রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের সার্বভৌম প্রতিভার নাম। বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর স্বাতন্ত্র্য সর্বজনবিদিত। অন্যান্য শাখার মতো নাট্যসাহিত্যেও তিনি অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসের প্রচলিত দুটি ধারা হালের অনুসন্ধানী পাঠকের চোখে অনায়াসেই ধরা পড়ে। একটির উদ্ভব ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে এবং তা ঔপনিবেশিক মনের সৃষ্টি। অপরটি স্বাধীন বাংলাদেশে উপনিবেশমুক্ত পরিমণ্ডলে জাতীয় সংস্কৃতির পুনর্গঠন পর্বে বি-উপনিবেশিক মনের সৃষ্টি। প্রথমোক্তটিতে বর্ণিত ১৭৯৫ সালে জনৈক রুশ পর্যটক লিয়েবেদেভ কর্তৃক প্রযোজিত বিদেশি ভাষা থেকে অনূদিত নাটক 'লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর' নাকি প্রথম বাংলা নাটক। ঔপনিবেশিক ইতিহাস চেতনা অযৌক্তিক বিষয়কে, ঘটনাকে বাংলা নাটকের অপ্রকৃত ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করেছে। উনিশ-বিশ শতকেই এই অসত্য ইতিহাসের বিরুদ্ধে অহীন্দ্র চৌধুরী ও শিশির কুমার ভাদুড়ী, সচীন সেনগুপ্ত প্রমুখের প্রতিবাদও উক্ত ধারার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে।
শেষোক্ত ধারার ইতিহাস গ্রন্থ একুশ শতকের বাংলাদেশে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বি-উপনিবেশিক মনের অধিকারী গবেষকের সৃষ্টি। প্রথমোক্ত ইতিহাস গ্রন্থের বিষয় বিন্যাস প্রথম ভাগ- 'আদিযুগ-১৭৯৫-১৮৭২'; দ্বিতীয় ভাগ- 'মধ্যযুগ- ১৮৭৩-১৯০০'; তৃতীয় ভাগ- 'আধুনিক যুগ-১৯০০-১৯৭০'। আধুনিক যুগের প্রথম অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮১-১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ। এই গ্রন্থের রচয়িতা স্বনামখ্যাত ঐতিহাসিক আশুতোষ ভট্টাচার্য। 'বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস' নামের পুস্তকে তিনি ''বাংলা নাট্যসাহিত্যের ক্রমবিকাশের ধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কোনো যোগ'' দেখতে পাননি। এ সকল ইতিহাস গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটককে স্বতন্ত্র সারণিভুক্ত করে নামকরণ করেছেন 'রবীন্দ্র-নাটক'। ঔপনিবেশিক যুগের চশমায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকের স্বরূপ আবিস্কার করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নাই। তাই বিভ্রান্তচিত্ত ঐতিহাসিক রবীন্দ্রনথের নাটককে বাংলা নাটকের ইতিহাসের ধারার সাথে গাঁথতে পারেন নাই অভিন্ন সূত্রে। ঔপনিবেশিক মনের সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অযৌক্তিক মধ্যখণ্ডনের দ্বারা কণ্টকিত। অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা নাটক ঐতিহ্যের ধারায় বাহিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মৌখিক ও লেখ্যরীতির নাট্যধারা আধুনিক যুগ অতিক্রম করে উত্তরাধুনিক যুগ পর্যন্ত বাহিত হয়েছে। তার প্রবাহ অদ্যাবধি বেগবান। সে-সব নাট্যশরীরে পরিবেশনার রূপটিও বিধৃত। পাঁচালি ও কথকতার রীতিতে উপস্থাপিত সে-সব নাট্যের অঙ্গসংস্থান- বন্দনা, আখ্যান, উপাখ্যান, সংগীত, নৃত্য, সংলাপ ইত্যাদির সমন্বয়ে দ্বৈতাদ্বৈতের নিখিল সৃজন করে। উল্লিখিত নাট্য উপাদান সমন্বয়ে সৃষ্ট নাট্যই ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য। রবীন্দ্রনাথের গীতনাট, নাটগীতশ্রেণির নাটক এবং গদ্য নাটকগুলো ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের ধারায় রচিত। ইউরোপীয় নাট্যতত্ত্বের অনুসারী ইতিহাস রচয়িতা তাই রবীন্দ্রনাথের নাটককে বাংলা নাটকের ধারায় বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
