একসঙ্গে কাজ করতে করতেই, প্রতিদিন দেখতে দেখতেই কেমন করে যেন মানীষার প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায় রাজুর। যখন প্রথম প্রথম ঠিকমতো কাজ করতে পারত না, তখন মানীষা এসে কাজ শিখিয়ে দিত। নিজের পয়সাতেই মাঝেমধ্যে তিনটায় টি-ব্রেকে আইস (বরফ চা), স্প্রাইট কিনে এনে দিত। এভাবেই কখন যে সে রাজুর হৃদয়ে একটু একটু করে স্থান করে নিয়েছে, রাজু নিজেও বুঝতে পারেনি।
রোকেয়া নামে রংপুর শহরের পায়রাবন্দ গ্রামের ক্লাস সেভেন পাস করা এক মেয়েকে এসএসসি পাস রাজিউর রহমান বিয়ে করে শ্বশুরের টাকাতেই তিন মাসের মাথায় দালালকে ধরে থাইল্যান্ড বর্ডার দিয়ে মালয়েশিয়ায় ঢুকে কাজ শুরু করে এই নিকেলিং কারখানায়। ছোট্ট এই পাকার নিকেলিং ক্লাং বা দক্ষ পলিশিং কারখানা। দালালই অন্য এক বাংলাদেশির অরিজিনাল ওয়ার্ক পারমিটওয়ালা পাসপোর্টে ছবি বদলিয়ে রাজুর ছবি বসিয়ে দেয়। তার মাধ্যমেই এখানে কাজ নেয়।
এক বছরে রাজু এই কারখানায় বেশ দক্ষ হয়ে ওঠে। বেতন বেড়ে আর ওভারটাইম মিলিয়ে মাসে এগারোশ থেকে বারোশ রিঙ্গিত আসে। এক পাকিস্তানি মুসলিম ও তিনজন বাংলাদেশি মিলে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থেকে, নিজেরা রান্না করে খেয়ে পানির বিল ইত্যাদি দিয়ে মাসে সাতশ রিঙ্গিত, মানে প্রায় চৌদ্দ হাজার টাকা জমাতে পারে।
রোকেয়ার স্মৃতিগুলোও তার মন থেকে মুছে যেতে শুরু করে। মাত্র দুই মাসের স্মৃতি! কিন্তু মানীষা যে তার দেড় বছরের দৈনন্দিন বন্ধু! কত সুন্দর তার ঘরের কুড়ি ইঞ্চি সেকেন্ড হ্যান্ড রঙিন টিভি আর নতুন ভিসিআর! ইতোমধ্যে সে মালয় ভাষাও খুব সুন্দর শিখে ফেলেছে।
কারখানায় ছয়জন তামিল মেয়ে আর রাজু। ভারী কাজ নেই বললেই চলে। সাথে একজন চীনা সুপারভাইজার আহ্‌ মেং, একটি চীনা কেরানি মেয়ে উই পং আর বস উ সু তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সের পঁচিশ বছরের এই মানীষা। খড়ি দিয়ে ভাত রান্না করলে হাঁড়ির তলা যেমন কালো হয়, গায়ের রং তেমনি কালো হলেও মানীষা দেখতে অপূর্ব। মায়াভরা দুটি চোখ, উঁচু নাক, গোলগাল মুখ, উন্নত বুক, সুগঠিত নিতম্ব, মসৃণ উরু।
হঠাৎ একদিন রাজুর মুখে তামিল ভাষায়-
না উন্নে কাদেল্‌ লিক্রেন, মানীষা- আমি তোমাকে ভালোবাসি মানীষা।
শুনে অবাক হয় সে। মালয়েশিয়ায় সচরাচর মালয় ভাষা চলে। তবে তামিল ও চীনারা যখন নিজেদের মাঝে কথা বলে তখন নিজেদের তামিল ও চীনা ভাষাই ব্যবহার করে। মানীষা মালয় ভাষায় জিজ্ঞেস করে-
মানা আওয়া বেলাজা টামিল
অর্থাৎ, তুমি কোথা থেকে তামিল শিখেছ?
রাজু বলে-
এন্নেক্যে অ্যল্লা তেঢ়িওঁ, অঙ্গুলিক্যে আল্লা তেঢ়িওঁ-
মানে, শিখেছি, শিখেছি, তোমার জন্যই শিখেছি।
বাহ্‌! তুমি তো বেশ ভালোই তামিল বলছ। এখন কাজের সময়। কাজ করো। কাল ছুটি। বিনতাং মার্কেটের রেস্তোরান জুলি চেনো ?
