বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক চিত্রশিল্পী রণজিৎ দাস। তাঁর ক্যানভাসে যেমন একটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতা রয়েছে, তেমনি তাঁর বিষয় প্রকৃতি, মানুষ আর জ্যামিতিক ফর্মের পাশাপাশি রঙের ব্যবহারে বিশেষ মাত্রা রয়েছে। হালকা অথবা গাঢ় রঙের ওপর টেক্সচার তাঁর কাজে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। ছায়ানটে সংগীত চর্চা করেছেন। গান গেয়েছেন রমনা বটমূলে। রেডিও-টেলিভিশনেও গান করতেন একসময়। এখনও বিছানার পাশে একটা হারমোনিয়াম আছে পুরোনো- ইচ্ছে হলে সেটা নিয়ে বসেন কখনও কখনও। একসময় কবিতাও লিখতেন। কিন্তু সেই সব কিছু ছাপিয়ে রংতুলি আর ক্যানভাসেই তাঁর মনোনিবেশ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। শিল্পীর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তাঁর খেরোখাতা তুলে ধরেছেন সঞ্জয় ঘোষ
তাঁর চিত্রকর্মের সাথে পরিচয় থাকলেও শিল্পী রণজিৎ দাসের সাথে আলাপচারিতা এবারই প্রথম। কুশল বিনিময়ের শুরুতেই জানালেন কেমন আছেন, কেমন চলছে দিনকাল। বললেন-
আছি ভালোয়মন্দয়- একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে যেভাবে কাটে দিন। আমি সব সময়ই ছবি আঁকার চেষ্টা করি। তবে করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এখন দেশে এই যে বন্যা-দুর্যোগ চলছে- এসব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
জীবন ও শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণার কথা জানতে চাইলে বললেন-
আসলে এটা একটা সহজাত ব্যাপার। অর্থাৎ যাঁরা পরবর্তী জীবনে শিল্পী হয়ে ওঠেন তাঁদের বেশির ভাগেরই সেই প্রবণতা ছোটবেলাতেই প্রকাশ পেতে থাকে। আমারও ছোটবেলাতেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁকটা ছিল। একেবারে শিশু বয়স থেকেই হয়তো আঁকিবুঁকি করতাম। আর শৈশবের সেই আঁকিবুঁকি কিংবা ছবি আঁকায় আমার অনুপ্রেরণা ছিল আমার মা। আমার মা বাসন্তী দাস ছিলেন গ্রামের মেয়ে। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রতি উৎসাহিত করতে মায়ের একটা অবদান আছে। মা টেপা পুতুল বানাতেন। তা ছাড়া গান-বাজনায়ও উৎসাহ দিতেন। সব মিলিয়ে মায়ের অনুপ্রেরণা দারুণভাবেই কাজ করেছে আমার ভেতরে। বলা যায়, মা-ই ছিলেন আমার প্রথম শিল্পগুরু। অবশ্য আমার বাবাও ছবি আঁকতেন, তবে সেই ছবিগুলো দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
স্কুলে যখন পড়ি- আমার সহপাঠীদের মধ্যে একজন দারুণ ড্রইং করত। নানারকম ফিগার ড্রইং করত, আমি দেখতাম। পাশের বাড়ির এক বন্ধুও সুন্দর আঁকত। সে সময়টায় আমাদের মধ্যে পারস্পরিক একটা ছবি আঁকার চর্চা চলত। তা ছাড়া আমি শাঁখারীবাজারের যে পরিবেশে বড় হয়েছি- সেখানেও নানারকম কুটিরশিল্প, মৃৎশিল্পের চর্চা ছিল; পুরান ঢাকার রিকশা পেইন্টিং, ব্যানার পেইন্টিংও বিখ্যাত। আর উৎসব আমেজ তো সেখানে লেগেই থাকত সারা বছর। এই সবকিছুই আমাকে প্রাণিত করেছে। আর এই সবকিছুর ওপর দাঁড়িয়ে চূড়ান্তভাবে আমাকে শিল্পী হিসেবে নির্মাণ করেছে যে জায়গাটা, সেটা হলো আর্ট কলেজ।
