অক্তাবিও পাস এক আলাপে, মূলত নিজের কাব্যসত্তার উন্মোচনের সূত্রেই, লেখকদের সত্তার দ্বৈততা নিয়ে যা বলেছিলেন তার গুরুত্ব অনুধাবন করলে আমাদের পক্ষে আলোচনার সূত্রপাত অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে বলে তার উক্তিটি তলব করব। বহুকাল থেকেই, বহু লেখক 'নিজ' (Self) ও 'অপর'(Other)-এর মধ্যকার বিভাজন ও ভিন্নতা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন বটে আর তার প্রকাশও ঘটেছে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে- লেখক থেকে দার্শনিক পর্যন্ত যার বিস্তার- কিন্তু তা কিছুটা অস্বচ্ছতায় ও আড়পথে বাঁধা ছিল সব সময়ই। পাস আমাদেরকে তার স্বভাবসুলভ স্বচ্ছতায় ধরিয়ে দেন সেই দ্বৈততার স্বরূপ :
Rimbaud criticizes the self through the other, but as I said, the other is another self, another I. We need to make a radical critique of subjectivity. In parts of Levi-Strauss we find a total criticism of subjectivity; and this is the importance of a philosopher like Wittgenstein. In criticizing language, he criticized the self, the ego. He has shown that `I’ is only a grammatical fiction. (Octavio Paz : Homage to the Poet, Kosrof Chantikian, Kosmos, USA, 1980, P-161)

দার্শনিক ভিটগেন্টাইনের কথা বাদ দিলে, কবিদের মধ্যে ওই 'অন্য আমি'র এক বাষ্পরূপ দেখা দিয়েছিল গত শতাব্দীর কোনো কোনো কবির মধ্যে এবং তারও আগে কোনো কোনো দার্শনিক ও ভাবুকের মাঝে। যেমন মার্টিন হাইডেগারের মধ্যে এর এক বিস্তার আমরা লক্ষ করব সত্তা নামক অনুসন্ধান ও তা নির্ণয়ের ফলে। মূলত ভাষার স্বভাবচরিত্রকে ধরতে গিয়ে সত্তার এই স্বরূপটিকে আবিস্কার ছিল দার্শনিক তাৎপর্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাহিত্যে সত্তা নানারূপে বিভাজিত হয়ে একে অপরের সাথে কীভাবে এক সুমধুর দ্বন্দ্ব্বে সম্পূূরক ভূমিকায় ঘনীভূত আর প্রত্যক্ষ হয়ে উঠছে তা আমরা পাব একদিকে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতায় এবং অন্য প্রান্তে- বহু বছর পর- হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি প্যারাবলে। শৈল্পিক আদর্শ আর কালের ব্যবধানের কথা ভাবলে, এই দুটি নাম যে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হবার নয়, তা পরহেজগার পাঠকমাত্রই জানেন। বহুদিক থেকেই অমিলের প্রাচুর্য বহমান এই দুই লেখকের মধ্যে। শৈল্পিক কলাকৌশলে যেমন, তেমনি প্রকাশের রীতিতেও দু'জন প্রায় মেরু-দূর ব্যবধানে। কিন্তু তবু দু'জনই ভিন্নতার শিখর থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসে মিলিত হয়েছেন উপলব্ধির উপত্যকায়, যদিও তার প্রকাশরীতিতে রয়েছে স্বভাবজাত স্বাতন্ত্র্য। ১৯১৮ সালে রচিত এক গানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দুই আমিকে তুলে ধরলেন এভাবে :

যে আমি ওই ভেসে চলে কালের ঢেউয়ে আকাশতলে
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।
ধুলার সাথে, জলের সাথে, ফুলের সাথে, ফলের সাথে,
সবার সাথে চলছে ও যে ধেয়ে।।
ও যে সদাই বাইরে আছে, দুঃখে সুখে নিত্য নাচে-
ঢেউ দিয়ে যায়, দোলে যে ঢেউ খেয়ে।
একটু ক্ষয়ে ক্ষতি লাগে, একটু ঘায়ে ক্ষত জাগে-
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।।
যে আমি যায় কেঁদে হেসে তাল দিতেছে মৃদঙ্গে সে,
অন্য আমি উঠতেছি গান গেয়ে।
ও যে সচল ছবির মতো, আমি নীরব কবির মতো-
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।
এই-যে আমি ঐ আমি নই, আপন-মাঝে আপনি যে রই,
যাই নে ভেসে মরণধারা বেয়ে-
মুক্ত আমি তৃপ্ত আমি, শান্ত আমি, দীপ্ত আমি,
ওরই পানে দেখছি আমি চেয়ে।।
(গীতিবীথিকা, [১৯১৮] )

অন্য এক কবিতায় দেখতে পাব এই দুই 'আমি'র এক লীলা :
শুরু হতেই ও আমার সঙ্গ ধরেছে,
ঐ একটা অনেককালের বুড়ো,
আমাতে মিশিয়ে আছে এক হয়ে।
আজ আমি ওকে জানাচ্ছি-
পৃথক হব আমরা।