চিনি।
সন্ধে সাতটায় এসো, আমি থাকব।
পরদিন সন্ধে সাতটায় রাজু রেস্তোরান জুলিতে এলো। দেখে খুব হালকা অথচ নিখুঁতভাবে সুন্দর মেকআপ নিয়ে সেজে এসেছে মানীষা। রাজু বসল মানীষার সামনের চেয়ারে। ওই টেবিলে ওরা দু'জনই।
মানীষা শুধু 'হাই' বলল।
অনেকক্ষণ দু'জনেই চুপচাপ। মানীষার অর্ডারে রুটি চানাই (পরোটা) ও তে আইস (বরফ চা) এলো। দু'জনে চুপচাপ খেলো। খাওয়াশেষে মানীষা মালয় ভাষাতে বলল-
আওয়া সুডা কাউইন গা (তুমি বিয়ে করেছ কি)?
ডাহা মিথ্যে বলল রাজু-
বুলুম (পরে করব)।
তোমার বয়স কত?
পঁচিশে পা রাখলাম।
তুমি জানো আমার এখন ছাব্বিশ?
ও কিছু না মানীষা।
তুমি মুসলিম, আমি হিন্দু?
অসুবিধা কী? সিনেমার শাহরুখ খান তো একটা হিন্দু মেয়েকে নিয়ে দিব্বি ঘর-সংসার করছে। ওদের বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়েও আছে। আমি তো তোমাকে চাই।
তুমি আমার সম্পর্কে কিছু জানো?
না বললে কোত্থেকে জানব?
আমি বিবাহিত।
সহসা সমস্ত বাতাস বের হয়ে গিয়ে চুপসে যাওয়া বেলুন হয়ে যায় রাজু।
কিন্তু এখন আমার স্বামী নেই। বালুভান নামে এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে আমার বিয়ে দেন বড় ভাই। আমার ছয় ভাই। আমিই তাদের একমাত্র বোন। অনেক শখ করে বড়লোকের ঘরে বিয়ে দেন বড় ভাই পুলিশ অফিসার। স্বামী পরে চাকরি নিয়ে আমেরিকায় চলে যায়। কথা ছিল, বাসা ঠিক হলে আমাকে নিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে একটি মেয়ে জন্ম নেয়। নাম বাসান্থি। তিন বছরের মাথায় সে আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়। সেখানে এক আমেরিকানকে সে বিয়ে করেছে। তার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই বর্তমানে সিঙ্গাপুরে সেটল্ড।
একটা চুম্বকের টানে, জান্তব টানে রাজু বলে-
তাহলে আর অসুবিধা কী? না উন্নে কাদেল লিক্রেন (আমি তোমাকে ভালোবাসি)।
এতক্ষণ বৃথা চেষ্টা করেছে মানীষা, মাথা দু'দিকে দুলিয়ে কয়েকবার চু চু করে শেষে বলল-
তুমি একটা পাগল। রাত দশটা বাজে, চলো ফেরা যাক।
নিজের বাসায় ফিরল রাজু। বন্ধুদের জানাল, কারখানার একটি তামিল মেয়েকে সে বিয়ে করবে।
ঘরের দু'জন সাংঘাতিক প্রতিবাদ করল-
তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? তুই এখানে এসেছিস বিয়ে করতে? নাকি মন দিয়ে কাজ করে টাকা রোজগার করতে?