তারপর ভারতের বরোদায় যখন পড়তে গিয়েছি- সেখানে বড় বড় শিল্পীর সান্নিধ্য আমার ঘটেছে। এ ছাড়া বাইরের দুনিয়ার বিভিন্ন মিউজিয়াম ও গ্যালারিতে গিয়েছি, সেখানকার কাজ দেখেছি। এই সবকিছুই একজন শিল্পীর জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তারপর ভারতে পড়তে গিয়ে কে বি সুব্রামানিয়মের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আমার অন্তর্দৃষ্টি তৈরিতে তিনি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। শিল্পী হিসেবে নিজেকে কতটা সফল মনে করেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন-
সফলতা এক জিনিস- আর কাজের প্রতি নিজের আনন্দ আরেক জিনিস। যে কোনো শিল্প সৃষ্টিতেই প্রথম তো নিজের তৃপ্তি পাওয়ার ব্যাপার। সেই সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার হলো চর্চাতে নিয়োজিত থাকতে পারা। পেশাগত কারণেই হোক কিংবা অন্য কোনো টানে- অনেকেই মেধাবী হবার পরেও ছবি আঁকায় থাকতে পারেন না শেষ পর্যন্ত। আমি সব সময়ই চেষ্টা করেছি ছবি আঁকায় থাকতে। এখন হয়তো বয়সের ভারে আগের মতো অতটা সময় দিতে পারি না, কিন্তু আমি যখনই ভালো লাগে ছবি আঁকি। ছবি আঁকার মধ্যে নিজের আনন্দটা ধরে রাখতে পারছি, এটাই আমার কাছে সুখের বিষয়। একজন শিল্পীর সফলতা তার নিজের কাছেই- একেক জন একেক লক্ষ্যে বা উদ্দেশ্যে সেটাকে পরিচালিত করে।
জীবনের এমন কোনো অধ্যায় আছে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়?
আমার সঙ্গিনীর প্রয়াণ আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছে, কষ্ট দিয়েছে। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে তাঁর চলে যাওয়াটা আমাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে।
ব্যক্তি রণজিৎ দাসের চরিত্রের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে বললেন-
আমি আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে চলি- আর তাতে আমি অবিচল থাকতে পছন্দ করি। আর শিল্পী হিসেবে আমি ক'টা পুরস্কার পেলাম না পেলাম- সেটা আমার কাছে বড় ব্যাপার নয়। বহু প্রদর্শনী করেছি, এখন আর প্রদর্শনী না করলেও চলে- কিন্তু আমার তো ছবি আঁকার নেশা। তাই সব সময় ছবি আঁকার মধ্যে থাকতে ভালোবাসি। একজন শিল্পীর জন্য তাঁর আত্মবিশ্বাসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা মানুষ যখন জীবনে থাকে, কোনো না কোনো শক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন, কী কাজ করছেন? বললেন-
ইদানীং আমি চারকোলে বেশ কিছু কাজ করছি। কিছু জলরঙের কাজ করছি। মাঝে মাঝে ক্যানভাস নিয়েও বসছি- সবই করি। যখন যেটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
শিল্পীর কাজের বিষয়বস্তু এবং তার উৎস নিয়ে নানা বিষয় উঠে এলো তাঁর কথায়-
আমি মনে করি একজন শিল্পীর কাজের স্টাইলাইজেশনে পরিবর্তন হতে পারে কিংবা তাঁর কাজের একটা সিগনেচার থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়বস্তুর ভেরিয়েশনের ব্যাপারে শিল্পী স্বাধীন। এখানে বাঁধ মানার কোনো ব্যাপার থাকতে পারে না। কারণ, একজন শিল্পী যে পরিবেশ-প্রতিবেশের মধ্যে থাকেন, সেখানে যা কিছু তিনি দেখেন, শোনেন; বা তাঁর শৈশব স্মৃতিতে যা কিছু কাজ করে কিংবা আমি যাঁর ভেতর দিয়ে যাপন করছি- সেই সব কিছুর প্রভাব তো আমার ভেতরে কাজ করবেই। মানুষের জীবন ও তাঁর যে যন্ত্রণা- তা আমাকে খুব ভাবিত করে। চারপাশের মানুষদের জীবনের কষ্ট ও যাপিত জীবনে সেই কষ্ট থেকে উত্তরণের নানা চেষ্টা, আকাঙ্ক্ষা- এসব আমার মনের মধ্যে ক্রিয়াশীল। এর অনেক কিছুই আমার ছবিতে কখনও স্পষ্ট, কখনওবা পরোক্ষভাবে চলে আসে। একজন শিল্পীর জন্য এটাই স্বাভাবিক।
কখন কাজ করেন?
