ঠিকই তনার কণ্ঠস্বর আমি আর মনে করতে পারছি না। কেমন ছিল ওর কণ্ঠস্বর, তাল পাতার বাঁশির মতো, বাঁশের বাঁশি, অনুনাসিক, হাস্কি, খসখসে, নদী বয়ে যাওয়ার শব্দের মতো?
মনে পড়ে না, আমি কিছুতেই আর মনে আনতে পারি না।
তনা ঠিকই বলেছিল তো বা কবে বলেছিল-
জানু, তুমি যে আমার কথা শুনবার জন্য, আমার গলাটা শোনার জন্য, আমার হাসি শুনবার জন্য অস্থির হয়ে থাকো, ঠিক ঠিক একদিন আমার এই কণ্ঠস্বর ভুলে যাবে তুমি। আর মনে করতে পারবে না।
আমি কঠিন করে কোনোকিছু ভাবতে পারি না। তাই তনার কণ্ঠস্বর নিয়ে কথাটা আমলে নিইনি। না হলে তনার কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে রাখতে পারতাম, ফোনের কথোপকথন, তনার গলায় গান বা কবিতা আবৃত্তি। এখন রেকর্ডিং শুনে তনার গলা মুখস্থ করে নিতে পারতাম।
এখন যতই তনা ফোনে বলুক-
আমি তনা। জানু, আমি তোমার তনা গো;
আমি তার অরিজিনাল গলার সাথে কীভাবে মেলাব? তনার ফোন আসে অচেনা সব নতুন নাম্ব্বার থেকে। গ্রামীণ, রবি, টেলিটক, কোনটায় অনেক ডিজিট- মনে হয় বিদেশের কল, আবার আননোন নাম্ব্বার লেখা কলও আসে।
তনা এত রকম জায়গা, এত রকম ফোন থেকে আমাকে কল করার সুযোগ পাচ্ছে কীভাবে?
আবার দেখি তনার ফোনকলের দিনরাত্রি নেই। আমার দুই ভাই, আনিকার চাচা, খালা, আমার দুয়েকজন বন্ধু আছে দুবাই, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড- আমি ওদের সময়টা আমাদের সময়ের সাথে মিলাতে পারি। কিন্তু তনার ফোন কোনো অঙ্ক মানে না। ফোনের সময়-অসময়ের ভেজালে আবার আমি কোন ঝামেলায় পড়ি! তাই আমার ফোন সব সময় আমার হাতের মুঠোয় চেপে রাখি। ঠিকমতো ফোনে একটা-দুইটা রিং হতে না হতেই কলটা আমি অ্যাকসেপ্ট করে ফেলি।
তনা বলে-
তুমি তো আমাকে ফোন করবে না!
আমি তোমার নাম্বার জানি না।
হা হা করে হাসে তনা ফোনের ভেতর।
আমি বুঝতে পারি, এটা তনার হাসি না, তনার কণ্ঠ না। আমি নিশ্চিত হই কী করে? আমি তো ওর কণ্ঠ ভুলে গেছি। তবে আবার এটা তনাই। আমার তনার কথা মনে হলে, ওকে দেখলে, ওর কথা শুনলে বুকের ভেতর একটা জায়গায় রক্ত ছলাৎ করে ওঠে। তনার ফোনের রিং কানে গেলেই আমার ওই জায়গাটায় রক্ত ছলাৎ করে সাড়া দিয়ে ওঠে।
আমি বলি-
তুমি তো নেই।
আবার হা হা হাসি তনার। এই হাসিটা আবার আগের হাসি থেকে আলাদা।