কিন্তু বন্ধুদের প্রবল আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে অনড় থাকে সে নিজ সিদ্ধান্তে।
মাঝে মাঝেই সে মানীষাকে নিয়ে কে.এল-য়ে (কুয়ালালামপুরের সংক্ষিপ্ত নাম) বেড়াতে যায়। মানীষার আপত্তি সত্ত্বেও বাসান্থির জন্য ফ্রক কিনে দেয়, ছবির বই কিনে দেয়। একসময় মানীষার ভাইদের কানেও কথাটা যায়।
একদিন রাজু দেখে কারখানায় একটি লোক কিছু কাগজপত্র নিয়ে এসেছে। তাতে মানীষা আর বসের স্বাক্ষর নেওয়া হলো কয়েকটা। পরে সে জানতে পারে, মানীষা দুই বছর আগে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিল তিন হাজার রিঙ্গিত ডাউনপেমেন্ট দিয়ে। তার মাসিক কিস্তি এই কারখানার মানীষার বেতন থেকে সেই হাউজিং সোসাইটি কেটে নেয়। তার কাগজপত্র নবায়ন করতে তারা এসেছিল। সামনের মাসে অ্যাপার্টমেন্টটি হস্তান্তর করবে মানীষাকে। বাকি ৯ হাজার রিঙ্গিত প্রতি মাসে মানীষার বেতন থেকে দুইশ করে কেটে নেবে। পাঁচ বছরেই সমস্ত দেনা মিটে যাবে। এ দেশে সরকার প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে বাড়ির সংস্থান করে দেয় সহজ ঋণের শর্তে।
মানীষার পুলিশ ভাই রাজুকে একদিন ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় বেদম মারধর করল। মানীষা থানায় গিয়ে রাজুকে ছাড়িয়ে আনল। রাজু মোটেও বিচলিত হয় না, সে অনড়। মানীষাকে ভালোবাসে, মানীষাকে সে বিয়ে করবেই। মানীষা ভয় দেখায়, সে এই কারখানা ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে সেখানে কাজ করবে। রাজু বলে, সে-ও সেখানে যাবে।
অবশেষে হার মানে মানীষা। মানীষা রাজুকে নিয়ে গিয়ে একটি চার্চে বিয়ে করে। ছয় ভাইয়ের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে আসে। কিন্তু বোনের সুখ ও ইচ্ছাতে তারা বাধা দেয় না। তা ছাড়া এ দেশে ধর্ম নিয়ে কেউ বেশি মাথা ঘামায় না।
মানীষা রাজুকে নিয়ে পুচংজয়া নামে তামিল অধ্যুষিত তল্লাটে তার ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত হয়, আগের পক্ষের মেয়ে বাসান্থি বড় হয়ে যে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে, সে ধর্মই পালন করবে বা তার বাবা এসে নিয়ে যেতে পারবে তাকে। মানীষা আগের স্বামীর সাথে প্রতারণা করতে পারবে না।
তিন বছরের মাথায় আরও একটি মেয়ে হলো। রাজু নাম রাখে শেফালি। ছয় ভাই দেখতে আসে। তারা তাদের হিন্দু রীতিতেই বাচ্চাকে আদর-আশীর্বাদ দিয়ে যায়। মানীষা বাসান্থিকে হিন্দু রীতিতেই চলাফেরা শেখায়, অন্য মেয়েকে মুসলিম রীতিতে বড় করতে থাকে।
কিছুদিন পার হতেই ওদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। রাজু চায় দু'জনই মুসলিম রীতিতে চলুক, মানীষা তা চায় না। আর এ নিয়েই অল্প শিক্ষিত রাজুর মাথা বিগড়ে যায়। একদিন সে মানীষাকে মারধর করে। মানীষা রাজুর এ আচরণে অবাক হয়। সে বলে-
আমিও কাজ করি, আমি তাকে আমার টাকাতেই খাবার দেই?
কিন্তু ও তো হিন্দু?
তাতে কী হয়েছে, সে কি মানুষ নয়?
সে রাতে রাজু বেশ দেরিতে বাসায় ফেরে। তার মুখে বিয়ারের গন্ধ পেয়ে মানীষা অবাক হয়-
আওয়া মিনুম আরাক- তুমি মদ খেয়েছ?
হ্যাঁ, খেয়েছি, তো কী হয়েছে?
মূলত বাসায় এবং বাইরে মানীষা রাজুর সাথে মালয় ভাষাতেই কথা বলে। রাজু তামিল ভাষা একটু-আধটু বুঝলেও খুব একটা বলতে পারে না। মানীষা অবাক হয়ে বলতে থাকে-
এখানে মালয়েশিয়ার মুসলিমরা মদ খায় না, ইন্ডিয়ান হিন্দুরা মদ খায়, মদ খেয়ে বাড়িতে ফেরে, বউদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। অযথা ছেলেমেয়েদের মারে। ভেবেছিলাম তুমি মুসলিম, তুমি মদ খাবে না, তুমি আমি কাজ করব, আমরা শান্তিতে থাকব। শেষে কিনা তুমিও মদ খাওয়া শুরু করেছ?