-আমার কাজের কোনো টাইমটেবিল নাই। আমার যখন ভালো লাগে তখনই কাজ করতে বসি। সেটা রাতেও হতে পারে, বিকেলে বা সকালেও হতে পারে।
আপনার কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন-
নিজের চিত্রকর্ম সম্পর্কে বিশ্নেষণ করাটা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। একজন শিল্পীর কাজ তাঁর জীবনের লক্ষ্য বা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পৃক্ত থাকে।
জ্যামিতিকে ব্যবহার করি, মানুষের অবয়ব কিংবা প্রকৃতির মাঝে যে অর্গানিক ফর্মগুলো আছে সেসবের সাথে জ্যামিতির সংযোজন করে আমার নিজের মতো করে একটা ভাবনার প্রক্ষেপণ ঘটাতে চেষ্টা করেছি। আর কাজের মধ্যে একটা ব্যতিক্রমধর্মিতা নির্মাণের প্রচেষ্টা তো থাকেই। সেটা জলরংই হোক কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে।
আপনার ছবির রং সম্পর্কে কিছু বলুন-
-প্রথম দিকে আমি মনোক্রোমাটিক বা একরঙা ছবি বেশি আঁকতাম। অনেকে বলতেন তোমার ছবিতে রং আসে না কেন? ছবির মধ্যে রং এত কম কেন? কিন্তু আমার সেই ধরনেরই ভালো লাগত। এসব ১৯৮১-৮২ সময়ের কথা বলছি। পরবর্তী সময়ে ছবিতে রঙের পরিবর্তন ঘটেছে।
আপনার রং ব্যবহার থেকে শুরু করে রৈখিক প্রক্ষেপণটা অন্যরকম। যেমন ধরা যাক, দিনমজুরের ছবি এঁকেছেন- সেখানে আমাদের এখানকার সেই চিরাচরিত দিনমজুরের অবয়ব এবং চিত্রতলে তাঁর উপস্থাপনেও এক ধরনের ভিন্নমাত্রা লক্ষ্য করা যায়-
আমি কিন্তু শৈশব থেকেই একটা দুষ্ট ছেলে ছিলাম। সিনেমার ব্যানার আঁকা দেখতাম। বাবার পকেট থেকে বা বাজারের পয়সা চুরি করে লায়ন সিনেমা হলে গিয়ে ইংরেজি সিনেমা দেখতাম। তখন হলিউডের অনেক সিনেমা আসত ঢাকার সিনেমা হলে। সেইসব ব্যানার পোস্টারের বিভিন্ন এক্সপ্রেশন, কালার কম্পোজিশন এসব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। হয়তো তখন এত কিছু বুঝতাম না, কিন্তু কিশোরমনেই ছবি আঁকার এসব মাধ্যম দাগ কেটেছিল বোধহয়। তাই আমার গ্রামের বিষয়ও অন্য রকম রঙে উপস্থাপিত হতে দেখে থাকবেন। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতে থাকার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটা অন্য ধরন হয়তো তৈরি হয়েছে আমার মধ্যে। তাতে আমি কতটুকু সার্থক, সেটা আমার ছবির দর্শকরা বলতে পারবেন। তবে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আনন্দ নিয়েই কাজ করি, এইটাই আমার সার্থকতা।
জীবনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাটা কেমন?
যতক্ষণ বেঁচে আছি আমি আমার মনের আনন্দ নিয়ে আমার কাজটা করে যেতে চাই। আর মানুষের জীবনে দুঃখ-বেদনা থাকবে, কিন্তু তার ভেতর থেকে আমি কতটা নিজেকে আনন্দিত রাখতে পারছি আমার কাজ দিয়ে, আমার সম্পর্ক দিয়ে- সেটাই বড় কথা।

বিষয় : খেরোখাতা রনজিৎ দাস

মন্তব্য করুন