বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণের ৭৬তম জন্মদিন ২১ জুন। অজস্র পাঠকনন্দিত কবিতার কারিগর এই কবি উত্তর প্রজন্মে নিত্যপাঠ্য। পরবর্তী প্রজন্মের তিন কবি- নাসির আহমেদ, তুষার কবির ও আফরোজা সোমা নির্মলেন্দু গুণের 'হুলিয়া, 'যাত্রাভঙ্গ' ও 'তোমার চোখ এত লাল কেন'-এর বিশ্নেষণ করেছেন। কবির জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন...
হুলিয়া
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল;- আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনল না।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি।
সেই একই ভাঙা পথ, একই কালোমাটির আল ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি।
আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ-শোঁ করছে হাওয়া।
অনেক বদলে গেছে বাড়িটা,
টিনের চাল থেকে শুরু করে পুকুরের জল,
ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনোখানে।
...
[অংশবিশেষ]
কাব্যগ্রন্থ : প্রেমাংশুর রক্ত চাই [১৯৭০]
নির্মলেন্দু গুণ

সময়ের দলিল
নাসির আহমেদ
নির্মলেন্দু গুণের 'হুলিয়া' কবিতাটি প্রথম পড়ি কলেজের ছাত্রাবস্থায়। ভোলা কলেজে সে বছর বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে পাওয়া অনেক বইয়ের মধ্যে নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই'ও ছিল। তখন যে কারণে কবিতাটি ভালো লেগেছিল তা হচ্ছে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তখনও আমাদের চোখে জ্বলজ্বল করছে। সামরিক শাসকের হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো যুবকটির পাঁচ বছর পর গ্রামের বাড়িতে ফেরার যে চমৎকার বিবরণ, তা একটি বিশাল ক্যানভাসের ফিকশনের আনন্দই দিয়েছিল। দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মী তরুণটি পালিয়ে বেড়াচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। রেলস্টেশনসহ একাধিক জায়গায় পুলিশের কাছে ধরা পড়তে পড়তেও রক্ষা পেয়ে যায় সে। বাড়িতে ফেরার পর মায়ের সস্নেহ আলিঙ্গন, রাতে দূর-দূরান্তের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ছুটে আসা ইয়াসিন, আদিত্য, আব্বাস প্রমুখ তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে যুবকের গোপন বৈঠক ইত্যাদি দারুণ চমকপ্রদ ঘটনা। সবারই উদ্বেগ জড়ানো প্রশ্ন :আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
-আইয়ুব খান এখন কোথায়?
-শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?
এ যেন সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষেরই উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা।
একটি কবিতা যখন তার উত্তপ্ত সমকালকে ধারণ করে, তখন তা কোন ব্যক্তির আলেখ্য থাকে না, হয়ে ওঠে সমগ্র সমাজেরই আলেখ্য। একটি শোষিত-বঞ্চিত জনপদের মানুষের জীবন আলেখ্য। হয়তো সে কারণেই কবিতার কলা-প্রকৌশল বা শিল্পমান না বুঝেও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ভালো লেগে গিয়েছিল হুলিয়া।
কিন্তু যখন পরিণত বয়সে কবিতার কলা-প্রকৌশল জেনে বুঝে এবং ষাটের দশকের অন্য কবিদের কবিতার নিরিখে এই কবিতাটি পাঠ করি, তখন বিস্মিত হই এই কবিতার শৈল্পিক ব্যাঞ্জনায়। নির্মলেন্দু গুণ যখন এই কবিতা লেখেন তখন পূর্ব বাংলার অধিকাংশ কবি অক্ষরবৃত্ত কিংবা পয়ার ছন্দে কবিতা লিখছেন। কিন্তু তরুণ নির্মলেন্দু গুণ গৎবাঁধা ছন্দের ধার না ধেরে একেবারে মুখের কথার কাছাকাছি অথচ ছন্দোময় ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করেছেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা হুলিয়া।
এই কবিতাকে পুরোপুরি গদ্য কবিতাও বলা যাবে না।
'আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর/আমার চারদিকে চকচক করছে রোদ/শোঁ শোঁ করছে হাওয়া...'
অক্ষরবৃত্তের সুরটি পুরোপুরি বজায় রেখেই এই পঙক্তি বিন্যাস। সাধারণ গদ্যের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনায় উত্তীর্ণ চিত্রকল্পময় কবিতা হুলিয়া। '...দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি/সেই একই ভাঙাপথ, কালো মাটির আল ধরে গ্রামে ফেরা,' এই দুটি মাত্র বাক্যে পাকিস্তানি দুঃশাসনে উন্নয়নবঞ্চিত পূর্ববাংলার যে ছবি ফুটে উঠেছে, তা অসাধারণ! আরো বিস্মিত হই প্রতীকী চিত্রকল্প 'একটি শেয়াল একটা কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়...'-এর মতো বাক্য পড়ে! কুকুরটি গন্ধ শুঁকে যুবককে চিনতে চেষ্টা করল, এই বাক্যের পরেই তুলনামূলক চিত্র 'যেমন পুলিশ-সমেত চেকার তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল'। '...একটা লাউডুগি উত্তপ্ত দুপুরকে তার লকলকে জিভ দেখালো'- কী চমৎকার প্রতীকী চিত্রকল্প! "...আমি বাড়ির পেছন থেকে দরোজায় টোকা দিয়ে ডাকলুম 'মা' বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি/ বহুদিন যে-দরোজায় কোনো কন্ঠস্বর ছিলনা/ মরচেপড়া সেই দরজা মুহূর্তেই ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে খুলে গেলো/ কত সহজেই একটা আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম'- মা আর সন্তানের স্নেহের এ এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য! গ্রামীণ সমাজেও তখন যে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রবেশ করতে চলেছে তারই দৃষ্টান্ত- 'সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবির জায়গায় লেনিন / বাবার জমাখরচের পাশে কার্ল মার্ক্সের ছবি।'
এইসব সামাজিক রাজনৈতিক এবং মানবিক চেতনা বিবেচনায় হুলিয়া সময়ের এক উজ্জ্বল দলিল। আর সম্ভবত সে কারণে এই কবিতাই অল্প বয়সে বিপুল খ্যাতি এনে দিয়েছিল তরুণ কবিকে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের স্বরূপ জানতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই যেমন অনিবার্য, তেমনি নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়াও অবশ্য পাঠ্য। া
যাত্রাভঙ্গ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এককে করি দুই।

