প্রান্তরের বাতাসের ধ্বনি
বুড়ো মানুষটিকে প্রতিদিনই যেতে হয় সে প্রান্তরে। সেখানে সকালে মৃদুমন্দ আর বিকেলে জোরে হাওয়া বয়। কিন্তু দুপুরটা বড় নিদারুণ। ঝাঁঝাঁ রোদ, বাতাস থেমে যায় আর গরমে সব গুমোট হয়ে ওঠে। দূরে কোথাও একলা ঘুঘু পাখি ডাকে। পাহারার গরুগুলো দূরে দূরে, আনমনা। ঝিমোতে থাকে। দুপুরটা যেন সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে। বুড়ো মানুষটির পুরোনো দুঃখগুলো তখনই জেগে ওঠে। বয়সে বুড়োর শরীরটা বেঁকে গেছে। চুল-দাড়িগুলো দুঃখের সমান পাকা। মুখ বিগত গুটিবসন্তের দাগে ভরা। দাঁত পড়ে মুখখানা থোবড়া। কথা সব বোঝা যায় না। প্রান্তরের কোনার একমাত্র বটগাছটিতে হেলান দিয়ে তখনই আকাশের পানে মুখখানা তুলে বুড়ো রোদন শুরু করেন।
হায় ঈশ্বর, তুমি আমারে কত দুঃখ দিলা! আমার জন্মের আগে বাবারে নিলা, চক্ষে দেখলাম না। ছোটকালে মারে নিলা, মুখখানাও মনে পড়ে না। বড় হইলাম পরের ঘরে রাখালের কাম করে। কম ভাত আর বেশি লাত্থি-গুঁতা খেয়ে। মানুষের ঘরে ঘরে। তারপর তুমি আমারে যৌবন দিলা। নারী দিলা। ছাওয়াল-পাওয়াল দিলা দেড় হালি। তারাও বিয়াশাদি করল। ঘরসংসারী হইল। তারপর আমার বউটারেও নিয়া নিলা। এখন ছেলের বউরা আমারে সেই কম খাবার বেশি খোঁটা দেয়। আমি আমার এই জনমের দুঃখ আর বইতে পারি না রে। আমার দুঃখ কিছু কমায়া দাও।
প্রতিদিনই বুড়ো এই একই অনুরোধ আকাশের ঈশ্বরকে করেন। কিন্তু ঈশ্বরের গ্রহ নক্ষত্র নিয়া কত কাম। গ্রহে গ্রহে কত কত প্রাণী, শূন্যে শূন্যে কত কত পাথর। মহাজাগতিক সে সকল চলাচলের শব্দের ভেতর এই বুড়োর পুরোনো দুঃখের কাসুন্দি তাঁর কাছে আর পৌঁছায় না। ফলত বুড়ো প্রতিদিনই দুপুরে এই গান গেয়ে চলেন। প্রান্তরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। দুঃখগুলো বিকেলে দক্ষিণা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে উত্তরে চলে কিন্তু কারও কাছেই পৌঁছায় না।
একদিন বুড়ো বিরক্তি নিয়ে তাঁর ঈশ্বরকে বকাবাধ্যি করেন আর সেদিনই বটগাছটির মাথা থেকে কে যেন কথা বলে ওঠে-
তোর যত দুঃখ আছে তুই একটা বস্তার মুখে মুখ নিয়ে বলবি। তারপর বস্তার মুখ বন্ধ করে রাখবি। আজ রোববার। আগামী শনিবার ত্রিসন্ধ্যায় ধর্মপুরের মাঠের দক্ষিণের মন্দিরে তোর দুঃখের ভারী বস্তা রেখে আসবি। আমি তোরে বদলে কম ভারী দুঃখের বস্তা দেব।
বুড়ো পরদিনই দুপুরে প্রান্তরের বটগাছের তলায় একটি পাটের পুরোনো বস্তা নিয়ে আসেন। বস্তার মুখে মুখ রেখে তাঁর দুঃখগুলো বলেন। তারপর বস্তাটির মুখ বন্ধ করে বটগাছের ঝুড়ির এক ফাঁকে রাখেন। তারপর প্রতিদিনই মনে করে করে তিনি তাঁর পুরোনো দুঃখগুলো বস্তায় জমাতে থাকেন। দুঃখগুলো জমতে থাকে। আর বটগাছের ছায়ায় পুরোনো হতে থাকে।
