আমি যে দুঃখের কথা বলছি, সেটা আমার একার নয়; সকলের। অনাদি কালের যুগল মানুষ থেকে অনন্তকালীন সহৃদয় মানব-মানবী পর্যন্ত এর ধারা অব্যাহত। এই দুঃখ তীব্র, কিন্তু সূক্ষ্ণ; এই দুঃখ গভীর, কিন্তু নিরাকার। যে দুঃখ সর্বজনীন, সর্বকালীন, তাকে পুরোনোই-বা বলি কী করে! আবার নিত্যনতুন বিশেষণটাও অতিশয্যের মতো লাগে।
কথায় কথায় আমরা যে সরি বলি, এটা সে-জাতের দুঃখ নয়। এই দুঃখ এমন যে, ঠিক বলে বোঝানো যায় না; অথচ নিজে নিজে ঠিকই বুঝতে পারি।
সমুদ্র সেচন করলে ছোট-বড় অনেক নুড়িপাথর উঠে আসে। হঠাৎ একদিন চিকচিক করে ওঠে রক্তপ্রবাল। সামুদ্রিক কীটের জীবাশ্ম থেকে জাত রত্নবিশেষ। এ পাথর কি মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে? এর উত্তর- না। তবে প্রতিটি নর-নারীর মানসিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন অবিস্মরণীয়তার গুণ যুক্ত হয়, তখন ওই মসৃণ পাথরটি প্রতীকের কাজ করে বৈকি।
সারারাত এপাশ-ওপাশ করা সেই নির্বস্তুক উপলব্ধিকে স্থানিকতা দিতে চাইলে ধ্রুবতারার জায়গাতেই তাকে বসাতে হবে। আর আঁকতে গেলে রক্তসুখী প্রবালের মতোই আঁকতে হবে। যেন জমাট রক্ত পধঃযবৎংরং- সুলভ মুক্তি তার ভাগ্যে নেই।

২.
প্রবাল পাথর বলি, প্রবল পাথর বলি- আমি তার দেখা পেয়েছি অর্ধশতাব্দীর আরও আগে। বছর দশেক আগে সে ইহলোক ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু সে-পাথর সে রেখে গেছে। আমার হূৎপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনে তার শব্দ টের পাই।
দেখাদেখি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু মানুষ যেটাকে মন বলে, সেই মন হঠাৎ একদিন এক ঝটকায় জেগে উঠল। ঠিক আঘাত নয়, আলোড়ন।
কথা বলছিলাম ওর মা এবং অন্যদের সঙ্গে। কী কারণে জানি না- বারকয়েক তার আসা-যাওয়া দৃশ্য এঁকেছিল। একবার চোখাচোখি হতেই সামনের একগুচ্ছ চুল এক ঝটকায় পিঠের পেছনে পাঠিয়ে দিল। সেই নরম অহংকারে আমিই যেন ছিটকে পড়লাম অনেক পেছনে। সেই দূরত্ব আর কোনো দিন ঘোচাতে পারিনি, পারব না। কেননা, সে আর বেঁচে নেই।
৩.
কিন্তু তিনটি দিনের হিসাব আমি আজও মেলাতে পারিনি। সেই তিনটি দিন আজও আমার বিবেচনায় পরাবাস্তব দিন। পূর্বাপর আর কোনো দিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক বা সংগতি নেই।
- 'ছাদে যাবেন?'
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। বিশাল ছাদ। বিস্তৃত আকাশ। অস্তায়মান সূর্যের আলোয় তার ফরসা মুখ লালচে দেখাচ্ছে। ছাদের কোণে ঝাঁকড়া লেবুগাছ। সে কয়েকটা লেবুপাতা ছিঁড়ে নিল। তারপর ডান হাতের তালুতে রেখে বাড়িয়ে ধরল। -'নেন, শুঁকে দেখেন।' তার হাতের নরম লালচে তালুতে লেগে আমার ওষ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত অপূর্ব এক শিহরণ।
কুটি কুটি করা লেবুপাতা, ঠোঁটের কোনায় অপরিচিত এক হাসি। আলোর বিপরীতে তার দৃষ্টির ভাষা আমি বুঝতে পারিনি। হঠাৎ 'তুমি' সম্বোধনে চমকে উঠলাম। আমি বাক্‌শক্তিহীন জিরাফের মতো দাঁড়িয়েই থাকলাম।
অল্পস্বল্প এমন যা ঘটল- পরাবাস্তবের মতো- এগুলো প্রতীকী কোনো শিক্ষা নয় তো!