এখন মোবাইল ফোন ছাড়া জীবন অচল। যা অত্যাবশক তা নিয়ে সব চাতুরী প্রতারণার ব্যবসা বেরোয়। এখন ফোনে পুরুষ মেয়ের গলায় কথা বলতে পারে, বাচ্চার মতো গলা করতে পারে, অন্যের কণ্ঠ অনুকরণ করতে পারে। তনার এত প্রযুক্তি, এত কারিকুরি জানবার কথা না। আমি যেটা জানি না সেটা তনাও জানতে চায় না। জ্ঞান, বুদ্ধিতে, সম্মানে- সবদিক দিয়ে তনা আমাকে বড় বানিয়ে দেখতে চায়। আনিকা আমার স্ত্রী, ওর বাবা আজফার হোসেন, আমার বস, হর্তাকর্তা- ওদের কাছে আমি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের। আমার তাতে কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ তনার কাছে আমি অনেক বড়।
আমি বলি-
তনা, তুমি তো মরে গেছ।
একটা কি দীর্ঘশ্বাস পড়ল, তনার দীর্ঘশ্বাস? তনা পারতপক্ষে আমার সামনে মন খারাপ করত না। এখনকার দীর্ঘশ্বাসটা মন খারাপেরই।
করোনা হয়ে তুমি তো মরে গেছ।
তোমাকে আসতে বললাম আমাকে দেখতে। পাপলু বলল। পাপলু সোজাসাপ্টা তোমার মতো, যা করতে বলি সে করে, স্বামীত্ব ফলাতে আসে না। তুমিও আমার সব কথা শোনো। কিন্তু এবার শুনলে না, আমাকে দেখতে এলে না।
করোনায় তখন সারা পৃথিবীর মানুষের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ কিছু জানে না, এটা কী, এটা কেন? কোন দরজা দিয়ে কার শরীরে ঢুকে ফুসফুস চেপে ধরবে। কেবল জানে, কাছের আরেক মানুষের কাছ থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হবে। করোনার তুলনায় তাই অন্য মানুষের কাছাকাছি থাকাটা বেশি আতঙ্কের হয়ে গেল। লকডাউন, ঘরবন্দি, আমিও। আনিকা কি আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে দেয়? সেটা হয়তো পুরো আমার জন্য না। আনিকা বা ওর বাবার জন্য, আমি হয়তো ভাইরাস ক্যারিয়ার হয়ে যাব।
তনা বলল-
তোমাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে হয়, তোমার সাথে থাকতে ইচ্ছে হয়, তোমার সাথে ঘর করতে সাধ হয়।
আমি বলি-
দেখ তনা এতদিন পর তুমি এসব অভাব-অনুযোগের কথা তুলতে পার না। তুমি আর আমি মিলে বুঝে নিয়েছিলাম তোমার আর আমার ঘর বাঁধা ঠিক হবে না। দু'জনেই আমরা দুর্বল খুঁটি, ওই খুঁটির জোরে ঘর দাঁড়াবে না।
তুমি চাইতে যে তোমার অনেক টাকা হবে। টাকার মধ্যে তুমি থাকতে চাও।
অভাব আমি খুব ভয় পেতাম। অভাব আমি দেখেছি, তুমি দেখেছ? তুমি অভাবী মানুষ, আমি অভাবী মানুষ। অভাবী মানুষেরা জোট বেঁধে বেশিদূর এগোতে পারে না।
তুমি খুঁজে পেতে টাকাওয়ালা শ্বশুর, খুঁতওয়ালা বউ জোগাড় করে ফেললে।
হ্যাঁ, কী আশ্চর্য জাদুর বাঁশি, এসব মানুষের ঘরে হুহু করে বানের পানির মতো টাকা ঢোকে। ওদের টাকা রাখার ফাঁকা জায়গা নেই। বস্তা বস্তা টাকা আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি ভুলে গেলাম অভাব কী, অভাবী মানুষেরা কীরকম!
