'নদীর যে দিকটা কচুরি ঠেকে সবুজ-বেগুনি হয়ে আছে, জলিলের নেশা ওই দিকেই। অথচ খলিল কিনা পারতপক্ষে দামের জঙ্গলে ঢুকতে চায় না। দামের জঙ্গলে নাও একবার ঢুকে পড়লে তাকে নানান ব্যারাচ্যারা পোহাতে হয়। তুমি যতই জল কেটে, পানা তুলে পথ কর না কেন- ভুলভুলাইয়ার ভেতর তোমাকে পড়তেই হবে।'
'এই রকম দিনগুলিতে রোদ্দুর বরাবরই চড়তা থাকে। যদিও মাথার ওপর ধূমল মেঘের চাঙারি বৃষ্টি নিয়ে ভেসে বেড়ায়। ভাসতে ভাসতে উড়ে চলে যায় বহুদূর।'
কিংবা 'ফুটে ওঠা ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেক দিন বাদে কোনো মফস্বলি সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল।'- এমনসব সূচনাবাক্যে সুষমামণ্ডিত পাপড়ি রহমানের গল্পগুলো। এই তিনটি সূচনাই পাপড়ি রহমানের 'করুণ ক্যাসিনো' গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া। যেখানে সংকলিত হয়েছে লেখকের বিভিন্ন স্বাদ ও স্বভাবের বিচিত্র আয়োজনের দশটি গল্প। গল্প দশটি হলো- 'গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ', 'ফাগুনবউ', 'নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত', 'হলদে ফুলের বিকেল', 'জলময়ূরীর সংসার', 'উড়ন্ত গিরিবাজের ইন্দ্রজাল', 'হিলুয়াছড়া ও বৃষ্টির সংহরণ', 'রাজনীতিবিদের স্ত্রী', 'হাওয়াকলের গাড়ি' এবং 'বনভূমি ও ঝিরির সংহরণ'।
শিরোনামের মতোই বহুবিচিত্র এই গল্পগ্রন্থের সমাজ ও জীবনবাস্তবতা। কোথাও নদীবিধৌত জীবন, কোথাও-বা শান্তিনিকেতনের শান্ত স্থবির দৈনন্দিনতা; আছে অরণ্যের নিবিড় পরিবেশে জীবনের ভিন্ন অভিজ্ঞতার বয়ান। আবার শহরজীবনও আছে, আছে আমাদের অতিচেনা ঐতিহাসিক চরিত্রের নবমাত্রিক উপস্থাপন। পাপড়ি রহমানের গল্পগুলো যেমন পাঠককে নতুন নতুন চমকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে, তেমনি কথাসাহিত্যিকের অত্যাবশ্যকীয় আরেকটি গুণ- ভাষার নির্মাণে সচেতন পাঠকমাত্রই পুলকিত হবেন বলা যায়। ভাষিক এই প্রচেষ্টায় লেখক কাহিনির চেয়েও যেন ঢের বেশি সচেতন।
বইটির প্রথম গল্প 'গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ' গল্পে লেখক বর্ণনা করছেন- 'শুধু ফুলের জন্যই জলিল দামরাজ্যে ঢুকতে চায় এমন নয়। এন্তার ফুল সে তোলে। ফুলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু টাগইয়ের থোপাও সে নাওয়ে টেনে তোলে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে, ওই থোপা থেকেই দুই-পাঁচটা কইমাছ পাওয়া যায়। থোপার নিচে চুলের গুচ্ছে প্রায়ই কইমাছ লটকে থাকে। যেদিন দুইটা-তিনটা কইমাছ জলিল তুলতে পারে, সেদিন তার আনন্দের সীমানার পাঁচিল ভেঙে পড়ে।' এমন বাক্যের পর বাক্যে ঘটনা আর গল্পকে ভাষার লাগাতার নির্মাণে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পাপড়ি রহমান। যা পাঠ করতে করতে পাঠক কথা আর গল্পের পৃথক ক্যারিশমার সমন্বয়ে নতুন এক অনুভূতির ভেতর দিয়ে পার হয়ে যাবেন।