'রাজা' (১৯০৯), 'ডাকঘর' (১৯১২), 'অচলায়তন' (১৯১১/১২), 'ফাল্কগ্দুনী' (১৯১৬), 'রক্তকরবী' (১৯২৩), 'তাসের দেশ' (১৯৩৩) রবীন্দ্রশিল্পী সত্তার পরিণত বয়সের রচনা। কবির একান্ন বছর বয়সের উক্ত সৃষ্টির মূল্যায়নকালে অবশ্য স্মর্তব্য যে, উপর্যুক্ত নাটক রচনাকালে রবীন্দ্র-শিল্পীসত্তা স্বীয় সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখবার অভিপ্রায়ে সুনির্দিষ্ট একটি শিল্পদর্শন উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। স্বতন্ত্র সেই দর্শন জাত সৃষ্টি এক বছর পরই রয়াল সুইডিশ একাডেমি কর্তৃক স্বীকৃত সম্মানিত হয়েছে। কবির জীবনদর্শন ও বিশ্বদর্শন কেবল স্বকালেই নয়, একালেও স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। সুতরাং নাটক রচনাকালে তিনি মতবাদবিশেষের বিধিবদ্ধ ছকে আটকে যাবেন এ-সত্য স্বীকার্য নয়। বাংলার সমাজ জীবনে প্রচল ধর্মমতসমূহের মধ্যে মন্ত্র, তাগা-তাবিজ, ব্রত, উপবাসসর্বস্ব সংস্কার ধর্ম, সনাতন হিন্দুধর্ম, তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, ঔপনিষদিক দর্শন ও বাউল দর্শন ইত্যাদি ধর্মদর্শনের তুলনামূলক বিচারে মানুষের ধর্মকেই শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের ধর্ম বলতে মানুষের ধর্মকেই বুঝাবে। বহুধর্ম মত-পথের দেশ ভারতবর্ষের বঙ্গীয় সমাজ বর্ণশ্রেণি বিভক্ত আধা-সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একটি পুঁজিবাদী শক্তির সঙ্গে যুদ্ধরত। ধর্মোন্মাদ সাম্প্র্রদায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিবদমান দ্বন্দ্ব জাতীয় মুক্তির জন্য আবশ্যক ঐক্যের প্রধান অন্তরায় বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ সকল ধর্মের অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধকরণ প্রয়াসী। নাট্যকারের পূর্বোক্ত প্রয়াস অচলায়তন নাটকের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 'মুক্তধারা'য় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, 'রক্তকরবী'তে বুর্জোয়া যন্ত্রসভ্যতার সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাকৃতজনের বিদ্রোহ লক্ষণীয়। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় ব্যতিরেকে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার নাট্য রচনাকালে নাট্যকারের চেতনায় সমুপস্থিত। নাটকে জীবনের এতগুলো সমস্যাকে উপজীব্য করা নিশ্চয়ই অসামান্য সৃজন ক্ষমতার পরিচায়ক। বিভিন্ন প্রক্ষেপণ বিন্দু থেকে বিচিত্র কৌণিক দৃষ্টি প্রক্ষেপণেই কেবল জীবনের এরূপ নিটোল সৌন্দর্য সৃজন সম্ভব। রবীন্দ্র-নাটকের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য বিচার প্রসঙ্গে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা অপরিহার্য।
