বেশ রাত করে এয়ারপোর্ট থেকে সেন্ট্রাল স্কয়ারের নিকটবর্তী হোটেলে পৌঁছুতে গিয়ে দেখি আশপাশের দোকানগুলো লোকারণ্য; হই-হট্টগোল। ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন। পথের পাশে পেতে রাখা টেবিলগুলোয় বসে সবাই ধুমসে খাচ্ছে বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। কেচআপ আর সদ্য ভেজে আনা ফ্রাই সেখানটায় তৈরি করেছে চনমনে টকটক গন্ধ।
'আপনাদের এখানে না করোনার বিধিনিষেধ বেশ কঠোর ছিল?'
ভিড়ভাট্টা ঠেলে রিসেপশনে পৌঁছেই পল্গাস্টিকের সুরক্ষা দেয়ালের ওপারে থাকা লোকটিকে প্রশ্ন না করে পারি না।
'সে তো ছিলই। কিন্তু এই গতকালই সেটা তুলে দিল সরকার। এতকাল পর লোকে একটু মুক্তি পেয়েছে। কাজেই বুঝতেই পারছেন।'
বলে লোকটি আমার পাসপোর্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি রেজিস্ট্রি খাতায় টুকে রাখায় মন দেয়। এথেন্সে তো বটেই, গোটা গ্রিসেই নাকি অল্প কিছুদিন আগ অবধি বাইরে বেরোতে হলে একটি নম্বরে মেসেজ পাঠিয়ে তবেই বেরোতে হতো। তাও সে একেবারে জরুরি কাজ হলে তবেই। এর অন্যথা হলে জরিমানা। এমন কঠোর নিয়মকানুনে মানুষের হাঁপিয়ে ওঠাটা তো বিচিত্র কিছু নয়।
সকালে উঠে হোটেল থেকে বাঁ-দিকে হেঁটে মনাস্তেরাকি স্কয়ার-এ যাই। ওখানটায় আছে পল্গাকা নামক বাজার। শুনেছি জমজমাট এলাকা। দিনরাত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। বঙ্গবাজারের মতো খুপরি দোকান। বেশ উঁচু সিলিং। সেখান থেকে মেঝে অবধি ঝুলে থাকা র‌্যাকে সস্তা দরের চায়নিজ মালামাল ঠেসে ঢুকে থাকে। কিছু পছন্দ হলে দোকানি লম্বা বাঁশের মতো কাঠি দিয়ে মাল নামিয়ে খদ্দেরকে দেন। স্বাভাবিক দিনে এরা বিক্রি করে কুলোতে পারেন না। মার্কেটের সাথেই মেট্রো স্টেশন। অনেকটা জংশনের মতো। এখান থেকে এথেন্সের প্রায় সবদিকেই যাওয়া চলে। দু-তিনটে লাইন এসে মিশেছে এই স্টেশনে।
গত রাতে বোধ করি রেস্তোরাঁগুলো চুটিয়ে ব্যবসা করেছে। সাফসুতরা করে ঝাঁপি বন্ধ করতে করতেই বেলা গড়িয়ে গেছে মাঝ রাত অবধি। আজ এখনও তাই এরা অতল ঘুমে। সামনের সরু সড়কটি দখল করে রাখা চেয়ার-টেবিলগুলো স্টিলের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা। এখানে-ওখানে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবার ঠুকরে খাচ্ছে কিছু ভোরের পাখি। ওদের মহা আনন্দ। বিরক্ত করবার মতো কেউ নেই আশপাশে। একেবারেই কেউ নেই, কথাটি হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়। একজন আছেন। অদূরে