কেমন হচ্ছে একুশ শতকের বাংলাদেশের কবিতা? কেমন লিখেছেন গত শতাব্দীর আশি-নব্বইয়ের কবিরা? কোন শিল্পবোধে আমরা বাস করছি শতাব্দীসন্ধিতে? এসব প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ সামনে রেখে বাংলা কবিতার ধারায় বাংলাদেশের সমকালীন কবিতার স্বরূপ সন্ধান করা হয়েছে 'শতাব্দীসন্ধির কবিতা : দিশা ও বিদিশা' গ্রন্থে। লিখেছেন বেগম আকতার কামাল। সেখানে উঠে এসেছে লেখকের কবিতা চিন্তা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ।
বইটির সূচিক্রম সাজানো হয়েছে- 'শতাব্দী শেষের কবিতা : পরিসর ও ধরন', 'একুশ শতকে কবিতার হালচাল', 'বাংলাদেশের কবিতার ভাষা', 'কবিতায় সময়ের স্রোত', 'খোন্দকার আশরাফ হোসেনের নির্বাচিত কবিতা : স্বজ্ঞা ও প্রজ্ঞার যৌগপদ্যে মানবিক সংবেদন', 'মাসুদ খানের কবিতা : বস্তু ও প্রাণপ্রৈতির চক্রমণে জীবন প্রপঞ্চ', 'হাজিফ রশিদ খানের কবিতায় আদিবাসীর স্বরচিত্র :কেন্দ্র-প্রান্তের যুগলবন্দি', 'সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের পুলিপোলাও : নির্বাসন-দণ্ডিতের আত্মবিলাপ', 'বায়তুল্নাহ্‌ কাদেরীর কাব্যযাত্রা : চিন্তাভ কারুবাসনা', 'চঞ্চল আশরাফের কবিতা : দৃশ্যের দৃশ্যান্তর', 'জেনিস মাহমুদের ডুবন্ত অক্ষর :নীরবতার মরমানন্দ' এবং 'ওবায়েদ আকাশের বাছাই কবিতা :শব্দকুশল বাকশিল্পায়ন'।
পূর্ব দশকের কাব্যঋণের পাশাপাশি ঐতিহাসিক চেতনা, পূর্ববর্তী ও চলমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাব্যচেতনার শক্তি জোগান দেয়। সুতরাং দশকের একটি প্রভাব নব্বইয়ের কবিদের ওপর পড়েছে এবং তা অন্য দশকের চেয়ে আলাদা।
দশকভিত্তিক সাহিত্য ভাবনা অভিনব নয়, তবে সম্প্রতি দশকভিত্তিক সাহিত্য বিচার-বিশ্নেষণ, আলোচনা-সমালোচনার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লক্ষণীয়। এই দশকভিত্তিক সাহিত্য ভাবনা নিয়ে পণ্ডিতমহলে যথেষ্ট মতবিরোধ থাকলেও ইতিহাসের পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এ রীতি প্রায় সবাই মেনে নিয়েছেন। তিরিশের দশকের নতুন সাহিত্যধারা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে দশকভিত্তিক ভাবনার শুরু হয়েছিল। ফলে দশকভিত্তিক সাহিত্য ভাবনা একেবারে যে আনকোরা নয়, তা বলা বাহুল্য। সুতরাং বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সাহিত্যে দশকভিত্তিক সাহিত্যের বিভিন্ন শ্রেণীকরণ, বিষয়বস্তু ও চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের প্রয়াস চলেছে। এ বিষয়ে মূল প্রশ্নটি অন্যত্র, অর্থাৎ দশকভিত্তিক এই সাহিত্য ভাবনায় আমরা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সাহিত্য প্রকৃতার্থেই পাচ্ছি কিনা? নাকি শুধুই কালিক সীমারেখা এই দশকভিত্তিক ভাবনার মূল হিসেবে কাজ করছে?