শনিবার ত্রিসন্ধ্যায় তিনি তাঁর জমানো দুঃখের বোঝাটি পিঠে নিয়ে ধর্মপুরের মাঠের দিকে রওনা দেন। বয়সের ভারে বেঁকে যাওয়া মানুষটির পিঠ সে বোঝার ভারে আরও বেঁকে যেতে থাকে। তিনি দম নিতে নিতে তাঁর বোঝাটি বহন করে অস্তাচলগামী সূর্যের লালিমার দিকে চেয়ে চেয়ে সে মন্দিরের মাঠের দিকে যেতে থাকেন। পথে সন্ধ্যার আলো আঁধার নেমে আসে। আর তিনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেন তাঁর আগে-পিছে আরও আরও মানুষ অমনি বোঝা কাঁধে নিয়ে সে মাঠের দিকে রওনা দিয়েছেন। অনেকের মুখ চেনা চেনা লাগে কিন্তু ঠিক চেনা যায় না। ত্রিসন্ধ্যার লগ্নের পর তাঁরা সকলে সে মাঠে উপস্থিত হন। আর তখনই সে কণ্ঠটি আবার শোনা যায়।
তোরা সব তোদের দুঃখের বোঝাগুলো মন্দিরের মাঠে রাখ। ফলত লোকেরা বোঝাগুলো পিঠ থেকে নামিয়ে মন্দিরের সামনে রাখেন। সে স্থানটি দুঃখের বোঝায় ভরে ওঠে। এইবার সেই কণ্ঠটি বলে-
ঠিক আছে এবার তোদের নিজের বোঝাটির বদলে কম মনে হয়- এমন বোঝার একটি নিয়ে ফিরে যা।
লোকগুলোর মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কিন্তু তারা বোঝাগুলো তুলতে গিয়ে দেখেন কোনো দুঃখের বোঝা কম ভারী নয়। আর কোনো কোনোটি কম ভারী মনে হলেও সকল ক্ষেত্রেই একই সমস্যা- এই নতুন বস্তার দুঃখগুলো পরস্পরের কাছে অজানা। এই অজানা দুঃখ পাওয়ার ভীতি তাঁদের পেয়ে বসে। আর তখন তাঁরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। নিজেদের এতদিন ধরে পোষা দুঃখগুলোর জন্য মায়া হতে থাকে।
এবার তাঁরা পুনরায় ঈশ্বরের দিকে হাত তুলে নিজেদের চেনা পোষা দুঃখের বোঝাটিই ফেরত চান।
কণ্ঠস্বরটি বলে-
তথাস্তু।
আর বৃদ্ধ পুরোনো দুঃখের বোঝা নিয়ে প্রান্তরের তাঁর গাছটির নিচে ফিরে আসেন। আর প্রতিদিন উদাস দুপুরে সে দুঃখের গানগুলো প্রান্তরে বাতাসে শোনা যায়।

বুকের ভেতর একটি কবর, জয়দেবপুরের
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সহপাঠীর সাথে আমার পরিচয় ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ভর্তি মেধাতালিকায় প্রথম যে নামটি জ্বলজ্বল করছিল তা একটি তরুণীর। আমরা খানিক ঈর্ষান্বিত কিন্তু উদগ্রীব হয়েছিলাম কেমন সে মেধাবী তরুণীটি? আর তাকে আবিস্কার করি কলা ভবনের নিচতলায়। সে তার ভাইকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে। তার মেজো ভাই কোনোভাবে অনুমান করেন আমিও ভর্তি হতে এসেছি। তিনি এগিয়ে এসে বলেন-
আমি হুমায়ুন। মাগফুরা আমার ছোট বোন। ও ভর্তি হতে এসেছে। মাগফুরা মিটিমিটি হেসে আমার দিকে তাকায়। আমি বুঝতে পারি এই সেই মেধাবী ছাত্রীটি, যে সবাইকে টপকে প্রথম হয়েছে।
আমি আগ্রহ নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলি-
আপনিই কাজী আজিজুন?
