আবে ওই রমিজ মিয়া, 'বউ ভাগছে কিল্লাই? বিবাদ করছোনি মিয়া?'
মুদি মালের দোকানের আবুল কাকার কাছ থেকে সব বাজার করে রমিজউদ্দীন। ভালো সম্পর্ক। হঠাৎ এমন করে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করায় মেজাজটা খারাপ হলো তার। কথার উত্তর না দিয়ে সরে গেল সেখান থেকে।
তাকে দেখেই চায়ের দোকান থেকে একজন বলে উঠল-
'যে না খোমার ছিরি, হ্যালায় আবার অইবার চাহে কমিছনার।'
চায়ের দোকানদার ছেলেটাকে ধমক দিয়ে বলে উঠল-
'অছমায় দেইখা ভাইজানরে অছনমানি করতাছস কেল্যা?'
রমিজউদ্দীন বিরক্ত হলো চরমভাবে। মানুষ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত কেন ভাবে? তাদের কেন এত মাথাব্যথা বুঝতে পারে না। এরই মধ্যে হোটেলের বেলায়েত ভাই এগিয়ে এসেছে কাছে-
'বাইজান, ভাবিজি নাখোশ হইছে কিল্লাই?'
কোনো কথার জবাব না দিয়ে বেলায়েত ভাইয়ের কাঁধে ছোট্ট একটা চাপ দিয়ে বাসার দিকে রওনা হলো রমিজউদ্দীন, বাজার না করেই।
পুরান ঢাকার ছক্কু ব্যাপারী লেনের বটতলার পাশের রং ওঠা দ্বিতীয় বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা এই রমিজউদ্দীন। নিচতলায় থাকে তারই চাচাতো এক ভাই। ওপরের তলায় বাবা-মা মরা রমিজের সংসার। শান্তিপ্রিয় শান্ত স্বভাবের লোক এই রমিজ। ভালো মানুষ হিসেবে এ পাড়ায় সবাই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু কী যে এক মুশকিলে পড়েছে সে। বাসায় ফিরে গোসল সেরে অফিসে রওনা হয়ে গেল। খাওয়া হলো না কিছুই। অফিস ক্যান্টিন থেকে একটা ডিমের ওমলেট, পাউরুটি আর কফি খেয়ে ওপরে উঠতেই ঘড়ি দেখল বস। বুঝল সে আজ দেরি করে ফেলেছে বেশ। দ্রুত ব্যাগ নামিয়ে ফাইল খুলে বসল। পাশের ডেস্কের রহিম সাহেব এসেই মেজাজ দেখাতে লাগল। একটা কাগজ চেয়েছিল গত পরশু দিন। ওটার জন্যই মেজাজ। ভুলে গিয়েছিল রমিজউদ্দীন। তাই বলে এমন ব্যবহার করবে! তারও হঠাৎ মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সকালের সকল ঘটনার রাগ যেন একসাথে জড়ো হয়ে মাথায় চড়েছে। সেও ঝাড়ি দিয়ে উঠল দ্বিগুণ জোরে। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো অফিসের সবাই তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। এত বছরের চাকরিতে কখনও রাগ তো দূরের কথা, মুখে হাসি ছাড়া কখনোই দেখেনি কেউ।
রহিম সাহেব ঘটনাটা হজম করে নিতে একটু সময় নিল। ধাক্কাটা সামলে উঠেই মুখে রাজ্যের বিরক্তি টেনে বলল-
'এজন্যই তো বউ চলে গেছে। যেমন পোশাকের ছিরি, তেমন তার ব্যবহার।'
বলেই গটগট করে নিজের ডেস্কের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