দুটো রেস্তোরাঁর মাঝের ত্রিকোণ স্থানটিতে। তবে তার পক্ষে হয়তো পাখিগুলো বিরক্ত করা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে গৃহহীন ভবঘুরে সেইজন গভীর নিদ্রায় শায়িত। ময়লাটে একটি জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে। জুন মাসের গরম বিদ্রুপ করছে যেন জ্যাকেটখানা। পাশেই আধখাওয়া স্যান্ডউইচের প্যাকেট। আর আছে একটি ফোমের গ্লাস। তাতে দুর্ভাগ্যের আধুলি।
মনাস্তেরিকি চত্বরে জমায়েত করেছে একপাল কবুতর। মনের আনন্দে। চত্বরের ডান ধারে একটি চার্চ। বহু পুরোনো। বাইজেনটাইন আমলের। কোমর অবধি যে ভিত দেয়াল, সেটার দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায়, এখান-ওখান থেকে কুড়িয়ে আনা ইট-পাথর দিয়ে বহু শত বছর আগে গড়া হয়েছিল এ স্থাপনা। এমন নয় যে, ইট-পাথরের অভাবে সেটি করা হয়েছিল। গ্রিসে তখন খ্রিষ্টধর্মের বীরোচিত অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিপুল বিক্রমে চলছে প্যাগানদের উপাসনালয়ের ধ্বংসলীলা। তারপর পূর্বের সেই 'মিথ্যে ধর্মের' অস্থি দিয়ে গড়া হলো পরবর্তী 'সত্যি ধর্মের' উপাসনালয়ের দেহাবয়ব।
চার্চটির চারধারে বাঁধানো অনুচ্চ দেয়াল। দু-একজন সেখানে বসে কবুতরের দিকে উচ্ছিষ্ট খাবার ছুড়ে দিচ্ছে।
চার্চের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হলদে মেট্রো স্টেশনের সামনেও হুড়মুড়িয়ে ছুটে চলা জনতা নেই। ওখানটায় অস্থায়ীভাবে গজিয়ে ওঠা দু-তিনটে চেরির দোকানের ঝাঁপ এই সবে খুলল। তাঁদের কেউ কেউ স্ট্যান্ডে কলা ঝুলিয়ে রাখছেন। বাকিরা ক্রেট থেকে চেরির থোকা বার করে সাজিয়ে রাখছেন সামনের টেবিলে। স্টেশন ভবনের দেয়ালঘড়িটি সেই সময়ে ঠিক নটা ত্রিশে এসে ঠেকে।
আমার গন্তব্য পিরেউস। ওখানে বন্দর। হিসাবমতে এখান থেকে মেট্রো ট্রেনে আধ ঘণ্টার মতো লাগার কথা।
স্টেশনের ভেতরে গিয়ে বুঝলাম, এটি পাতালরেল নয়। মাটির উপরকার ট্রেন। তবে আবার ঢাকার এলিভেটেড ট্রেনের মতো উড়ন্ত সেতু বেয়ে ছুটে চলা ট্রেনও নয়। এ ট্রেন শহরের মাঝ দিয়েই মাটি আঁকড়ে ছুটে চলে।
স্টেশনে দুটো ট্র্যাক। দু'পারে দাঁড়িয়ে আছে অল্প কিছু মানুষ। কারও মুখেই কথা নেই। যেন এক নির্বাক চলচ্চিত্রের দৃশ্য। দু-একটা পাখির ডাক অবশ্য শোনা যাচ্ছে। মিনিট দশেক অপেক্ষার পরই ট্রেনটি এসে পল্গ্যাটফর্মে থামে। ট্রেনের সারা গায়ে নানা গ্রাফিটো। নানা কথা। স্লোগানে স্লোগানে মুখর যেন এক চলন্ত পাঁচিল। স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে গেলে ভেতরে ঢুকে দেখি, কামরাটি মোটামুটি ফাঁকা। জানালার কাচ অর্ধেক নামানো। যারা দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁরা খানিকটা তফাতেই দাঁড়িয়েছেন। আমি অপ্রয়োজনীয় গা ঠোকাঠুকি এড়িয়ে একটা সিট বুঝে নিয়ে বসে পড়ি। পাশের সিটে এক বৃদ্ধা। ইনি চরম সতর্ক। মুখে মাস্ক, হাতে গল্গাভস তো আছেই, সেই সাথে সিটে বসবার আগে পেতে রেখেছেন পাতলা প্লাস্টিকের চাদর; যাতে করে সিটে লেগে থাকা ভাইরাস তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে। আমাকে পাশেই বসতে দেখে ভদ্রমহিলা ত্রিশ ডিগ্রি ঘুরে জানালার দিকে মুখ করে রইলেন। ফলে মহিলার সাথে চোখাচোখি হবারও আর সুযোগ রইল না।
পিরেউস স্টেশনটি এ লাইনের শেষ স্টেশন। ফলে এখানে ট্রেনের আবারও দৌড়োবার তাড়া নেই। স্টেশনের ছাদটি আচ্ছাদিত। স্বচ্ছ সেই আচ্ছাদন ভেদ করে চুইয়ে আসছে সূর্যালোক। বহিরাগমন পথটি খুঁজে নিয়ে সে পথে পা বাড়াই। হিসাবমতে খুব কাছেই বন্দরের দেখা মেলার কথা। হাঁটা পথ হয়তো!
আমার আজকের গন্তব্য হাইড্রা নামের এক ক্ষুদ্র দ্বীপ। এখানকার লোকে অবশ্য বলে ইদ্রা। এথেন্স থেকে ঘণ্টা দুয়েকের সমুদ্রপথ। প্রিয় কবি লিওনার্ডো কোহেন তাঁর ভবঘুরে জীবনের বেশ কয়েকটা বছর কাটিয়ে গেছেন এই দ্বীপেই। মিশিগান রাজ্যের ম্যাকিনাক দ্বীপের মতোই এই হাইড্রা দ্বীপেও নাকি জীবাশ্ম-জ্বালানিনির্ভর কোনো যান চলে না। কোথাও যেতে হলে ঘোড়া কিংবা গাধার পিঠে চাপ, নয়তো পয়দলে হেঁটে যাও। শুনেছি, এই জাহাজঘাটা থেকেই নাকি ফেরিতে করে যাওয়া যায় সে দ্বীপে।
'আপনি তো আধ ঘণ্টা দেরি করে ফেলেছেন। সকালের ফেরি তো কখন ছেড়ে গেছে! পরের ফেরি আবার সেই দুপুর দুটোর আগে নয়।'
আমাকে দেখে টেবিলে রাখা মাস্কটি ঝটপট মুখে লাগিয়ে টিকিট বিক্রেতা মহিলার উত্তর। পেল্গক্সিগল্গাসের উল্টোদিকে বিশাল বপু নিয়ে বসেছেন। কণ্ঠে রুক্ষতার ছাপ স্পষ্ট। সেটাকে গোপন করার কোনো অভিপ্রায়ও তাঁর মাঝে নেই।
দুটোর ফেরি ধরে হাইড্রায় গেলে আজই আবার এথেন্সে ফেরা হচ্ছে না।
তাহলে উপায়?
ভগ্ন মনোরথে আমি জিজ্ঞাসা করি।
'চাইলে এজিনা দ্বীপে যেতে পারেন। ওটার ফেরি আছে এই আধ ঘণ্টা বাদে।'
খানিকটা যেন উন্নাসিকভাবে মহিলার উত্তর।
ভদ্রমহিলার দপ্তর থেকে খানিকটা সরে এসে আমি ভাবতে থাকি। এজিনা খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র ঘণ্টাখানেক দূরে। আজকের দিনটি যেহেতু দ্বীপান্তরেই কাটাব বলে ভেবেছি, সেক্ষেত্রে এজিনা দ্বীপে গেলেইবা ক্ষতি কী?