(২২ নং কবিতা, শেষ সপ্তক [কাব্যগ্রন্থ, ১৯৩৫])

প্রথম উদ্ধৃত ওই গান আর তারও ১৭ বছর পরে রচিত কবিতার এই উদ্ধৃত অংশটুকুতে আমার দেখতে পাচ্ছি দুই আমির এক সহাবস্থান এবং দ্বিতীয় কবিতায় তাদের আবার পৃথক হবার আকাঙ্ক্ষা। রবীন্দ্রনাথের এই দ্বৈততার সাথে বহু বছর পরে রচিত আর্হেন্তিনীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি প্যারাবলের আশ্চর্য নৈকট্য আমরা খুঁজে পাব। নৈকট্যের বিষয়টি চিহ্নিত ও বিশ্নেষণ করার আগে আমরা বোর্হেসের লেখাটিও এক লহমায় পাঠ করে নেব :
বোর্হেস এবং আমি
যা কিছু ঘটে সে অন্য কেউ, অন্য এক বোর্হেসের জীবনে ঘটে। আমি বুয়েনোস আইরেসের রাস্তা দিয়ে হাঁটি, হয়তো মুহূর্তের জন্য দাঁড়াই কখনও, তাকিয়ে দেখি হলঘরে প্রবেশপথের খিলানের দিকে আর গ্রিল করা দরজার দিকে : চিঠিপত্রে খবর পাই বোর্হেসের আর তাকে দেখতে পাই অধ্যাপকদের নামের তালিকায় অথবা কোনো কোনো জীবনী-অভিধানে। ভালোবাসি বালি-ঘড়ি, মানচিত্র অষ্টাদশ শতকের মুদ্রণরীতি, কফির স্বাদ আর স্টিভেনসনের গদ্য : অন্যজনও এইসব পছন্দ করে ; কিন্তু তা এতটা চটুলভাবে করে যে নাটুকে বলে মনে হয়। এটা বলা অত্যুক্তি যে, আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক দ্বন্দ্বময় : আমি বাঁচি বেঁচে থাকতে হয়, যাতে বোর্হেস সাহিত্য রচনা করতে পারে, আর এই সাহিত্য রচনাই আমার বেঁচে যাবার ইন্ধন। আমার পক্ষে এটা স্বীকার করা এখন কঠিন নয় যে, ইতোমধ্যে সে মূল্যবান কয়েকটি পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছে; কিন্তু এই পৃষ্ঠাগুলো আমাকে রক্ষা করতে পারে না, সম্ভবত এই কারণে যে, যা কিছু ভালো তা কারও একার নয়, এমনকি তারও নয়, বরং তা ভাষা এবং ঐতিহ্যের। তাছাড়া বিলুপ্ত হওয়াই আমার নিশ্চিত নিয়তি, আর আমার জীবনের কোনো কোনো মুহূর্ত তার মধ্যে টিকে থাকতে পারে। ধীরে ধীরে, আমি তার কাছে সবকিছু অর্পণ করছি, যদিও তার বানিয়ে এবং বাড়িয়ে বলার বিশ্রী অভ্যেস সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সজাগ। স্পিনোজা ভাবতেন যে, সমস্ত বস্তুরাশি সর্বাবস্থায় তার সত্তার অনুরূপ হয়ে উঠতে চায়, পাথর চিরকালই পাথর হতে চায়, আর বাঘ চায় বাঘ হতে, আমি বোর্হেসের মধ্যেই থেকে যাব; আমার নিজের মধ্যে নয় (আমি অন্য কেউ- যদি এটা সত্য হয়) ; শ্রমসাধ্য কোনো গিটার বাজনা কিংবা, অন্য কিছুর চেয়ে তার বইপত্রে আমি নিজেকে কম খুঁজে পাই। অনেক বছর আগে আমি তার কাছ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম এবং শহরতলির পুরাণ থেকে চলে গিয়েছিলাম সময়, আর অনন্তের খেলার মধ্যে, কিন্তু এইসব খেলা এখন বোর্হেসের জীবনের অংশ আর আমাকে এখন অন্যকিছু ভাবতে হবে। এইভাবে আমার জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে আর আমি সবকিছুই হারিয়ে ফেলি এবং সবকিছুই বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যায় অথবা অন্যের বিষয় হয়ে যায়।
জানি না আমাদের মধ্যে কে এই পাতাটি লিখছে।
(অনুবাদ : রাজু আলাউদ্দিন)
দুই লেখক থেকে উদ্ধৃত এই লেখা দুটো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে আমরা তাঁদের সাদৃশ্যের স্বরূপ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব কিছু কিছু ঘটনা আর রচনার সূত্রে।
রবীন্দ্রনাথ ও বোর্হেসের মধ্যে মিলের সম্ভাবনা যে কম, দুই লেখকের স্বভাবের স্বাতন্ত্র্য আর শৈলীর ভিন্নতা দেখেই যে-কোনো পাঠক তা বুঝতে পারবেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য শৈলীর। নান্দনিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও তাদের পার্থক্য মেরু-দূর নাহলেও, তা 'মৈত্রীঘনিম' নয় কোনোভাবেই। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে, তা সে কবিতাই হোক আর কথাসাহিত্যই হোক- বিছিয়ে এবং বিস্তারে বলার এক রাজরঙিন ধীরশ্রী প্রবণতা আছে, কিন্তু বোর্হেস এই প্রবণতাকে এতটাই শত্রুজ্ঞান করেন যে উপন্যাসের মতো অসংযত ও 'বাগাড়ম্বরপূর্ণ' এই বিভাগটিকেই তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে অস্বীকার করেন। গল্পে তিনি এতই নিখুঁত আর শৈল্পিক সংযমের এক অনন্য রূপকার যে তা যে-কোনো ভাষার প্রধান শিল্পীর কাছেই এক অবিশ্বাস্য অর্জন বলে মনে হবে। পার্থক্য আছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও। কোনো কোনো লেখককে পছন্দের ক্ষেত্রেও আছে এই ভিন্নতা। ১৯২৪ সালে যখন তাদের সাক্ষাৎ হলো বুয়েনোস আইরেস-এ তখন ইংরেজ লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং নিয়ে বেশ খানিকটা তর্কই হয়েছিল দু'জনের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত জাতীয়তাবাদী ছিলেন না, ছিলেন না অন্ধ ইংরেজবিরোধীও, তাই বলে ইংরেজতোষণের নীতিও কখনও সমর্থন করেননি। বহু ইংরেজ লেখকই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয়, তারপরও কিপলিংয়ের জাতিবিদ্বেষী মনোভাবকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মেনে নেননি। অন্যদিকে কিপলিংয়ের রচনাশৈলী বোর্হেসের এতটাই প্রিয় ছিল যে সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা তাঁর কাছে গৌণ হয়ে গিয়েছিল। এই বৈপরীত্য সত্ত্বেও- বোর্হেস ও রবীন্দ্রনাথ- জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে ছিলেন অভিন্ন অবস্থানে। দু'জনই জাতীয়তাবাদের ঘোরতর সমালোচক। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপযাপন উপলক্ষে যখন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর পক্ষ থেকে লেখার তাগিদ এলো, তখন ঘটনাক্রমে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ (Nationalism) নামক গ্রন্থটিকেই তিনি বেছে নিলেন আলোচনার জন্য। এবং বোর্হেস সেখানে 'প্রাচ্যীয় বিচ্যুতি' সত্ত্বেও অকুণ্ঠ সমর্থন জানালেন রবীন্দ্রনাথকে। বোর্হেসের সাথে ওই সাক্ষাতেই কিপলিং নিয়ে বিরোধ হলেও, ফরাসি কবি বোদলেয়ারকে অপছন্দের ক্ষেত্রে ছিলেন অভিন্ন। পৃথিবীর এতসব লেখক সম্পর্কে বোর্হেস লিখলেন, কিন্তু আধুনিকতার প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত বোদলেয়ারকে নিয়ে একটি প্রবন্ধও লিখলেন না। রবীন্দ্রনাথও কখনও এই ফরাসি কবিকে নিয়ে লেখেননি কোনো প্রবন্ধ।
আরও একটি মিলের কথাও এই সূত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, তা হচ্ছে জার্মান ও ফরাসি ভাষা শেখার ব্যাপারে উভয়ের আগ্রহ। রবীন্দ্রনাথ কৈশোরে এই দুটো ভাষাই শেখার চেষ্টা করেছিলেন এবং উভয় ভাষায় বিশেষজ্ঞের সহায়তায় তিনি এই দুই ভাষার একাধিক কবির কবিতা অনুবাদও করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনে, যাঁর ৯টি কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন। আর ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন ভিক্তর ইউগোর ছয়টি আর জঁ-পিয়ের ফ্লরিয়াঁর একটি কবিতা। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য এই ভাষা দুটি আরও বেশি ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য সময় দিতে পারেননি। কিন্তু বোর্হেসের ক্ষেত্রে ঘটনা ছিল একটু অন্যরকম। ১৯১৪ বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে আগে বোর্হেসের বাবার চোখের চিকিৎসার জন্য যখন গোটা পরিবার জেনেভা পৌঁছান, তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় সেখানেই তারা ১৯১৯ সাল পর্যন্ত থেকে যেতে বাধ্য হন এবং বোর্হেসকে ভর্তি করা হয় সেখানকার এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এই সময় তিনি লাতিন, জার্মান ও ফরাসি ভাষা শেখেন। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, জার্মান শিখতে গিয়ে তিনি দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দ্বারা প্রতিহত হওয়ায় হাইনে পড়া শুরু করেন। এ ছাড়া নিটশে এবং শোপেনহাওয়ারও তিনি জার্মান ভাষায় পড়েন। কিন্তু কবিদের মধ্যে হাইনেই হয়ে উঠেছিল তার প্রথমদিককার পাঠ।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]