'ফাগুনবউ' গল্পে লেখক বর্ণনা করছেন, 'চান-সুরুযের হিসাব ভরত নির্ভুল রাখে। বিশেষ করে চৈত্রের শেষ পূর্ণিমার খবর শুধু ভরত নয়, বীরভূমের সবাই-ই কমবেশি রাখে। এই শেষ পূর্ণিমাতেই জমে ওঠে দোলের উৎসব। শুর হয় বসন্ত-কীর্তন। আর ম্যালা মানুষের ঢল নামে শান্তিনিকেতনের চত্বরে। আবির ছড়ানো হাওয়া রঙিন হয়ে ওঠে।'
'রাজনীতিবিদের স্ত্রী' গল্পে পাপড়ি রহমান যে রাজনীতিবিদের জীবনের অপরিচিত অধ্যায়ের ওপর নতুনভাবে আলোকপাত করলেন, তিনি আমাদের অবিস্মরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন ব্যস্ততম রাজনীতিবিদের স্ত্রী হিসেবে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের অনুপুঙ্খ কথকতা তিনি মেলে ধরেছেন এই গল্পে; যা পাঠকদের কাছে নতুন এবং একান্তভাবে ধরা পড়বে। গল্পে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ডাকনামই বারবার উচ্চারিত। লেখক বলছেন, 'তাজা-গোলাপ কিংবা ফুলবাগানের মরণ-বাঁচন নিয়ে আরও পরে ভাবা যাবে, আপাতত এমব্রয়ডারি নিয়ে ভাবা যাক। রেণু লেইজি-ডেইজি দিতে চান না রুমালে। কারণ এইটা একটা ফাঁকিবাজি সেলাই। তাছাড়া এই সেলাইয়ে গোলাপ ভালো করে ফুটবেও না- কাশ্মীরি সেলাইতেও না। গোলাপ ফুটে ওঠে ভরাট সেলাইয়ে। রেণুর মনে আরও একটা সুপ্ত ইচ্ছে রয়েছে- দুটি সবুজ পাতা আর লাল গোলাপের কুঁড়ির নিচে নিজের নামের আদ্যক্ষর ইরেজি 'আর' অক্ষরটা বসিয়ে দেবে। এই 'আর' সে বসিয়ে দেবে নীল সুতায়; ধীরে-সুস্থে- একেবারে নিখুঁতভাবে সেলাই করে।' এভাবে একজন রাজনীতিবিদের সহধর্মিণীর জীবনের একান্ত বাস্তবতা লেখক ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকেই একেবারে চাক্ষুষ দেখার মতো করে বর্ণনা করে গেছেন। পুতুল খেলার বয়সের আগেই রেণুর বিয়ে হয়েছিল মুজিবুরের সঙ্গে। মুজিবুরের তখন চৌদ্দ বছর বয়স। বাবা-মাহারা রেণুর বয়স তখন তিন। জীবনের প্রারম্ভকথা থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু ও ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের যৌথ জীবনের ধারাবাহিকতাকে লেখক নিজ শক্তিতে জোড়া লাগিয়েছেন গল্পের কাঠামোর মাপে। যেখানে রেণুই প্রধান, তাঁর জীবনের ত্যাগ ও প্রেরণা নিয়ে।
লেখক লিখছেন, 'রেণু ঢাকায় এসেছে মাত্র মাস দুয়েক আগে। মুজিবুরের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে শতগুণ। আজ মিটিং তো কাল ওই কনফারেন্স। ... আজকে কলকাতা তো আগামীকাল করাচি- এই চলছে হরদম। গোপালগঞ্জে যাওয়ার একেবারেই সময়-সুযোগ পায় না মুজিবুর। ফলে রেণুকেই ঢাকায় চলে আসতে হয়েছে।'
এভাবে নানা মাত্রায় নানান সমাজবাস্তবতার বিচিত্র চরিত্রকে পাপড়ি রহমান তাঁর গল্পে স্থান দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন স্বরে ও সুরে। তবে সেই বিচিত্র জীবনের উপস্থাপনে লেখকের ভাষাগত পরিমিতিবোধের হিসেবি সঞ্চরণ গল্পগুলোকে যেন এক ধ্যানে নিবদ্ধ করেছে। পাঠক সেই ধ্যানে আবিষ্ট না হয়ে পারবেন না।