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি।

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই।

তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরণী নায়ে।

নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব,
হাত দিয়ে তো ছোঁব না মুখ
দুঃখ দিয়ে ছোঁব।

কাব্যগ্রন্থ :আনন্দ কুসুম [১৯৭৬]
নির্মলেন্দু গুণ
গুনগুন গুণকাব্য
তুষার কবির
কবিতায় যখন হৃদয়ের জলের মতন কথা উঠে আসে তখন তা পাঠকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে! আর এ রকম একটি ছড়িয়ে পড়া কবিতা হলো কবি নির্মলেন্দু গুণের 'যাত্রাভঙ্গ'। কবির 'আনন্দ কুসুম' কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি রয়েছে। ''হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,/ মন বাড়িয়ে ছুঁই,/ দুইকে আমি এক করি না/ এককে করি দুই।'' এ যেন হৃদয়ের ভেতর থেকে আচমকা উঠে আসা একটি কবিতা! পাঠকের দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়িয়ে দেওয়া একটি কবিতা! হৃদয়ের জানালায় আলতো আঁচড় কাটা একটি কবিতা! নির্মলেন্দু গুণের জনপ্রিয় কবিতা খুঁজতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলতে হয়- একটা থেকে আরেকটা কবিতা পাঠকের নিত্য পাঠে জেগে ওঠে! 'মানুষ', 'হুলিয়া', 'ফুলদানি', 'তোমার চোখ এত লাল কেন', 'আগ্নেয়াস্ত্র', 'ওটা কিছু নয়', 'সেই প্রজাপতি', 'যুদ্ধ', 'প্রলেতারিয়েত', 'স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো', 'আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি'- এ রকম সাড়া ও শিহরণ জাগানো কবিতা গুণদার মতন তাঁর সময়ে আর কেউ লিখতে পেরেছেন বলে মনে হয় না! 'যাত্রাভঙ্গ' কবিতাটি, বলা যায়, একটি সহজ-সরল-কোমল-মেদহীন-ছিপছিপে কবিতা! এ কবিতাটিতে না আছে কোনো ভারি উপমার অভিঘাত, না আছে কোনো জমাট চিত্রকল্পের চাপ! যদিও গুণদার অনেক কবিতাতেই খুঁজে পাওয়া যায় ভয়ংকর সুন্দর সব রূপক-উপমা-চিত্রকল্প! 'নিকেলমাখা চোখ', 'অজগর খোঁপা', 'হৃদয়ের মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র'- এ রকম দ্যুতিময় ক্র্যাফটগুলো তাঁর কবিতায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে বারবার! তবে 'যাত্রাভঙ্গ' কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত গীতল এক প্রেমময়তা; "হেমের মাঝে শুই না যবে/ প্রেমের মাঝে শুই/ তুই কেমন করে যাবি?/ পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া/ আমাকেই তুই পাবি"- পঙ্‌ক্তিগুলো আমাদের সম্মোহিত ও আপ্লুত করে! প্রেমাস্পদের প্রতি এই কাতরতা, মন বাড়িয়ে এ রকম অতীন্দ্রিয় ছোঁয়ার আকুলতা কবিতাটিতে ভিন্ন এক দ্যোতনা ছড়িয়ে দেয়! আর তাই কবিতাটি হয়ে উঠেছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের এক সহজিয়া উচ্চারণ! "নায়ের মাঝে বসব বটে,/ না-এর মাঝে শোব।/ হাত দিয়ে তো ছোঁব না মুখ,/ দুঃখ দিয়ে ছোঁব।' এ রকম দুঃখ দিয়ে অপার্থিব ছোঁয়া মনে হয় কেবল কবিতাতেই সম্ভব! গুণদার এ কবিতাটি যেন অসম্ভব এক স্পর্শময়তার বা স্পর্শহীনতার অভিজ্ঞান! এ যেন পাঠকের হৃদয়ে গান হয়ে বেজে ওঠে! গুনগুন করে হৃদয়ে বয়ে যায় কবিতাটির ছোঁয়া না-ছোঁয়ার অনুরণন!