স্ট্যাচু হয়ে বসে রইল রমিজউদ্দীন। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মানুষ এভাবে প্রতিনিয়ত খোঁচা দিতে পারে! জীবনের এ অধ্যায় অচেনা তার। রমিজউদ্দীনের বুঝে আসে না মানুষের কি খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজ নেই! এই ব্যস্ততার শহরে একমাত্র ভাববার বিষয় হয়ে সেই দাঁড়িয়েছে। তার আশ্চর্য হবার যেন শেষ নেই। আত্মীয়, সহকর্মী, বাজারের লোকজন, সবার আচরণ এই তিন মাসে এত বদলে গেছে যে রমিজউদ্দীন তাদের চিনতে পারছে না। মনে হচ্ছে চেনা চরিত্রগুলো কারও নির্দেশে অচেনা চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করছে। অথবা ঘুমের মধ্যে হাঁটা রোগীদের মতো হাঁটতে হাঁটতে কোনো ভিন্ন জগতে ঢুকে পড়েছে সে। ঘুম ভাঙলেই চেনা পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে। রমিজউদ্দীন মাঝে মাঝে ভাবছে সব ছেড়ে কোথাও চলে যায়, যেখানে কেউ তাকে চেনে না। এভাবে মানুষের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে চলতে পারছে না আর সে। খুন, চুরি, ডাকাতি তো করেনি তবুও সবার আচরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে সে ভয়ংকর কোনো অপরাধী।
পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই রমিজউদ্দীনের মাথাটা যতটা না গোল, তার কদমছাঁটের চুলের ডিজাইনের কারণে আরও গোলাকৃতি মনে হয়। চশমাটার ফ্রেমও গোলাকৃতির। ঢিলেঢালা পোশাকে তার রুচি একটু ব্যাকডেটেড হলেও মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো মনের এই রমিজউদ্দীন। পুরান ঢাকার প্রায় সব মানুষই তাকে ভালো মানুষ হিসেবে চেনে। একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চাকরির সুবাদে এলাকার প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে ছুটতে হয়েছে তাকে। শুরুতে তার পোশাক, চেহারা দেখে তেমন গুরুত্ব না দিলেও তার কথায় এবং সততায় মুগ্ধ হয়ে ইন্স্যুরেন্সে ঝুঁকেছে অনেকে। অফিসেও তার গুরুত্ব কম নয়। তবে তার চশমা বা ঢিলেঢালা পোশাকে তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি হয় সে বুঝতে পারে। কিন্তু এতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। লোকের পছন্দের জন্য সে নিজের অনেক দিনের অভ্যাস বদলাতে পারবে না। যাতে তার আরাম না হয়ে দম বন্ধ হয়ে আসে তেমন পোশাকে সে কখনোই নিজেকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করবে না। তাই টাইট জিন্স, ফিটিং শার্ট সে কখনোই পরবে না। কখনোই পরবে না এটা ঠিক, তবে কখনোই যে পরেনি এমনটা নয়। একবার এবং শেষবারের মতো পরেছিল রমিজউদ্দীন। তবে সে আর কখনও কারও সম্মান বাঁচাতে নিজের স্বকীয়তা হারাতে পারবে না। তার এসব দেখে যদি কারও মানতে ইচ্ছে হয় মানবে। না হয় কোনো দুঃখ বা অভিযোগ নেই রমিজউদ্দীনের।
তিন কামরার দোতলা এই ঘরের একটা বড় ব্যালকনি রয়েছে। ব্যালকনির পাশেই পাশের বাড়ির ছাদ লাগোয়া। রমিজউদ্দীনের সংসারের রান্নাঘর হিসেবে এই ব্যালকনিই ব্যবহার করা হয়। তাই কিছুটা অংশ টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশের গ্রিলে মশারির জাল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। না হলে পাখিদের অত্যাচারে রান্নাঘরে কিছু রেখে শান্তি পাওয়া যেত না। পাশের বাড়ির ছাদে আসা লোকদের সাথে গল্প করা যায়, দেখা হয়। তাই পুরোটা আটকে দেয়নি রমিজ।