তার মিটিমিটি হাসিটি আরও বিস্তৃত হয়।
আপনি আপনি করছ কেন? আমরা তো ক্লাসমেট।
আমি আমার গ্রাম্য ভদ্রতা বুঝতে পারি। শরমিন্দা হয়ে বলি-
সে ঠিক আছে। প্রথম প্রথম তো। কিছুদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে। হুমায়ুন ভাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। তার যেন সব দায়িত্ব শেষ হলো।
বলেন-
ওকে তাহলে দেখে রেখো।
আমি তাকে সত্যিই দেখে রেখেছিলাম।
আমরা দু'জন ভর্তি হতে একসাথে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে যাই। এই ঘর সেই ঘর, এই টেবিল সেই টেবিল ঘুরে ঘুরে আমাদের ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করি। তারপর রেজিস্ট্রার বিল্ডিং থেকে লাল ইট বিছানো ছায়া ঢাকা পথ দিয়ে আমরা ফিরতে থাকি। বাসা কোথায়, কে কোথা থেকে পাশ করেছি-দু'জন সহপাঠীর মধ্যে প্রথম পরিচয়ে যা যা প্রাথমিক আলাপ হতে পারে।
তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। হঠাৎ করেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।
অনেক দিন পর আমাদের ক্লাস শুরু হলে ক্লাসে আমাদের একটি বৃত্ত গড়ে ওঠে। এ বৃত্তে চারজন মেয়ে। মেয়েগুলোর সংক্ষিপ্ত নামও আমরা দিয়ে দিই। নিপু, লিপি, শিপু আর দিপু। আর ছেলে প্রধানত চারজন। রফিক, বিপ্লব, জয় আর আমি। এই আটজনের আড্ডা ক্লাসের আগে, পরে আর ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে। মাঝে মাঝে আমরা ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে দূরে দূরেও চলে যাই। এই আড্ডার ভেতর আমরা দু'জন নিজেদের অজান্তেই আলাদা হতে থাকি। আমাদের বিকেলগুলো আলাদা হতে থাকে। আমরা বিকেলে ক্যাম্পাসের বিশমাইলের নির্জনতার সবুজ অরণ্যের দিকে হাঁটতে থাকি। আমাদের আলাপের বিষয় মূলত কবিতা।
আমি তখন সাহিত্যে মগ্ন। প্রায় নিয়মিত শাহবাগে ভাত হজম করতে যাই। শাহবাগের কবিবন্ধুরা প্রায় সময় আমার রুমে হানা দেয়। ক্লাসের দরজা অবধি এসে অপেক্ষা করে। সে সময় জাহাঙ্গীরনগর থেকে শব্দপাঠ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের পরিকল্পনা করি। মাগফুরার সাথেও সে পরিকল্পনা শেয়ার করি। সে উৎসাহ দেয়। আমাদের বৃত্তের বিপ্লবও তখন সাহিত্যচর্চা করে। তার সাথেও পরামর্শ করি। সে রাজি হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহে নামি। মাগফুরাও এ অভিযানে সঙ্গী হয়। ঢাকার বিভিন্ন অফিসে আমরা দু'জন ঘুরতে থাকি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বিজ্ঞাপন আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি। আমার বা বন্ধুটির সে আর্থিক অবস্থা সে সময় নাই যে, নিজেদের পয়সায় পত্রিকা বের করে ফেলব। ফলত নাজিব তারেকের ইলাস্ট্রেশন করা অবস্থায় পত্রিকার ট্রেসিং দীর্ঘদিন আমার রুমে পড়ে থাকে। এক সময় মাগফুরাই খরচের একটা বড় অংশ নিয়ে এগিয়ে আসে। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
সে সময় আমাদের তত্ত্বচর্চার কাল। শব্দপাঠ সে সময় সে তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। একটি কবিতা পত্রিকার অভাব অনুভব করি। মাগফুরাই সে অভাব পূরণে এগিয়ে আসে। 'কিউপিড' নামে একটি কবিতা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে আমাদের দু'জনের নাম থাকলেও পরের সংখ্যা থেকে মাগফুরার একক সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকে। 'কিউপিড' সে সময় সাড়াজাগানো পত্রিকায় পরিণত হয়েছিল।