রাজু বুঝতে পারে দোষটা তারই হয়ে গেছে। কিছু না বলে সে ঘুমোতে যায়।
পরদিন মানীষা মাত্র দু'ঘণ্টা ওভারটাইম করে সন্ধে সাতটায় বাসায় ফেরে। রাজু দেখে, এখানে সবই যান্ত্রিক। বউ-ও কাজ করে, সেও কাজ করে। দুটি বাচ্চাকে সময় দিতেই মানীষার সন্ধ্যার অধিকাংশ সময় পার হয়ে যায়।
বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছ কি?
বলে একই সাথে বাসান্থি ও শেফালি এসে বিছানায় শোয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরে। রাজুর চিন্তায় ছেদ পড়ে যায়।
এখনও না-
বলে মুহূর্তে একবার বাসান্থি ও একবার শেফালির দিকে তাকায়। হঠাৎ করেই সে বুঝে উঠতে পারে না, নির্বোধ শিশু দুটির কোনটি মুসলমান, কোনটি হিন্দু। মনে হয় দু'জনই দেবদূত।
খেয়েছ?
শেষ।
বাসান্থি ও শেফালি একই সাথে উত্তর দেয়। রাজু বাচ্চা দুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমসাগরের অতলে তলিয়ে যায়। মানীষা এসে দেখে রাজু বাসান্থি ও শেফালিকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কাউকে না জাগিয়ে সেও রাজুর পাশে শুয়ে পড়ে।
রাজু দেখে, মালয়েশিয়ায় হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দীপাবলিতে (কালীপূজা) মানীষা খুব সকালে গোসল করিয়ে খুব সুন্দর করে পাঁচ বছরের বাসান্থিকে সাজিয়ে দিয়ে রাজুকে প্রণাম করিয়ে নিয়ে বড় ভাইদের বাসায় পাঠায়। সেখানে মামাদের বাসায় ঘুরেফিরে আনন্দ করে শেষে রাতে বাসান্থি রাজু ও মায়ের কাছে ফিরে আসে। মানীষার পীড়াপীড়িতেই মাঝেমধ্যে রাজু শেফালি ও মানীষাকে নিয়ে এই দীপাবলিতেই পুলিশ ভাই ও অন্য ভাইদের বাসায় বেড়াতে যায়, দাওয়াত খেয়ে আসে।
আবার ঈদের দিনে মানীষা দুই বছরের শেফালিকে খুব ভোরে গোসল করিয়ে দিয়ে মালয়েশিয়ার মুসলিম মেয়েদের মতো সাজিয়ে, বাসান্থিকে পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিয়ে দিয়ে তিনজন এসে রাজুকে সালাম করে। রাজু প্রত্যেককে আমপাও (ঈদ সেলামি, টাকার প্যাকেট) দিয়ে নিজে নামাজ পড়তে যায়। নামাজের পর বাসায় এসে শেফালি, বাসান্থি ও মানীষাকে নিয়ে খেতে বসে। মানীষার বড় ভাই, ভাবি, অন্য ভাই-ভাবিরা এলে তাদের সুন্দরভাবে আপ্যায়ন করে।
এসব ভাবতে ভাবতেই মোটরসাইকেলের পায়ের গিয়ার-কি দুটি, স্টার্টার এবং স্পোকগুলোসহ আরও পার্টস অ্যাসিডে ফেলে দেয়। এগুলোর কালো রং ও জং ধরা ময়লাগুলো উঠে এলে পরিস্কার পানিতে ধুয়ে আবারও নিকেলিং করে গ্রাহককে দেওয়া হবে।
রাজু অন্য কাজে চলে যায়। আধঘণ্টা পর সুপারভাইজার আহ্‌ মেং-এর চিৎকার শোনে-
রাজু আওয়া বুয়াত আপ্পা (রাজু, তুমি এ কী করেছ)?