রান্নাঘরে চায়ের কাপে এক চামচ চিনি দিয়ে নাড়তে নাড়তে স্নিগ্ধা কথা বলছিল।
-একটা দিনেরই তো ব্যাপার। আপনি একবার চেষ্টা করে দেখেন। খারাপ লাগলে না হয় আর বলব না।
পুরান ঢাকায় বাড়ি হলেও রমিজউদ্দীন চমৎকার শুদ্ধ করে কথা বলতে পারে। কলেজে পড়ার সময় থেকেই এটা রপ্ত করে ফেলেছিল। এলাকার সকলের সাথে ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বললেও কলেজের বন্ধুবান্ধব, অফিস এবং এখন যোগ হয়েছে স্নিগ্ধা- এদের সাথে কথা বলার সময় কেউ বুঝতেও পারবে না যে রমিজউদ্দীন পুরান ঢাকার মানুষ। স্নিগ্ধার কথায় সেও চিৎকার করে উত্তর দিল-
দেখো, এ বিষয়ে আর কোনো কথা নয়। দু'দিন থেকে তোমাকে বোঝাচ্ছি। আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। চা নিয়ে এসো, অফিসে তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।
চেহারায় রাজ্যের মেঘ জমা করে ম্লান মুখে চা হাতে ঢুকল স্নিগ্ধা। রমিজের হঠাৎ করেই বুকের মধ্যে হুহু করে উঠল। এ অনুভূতি বোঝানো যাবে না। স্নিগ্ধার মলিন মুখটা দেখে বড্ড মায়া হচ্ছিল। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছিল-
'তোমার জন্য সব পারব আমি। শুধু মুখের হাসি দেখতে চাই তোমার।'
কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে কঠিন মুখে চা খেয়ে বেরিয়ে গেল অফিসে। সারাদিন অফিসের কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারল না। আনমনা ভাব দেখে সবাই জানতে চাইল শরীর খারাপ কিনা। নানারকম হাসি-ঠাট্টা করল কেউ কেউ। রহিম সাহেব কফির মগ হাতে করে রমিজউদ্দীনের ডেস্কের সামনে এসে চশমার ওপর দিকে বাঁকাভাবে তাকিয়ে বলল-
'আরে মিয়া বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই চেহারার এই দশা! এক-দুই বছর তো নতুন বিয়ের রেশই কাটে না। আর তোমার বউ তো অল্পবয়সী সুন্দরী।'
অল্পবয়সী আর সুন্দরী শব্দ দুটো কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল আর বলার সময় এমনভাবে চোখ টিপল এবং হাসিটা এত নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ যে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু সে সহজে রাগে না। নিজেকে শান্ত করল।
ইন্স্যুরেন্সের মাসিক জমা দেওয়ার টাকা এখনও বকেয়া পড়ে আছে কতগুলো। কয়েকবার ফোন করেও তাদের আনতে পারেনি। রমিজ বুঝতে পারে না। মানুষ নিজের ভবিষ্যতের ব্যাপারে এত উদাস কেন! তাদের টাকা জমা হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য এবং তারাই জমানো টাকা থেকে লাভবান হবে তবুও এই টাকা তুলতে কতইনা পরিশ্রম করতে হয় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির লোকদের। তারপর আবার কিছু কিছু জায়গা থেকে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির টাকা নিয়ে হাওয়া হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের ভরসা পাওয়া কঠিন। শুধু এ দেশেই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তেমন কিছু করতে পারেনি। পাশের দেশ ভারত বা অন্যান্য দেশে ইন্স্যুরেন্সের জয়জয়কার। সবকিছুতেই মানুষ ইন্স্যুরেন্স করে। এসব ভাবতে ভাবতেই হোন্ডা কোম্পানির সেকেন্ড হ্যান্ড বাইকটা ঘুরিয়ে নিল নিউ মার্কেটের দিকে। আজ আর ক্লায়েন্টদের বাড়ি যাওয়া হবে না। যা হবে পরে দেখা যাবে। স্নিগ্ধার মলিন মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বয়সের পার্থক্য এবং রমিজের লাজুক স্বভাবের কারণে সম্পর্কটা যেমন হওয়া উচিত ততটা এগোয়নি ওদের এখনও।
স্নিগ্ধার মামাতো বোনের বিয়ে। বাবা-মা হারিয়ে ছোটবেলা থেকে এই মামার বাড়িতেই মানুষ হয়েছে স্নিগ্ধা। তাই এরাই একমাত্র আপনজন ওর। রমিজ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে যেতে রাজি হয়েছে। কিন্তু ঝামেলা বেঁধেছে অন্য জায়গায়। স্নিগ্ধা বলেছিল রমিজের পোশাকটা একটু পরিবর্তন করতে। এত লোকজন থাকবে সেখানে এমন পোশাকে গেলে সবাই হাসাহাসি করবে এই ভেবেই স্নিগ্ধা কথাটা বলেছিল। রমিজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে স্নিগ্ধাকে সে যেন তাহলে একা গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। তার কোনো আপত্তি নেই। এ নিয়েই দু'দিন ধরে কথা কাটাকাটি চলছে। কিন্তু সকালে স্নিগ্ধার ব্যথাতুর মলিন মুখটা দেখে ভীষণ অস্থির লাগছে রমিজের। এ অস্থিরতার নামই কি তাহলে ভালোবাসা। জানে না এতসব রমিজ। নিউমার্কেটের ভেতরে বাইকটা পার্ক করে লক করে দিল। এরপর চার-পাঁচটা দোকান ঘুরে একটা জিন্সের প্যান্ট, বেল্ট, নীল রঙের একটা শার্ট এবং একজোড়া জুতা কিনে নিল। প্রথম দোকানের ছেলেটা রমিজকে দেখেই হাসছিল। কেমন তাচ্ছিল্য করা সে হাসি। আগুন রং করা চুলের ছেলেটার হাসিতে বিরক্ত লাগল খুব রমিজের। কোনো কথা না বলে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল সে। পেছন থেকে ছেলেটা হেসে হেসে ডাকছিল তাকে-
'ও কাকু, কী লাগবে? আরে দেখেন না, এইখানে সব আছে ... ও কাকু।'
ফিরেও তাকায়নি রমিজ। ছেলেটা আরও জোরে বলল-
'কাকু পোশাকের টেস বদলান।'
সেদিকে না পাত্তা দিয়ে অন্য দোকানে ঢুকে পড়ল সে। অবশেষে ভাই ভাই ফ্যাশন থেকে সব কিনে নিল। দোকানের ছেলেটা খুবই ভালো। আন্তরিকতা দেখে সব খুলে বলেছিল রমিজ তাকে। লোকটার নাম তপন। তপন তাকে জুতা কিনতেও সাহায্য করল। শাড়ির দোকানগুলো ঘুরে তার শার্টের সাথে মিলিয়ে গাঢ় নীল রঙের শাড়ি কিনে নিলো স্নিগ্ধার জন্য।
ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে লজ্জায় রমিজের মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। কোনোরকম বাড়িতে ঢুকে লুকিয়ে রেখেছিল ব্যাগ। রাতে স্নিগ্ধা ঘুমিয়ে পড়লে বারবার মশারির মধ্য থেকে বের হয়ে ব্যাগ দেখছিল। আবার রেখে দিচ্ছিল। স্নিগ্ধা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। রমিজের ঘুম আসছিল না কিছুতেই। কেনা তো হলো, কিন্তু বলবে কী করে স্নিগ্ধাকে যে সে এই পোশাক পরে যেতে চায়।