হাঁ করা তিমি মাছের মতো ফেরির দরজা খোলা। ভেতরটা প্রকাণ্ড। অন্তত গোটা পঞ্চাশেক গাড়ি হয়তো অনায়াসে সেখানে ঠুসে দেওয়া যাবে। বাদবাকি যাত্রীদের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে হবে ওপরের তলগুলোতে। এই করোনাকালে অবশ্য সেই নিয়মে খানিকটা ব্যত্যয় ঘটেছে। এখন চাইলেই গটগট করে ওপরে ওঠা যায় না। গ্রিক দেশ তার দ্বীপগুলোয় করোনার বিস্তার নিয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ, দ্বীপগুলোই তো পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। আর তাতে একবার যদি দ্বীপে করোনার দাবানল শুরু হয়, তবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সব পরিকল্পনা যে মুখ থুবড়ে পড়বে! সরকার ঘোষিত নিয়ম হলো দ্বীপে যাওয়ার আগে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সেখানে নাম, ঠিকানা, ভ্যাকসিন নেওয়ার সত্যতা ইত্যাদি তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক। তার বাদেই কেবল ফেরির ওপরতলে যাবার অনুমতি মিলবে।
ওপরতলের অঙ্গসজ্জা অনেকটা যেন ধনী বাড়ির বৈঠকখানার মতো। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নরম গদির সোফা। পায়ের তলে পুরু কার্পেট। একপাশে বার। সেখানে হরেক পদের পানীয়ের কাচ-বোতল। যাত্রীসংখ্যা কম হওয়ায় অধিকাংশ সোফাই ফাঁকা। বিশাল একটি সোফা বেছে নিয়ে সেখানে গা এলিয়ে বসি। খানিক পরেই মৃদু ঘড়ঘড় শব্দে চালু হয় দৈত্যসম ফেরি। হয়তো তারপর এটি ছুটে চলে ত্বরিত গতিতে, কিন্তু ভেতরের সোফায় শুয়ে সেটি বোঝার উপায় নেই। নেই তরঙ্গাভিঘাতে ফেরির লাফিয়ে ওঠার প্রবণতা। যেন পুকুরের নিথর জলে ভেসে চলেছে এক টুকরো কাগজ।
কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে হঠাৎ সচকিত হয়ে জেগে উঠি। খেয়াল হয়, এতক্ষণ আসলে ছিলাম তন্দ্রার কোলে। কিন্তু এই কুকুর কোথা থেকে এলো? আর আমার খুব কাছ দিয়ে ঘেঁষেইবা এভাবে ওর হেঁটে যাওয়ার কারণ কী? সিনেমা শেষের পর দর্শকবৃন্দ যেভাবে হলের মাঝে একযোগে উঠে দাঁড়ায়, এখানেও দেখছি ঠিক সেভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র আমিই সোফায় আধশোয়া ভঙ্গিতে মটকা মেরে পড়ে আছি। তার মানে এসে গেছে দ্বীপ। কুকুরটিও মনিবের সাথে নামার অপেক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ঘাটে সাথে ফেরির দড়ি বাঁধতে দেরি হওয়ায় বেচারা অস্থির হয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। মনিবের কাছ থেকে দু-একটা ধমক খেয়ে অবশেষে সে থামল।