শিল্পের সৌন্দর্য রচনায় রচয়িতার সৃজনকালীন ভাবনার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই সময়টি রচয়িতার জন্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ এবং অপেক্ষাকৃত জটিল। প্রথমত রচনাকালে বিষয়টি সম্পর্কে শিল্পী সর্বাধিক নিশ্চিত হন এবং তাঁর উদ্দেশ্য সম্বন্ধেও। দ্বিতীয়ত, রচনার কৌশল বিষয়েও একটি খসড়া তৈরি হয়ে যায় শিল্পীর চেতনায়। অবশ্যই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় পূর্বপ্রস্তুতির ষোল আনাই বদলে যায় কখনও কখনও। প্রকৃতপক্ষে জগৎ-জীবনকে সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণভাবে দেখবার ক্ষমতা এবং অবধারণের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সৃজ্যমান শিল্পে তিনি জীবনের কোন মহত্তর দিকটিকে উপস্থাপন করতে চান তার স্বরূপ। অতঃপর চলে অলংকার-পোশাক-সাজসজ্জার পালা। যে কোনো রচনার জন্য উপরি-উক্ত বক্তব্য সত্য। অনস্বীকার্য সত্য যে, সৌন্দর্য ভাবনার পেছনে ভালোবাসার একটা গুরুত্ব রয়েছে- জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও ভূয়োদর্শনের ব্যাপ্তি এবং গভীরতা সৌন্দর্যের শিখরে পৌঁছতে যে-পরিমাণ ভালোবাসা আবশ্যক একজন স্রষ্টাকে তা সরবরাহ করে। অতঃপর নিগূঢ় ভাবের প্রান্তদেশে অভিগমন চলে সৃজনকৌশল ও বিষয়ের মহত্তম রূপাঙ্কনের প্রক্রিয়ায়। শিল্প বিচার প্রকৃতপক্ষে শিল্পীর প্রত্যক্ষণ, অবধারণ, সৃজননৈপুণ্য ও সৃজনকালীন মানসরূপেরই পরীক্ষণ।
রবীন্দ্রনাথ রচিত 'রাজা' (১৯০৯), 'ডাকঘর' (১৯১২), 'অচলায়তন' (১৯১১/১২), 'ফাল্কগ্দুনী' (১৯১৬), 'মুক্তধারা' (১৯২২) 'রক্তকরবী' (১৯২৩), 'তাসের দেশ' (১৯৩৩) নাট্যকারের প্রবুদ্ধ চেতনার ফসল। উল্লিখিত নাটকসমূহ ইউরোপীয় নাট্য-আঙ্গিকের প্রভাবে রচিত এমন সাব্যস্ত করে সমালোচকগণ বিচারে প্রবৃত্ত হয়েছেন। রূপক, সাংকেতিক নাটকগোত্রীয় বলেও করেছেন অভিহিত। ইউরোপীয় কোনো নাট্যকারের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকগুলো রচনা করেন তারও উল্লেখ পাওয়া যায় বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে। বলা বাহুল্য যে, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের ইতিহাস, শাস্ত্রের চাইতে সমালোচকের চিত্ত দ্বারা অধিকতর শাসিত। সাহিত্য-শিল্পের আলোচনায় তুলনা নয় অনুরূপতা অনুসন্ধানে আমাদের সময় ব্যয়িত হয় পর্যাপ্ত। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির জন্য প্রথমেই আবশ্যক শিল্পের ভুবনে রচনাটির মূল্য কতটা তা নির্ণয় করা এবং তার স্রষ্টার সৃজন ক্ষমতার পরিচয় প্রদান। জীবন ও জগতকে প্রত্যক্ষণের নিজস্ব পদ্ধতি এবং উপস্থাপনের স্বকীয়তা, বিষয়কে ভাব ও রস ধারায় পরিপ্লুত করার প্রয়াস ছিল কিনা তা যাচাই করা। এবং এ-সত্যটিও স্বীকার করা যে, একই বিষয়, অভিন্ন আখ্যান সংবলিত দুই বা দুইয়ের অধিক লেখকের রচনা নিঃসন্দেহে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কারণেই ভিন্ন। অতএব, একজন লেখকের রচনা তাঁরই সৃষ্টি- হতে পারে তা সাদৃশ্যমূলক। অন্য কোনো লেখকের রচনার সঙ্গে সাদৃশ্য অবিকল নকল কী? উত্তর না বোধক হওয়াই সংগত। বহুমুখী রবীন্দ্র-প্রতিভার একটি মুখআদ্যন্ত নাটক সৃষ্টির অভিমুখী ছিল এ কথা বলাই বাহুল্য। নিঃসন্দেহে কবি নাটকের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র একটি পথ রচনার প্রয়াসীও ছিলেন। কবির বক্তব্যটি এতদ্‌বিষয়ে আমাদের ভাবনাকে অগ্রসর করতে পারে কতকটা। কবি বলেন- "একটা সময় এসেছিল যখন আমার গীতিকাব্যিক মনোবৃত্তির ফাঁকের মধ্যে নাট্যের উঁকিঝুঁকি চলছিল। তখন সংসারের দেউড়ি পার হয়ে সবে ভিতর-মহলে পা দিয়েছি; মানুষে মানুষে সম্বন্ধের জাল-বুনোনিটাই তখন বিশেষ করে ঔৎসুক্যের বিষয় হয়ে উঠেছিল।"