এই সহজ একটা কথা বলা যে এত কঠিন বিষয়, সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছে রমিজ। সারারাত না ঘুমিয়ে জবা ফুলের মতো চোখমুখ লাল করে অফিসে ঢুকল রমিজ। সহকর্মীদের ঠাট্টায় কান না দিয়ে মন দিয়ে কাজ করছে সে। আগামী তিন দিন সে থাকবে না অফিসে। তাই বাকি কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
ছুটির দরখাস্তটা অনুমোদন করে একটা ফটোকপি করে নিল। সে তার ছুটির ফাইলে দরখাস্তটা রেখে মূল কপি নিয়ামুল সাহেবের কাছে জমা করে বেরিয়ে পড়ল। বাইকে স্টার্ট দিতেই মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, স্নিগ্ধা কি তার ব্যাগগুলো খুঁজে পেয়েছে? জামাকাপড় কি স্নিগ্ধার ভালো লাগবে? চিরকুটের কথা ভাবতেই আবারও লাল হয়ে উঠল তার মুখ।
ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ স্নিগ্ধা জড়িয়ে ধরায় ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল রমিজ। এত খুশি মেয়েটা! বয়সের পার্থক্যের কারণে নিজেকে সব সময় গুটিয়ে রাখে রমিজ। স্নিগ্ধা সত্যিই ছেলেমানুষ। রমিজের জীবনে সেটা ছিল সবচেয়ে মধুরতম মুহূর্ত। তবে তা বিষাদের কালিমায় পরিণত হতে বেশি সময় নেয়নি।
দু'জনে পরদিন ভোরবেলায় রওনা দিয়েছিল। উঠেছিল চাঁদপুরের খানজাহান আলী লঞ্চে। সমস্যা হচ্ছিল আবার সেই পোশাক নিয়ে। প্রথমবারের মতো এই ধরনের পোশাক পরেছিল রমিজ। তাই তার হাঁটা এবং চেহারার মধ্যে যে অস্বাভাবিকতা ছিল সেটা নজর কাড়ছিল রাস্তার সকল লোকের। বিয়েবাড়ির অন্যতম হাসির খোরাক হয়েছিল রমিজউদ্দীন। সকলের বিদ্রুপ আর হাসাহাসিতে লজ্জায় কেঁদে ফেলেছিল স্নিগ্ধা। রমিজও এসব সহ্য করতে না পেরে নিজের অভ্যাসমতো পোশাক পরেছিল জিন্স শার্ট বদলে। তাকে দেখে বিয়েবাড়ি ফেটে পড়েছিল হাসিতে। একজন বলল-
'স্নিগ্ধা, মাথায় তেল দিয়ে মাঝখানে সিঁথিটা কেটে দিলেই ষোলকলা পূর্ণ হয় এবার।'
স্নিগ্ধা লজ্জায় অপমানে ভীষণ কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছিল রমিজকে। জানিয়ে দিয়েছিল সে আর ফিরতে চায় না রমিজের সাথে। এমন সংয়ের সাথে তাকে কিছুতেই মানায় না।
একটা কথারও উত্তর দেয়নি রমিজ সেদিন। স্নিগ্ধাকে রেখেই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না করেই রাতের লঞ্চে উঠে পড়েছিল সে। সত্যিই তো স্নিগ্ধার সাথে যে বড্ড বেমানান সে। নিজেকে এই বয়সে আর বদলানোর সুযোগ তার নেই। তার থেকে স্নিগ্ধার জীবনটা নষ্ট না করে দূরে থাকাই উত্তম। পোশাক যে এত বড় একটা বিষয় হয়ে ধরা দিয়ে জীবন এলোমেলো করে দেবে, সেটা সে কখনোই ভাবেনি।