তোমার চোখ এত লাল কেন?
তুমি কি আমার সাথে রাতে ঘুমোবে?
'আওয়ার সোল্‌স এট নাইট' নামে একটা সিনেমা আছে। দু'জন একা মানুষ। দু'জনেই বয়োজ্যেষ্ঠ। একজন বিধবা, আরেকজন বিপত্নীক। প্রতিবেশী হলেও একে অপরের কাছে তারা যেন দুই ভিন্নগ্রহ। বিচ্ছিন্ন এই দুই নর-নারীকে সিনেমার গল্পে এক সুতোয় বাঁধে তাদের একাকিত্ব।
রাতের পর রাত জেগে-জেগে কাটায় এডি। একা ঘুমোতে পারে না। একাকিত্বের ভার বইতে না পেরে একদিন প্রতিবেশী পুরুষ লুইসের দরজায় গিয়ে হাজির হয় ইতস্তত এডি। কিশোরীর মতন দ্বিধা জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করে, 'উড ইউ বি ইন্টারেস্টেট ইন কামিং টু মাই হাউস টু স্লিপ উইথ মি'?
রাতে ঘুমোনোর প্রস্তাব দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আবার ব্যাখ্যা দেয় অপ্রস্তুত এডি। না না! যৌনতা বা প্রেম নয়। বিছানায় তারা শুধু পাশাপাশি শুয়ে থাকবে; ঘুমোবে। ব্যাস! এটুকুই! এর বেশি দাবি-দাওয়া-চাহিদা-অনুরোধ নেই। শুধু পাশাপাশি থাকা! শুধু নিঃশ্বাসের সঙ্গ পাওয়া! "হয়তো বিরহ থাকবে তখনো/ পালঙ্কে থাকবে বিচ্ছেদ; তবু আজ/ সে চায়, নিঃশ্বাসের সঙ্গ কিছু মৌনতা ঘোচাক"। উল্লিখিত পঙক্তিগুলো এই অভাজনের। 'বরষাসঙ্গী' কবিতার। বিচ্ছেদ, বিরহ ও একাকীত্ব বাংলা কবিতার চিরায়ত উপাদান। কালিদাসের মেঘদূতে যক্ষের কাছ থেকে হৃদয়ের বার্তা নিয়ে দূরদেশে থাকা প্রেয়সীর কাছে যায় মেঘ। হৃদয়েরই আকুলতা প্রকাশে জ্ঞানদাস বলেন, 'হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে/পরাণ-পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে'।
কালিদাস বা জ্ঞানদাস বর্ণিত বিরহ ও নিঃসঙ্গতার মধ্যেও একধরনের 'নিশ্চিন্তি' আছে। তাদের কবিতার ভাষ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের কেউ একজন প্রেমের মানুষ, প্রাণের মানুষ আছে। আমরা দেখছি যক্ষ জানাচ্ছে, তার প্রেয়সী এক তন্বী তরুণী শ্যামা, যার অধর ওষ্ঠ পকস্ফ বিম্ব সম। হরিণী নয়না সেই নারীর কটি, স্তন, নিতম্বের সুনিপুণ বর্ণনাও দিয়েছেন কালিদাস। এমন হৃদয়হরার বিচ্ছেদে যক্ষের মন উচাটন হওয়া স্বাভাবিক। হয়তো এমনই উচাটন এক বোধ থেকেই জ্ঞানদাসও বলেছেন, 'প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর'।
কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ যখন বলেন, "আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই/কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক" তখন একটু যেন খটকা লাগে। একটু যেন থামতে হয়। একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা কতটা গাঢ় হলে, একজন মানুষ প্রেম বা কাম নয়, শুধু আরেকজন মানুষের সঙ্গ চেয়ে অধীর, আকুল হয়ে ওঠে?
'একটি জলের খনি, তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি'