১৯৩৯ সালে বক্তব্যটি 'বাল্মীকি প্রতিভা' (১৮৮১) ও 'মায়ার খেলা' (১৮৮৮) সম্বন্ধে উচ্চারিত। প্রথমোক্তটি রচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স মাত্র কুড়ি এবং শেষোক্তটি রচনাকালে আটাশ বছর। মধ্যবর্তী সাত বছরে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার রচনা ব্যতীত শুধু নাটক রচনা করেন কালমৃগয়া (১৮৮২), 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' (১৮৮৪)। কুড়ি বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের 'গীতিকাব্যিক মনোবৃত্তির ফাঁকের মধ্যে' নাটক কেবল উঁকিঝুঁকিই নয়, যথার্থ অর্থেই জায়গা করে নিয়েছে। এবং কুড়ি বছর বয়সেই 'মানুষে মানুষে সম্বন্ধের জালবুনোনিটি' কবির 'ঔৎসুক্যের বিষয় হয়ে' ওঠার কারণ- মনুষ্যত্বের চর্চা, মানুষের ধর্ম ও মানবতার বোধ ইতোমধ্যে তাঁর চেতনাকে একটি লক্ষাভিসারী করেছে। এবং সে পথেই তিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর আরাধ্য দর্শন 'মানুষের ধর্ম' অনুশীলনে তৎপর হন। 'গীতিকাব্যিক মনোবৃত্তির' জন্যই রবীন্দ্র-নাটকে সংগীত এক অনিবার্য চরিত্র। কখনও তা বিষয়ের মর্মগত সত্যের বাহন। কখনও ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক পালা, উপাখ্যানবর্তী আখ্যানে ব্যবহূত সংগীতের মতো চলনের সহায়ক শক্তি। পাঁচালির পরিবেশনার অন্যতম উপাদানের আধুনিক রূপ। সংগীত কখনও সংলাপের পরিপূরক। আখ্যানের হালরূপে ব্যবহূত সংগীত রবীন্দ্র-নাটকে আখ্যানকে পরিণতির পথে পরিচালিত করে। এবং গদ্য নাটকগুলো থেকে সংগীতকে অপসারিত করলে সেগুলো অসম্পূর্ণতাজনিত ত্রুটির অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। অর্থাৎ রবীন্দ্র-নাটকে সংগীত প্রচল নাট্যসংগীত নয়- চরিত্রের মানসিকতা বা পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝাবার তাগিদ প্রসূত নয়।
অর্থাৎ এগুলো ঘটনার অনুষঙ্গী সংগীত নয়, ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের অন্যতম উপাদান। প্রসঙ্গত বলা যায়, ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক- ক. কথা অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট আয়তনবিশিষ্ট কোনো একটি ঘটনার বা ক্রিয়ার অনুকরণ নয়, শ্রুতিসুন্দর ঘাত-প্রতিঘাতপূর্ণ একটি ভাবময়, রূপময় ইতিবৃত্ত বা আখ্যানের ব্যাখ্যাধর্মী উপস্থাপনা;
খ. বর্ণনা অর্থাৎ বহমান আখ্যানস্থ চরিত্রের পরিবেশ, প্রতিবেশ সংক্রান্ত সুললিত কাব্যিক বর্ণনা বা চরিত্রের মনোজাগতিক অবস্থান্তরকে প্রকৃতির চিত্রময় রূপের মধ্যে অবলোকন;
গ. চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে একটা ঘটনা, সময় এবং স্থানগত ঐক্য অগ্রাহ্য করে সংলাপকে আখ্যানাংশে পরিণত করা, কখনও তা সংলাপ;
ঘ. জীবনের ইতিবৃত্ত রচনার প্রয়োজনে নৃত্যকে অনুষঙ্গ না করে মূল বিষয়ের সঙ্গে সমন্বিত করা, বা পাণ্ডুলিপিতে পরিবেশনার অপরিহার্য উপাদানরূপে নৃত্যকে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি,
ঙ. সংগীত অর্থাৎ চরিত্রের মনোভাব প্রকাশক উপাদান, কখনও সংলাপের পরিপূরক উপাদান, কখনও আখ্যানের পরিণতি নির্দেশক চরিত্র ইত্যাদি উপাদান সমন্বয়ে গঠিত।
উপর্যুক্ত তথ্য সূত্রে এ কথা অসংকোচে বলা যায় যে, কথা-বর্ণনা-সংলাপ-নৃত্য ও সংগীত এই পঞ্চ উপাদানে সৃষ্ট ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগীত। বরীন্দ্র-নাটকে সংগীতকে বিশুদ্ধ নাটকের গান রূপে বিবেচনা তাই অসমীচীন। 'ডাকঘর' 'রাজা' 'অচলায়তন', ফাল্কগ্দুনী, রক্তকরবী, 'মুক্তধারা', 'তাসের দেশে, প্রভৃতি গদ্যনাটকের সংগীতের বেলায় কথাটি অবশ্যস্মর্তব্য।