তুমি নিজেও বড় জাদুকর জানু। নিজে অভাব থেকে বেরোলে, আমাকে বের করার চেষ্টা করলে। আমাকে বিয়ে দিলে পাপলুর সাথে। টাকা দিলে পাপলুকে ব্যবসা করতে। পাপলুও খুশি, এটা-ওটা বলে টাকা নেয় তোমার কাছ থেকে। তবে পাপলু মানুষ ভালো। তুমি ঠিক মানুষ বেছে নিয়েছিলে। সে টাকা নষ্ট করে না, কাজে লাগায়। তোমার কাছ থেকে সে টাকা পেল, আমাকে পেল। আমাকেও সে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। আমার কাছ থেকে পাপলু ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজ, এভাবে হয়? ভালোবাসা কীভাবে হয় সে জানি তুমি আর আমি। তুমি পাপলুকে বলতে, তনার ভালোবাসা থেকে আমি বেরোতে পারছি না। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে রাস্তায় নেমে যাই। এটা পাপলুও চাইত না, আবার আমাদের রাস্তায় নেমে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা তৈরি হোক। তাই আমাকে নিয়ে সে তোমার কাছ থেকে আরও দূরে দূরে সরে যেত। এভাবে তোমাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কত জায়গায় যে ঘুরলাম, থাকলাম।
একটা সময় ভাবতাম তুমি আর আমি অনর্থক চেষ্টা করছি। এই ভালোবাসার ঘোর থেকে আমরা দু'জন বেরোতে পারব না। জোর করে আমি তখন নিষ্ঠুর হওয়ার চেষ্টা করতাম। তুমি ডাকলে, পাপলু ডাকল। তুমি বললে- করোনার পিপিই, কিট, পোশাক-আশাক পরে তুমি আসো, অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থেকো, আমাকে দেখতে হবে না, আমি তোমাকে দেখব। তোমার ইচ্ছাপূরণের একটা বুদ্ধি নিশ্চয়ই বের করতে পারতাম তনা। কিন্তু আমি করলাম কি তোমার ফোন, পাপলুর ফোন নাম্ব্বার ব্লক করে দিলাম।
তুমি ফোন ব্লক না করলেও পারতে। দু'দিন পরেই তো আমাদের বাড়িতে লাল পতাকা তুলে দিল। অ্যাস্ট্রনটদের মতো সাদা পোশাকের মানুষেরা এসে আমাকে তুলে নিয়ে গেল।
পাপলুর সাথে অনেক পরে আবার ফোনে যখন কথা বলি, সে বলে-
তোমাকে যে সাদা আবরণের মাস্ক পরা মানুষেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সেটাই সে শেষ জানে। তুমি মারা গেলে কি বেঁচে থাকলে, তোমাকে গণকবর দিল না লাশ পুড়িয়ে ফেলল?
তনা বলে-
কী জানি, পাপলু কি জানে তারটা সে-ই জানে।
আমি বলি-
পাপলু আর আমার কাছ থেকে টাকা নেয় না। আমি দিতে চাই।
তোমাকে পাপলুর আর দরকার নেই।
তনার কথাটা আমার মনে ঘা দেয়। আমার যাকে মনে হয় তাকে রাখি, আবার যাকে ইচ্ছা ফেলে দিই। পাপলুর এই অধিকার থাকবে কেন?
আমি তনাকে জিজ্ঞেস করি-
তুমি আবার প্রথম যেন কবে আমাকে ফোন করলে?
তনা কিছু বলার আগেই আমার মাথা খেলে যায়, যেদিন আমি চেষ্টা করে দেখলাম, তনার কণ্ঠস্বর আমি মনে করতে পারছি না, তার পরপরই যেন ফোনটা এলো।
তনা বলল-
তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছ জানু।
তনার এবারের গলায় কী ছিল জানি না, আমি সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেলাম।
ফোনে আমি তোতলাতে থাকলাম, ত ত ত না। শোঁ শোঁ শোঁ নো।
তনা বলে-
তুমি আমাকে ভুলতে পারো না, তাহলে শপথ ভঙ্গ হয়ে যায়, আমি তোমাকে ভুলিনি।
ভয় পাওয়া গলায় আমি বলি-
তুমি তো আর নেই। মৃত, ভূত। তোমার কণ্ঠস্বর ভুলে গেছি, তোমার চেহারা ভালোভাবে আর মনে করতে পারি না। তোমার আর আমার একসাথের স্মৃতিগুলো ঝাপসা, আউট অব ফোকাস হয়ে গেছে।
তা কেন হবে, জানু? আমি তো তোমাকে ভুলিনি, ভুলতে চাই না। ভালো তো বেসেছিলে আমাকে। স্বপ্টম্ন তো দেখিয়েছিলে। মেয়েরা আর কী স্বপ্টম্ন দেখে- ঘর বাঁধার, একসাথে থাকার। আমাকে ভুজংভাজং বুঝিয়ে ফেলে দিয়ে তুমি চলে গেলে।
এখন এসব কথা কেন?