নির্মলেন্দু গুণের 'তোমার চোখ এত লাল কেন' কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। কোনো রাক-ঢাক না রেখেই একজন পুরুষের জবানিতেই কবিতায় উঠে এসেছে একাকী এক পুরুষের একাকীত্বের প্রগাঢ় বেদনা। খুব সরলভাবে মুখের ভাষায় তিনি কবিতায় বলেন, 'বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত'। তাই, তিনি চান, কেউ একজন তার জন্য অপেক্ষা করুক। অপেক্ষা করুক ঘরের ভেতর। সেই অপেক্ষারতার কাছে বেশি কিছু প্রত্যাশা থাকবে না একাকী পুরুষটির। সে শুধু চায় ঘরের ভেতর থেকে একটি হাত দরজাখানি খুলে দেবে! এইটুকু! শুধু এইটুকু!
এই সামান্য আকাঙ্ক্ষার কথা পড়তে পড়তে পাঠকের হৃদয় আর্দ্র হয়ে ওঠে। এই আকাঙ্ক্ষা শুধু কোনো একাকী পুরুষের নয়। একজন পুরুষের জবানিতে হলেও এই আকাঙ্ক্ষার কাছে এসে কবিতাখানি হয়ে ওঠে নারী-পুরুষ সকলের কবিতা। খাবার টেবিলে দিনের পর দিন একাকী রাতের আহার এই নগরে বহু মানুষ খায়। কোনো এক দুর্বল দিনে একাকী আহারের সময় কার না মনে হয়, আহা! কেউ একজন থাকুক পাশে বসে। খেতে-খেতে দু'জনে গল্প হবে। খুনসুটি হবে। তারপর আবার না হয় ফেরা যাবে যে যার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের প্রাচীর ঘেরা কুঠুরিতে।
আবুল হাসান লিখেছিলেন, 'অতটুকু চায়নি বালিকা/ অত শোভা, অত স্বাধীনতা/ চেয়েছিল আরো কিছু কম'। ওই কমটুকুই অনেক সময় জোটে না। বালিকা চেয়েছিল, 'একটি জলের খনি/তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল/একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!' এইভাবে অনেক মানুষ অনেক হৈ রৈ, অনেক ভিড় সমাগমের মধ্যে নিজের ভেতর একলা থাকে। 'মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা' দেখেই মানুষ সঙ্গ চায়। মানুষ সঙ্গি খোঁজে। প্রেমের মানুষ, প্রাণের মানুষ পেলে তো কথা নেই। সোনায় সোহাগা। কিন্তু যার তা নেই, তারও তো লাগে একজন! যার আক্ষরিক অর্থেই ভেতর থেকে দুয়ার খুলে দেবার কেউ নেই, যত বড় শক্তিধর আর মনোবলের মানুষ তিনি হোন না কেন, বাইরে থেকে দুয়ার খুলতে খুলতে কোনো এক দুর্বল দিনে তাকে কাবু করে ফেলতে পারে নিঃসঙ্গতা। কিন্তু এরচেয়েও নিঃসঙ্গ মানুষ আছে। দুয়ার খুলে দেয়ার লোক থাকার পরেও, হৈ রৈ সমাগম ব্যস্ততা থাকার পরেও হৃদয়ের গভীর দরজায় একা চাবি হাতড়ে যার খুলতে হয় তালা, "তার জানালার ধারে/ উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে" দাঁড়াবে রোজ, সেই কি স্বাভাবিক নয়?
নির্মলেন্দু গুণ যখন বলেন, 'কেউ অন্তত আমাকে/ জিজ্ঞেস করুক: তোমার চোখ এত লাল কেন?' তখন সেটি শুধু এক পুরুষের আকুলতা নয়। একাকী সকল মানুষের হয়ে এই পঙক্তি কথা কয়ে ওঠে। বলে ওঠে, "আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই/কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক"। া

তোমার চোখ এত লাল কেন
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভিতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।

আমি চাই কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কিনা, নুন লাগবে কিনা।
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : 'তোমার চোখ এত লাল কেন?'

কাব্যগ্রন্থ :নির্বাচিতা [১৯৮৩]
নির্মলেন্দু গুণ