সত্তরের দশকের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগার্তি, স্লোগানধর্মী, ভায়োলেন্সমূলক শব্দানুষঙ্গের পরিবর্তে আশির দশকে চর্চিত হতে থাকা মন্ময়ধর্মী, স্বজ্ঞাবাদী দার্শনিকতা-বিজ্ঞানবোধি আর ঐতিহ্য ও লোকায়ত সংস্কৃতির পরিচর্যা বিষয়াদি থেকে শুরু করে রচনাকৃতির ভাবকল্প, অর্থ ও শিল্পসৌন্দর্য নানান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবহুল বই এটি।
'জন্মের আগেই আমি মৃত্যুকে করেছি আলিঙ্গন
আমার কোনো দেশ নেই, ভাষা নেই, জাতি নেই-
ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পুণ্যের ভেদাভেদ নেই
জীবনের বীভৎস রূপ দেখে জন্মের আগেই-
আমি ক্রন্দনকে গিলে ফেলেছি।'
এ রকম মানবিক ভাষায় কবিতার ভাববস্তু তুলে ধরেছেন বইটিতে। বাস্তবতা প্রতিসরিত হয়েছে কাব্যিকতায়, এখানে মর্মান্তিক স্বর নেই; আছে ঘটনার চিত্রলিপি, পুরো দৃশ্যপটে মানবিকতা।
বইটিতে অকবিতা থেকে কবিতায় ফেরার কালপর্ব হিসেবে আশির দশককে দেখা হয়েছে। আরও বলা যেতে পারে, তারল্য থেকে গাঢ়তায়, কাতরতা থেকে দৃঢ়তায়, স্লোগান থেকে ব্যক্তির অন্তর্মুখ উচ্চারণে প্রত্যাবর্তনের কাল এটি। কিন্তু কেমন করে তা হলো? আজ বোধগম্য এবং খুব ভালো করেই বোঝা যায়, আশির অন্তিমের ওই চেষ্টায় কবিতা যতটা ফিরেছে শিল্পে, ততটা জীবনবোধে ফিরতে পারেনি। সেই লক্ষ্যটিও তখনকার কবিতায় তেমন প্রকাশ্য হতে দেখা যায় না। এই ফেরা বাধ্যতামূলক নয়; অন্তত তখন, কেননা সৌন্দর্যে ফেরার প্রয়োজনটাই ছিল সে সময়ের বাস্তবতা।
'এখানে জলাজংলা, পলিবাহিত মাঠ আছে
পৃথিবীর নিভৃত ক্রোড়ে শরীরের বাকল খুলে উড়ছে দুরন্ত শৈশব
ঠোঁটে কাদা মেখে যে শালিক ধান খুঁজে খেত
আর মাছরাঙা ঝুপ করে ঠোঁটে তুলে নিত মাছ-
তাদের শৈশব থেকে যৌবনে তুলে এনে দেখি- আজ তার গাছ-ঝোপ বাড়ির
উঠোন ছেড়ে জুড়ে বসেছে পরা-পৃথিবীর বিস্ময়...'
শহুরে যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে প্রকৃতির অপরূপ মাধুর্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার যে আনন্দবোধ, তা এমন কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায়। কোনটি পরা পৃথিবী? নিসর্গজ শৈশব নাকি বর্তমানের শহুরে যান্ত্রিকতা? ওবায়েদ আকাশের কবিতায় এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। 'ওবায়েদ আকাশের বাছাই কবিতা :শব্দকুশল বাকশিল্পায়ন' অধ্যায়ে এ বিষয়গুলো চমৎকারভাবে উপস্থাপন হয়েছে।
বেগম আকতার কামালের সাহিত্যমান ও তাঁর কবিতা চিন্তা নিয়ে দু'চার কথা লেখা সত্যিই দুঃসাধ্য কাজ। এত বিশাল শব্দভাণ্ডার এবং বাক্যের সম্মিলন, যা সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণভাবে ধরতে না পারলে লেখার অনেক মর্মার্থ অধরাই থেকে যাবে। তবে এ রকম সাহিত্য সবার জন্য নয়- গবেষক, পণ্ডিত ব্যক্তিসহ নির্দিষ্ট একটি পাঠকগোষ্ঠীর মাঝেই এ রকম বইয়ের বিস্তার বেশি।
তবে সাহিত্যজগতে এ ধরনের গবেষণামূলক বইয়ের বিকল্প নেই। আশি-নব্বইয়ের দশকের কবিতার অন্যতম প্রপঞ্চ ছিল প্রাকৃতায়ন চর্চা। বস্তুভারাকীর্ণ নানান বিষয়ের খণ্ডন রয়েছে বইটিতে। া
'মাসুদ খানের কবিতা :বস্তু ও প্রাণপ্রৈতির চক্রমণে জীবন প্রপঞ্চ' অধ্যায়টি কবিতার এক নতুন জগতে প্রবেশ করিয়ে দেবে। এর অন্তর্মূলের নিজস্ব শৈলী ও অন্তর্নিবিষ্টতা আধুনিক বোধ ছাড়িয়ে বর্তমানতার চারিত্র্য গঠনে মনোনিবেশী।
'বহমান সময়লগ্নে বোধের উদ্ভাসনই কবিতা
কখনও তা সময়ের উত্তাল স্রোতে সাঁতরায়
কখনও-বা নতুন বাঁকে এসে খুঁজে ফেরে
বোধাতীত জাফরানি রোদের রং
শতাব্দীসন্ধিতে কবিতার আকাশে চমকায় মেঘবিদ্যুৎ
দিশা-বিদিশার হয়ে ওঠে চলচঞ্চল চরৈবেতি
কবি-কুমোরের ঘূর্ণ্যমান চাকায় রস পায় জীবনকলস...'