তোমাকে যে বাঁধতে চাই আমার সাথে। হা হা হা।
তনা ফোন কেটে দেয়।
আমি তো জানি না তনাকে এখন কোন ফোন নাম্ব্বারে পাওয়া যাবে।
আমাকে বেশি অপেক্ষা করতে হয় না, তনার ফোন আবার আসে। আমি তখন আজফার হোসেন, আমার শ্বশুরের সামনে বসা। তাঁর কাজ করছি। আমি তাঁর সিকিউরিটি গার্ড। তবে তাঁর শরীরের নিরাপত্তা না, আমি তাঁর সব কাগজপত্র, গোপন তথ্যের নিরাপত্তা বিধান করি। আমি তাঁর মেয়ের অর্থলোলুপ জামাই, আমার পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, দুর্বল ও ভীরু, বাধ্য হয়ে দারুণ বিশ্বাসী। বিরাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শ্বশুরের। বড় নির্মাণ ঠিকাদার, শিল্পমালিক। যত ব্যবসা, তত গোপনীয়তা। ব্যাংক, ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট, থানা পুলিশ, কাস্টমসের লোক, সরকারি অফিস- যারা ঠিকাদারি কাজগুলো দেয়। আজফার হোসেনের বিভিন্ন কাজ করার বিভিন্ন টিম। আমার তেমন যোগ্যতা নেই ওইসব বড় বড় টিমের সাথে যে কাজ করব। আমার একটাই যোগ্যতা- আমি আজফার হোসেনের সবচেয়ে বিশ্বাসী ও কাছের লোক।
কাজের সময় ফোন, বিরক্ত হয় আজফার হোসেন। দু'বছর ধরে আমরা অনেক বড় একটি ব্রিজ রেলওয়ে প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট পাওয়ার জন্য কাজ করছি। এই কাজটা পাওয়ার জন্য আরও দুই বাঘা কোম্পানি খাটাখাটনি করছে। দাতা সংস্থা, সরকারি আমলা, রোড ডিপার্টমেন্টের সব জায়গা আমাদের পক্ষে আনতে কাজ করছি, টাকা ঢালা হচ্ছে, ক্ষমতার প্রদর্শনী তাও হচ্ছে, আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে চাই কন্ট্রাক্টটা আমরা পাব। তার জন্য কত গোপন চিঠি চালাচালি, ডকুমেন্টস তৈরি। আজফার হোসেন কম্পিউটারে নিজে কাজ করেন না, তাঁর পাশে বসে কম্পিউটারে আমাকে সব কাজ করতে হয়। গোপন চিঠি লেখালেখি, মেসেজ পাঠানো, অনলাইন ব্যাংকিং, কাদের কত টাকা ঘুষ দেওয়া হলো তার হিসাব।
তনা ঠিক টের পায় কখন আমি আজফার হোসেনের পাশে। আজফার হোসেন আমাকে নিয়ে এসব গোপনীয় কাজ যখন করে, তখন অফিসের দরজার বাইরে লাল বাতি। কঠোর নির্দেশ- এ সময় কেউ ভেতরে ঢুকবে না, যত বড় কর্তার ফোনই হোক, এ ঘরে এখন ট্রান্সফার করা যাবে না। আজফার হোসেনের সব কয়টা ফোন সাইলেন্ট মোডে। সব ফাঁক গলিয়ে তনার ফোন এখানে এসে আমার বুক কাঁপিয়ে দেয়। তনার ফোনকে এখন আমি ভয় পাই। আমার ফোনের সিম বদলে ফেলি।
আজফার হোসেন আমাকে বলেন-
দরকারের সময় তোমার ফোন বন্ধ।
ফোনের সিম পাল্টেছি।
কেন?