দ্বীপের পোতাশ্রয়ে পা রাখতেই দেখি, সমুখে একটি চার্চ। ছোট্ট চার্চ। ধবধবে সাদা রঙে ঢাকা। সাগরের একেবারে জল ঘেঁষে। পেছনের আকাশটায় মালগাড়ির বগির মতো করে লাইন বেঁধে উড়ে যাচ্ছে সাদা মেঘের দল। এখানে এককালে নাবিকরা সমুদ্রযাত্রায় যাবার প্রাক্কালে প্রথমে যিশুর চরণে প্রণতি জানিয়ে তবেই জাহাজে চাপতেন। চার্চের দেয়ালের একধারে পড়ে আছে বিশাল নোঙর। হয়তো ডুবে যাওয়া কিংবা পরিত্যক্ত কোনো জাহাজের। সামুদ্রিক সারস পাখি সে নোঙরের ওপর বসে আরামসে রোদ পোহায়।
এবারে শহরের পথে হাঁটি। শহরের পথ বলতে সাগরের পাড় ধরে এঁকেবেঁকে যাওয়া দুই লেনের পিচঢালা পথ। সেখানে দ্রুতগামী গাড়ির চেয়ে সাইকেল আর স্কুটার বাইকের দাপটই বেশি। সেই সাথে আছে এখানে-ওখানে গজিয়ে ওঠা টুকিটাকি অস্থায়ী দোকানের জটলা। তাদের কোনোটিতে বিক্রি হচ্ছে হস্তশিল্প সামগ্রী, কোনোটিতে দ্বীপের জমিতে উৎপাদিত পেস্তাবাদাম। আবার কোনোটিতে হয়তো বিক্রি হচ্ছে সাগর থেকে সদ্য ধরে আনা তাজা মাছ।
তেমন কয়েকটি দোকানের পরই একটি ক্যাফে। ভেতরটা ফাঁকা। দুপুরের সময়। এ বেলায় কেইবা এসে কফি খাবে? থাকার মধ্যে আছে দুই বুড়ো। এরা বাইরে পেতে রাখা চেয়ার-টেবিলে বেশ আয়েশ করে বসে তাভলি খেলছেন। পাশেই ধবধবে সাদা পেয়ালায় রাখা ব্ল্যাক কফি জুড়িয়ে যাচ্ছে। সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। কে কার আগে গুটি চেলে বেশি পয়েন্ট জোগাড় করবেন, সেই চিন্তায় নিমগ্ন। এরা যা খেলছেন, সেটিকে হয়তো তুলনা করা যায় আমাদের লুডুর সাথে। লুডুর পাতার আয়তনের কাছাকাছি কাঠের বোর্ডে এ খেলা খেলতে হয়। বোর্ডটি অনেকটা যেন বাক্সের মতো। এর উল্টোদিকে আবার থাকে দাবার ছক। অর্থাৎ কেউ বোর্ডটি কিনলে দাবা আর তাভলি- দুটোই খেলা সম্ভব। গ্রিক দেশের বুড়োদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এ খেলা। এখানকার ক্যাফেগুলোতে এমন বুড়োদের হরহামেশাই দেখা যায়, সেই সাথে পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ কিংবা পরামর্শ দেন, এমন দর্শকের সংখ্যাও নেহাত মন্দ নয়। এখানে যেমন এ দুই বুড়োকে সঙ্গ দিচ্ছেন বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাফের মালিক।
পোতাশ্রয়ের ধারেই এক বুড়ো দোকানি আমার নজর কাড়েন। দোকানটি মালামালে পূর্ণ। চায়ের দোকানের সামনে ঝুলে থাকা কলার কাঁদির মতোই তার দোকানের সামনে ঝুলে আছে হরেক পদের মান্দলিন। বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন দামের। এই মান্দলিন নামক বাদ্যযন্ত্রটির সাথে আমার পরিচয় 'ক্যাপ্টেন করেলি'স মান্দলিন' চলচ্চিত্রটি দেখার মাধ্যমে। সেই যে যেখানে শত্রুবাহিনীর অফিসার হয়েও নিকলাস কেজ এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সুন্দরী দ্বীপবাসিনী পেনেলপে ক্রুজের হৃদয় হরণ করেছিলেন। এ যেন গ্রিক দেশের হারমোনিয়াম। সুরের জাদুবাক্স। ওরা এটা বাজায় উৎসবে, পরবে। ছেলেরা বাজায়, মেয়েরা তার তালে নাচে। তার মাঝেই হয়তো চলে হৃদয় আর দৃষ্টি বিনিময়।