এ তো বড় ভুল! হায় হায়, আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।
রাজু দ্রুত আহ্‌ মেং-এর পাশে এসে দাঁড়ায়। বুঝতে পারে, দস্তার জিনিসগুলো যে অ্যাসিডে ডুবিয়েছে, তাতে সেগুলো পরিস্কার না হয়ে বরং অ্যাসিডের ক্রিয়ায় ক্ষয়ে গেছে। এই অ্যাসিডে ক্ষার বেশি, এখানে গাড়ির বড় বড় এগজস্ট পাইপ ডোবানো হয়। রাজু বলে-
মা-আফকান তওকে, সরি লা (মাফ করে দাও বস, দুঃখিত)।
মেং গর্জন করে ওঠে-
ইয়া মা চি বাই, সাইয়্যা সুডা রুগি, সিয়াপা তাংগুং দিয়া পুঁইয়া সেরাতুস রিঙ্গিত (ইয়া মা চি বাই-চীনা নোংরা গালি, আমার এত ক্ষতি হলো, কে তার ওই একশ রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ দেবে)?
আহ্‌ মেং রাজুকে প্রায় মারতে আসে, চীনা ও মালয় ভাষায় আরও অকথ্য গালি দিতে থাকে। রাজু কারখানা থেকে বের হয়ে আসে।
পরদিন সে কারখানায় যায় না। রাতে ফিরে এসে মানীষা বলে- তাকে কাজে ডেকেছে। কোনো অসুবিধা নেই। তার বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হবে না।
কিন্তু পরদিন সকালেও রাজু কাজে যায় না। পরের মাসে গিয়ে বেতন তুলে আনে। বস আবারও কাজ করতে বললে রাজু তা মাও (চাই না) বলে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে।
মানীষার ভাইদের কানে গেলে তারা অন্য কারখানায় রাজুর কাজ খুঁজতে থাকে। দিন পনেরোর মাথায় পুলিশ ভাই পুচংজয়ার সামান্য দূরে একটি আয়রন সার্ফেস গ্রাইন্ডিং কারখানায় রাজুর কাজ জুটিয়ে দেয়। রাজু কাজ করতে থাকে। কিন্তু প্রায়ই সে মাসের বেতন ঠিকমতো বাসায় আনে না। মানীষা অভিযোগ করে-
বাসান্থির এখন পাঁচ বছর বয়স। তার স্কুলের, বাসের খরচ; শেফালির বয়স তিন, তারও অনেক খরচ- এত খরচ সে একা বহন করবে কেমন করে? কিন্তু রাজু কোনো জবাব দেয় না।
তাদের মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকে। মানীষা কোনো কারণ খুঁজে পায় না। এর মধ্যে একবার রাজু মাসশেষে খালি হাতেই ফিরে আসে। মানীষা জিজ্ঞেস করলে সে বলে, কাল দেবে।
এভাবে সাতদিন কাটালে মানীষা গোপনে একদিন রাজুর কারখানায় এক বন্ধুর সাথে দেখা করে। জানতে পারে- রাজু কাজ করে ঠিকই, তবে প্রায়ই ভিডিও গেম খেলে। শুনে পাথর হয়ে যায় মানীষা!
রাজু কাজ থেকে ফিরে দেখে মানীষার ছয় ভাই-ই তার বাসায় বসে আছে। হঠাৎ ছোট ভাই চান্দ্রান চটচট করে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-
তুই মুসলিম হয়ে জুয়া খেলিস, ভিডিও গেম খেলিস, লজ্জা করে না?
মেজো ভাই কৃষ্ণান বলে-
আমাদের বড় আদরের বোন তোর জন্যই আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম পালন করে তোকে বিয়ে করল, আমরা অনেক কষ্টে মেনে নিলাম। আর তুই সংসারের খরচ না দিয়ে পয়সা ওড়াস শালা!