ফোনে লাইফ থ্রেট আসছে।
তার জন্য সিম বদলাতে হবে কেন? আমাকে বলো কাকে বলতে হবে। ওর চৌদ্দ গুষ্টি তুলে নিয়ে আসবে।
মাথা নিচু করে থাকি। শ্বশুর সাহেবকে বলা যায় না, আপনার কোনো বাহিনীতে এখানে কাজ হবে না।
আনিকা দেখি দিন দিন আরও অসুস্থ হচ্ছে। ক্লান্ত। ঘুমিয়ে থাকে সারাক্ষণ। বেশি নড়াচড়া করতে চায় না।
আমি নির্ভার বোধ করি। বউয়ের প্রতাপের সামনে আমি দাঁড়াতে পারি না।
কিন্তু এই প্রশান্তি আমার বেশি সময় থাকে না। ইঙ্গিত, ইশারায় আনিকা আমাকে বিছানায় তার পাশে বসতে বলে। তার নির্দেশ অমান্যের দুঃসাহস আমার নেই।
তুমি একটা ছোট লোকের বাচ্চা। তোমার সাহস হলো কী করে আমাকে বিয়ে করতে?
আনিকা, তুমি হঠাৎ কী বলছ? তোমার শরীর বেশি খারাপ লাগছে? মাথায় বেশি কষ্ট হচ্ছে?
তুমি দুই ডাক্তার লাগিয়ে রেখেছ। মাসে মাসে ওদের মোটা টাকা দাও। তারা ওষুধ খাইয়ে, ইনজেকশন দিয়ে আমাকে নির্জীব, অচল করে রাখে। আধমরা করে ওরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমি থাকলে তোমার অসুবিধা। আবার আমি মারা গেলে আমার বাবা তোমাকে লাথি দিয়ে বের করে দেবে।
এসব তুমি কী বলছ বউ?
তোমার তনা মাগি ফোন করে সব খবর আমাকে দেয়। তোমার আর আমার কোন কথাটা জানে না সে। তুমি কবে আমার সাথে শুয়েছ, সে কথাটাও তাকে তুমি বলেছ।
আনিকা আমাকে কী কী কথা বলে ধমকেছে সে কথা তনাকে বললে সে হা হা করে হাসে।
আমাকে আর ভালোবাস না কেন তুমি?
আমার মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে আসে- ভালোবাসব কী তুই তো মাগি ভূত।
বলি না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। তনার সাথে লড়ার ক্ষমতা আমার নেই। তনা আমার আরও কী কী ক্ষতি করার চেষ্টা করবে? বড় ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত তনা করে। রোড-রেলওয়ে কন্ট্রাক্টের টেন্ডার জমা হয়। আমরা আর হাইটেক কনস্ট্রাকশন টেন্ডার জমা দিয়েছি। দেখা যায় আমাদের দু'জনের টেন্ডার প্রায় এক। হাইটেক আমাদের টেন্ডারের সব কাগজপত্র আগেই হাতে পেয়ে গিয়েছিল। তা দেখে তাদের টেন্ডার ঠিকঠাক করে আমাদের থেকে দুই পার্সেন্ট দর কমিয়ে দিয়ে টেন্ডার দাখিল করেছে। ওরা লোয়েস্ট দরদাতা। কাজটা ওরা পাবে।
আজফার হোসেনের মাথায় হাত, পাগল দশা। শাউটিং করছে টিমের লোকের সাথে।
কোন শুয়োরের বাচ্চা বিট্রে করেছে।
দুই দিন পর থেকে বড় পত্রিকায় রিপোর্ট বের হতে থাকে, আমার কম্পিউটারে যত গোপন দলিলপত্র ছিল এই প্রজেক্ট, এই টেন্ডার নিয়ে; কাজ ছিনতাই করার জন্য কাকে কী কমিটমেন্ট করা হয়েছে, কত টাকা দিয়েছি আমরা।
আজফার হোসেন বুঝতে আর বাকি থাকে না সর্বনাশের এই কাজটা কে করেছে?