দোকানটিতে ক্রেতা অবশ্য নেই একজনও। বুড়ো তাই বাইরের দিকের সিঁড়িতে বসে সিগারেট ফুঁকছেন। খানিকটা খোশগল্পের আশায় 'হ্যালো' বলে পাশে গিয়ে বসি। ধোঁয়ার একটা বিশাল কু লী ছেড়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে তিনি আমার অভিবাদনের নীরব প্রত্যুত্তর দেন।
'আমেরিকায় একবার যাবার বড্ড শখ, বুঝলেন! বহুকাল ধরে আশা- একবার হলিউড দেখব। নায়ক-নায়িকাদের পাড়ায় ঘুরে বেড়াব। প্রতি বছরই ভাবি, এই হয়তো আগামী বছর ধরে ফেলব পেল্গনটা। সেই আগামী বছর হতে হতেই ঊনত্রিশটা বছর কেটে গেল। আর তার বাদে তো এলো এই করোনা।'
বেশ লম্বা টানে সিগারেটের বাকি অংশটুকু দ্রুত নিঃশেষ করে তিনি বলেন।
আমাদের গল্প করতে দেখে দোকানের পেছনের দিকটায় জিনিসপত্র সাজানোয় ব্যস্ত এক ভদ্রমহিলা খানিকটা বিরক্তিমিশ্রিত চোখে তাকান। সেটা আন্দাজ করে বুড়ো বলে-
'আমার বউ। স্বামী-স্ত্রী মিলে বিয়ের পরপরই দোকানটা খুলেছিলাম। ও-ই মূলত সব চালায়। হিসাবনিকাশে পাকা।'
পাশে থাকা পেতলের ছাইদানিতে সিগারেটের পুড়ে যাওয়া অংশটুকু ফেলে দিয়ে যোগ করে-
'আমি বলতে পারেন দোকানের কর্মচারী।'
শেষের এই কথাটি বলে বুড়ো হো হো করে হাসে।
বুড়ির দৃষ্টিকে নিকুচি করে বুড়োর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি-
'তা এই যে গত প্রায় পুরোটা বছর দোকান বন্ধ রাখলেন, কী করে চলল?'
'সরকার থেকে ভাতা দিয়েছে তো! তাই একেবারে ভাতে মরিনি। একদিকে হয়তো ভালোই হয়েছে। শুয়েবসে একটু আরাম করে কাটিয়েছি। এ বয়সে এত হ্যাপা আর ভালো লাগে না বাপু।'
এটুকু বলে তাকে একটু থামতে হয়। কারণ, টাকা নেবার মেশিনটি বহুকাল বন্ধ থাকার পর চালু করামাত্র বিদ্রোহের সংকেত দিচ্ছে। ওটি নিয়ে বৃদ্ধা এগিয়ে এসেছেন স্বামীর দিকে। ভদ্রলোক সেটির কলকব্জা মেরামতে হাত দেন। দু'জনের মাঝে কিছু কথাবার্তা চলে। বুড়োকে যন্ত্র সারাইয়ে লাগিয়ে দিয়ে বুড়ি একটা সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় দোকানের ছাদসংলগ্ন চিলেকোঠায়।
সিঁড়ির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ মিলিয়ে গেলে বুড়ো বলে-
'এত দিন বাদে দোকান খুলে আমরা ভুলেই গেছি কোন মাল কোথায় রেখেছি। বুড়ি এখন সেসবের একটা লিস্ট বানাচ্ছে। সেজন্যই ওপরে গেল। বাড়তি মাল কোনটা কেমন পরিমাণে আছে, দেখার জন্য।'