এই লিটল ম্য্যাগাজিন প্রকাশ, লেখালেখি আর বিকেলের ঘোরাঘুরি করতে করতে আমি আর মাগফুরা একসময় বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠি। সেটা আরও ত্বরান্বিত হয় আমাদের এক সিনিয়র ভাইয়ের মাগফুরাকে প্রেম নিবেদন কেন্দ্র করে। মাগফুরা সে সময় আমার দিকে বেশি করে ঝুঁকে আসে। আমাদের সাহিত্য সম্পর্ক প্রেমের সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়। সে সম্পর্ক মাগফুরাদের বাসা অবধি যাওয়াতে গড়ায়, বন্ধুসমেত। আমরা গভীরভাবে জড়িয়ে যাই। একসময় আমাদের সকাল-বিকেল এক হয়ে যায়।
কবি সৌভিক রেজা সে সময় প্রেমে পড়েছিলেন খিলগাঁওয়ে বসবাসে বসবাস করা এক সহপাঠীর। লিখেছিলেন-
'আমার রাস্তাগুলো সব খিলগাঁয়ের দিকে ধাবিত।'
আক্ষরিক অর্থে আমার রাস্তা তখন মাগফুরার নবাব ফয়জুন্নেসা হলের দিকে ধাবিত। বিকেলে সে হলের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে না থাকলে চলেই না। দাঁড়িয়ে থেকে কোনো পরিচিত সহপাঠী বা পরিচিত কাউকে পেলে মাগফুরাকে ডেকে দিতে অনুরোধ করি। মাগফুরার সে সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু লিপি আর জেসমিন। লিপিকে বললে সে বিনা বাক্যব্যয়ে ডেকে দেয় কিন্তু জেসমিনকে যদি বলি-
একটু ডেকে দাও না ভাই।
সে উল্টো ভেঙিয়ে বলত-
ডেকে দিতে পারব না ভাই। অবশ্য ডেকে দিত। তারপর রাত নয়-দশটা অবধি আমরা ঘোরাঘুরি করেই কাটাতাম। সে সময় আমি ঘন ঘন অসুস্থ হতাম। মাগফুরা আমার আল বেরুণী হলের ১১০ নম্বর কক্ষে চলে আসত। খাবারদাবার তো নিয়েই আসত। কখনও কখনও রুমেই টুকটাক রান্না করত। যাবার সময় ময়লা জামাকাপড় নিয়ে যেত। মেয়েদের হলে ছেলেদের পোশাক ঝোলা নিয়ে সে সময় নাকি সে হলে বেশ হাসাহাসি হতো। অবশ্য জাহাঙ্গীরনগরে উদার পরিবেশের অধিকাংশ জুটির কাহিনি প্রায় একই রকম ছিল।
অনার্সে থাকতেই সংবাদপত্রে আমার চাকরি হয়ে যায়। আমাকে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়। সাবলেট নিই মতিঝিল এজিবি কলোনির এক কর্মচারীর বাসায়। সেখান থেকেই অনিয়মিত ক্লাস আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে থাকি।
সে সময়ের কথা এখন খুব মনে পড়ছে। টিউটোরিয়াল পরীক্ষার তারিখ পড়লেই রাতে পত্রিকা অফিসে মাগফুরা ফোন করত। আমি পরীক্ষার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব ভোরের বাসে এসে মাগফুরার হলের সামনের কাঁঠাল গাছের সিমেন্টের বেঞ্চির ওপর বসে থাকতাম। মাগফুরা নাশতা আর নোট নিয়ে উপস্থিত হতো। আমি নাশতা খেতে খেতে তার তৈরি করা নোটখানা মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতাম। তারপর একই নোটে দু'জনই পরীক্ষা দিতাম। মাগফুরা দশের মধ্যে পেত পাঁচ-সাড়ে পাঁচ, আমি পেতাম ছয়। অথচ মাগফুরা আমার চেয়ে মেধাবী ছাত্রী ছিল। আজ আমার মনে প্রশ্ন জাগে, মাগফুরা কি ইচ্ছে করেই খারাপ পরীক্ষা দিত? যাতে আমি তার চেয়ে ভালো করি! ফলাফল আমি তার চেয়ে ভালো করেছিলাম। আর সবচেয়ে খুশি সে-ই হয়েছিল।