৪.
জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, হৃদ্যতাও হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই এক বা একাধিক গুণের অধিকারী। কেউ কেউ পড়ূয়া। কেউ কেউ লেখালেখির চেষ্টা করত। কেউ কেউ ভালো গাইতে পারত। কারও কারও বাচনভঙ্গি মনোমুগ্ধকর। কেউ কেউ দারুণ রোমান্টিক। পক্ষান্তরে, গাত্রবর্ণ ছাড়া ওর কোনো গুণই আমি দেখিনি। তবুও ধ্রুবতারা আগের জায়গায়।
আমার প্রথম বইয়ের (১৯৮৯) উৎসর্গপত্র ছিল এ রকম- 'জীবনের প্রথম কাব্য তোমাকে উৎসর্গ করতে না পারার দুঃখ কোনো দিন ভুলব না।'
ইতোমধ্যে তার বিয়েও হয়ে গেল। কিন্তু আমার কবিতা থেমে থাকেনি। ২০০০ সালে প্রকাশিত হলো 'তোমার জানলায় আমি জেগে আছি চন্দ্রমল্লিকা'। সেই বইয়ের একটি কবিতার নাম 'এইসব দুঃখটুঃখের জন্যে শ্যামলী দায়ী নয়'। কয়েকটি টুকরো কবিতার সমাবেশ। দু-একটি নমুনা দিচ্ছি-
গ. 'আমি কথা দিচ্ছি, কাউকে কিছু বলবো না;
বলবো এসবের জন্যে তুমি দায়ী নও।
তুমি শুধু একবার বলো, তোমাকে কোনোদিন দুঃখ দিইনি আমি;
আর বলো, ৩৬২ দিনে এক বছর হয়েছিল ১৯৭০ সালে।
ছ. শরীরটাকে টেনে-হিঁচড়ে দূরে নেওয়া যায়,
সেটা কি দূরত্ব হলো!
সম্পর্কটা যখন দুঃখের
তখন নিকটবর্তিতায় কী আসে যায়!
জ. বাগানের কোনো ফুল, লতাপাতা, এমন-কি কাঁটাও
আমার কথা বিশ্বাস করে না।
আমি বারবার বলেছি-
সত্যি, আমাকে কেউ কখনো দুঃখ দেয়নি
আমার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই।
আল্লার কসম,
মিথ্যে বলার এই কষ্টুটুকু ছাড়া
আমার আর কোনো দুঃখ নেই।'

৫.
অন্য একটি মেয়ে বলেছিল- 'জানেন তো, মেয়েদের কিছু না থাকারও একটা অহংকার থাকে।' তবে কি তার কথাই ঠিক? হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়- আমার সেই প্রবাল পাথরই তার প্রমাণ।
এ রকম কেউ কেউ থাকে, যার নিজের কোনো গুণ নেই, কিন্তু অন্যকে গুণান্বিত করে তুলতে পারে- শাদামাটা একজন তরুণকে বানিয়ে দেয় রাতজাগা কবি। এটারও প্রমাণ পূর্বোক্ত অহংকারী।
সে নিজে জ্বলেনি, কিন্তু আমাকে জ্বলে উঠতে সাহায্য করেছিল। ঠিক অক্সিজেনের মতো- এবং সব অর্থে। রাতের পর রাত সে আমাকে জাগিয়েছে, জ্বালিয়েছে, পুড়িয়েছে- আজও; তার মৃত্যুর দশ বছর পরেও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি তার কাছে ঋণী। সে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, কবিতাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আজও, ভালোবাসা নিয়ে কিছু লিখতে বসলে, সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। অর্ধশতাব্দী ধরে বলতে না পারার যে দুঃখ আমি বহন করে চলেছি, তাকে পুরোনো দুঃখ বলে কিছুতেই ছোট করতে পারব না।

৬.
আগেই বলেছি, তার কোনো গুণ নেই, অন্যদের তুলনায় দেখতে-শুনতেও তেমন কিছু না। কিন্তু সেই নরম অহংকার, অহংকারের সেই লাবণ্য কোথায় পাব! তার ঠিক অর্ধশতাব্দী পর হঠাৎ করে লেবুপাতার গন্ধ এসে লাগল। তাকিয়ে দেখি : নরম অহংকার। অবিশ্বাস্য পুনর্জন্মের আবহ! হাতের তালুর সে স্পষ্ট রেখাগুলো রীতিমতো ছুঁতে পারলাম। আবার জেগে উঠল সেই শিহরণ। আবার আমি নির্বাক জিরাফ।
'জীবনে প্রথমবার বলতে পারিনি
জীবনের শেষের-বারও উচ্চারণহীন।
অনেক জমানো কথা সারাদেহে দুঃখের মোহর
ফোঁটা ফোঁটা আবেগের ব্যথিত সঞ্চয়
এ কেমন রুদ্ধবাক জিরাফজীবন!
একটি কথার ভ্রূণ মাকড়সার জালের মতন
ক্রমাগত বুনে যাচ্ছে জিরাফের অন্তিম কাফন।'