আমাকে অফিসিয়ালি নোটিশ দেয় আজফার হোসেন, ইউর সার্ভিস ইজ নো মোর রিকোয়ার্ড। আমার আর কোম্পানির অফিসের আশেপাশে যাওয়ার অনুমতি নেই।
আমার বক্তব্য শোনার কোনো দরকার মনে করে না আজফার হোসেন। যদি সে সুযোগও পেতাম, আমি কী প্রমাণ দেখাতে পারব, এতসব অঘটন কার হাত দিয়ে হলো!
আমার কাজ নির্ধারিত হলো আজফার হোসেনের মেয়ের ২৪ ঘণ্টা নার্সিং।
আনিকাকে ক্লিনিকে, হাসপাতালে এখন টেনে নেওয়া যায় না।
ডাক্তাররা আসে তাকে দেখতে।
আমার সব চেনা ডাক্তারকে আমি বলি-
ডাক্তার আনিকাকে ভালো করে দেন, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। আমি আর ওর ভার বইতে পারছি না।
ডাক্তার সমবেদনার চোখে আমার দিকে তাকায়।
মানুষ কি আর মেশিন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি- পুরোনোকে নতুন করে ফেলা যায়। শরীরের যা গেছে, গেছে, যেটুকু আছে সেটুক ধরে রাখা ডাক্তারের কাজ।
ক'দিন পর আমার জন্য আনিকার পাশে আরেকটা বিছানা পড়ে। তীব্র জ্বর, মাথা-শরীর ব্যথা, সর্দি, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমার আবার কী অসুখ হলো?
আমার রক্ত, কফ, মূত্র নেয়; টেস্ট করা হবে।
আবার আমার নাকের ফুটোয় কটন সোয়াব ঢুকিয়ে স্যাম্পল নেয়। এই টেস্টে ডাক্তাররা বিস্মিত। পৃথিবী থেকে যে ভাইরাস নির্মূল করা হয়েছে, তা আবার আমার কাছে ফিরে এলো কী করে?
আমি চোখ খুলে তাকাতে পারি না, শ্বাস নিতে পারি না। তার ভেতরই নানারকম তৎপরতা টের পাই। আমাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। আমি যেন এই ভাইরাস নতুন করে মানুষের মধ্যে আর না ঢোকাতে পারি। মহাশূন্যচারীদের মতো পোশাকে ঢাকা মানুষজন আমাকে স্ট্রেচারে নিয়ে সিল করা অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। হাসপাতালের সিল করা কেবিন। আমাকে কেবিনে ঢুকিয়ে জোর শব্দে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।
আমি বুঝলাম, আমি আর কোনোদিন এ জায়গা থেকে বেরোতে পারব না।
তিন-চারজন ডাক্তার আমার চারপাশে। তারা আমাকে নিয়ে কী করবে আমি জানি না।
ভেন্টিলেটার মেশিনের কথা আমি শুনেছি। ওরকম একটা কিছুতে আমার নাক-মুখ চাপা দেওয়া হচ্ছে।
আহ্‌ অক্সিজেন। আমার এখন আরাম লাগছে।
তনাকে স্পষ্ট আমি কাছে দেখতে পাচ্ছি। আমার নাকের ভিতর দিয়ে তনার জন্য ফুরফুর করে ভালোবাসা শরীরে ঢুকে যাচ্ছে।
তনাকে, আমাকে কেউ আলাদা করে রাখতে পারবে না আর।