মাস্টার্সে আমরা বিয়ে করে ফেলি। বিয়ে করে আমরা সাবলেট নিই এজিবি কলোনির এক গাড়িচালকের বাসায়। মাগফুরা তখন পুরোপুরি ছাত্রী আর আমিও বলা যায় প্রচ্ছন্ন বেকার। কেননা, পত্রিকাটি থেকে যে বেতন পাই তা নিয়ে সংসার চলার উপায় নেই। তার ওপর সে বেতনও হয় অনিয়মিত। আমাদের সংসার করার হাঁড়িপাতিল নেই। যে ছোট ছোট দু-একটা পাতিল আছে, সে পাতিলে ভাতের ব্যবস্থা নেই। এক রাতের কথা খুব মনে পড়ে। আমাদের সে হাঁড়িপাতিল চালচুলাহীন এক রুমের সাবলেটের সংসার দেখতে একদিন রাতে উপস্থিত হোন কবিবন্ধুরা। আমাদের রাতের খাবারের কোনো ব্যবস্থাই নেই। মাগফুরা গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে সব ধার নেয়। কিন্তু তাতে বন্ধুদের ভরপেট হয় না। উপস্থিত বন্ধুদের মধ্যে তখন আমাদের মতো বিয়ে করেছেন কবি সরকার আমিন আর শাহনাজ মুন্নী। তাঁরা তখন মোটামুটি একই হালতে আজিমপুর থাকেন। তিনি তখন বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। আমিন ভাই উচ্চ স্বরে বললেন-
আমরা শোয়াইবের বাসায় তো খেতে আসিনি। আড্ডা দিতে এসেছি। দরকার হলে বাইরে গিয়ে আমরা সকলে মিলে আবার খাব।
আমিন ভাইয়ের কথায় সকল অভাব দূর হয়ে গেল। হল্লায় সে রুমটি ভরে উঠল।
এ অভাবের ভেতরও মাগফুরাকে আমি কখনও মন খারাপ করতে দেখিনি। তার মুখখানা সব সময় মৃদু হাসিতে ভরে থাকত। এক অদ্ভুত সহনশীলতা আর সবর মাগফুরাকে দিয়ে মাবুদ এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরনগরের ১৯ ব্যাচের র‌্যাগ ডেতে মুক্তমঞ্চে বিদায়ী আয়োজনে সে ব্যাচের বিয়ে করা জুটিদের একটি পর্ব রাখা হয়েছিল। আলো ঝলমলে মঞ্চে ক্যাম্পাসের সকল ব্যাচের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সামনে আমাকে আর মাগফুরাকে তোলা হয়। নানা প্রশ্নের পর মাগফুরাকে জিজ্ঞেস করা হয় তার কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি কখন?
সে বলে- 'শোয়াইব পত্রিকা অফিসে চাকরি করে। সে অনেক রাতে ফেরে। আমি তার জন্য জেগে অপেক্ষা করি। যখন নিচে তাকে পৌঁছানোর সিএনজির শব্দ শুনতে পাই সেই মুহূর্তটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।'
মাগফুরা আর কিছু নয়, আমাকে চেয়েছিল।
কিছুদিন পরই আমরা দু'জনেই একই কলেজে চাকরি পেয়ে পাই। আমরা হুমায়ুন ভাইয়ের কাছ থেকে তার ভেসপাটি পেয়ে যাই। আমরা সে ভেসপাতে করে ধানমন্ডির কোডা কলেজে আসা-যাওয়া করি। শহর উথালপাতাল করি। একসময় আমাদের ঘর আলো করে আমাদের প্রথম সন্তান এথিনা আসে। ততদিনে মাগফুরা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে আর আমি রাজউক কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি। অর্থের কষ্ট আমাদের দূর হয়ে যায়। ততদিনে আমরা আস্তানা মাগফুরার কলেজের পাশে ৭ রাজচন্দ্র মুন্সী লেন, লক্ষ্মীবাজারে নিয়েছি।
পুরান ঢাকায় আত্মীয়পরিজন নিয়ে সে চাঁদমারি সময়।
