্পচর্চার সম্পর্ক নিরূপণের চমৎকার একটি শৈল্পিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
'রবীন্দ্রনামা' প্রদর্শনীটি ২৭ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।