এসব কথা কী করে বোঝাবে সে মানুষজনকে। আর মানুষকে বোঝানোর কোনো ইচ্ছেও নেই তার। দেখতে দেখতে তিন মাস হয়ে গেল। কোনো যোগাযোগ করেনি কেউ কারও সাথে। তবে রমিজের কেবলই মনে হয় তার একটু একটু করে পোশাকের পরিবর্তন আনা উচিত ছিল স্নিগ্ধার জন্য। মেয়েটা সবার সামনে কত ছোট হয়েছিল তার জন্য। ভুল তারও ছিল। পোশাক সব না হলেও জায়গা অনুযায়ী কিছুটা মানানসই পোশাক পরার অভ্যাস তাকেও গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে বিয়ের ঝামেলা মিটে যাবার পর স্নিগ্ধা প্রতি মুহূর্তে বুঝতে পারে বিয়ের পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেনে নিলেও একেবারে থেকে যাবার সিদ্ধান্তটা কতটা ভয়ংকর। আর সে তো তার মামার বাড়িতে থাকে। প্রতি মুহূর্তে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে ওর। কিন্তু মানুষটা তো একটিবার ফোন করে ফিরে যেতে বলেনি। কী করে যাবে সে? পোশাকটা অদ্ভুত হলেও মানুষ হিসেবে সে ভীষণ ভালো। কতটা আঘাত দিয়ে ফেলেছে, এ কথা ভাবতেই মরমে মরে যায় স্নিগ্ধা। কী করে ফিরে যাবে সে? মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় তার ইদানীং। আজও তাই হলো। কিছুতেই ঘুম আসছে না। এপাশ ওপাশ করে উঠে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। অন্ধকার রাত, কিছুই দেখা যায় না। তবুও তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। যেন অন্ধকারে সকল অস্থিরতা, প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়ানো। মানুষটা নিজের এত বছরের অভ্যাস বদলে নিতে রাজি হয়েছিল শুধু তার জন্য। অথচ কত অপমানিত হতে হয়েছে এত মানুষের সামনে। হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে স্নিগ্ধার কান্না ছড়িয়ে পড়ল নারকেলের পাতায় পাতায়।
স্নিগ্ধা সকাল ৬টার লঞ্চে উঠেই ব্যাগটা রেখে দিল সিটে। তারপর রেলিং ধরে এসে দাঁড়াল। বয়সটা একটু বেশি, আর এমন পোশাক দেখে মন খারাপ হয়েছিল স্নিগ্ধার। তবু মামা-মামির মুখের ওপর কথা বলতে পারেনি স্নিগ্ধা। বিয়ে করছিল রমিজকে। কিন্তু ছয় মাস একসাথে থেকে যেটা মনে হয়েছে, রমিজের মতো ভালোমানুষের খুব অভাব চারপাশে। এত অপমানিত হয়েও একটা কড়া কথা শোনায়নি তাকে। এত ভালো মানুষটাকে শুধু পোশাকের জন্য এমনভাবে কষ্ট দেওয়াটা অন্যায় হয়েছে তার। নিজেকে গালি দিচ্ছে তার ভুলের জন্য। মনের আলোয় যে আলোকিত তার পোশাক যা-ই হোক না কেন, তাতে কিছুই এসে যায় না।
আচ্ছা! অফিস থেকে ফিরে স্নিগ্ধাকে দেখে কী করবে রমিজ! কতটা অবাক হবে? আর তখন তার চেহারাটা কেমন হবে? এসব ভাবতেই অস্থির হয়ে উঠছে ভেতরে ভেতরে সে। তার কাছে বাসার আরেকটা চাবি রয়েছে। হাতের মুঠোয় চাবিটা নিতেই মনটা ভালো হয়ে গেল স্নিগ্ধার। চাঁদপুর ঘাট থেকে বাঁশি বাজিয়ে লঞ্চ ছেড়েছে। বাতাস এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে। স্নিগ্ধা চুল ঠিক করার কোনো চেষ্টাই করল না। একঝাঁক পাখি মেঘমুক্ত ঝকঝকে আকাশে উড়ে গেল প্রায় পানি ছুঁয়ে। হাতের মুঠোয় বাসার চাবিটি শক্ত করে ধরা স্নিগ্ধার। মিষ্টি বাতাসে নির্ঘুম চোখ দুটো বুজে এলো আবেশে।