আমাদের দ্রুত সময় যেতে থাকে। এর মধ্যে মাগফুরা দ্বিতীয় সন্তান ধারণ করে। ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের গাইনি বিশেষজ্ঞকে সে দেখাতে থাকে। আর এরই মধ্যে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরশিক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য সুকতাই থাম্মাথিরাত ওপেন ইউনিভার্সিটিতে পাঠানো হয়। আমি সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি এথিনা আর আমাদের অনাগত শিশুর জন্য নানা উপহার কিনে ব্যাগ ভর্তি করতে থাকি। সে আনন্দ উপহারগুলো নিয়ে যেদিন লক্ষ্মীবাজার ফিরে আসি, তার পরের দিনই মাগফুরা তার সব আত্মীয়কে বাসায় দাওয়াত দেয়। নিজে মাংস পিষে টিকিয়া পর্যন্ত বানায়। আনন্দে আমাদের ঘর ভরে ওঠে। এর পরদিনই তার হালকা জ্বর আসে। আমি সন্ধ্যায় গাইনি বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাই। সে চেম্বারে ভীষণ ভিড়। তিনি একসাথে দু'জন করে রোগী ভিতরে ডেকে নিচ্ছিলেন আর দ্রুত ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছিলেন। মাগফুরাকে দেখে বলেন, সাধারণ জ্বর হয়তো। বেশি হলে প্যারাসিটামল খাবেন। সব ঠিক আছে। মাগফুরা রাতে প্যারাসিটামল গ্রহণ করে।
পরদিন সকালে তাকে অনেক দুর্বল মনে হয়। চোখগুলো হলুদ হয়ে আসে। সে দু'তলায় তার বোনের কাছে আর প্রতিদিনের মতো সেদিনও রেস্ট নিতে চলে যায়। আমি বাইরে বের হই। দুপুরে ফিরে যখন তাকে ডেকে আসতে যাই, দেখি সে ডাকে ঠিক স্বাভাবিক সাড়া দিচ্ছে না। ঘন হলুদ চোখ খুলে আমার দিকে আবছায়া তাকাচ্ছে। যেন ঘোরের মধ্যে আছে। বিপদের আশঙ্কা আমার মনে জাগে। দ্রুত তাকে ন্যাশলান মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাই। তারা দেখেই জন্ডিস সন্দেহ করেন। দ্রুত বিলোরবিন টেস্ট করতে পাঠান। সে রিপোর্ট আসে মাত্রা ১৮। একজন অন্তঃসত্ত্বার জন্য এ মাত্রা মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। পরে দ্রুত শনাক্ত হয় এটি মাতৃত্বকালে প্রাণঘাতী ভাইরাস। তারা বলেন-
রোগী যদি এ সময় প্রসব করেন তাহলে আইসিইউ লাগতে পারে। সাথে ভেন্টিলেশনও লাগতে পারে।
তারা এমন একটা আইসিইউ খুঁজে বের করতে বলেন যেখানে এসব সুবিধা আছে। আমরা হন্যে হয়ে শহরময় আইসিইউ খুঁজতে থাকি। প্রথমে ন্যাশনাল থেকে তাকে বারডেমে স্থানান্তর করা হয়। তারপর সেখান থেকে ধানমন্ডি ক্লিনিকে। সে ক্লিনিক থেকে সর্বশেষ মোহাম্মদপুর মিলেনিয়াম হাসপাতালে। মাগফুরা আমার দুনিয়া কাঁপানো সাত দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে। মাঝখানে আমাদের ফুটফুটে মৃত কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। সকল যুদ্ধ শেষে ২০০২ সালে ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে মাগফুরা মৃত্যুর কাছে হার মানে।
আমি তাকে আমার কর্মস্থল আর তার বেড়ে ওঠার স্থান গাজীপুরে সমাহিত করি। জয়দেবপুরের কবরস্থানে সে এখন মাটির ঘরে শুয়ে আছে। কিন্তু মাগফুরা কি আসলেই জয়দেবপুরের কবরে শুয়ে আছে?
আমার আনন্দ আর বেদনায়, জনারণ্যে আর একলা ক্ষণে আমি টের পাই মাগফুরা আমার বুকের ভেতর শুয়ে আছে। নিভৃতে। আমি তাকে সদা বহন করি, কবরসমেত।
সে কবরের ভার বড় ভারী।
জেন গল্পের দুঃখিত মানুষেরা দুঃখগুলো বহন করেছিলেন পিঠে করে। পিঠে করে ভার বহন করা যায়। কিন্তু বুকে করে? যে ভার একটি কবরের। আমি সে ভার বহন করি।
গৌতম বলেছিলেন, জগৎ দুঃখময়। জেন গল্পের মানুষের দুঃখগুলো যে প্রান্তরের বাতাসে ভেসে আসছে, পাঠক কান পাতো, সেই শব্দে আমার আত্মার ক্রন্দন ধ্বনিও মিশে আছে।
[সংক্ষেপিত। পুরো লেখাটি লেখকের প্রকাশিতব্য গ্রন্থে পাওয়া যাবে।]