নির্জন দুপুরে নীরব শ্রোতা পেয়ে বুড়োকে যেন কথায় পেয়ে বসেছে। হাতের কাজটা দ্রুত সেরে তিনি আবারও এসে বসেন আগের জায়গাটিতে। তারপর বলতে থাকেন-
'আর এসব লিস্ট করেইবা কী হবে! আগের মতো সেই বিক্রিবাট্টা কি আর এখন আছে? স্বর্ণ সময় ছিল সেই আশির দশক কিংবা নব্বইয়ের দশকে। এই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হওয়ার পর থেকেই শুরু হলো মন্দা। বিশেষ করে ওই যে যেবার গ্রিসে অলিম্পিক হলো, তার পর থেকে।'
গ্রিসে অলিম্পিক হয়েছিল ২০০৪ সালে। অর্থাৎ বুড়ো সে সময়ের পরের কথা বলছে।
বুঝলাম, বুড়ো ইউনিয়নের ওপর বেজায় খাপ্পা। কিন্তু কেন? উনার যুক্তি হলো-
'দেখ বাপু, এই যে এরা সীমান্তহীন এক দেশ, এক মুদ্রার কথা বলে, কিন্তু আসলেই কি সেটা বাস্তবে সম্ভব? আজ দেখা যাচ্ছে, ইউনিয়নের একেক দেশে বেতন-ভাতা একেক। কর ব্যবস্থাও দেশভেদে ভিন্ন। গ্রিসে যেখানে ঘণ্টাভিত্তিক মজুরি বিশ ইউরো, সাইপ্রাসে পঁচিশ, ওদিকে বুলগেরিয়ায় হয়তো দশ ইউরো। ফলে বহু কোম্পানি আছে, যারা কেবল উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য চলে যাচ্ছে রুমানিয়া কিংবা বুলগেরিয়ায়।'
তার কথায় খানিকটা দ্বিমত পোষণ করে বলি-
'কিন্তু ইউনিয়নে থাকার নানা সুফলও কি আপনারা ভোগ করছেন না?'
বুড়ো তীব্রভাবে মাথা নেড়ে বলে-
'ত্রিশ বছরের এই ব্যবসায়ী জীবনে আমি তো তার কোনো সুফল পেলাম না। বরং দেখলাম, আগের চেয়েও গরিব হয়ে গেছি আমি। পলিটিশিয়ানরা তো কত কথাই বলে। কথার ফুলঝুরি। সুখের স্বপ্ন। বাস্তবে তো দেখছি সব লবডঙ্কা।'
একটা মিনিয়েচার মান্দলিন পছন্দ হয়েছিল আমার। পাশের শেল্কেম্ফ রাখা। ওটা তুলে এনে নেড়েচেড়ে দেখার মুহূর্তে বুড়ো বলতে থাকেন-
'তারপর এই দেখো, গত ক'বছর ধরে তুরস্ক আমাদের দেশে রাজ্যের লোক ঠেলে পাঠাচ্ছে। বদমায়েশি আরকি। কিন্তু কোথায় এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা তো সব গ্রিসের ওপর ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে ব্রাসেলসে আর বার্লিনে লেজ গুটিয়ে ঘুমাচ্ছে।'
বুড়োর এমন নানা অভিযোগ, আত্মোপলব্ধি শোনার পর দোকানটি থেকে বেরিয়ে ফেরিঘাটে আসি। দূর থেকে দেখতে পাই, নোভা কোম্পানির গাঢ় লাল রঙের ফেরিটি নোঙর করে বসে আছে। হয়তো এক্ষুনি ছাড়বে। বিশাল দুটো চিমনি দিয়ে গলগল করে বেরোচ্ছে জ্বালানিপোড়া ধোঁয়া। সেখানটায় দাঁড়িয়ে দ্রুত হিসাবনিকাশ করে ভাবি, এতে চড়ে এ বেলায় এথেন্সে ফিরে গেলেই হয়তো ভালো। ওখানে না হয় দিনাবসানের আগেই গ্রীষ্ফ্মের প্রলম্বিত সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে মনাস্তেরিকি এলাকার চোরবাজারে ঘুরে বেড়াব।