বলেই ধাঁই ধাঁই করে রাজুকে নাকে, মুখে, পিঠে ঘুসি মারতে লাগল। প্রায় চার মিনিট ঝড় বয়ে গেল রাজুর ওপর। সে বসে পড়ল মেঝেতে।
সেজো ভাই ধুলু রান্নাঘর থেকে মুরগির গোশত কাটার বড় ছুরি নিয়ে এসে রাজুর ডান হাত ধরে ছুরি উঁচিয়ে বলল-
তুই যে হাত দিয়ে ভিডিও গেম খেলিস, তোর সেই হাত কেটেই ফেলব। দরকার হলে আমাদের বোন ও ভাগনিদের আমরা ছ'ভাইই কাজ করে খাওয়াব।
সাথে সাথে পুলিশ ভাই এসে ধুলুকে আটকালেন। বললেন-
আমি পুলিশে চাকরি করি। আমি পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান, শ্রীলঙ্কান, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়ান- সব বিদেশি যারা এখানে কাজ করে, তাদের চরিত্র জানি। পাকিস্তানিরা কাজ করে আর কাজশেষে অধিকাংশ সময় বাসায় বা কারখানার ভেতরে থাকার জায়গায় বসে বিয়ার খেয়ে সময় কাটায়, পয়সা ওড়ায়। শ্রীলঙ্কানরা এখানে বিশেষ করে চীনা বৌদ্ধ মেয়েদের সাথে প্রেম করে পয়সা ওড়ায়, মিয়ানমারের লোকেরা কাজ করে আর বেতনের অর্ধেক টাকাই চৌকিটের প্রসকোয়ার্টারে গিয়ে বাজে মেয়েদের পেছনে ওড়ায়। ইন্দোনেশিয়ানরা এ দেশে এসে এহেন অপরাধজনক কাজ নেই, যা তারা করে না। তোরা বাংলাদেশিরা কাজ করিস, ফিরে এসে ঘরেই রান্নাবান্না করিস, ঘরেই খাওয়াদাওয়া করিস, কাপড় পরিস্কার করিস, ঘরেই আয়রন করিস, নামাজ পড়িস, রোজা রাখিস। অথচ তুই হঠাৎ করে এত খারাপ হলি কেমন করে?
রাজু নিরুত্তর। বড় ভাই আবারও বললেন-
দ্যাখ্‌, আমি তোকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি- ভালো হয়ে যা, ভালোভাবে কাজ কর, দেশে মাঝেমধ্যে বাবা-মাকে টাকা পাঠা, সংসার ভালো করে চালা, মেয়েদের মানুষ কর, আমরা তোর মালয়েশিয়ান আইসি করে দেব। এরপর আর কোনোদিন যদি তোর ভিডিও গেম খেলার কথা শুনি, তাহলে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেব। জানিস তো, এ দেশে মুসলিমদের জুয়া খেলার সাজা ছয় মাসের জেল। সাবধান করে দিয়ে গেলাম।
ওরা সবাই চলে গেলে মানীষা রাজুকে ভাত দিল। রাজু কোনো কথা না বলে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন কারখানার উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। রাতে বাসায় ফিরল না। অনেক সময় ওভারটাইম করে রাত এগারোটায় বাসায় ফেরে। কিন্তু এদিন তাও ফিরল না। পরদিন কাজে যাওয়ার আগে মানীষা তার বড় ভাইকে টেলিফোনে জানাল-
রাতে রাজু বাসায় ফেরেনি।
সন্ধে সাতটায় বড় ভাইয়ের বাসা থেকে বাসান্থি ও শেফালিকে আনতে গেলে ভাবি জানালেন-
রাজু গতকালও কাজে যায়নি, আজও যায়নি। কোথায় গেছে, কারখানার কেউ জানে না।
এভাবে সপ্তাহখানেক কেটে গেল। রাজু সম্ভাব্য যেখানে যত বাংলাদেশি বন্ধু আছে- সবার কাছেই মানীষা খোঁজ নেয়, কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারল না।
এভাবে এক মাস, দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেল। রাজু লাপাত্তা।
চার মাসের মাথায় হঠাৎ মানীষার মেজ ভাই কৃষ্ণান একদিন এসে সন্ধ্যায় জানাল, তার এক বন্ধু আছে সেরেম্বান স্টেটে। সেখানে তার চাচার রেস্তোরাঁয় রাজু নামে এক ছেলে কাজ করে। কৃষ্ণানের বন্ধু যে রকম বর্ণনা দিয়েছে, তাতে রাজুর চেহারার সাথে হুবহু মিল পাওয়া যায়।
বড় ভাই ছোট, মেজো ও সেজ ভাইকে বললেন-
তোরা আমার পার্সোনাল বিএমডব্লিউটি নিয়ে কাল খুব ভোরে গিয়ে ওকে দোকান থেকে পাকড়াও করে নিয়ে আয়। খবরদার, কোনো মারধর করবি না। তোরিমা-আ (বুঝলি-তামিল)?
সবাই বলল-
বুঝেছি।
পরদিন বিকেলে রাজুকে নিয়ে তিন ভাই ফিরল।
মানীষা সেজ ভাইকে দিয়ে মেয়ে দুটিকে বড় ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিল। সবাইকে চলে যেতে বলে সে বাসায় লোহার গ্রিলের দরজা বন্ধ করে দিয়ে কাঠের দরজাও বন্ধ করে দিল।
ড্রইংরুমে চোরের মতো বসে আছে রাজু। হঠাৎ তার শার্টের কলার ধরে শোবার ঘরে এনে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দরজার কাছ থেকে একটি কাঠের লাঠি টেনে নিয়ে কোনো ভূমিকা ছাড়াই পেটানো শুরু করল। রাজু প্রথম প্রথম হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার হাতেও সজোরে কাঠের লাঠি দিয়ে ঘা দিল মানীষা। পিঠে, পায়ে. উরুতে পাইকারিধোলাই। রাজুর উরু ফেটে রক্ত বের হয়ে এলো। মানীষার সেদিকে খেয়াল নেই। শপাশপ্‌ পিটুনি পড়ছে রাজুর পিঠে। পিঠের ডানদিকে ফেটে গেল, রক্ত পড়ছে।
মানীষা মেরেই চলেছে। রাজুর আর্তনাদ, চোখে পানির বন্যা, তবুও মানীষার থামার নাম নেই। প্রায় আধঘণ্টা পর ক্লান্ত হয়ে মানীষা হাতের ভাঙা কাঠের লাঠিটি ঘরের একদিকে ছুড়ে ফেলে বিছানায় বসল।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-
তোকে আমি অনেক বিশ্বাস করেছিলাম। আমার বিশ্বাসের মর্যাদা তুই কতটুকু রেখেছিস, তোর বিবেককে জিজ্ঞেস কর। তোকে আমার বলার কিছুই নেই। তুই একটা মিথ্যুক। বলেছিলি, তুই বিয়ে করিসনি, তোর বন্ধুরা বলেছে, দেশে তোর বউ আছে।
রাগ এবং দুঃখে তার হূৎপিণ্ডের গভীরতম প্রদেশে থেকে তামিল বেরিয়ে এলো-
না উন্নে সোলে মাট্টে। ইপ্পে নিংগে পুম্‌লে পুল্লে, পেরছাও উন্নে নিওং পোম্বলে পুল্লে ইন্দে উঢ়েক্যে কনডো আন্দ্রো। অন্যেকে না পুডিক্‌লে, না কাস্টে পেট্টে ইন্দুপুলে মালায়ে মুসলিম আকায়ে। বাসান্থি ওয়ালকে নি কাস্ট পঢ়াদে। আদে, আউরকে না পেরসা আকুয়েঁ। নি ইতনা নাল মালেশিয়া তাংবা, নি আমাঢ়কুরে তাংবা। নি ভ্যলে সেই, নি ভ্যলে সেইল্লে- আদে ওংগোইস্ট। নি এন্নেকুঢ়ে তাংবা। নি এংগোলকুঢ়ে তাংবা। নি ব্যারা য়্যঢ়াত্‌লে তাংমুঢ়িয়াদে (আমার আর বলার কিছু নাই। তোর মেয়ে বড় হলে, ইচ্ছে হলে তুই দেশে ফেরত নিয়ে যাস। ইচ্ছে না হলে, আমি যেমন করেই হোক ওকে মুসলিম মালায়ু মেয়ে হিসেবেই বড় করব। বাসান্থির কথা তোকে ভাবতে হবে না। ওকে আমিই মানুষ করব। শুধু যে ক'টা দিন তুই মালয়েশিয়াতে আছিস, আমার সাথেই থাকতে হবে। অন্য কোথাও থাকতে পারবি না)।
এরপর মানীষা রাজুর পকেট হাতড়িয়ে তার পাসপোর্টটি বের করে নিয়ে নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে বলল-
ইপ্পানি উঢ়ক্কো পোবে, নি য়্যংগোট্টে নেল্লামাদি, না অংগোল ওঢ়ে পাসপোট্টে তিরিপ্পি কুঢ়েত্তেরেব্যেঁ। না উংগুল্‌ মাদ্রি নাই ইল্লে (যখন দেশে যাওয়ার তোর মত হবে, আমাকে সুন্দরভাবে বলিস, তোর পাসপোর্ট তোকে দিয়ে দেব। আমি তোর মতো কুকুর নই)। তেরিমা (বুঝলি)?
ব্যথায় জর্জরিত রাজুর হৃদয়ের অনিশ্চিত অন্ধকার টানেল থেকে উঠে এলো একটি মাত্র শব্দ- তেরিওঁ (বুঝেছি)।