রবীন্দ্র-সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন ভাব। সংগীতেও পরিদৃষ্ট স্থায়ীভাবের ওপর সুরের চলন। গভীরতম ভাব সজীব, সচল চিত্রের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তি পেয়েছে- সংগীতবিশেষজ্ঞ যাকে কাব্যসংগীত বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ ভাব সম্পদে সেগুলো কাব্য এবং বিচিত্র সুরের মায়াজালে অপূর্ব সংগীত। সহজ, সরল শব্দের সুমিত ব্যবহারে সংগীতগুলো সকল শ্রেণির শ্রোতার অনুভব ভেদ্য হবার কথা- কিন্তু রবীন্দ্র-সংগীত প্রকৃত অর্থে তা নয়। ভাব গভীরতায় সে-সংগীত এক অসীমলোকে লীন। তাই রবীন্দ্র-সংগীতের সুরের মাধুর্যে কান-মন জেগে ওঠে- কিন্তু অর্থের-বর্ম ভেদ করা সহজ হলেও ভাবের দুয়ারে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য বটে। রবীন্দ্র-নাটক বিশেষত গদ্যনাটকগুলো বাস্তবিকতাকে অবলম্বন করে রচিত- অথচ কাব্যসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। 'কবির মনোভূমি রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য' যে-যুক্তি বলে, সেই যুক্তিতেই রবীন্দ্র-নাটকে ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি দুর্নিরীক্ষ্য। বাস্তবতার শিল্পিত উপস্থাপনা নানান কলাকৌশল এবং শিল্পভাবনার ও উপকরণের আশ্রয়ে নিটোল সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত। রবীন্দ্র-ভাবনায় নাটক দৃশ্যকাব্য- কাব্যগুণ ও নাট্যগুণ তাতে সমপরিমাণেই অভিপ্রেত। ঘটনা পরম্পরায় আখ্যান উপস্থাপিত হলে নাট্যগুণের আধিক্য সৃষ্টির জন্য দ্বান্দ্বিক অবস্থার ভিতর দিয়ে একটি চরমোৎকর্ষ বা ক্লাইমেক্সে পৌঁছানো অত্যাবশ্যক। সেক্ষেত্রে উপর্যুপরি উৎকণ্ঠা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির প্রয়োজনে এন্টাগনিস্ট, প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের সংঘাতপূর্ণ সহাবস্থান জরুরি। উক্ত বিধি অনুপুঙ্খ অনুসরণ কাব্যসত্য রক্ষার প্রধান অন্তরায়। রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত বিষয়ে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই ক্রিয়াত্মক নাটক রচনার পরিবর্তে আখ্যান প্রধান জীবনের ইতিবৃত্ত রচনা করলেন। তাতে আখ্যান উপস্থাপনায় সতর্কতার সঙ্গে ব্যক্তি নয়, ব্যষ্টির জীবনচিত্র মুখ্য হলো, প্রাধান্য পেল একটি জনপদের মানুষ। চিরায়ত কোনো সত্য হলো প্রতিপাদ্য। 'ডাকঘর', 'রাজা', 'অচলায়তন', 'মুক্তধারা' ইত্যাদি নাটক অবশ্য স্মর্তব্য।
ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক সহস্র বছর কালসীমায় পরিব্যাপ্ত। ইতিহাসের পথরেখায় ক্রমবিকাশের নিয়মে একালের নাগর-সংস্কৃতির পঙ্‌ক্তিভুক্ত হয়েছে সে আপন স্বভাব স্বাতন্ত্র্যে। আসরে আসরে দর্শক-শ্রোতার প্রেম-প্রশ্রয়ে তার রূপময় সৌন্দর্যের প্রকাশ। লীলা-লাস্যে সে স্নিগ্ধ শিল্পের প্রায় সকল শাখাকে একই অঙ্গে ধারণ করে- দ্বৈতাদ্বৈত তার আঙ্গিক। আসরে দর্শক-শ্রোতার প্রেমস্পর্শে তার রূপের যথার্থ উদ্ভাসন- তাই উপস্থিত রসিকজনকে হৃদয়ার্ঘ্য নিবেদন হাজার বছরের দস্তুর। দর্শক-শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের অভিপ্রায়েই ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকে 'আসর বন্দনা' কৃত্য (Ritual), মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষ এর স্রষ্টা বলেই আসর বন্দনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেব-বন্দনা, দিক-বন্দনা এবং স্রষ্টার মহিমাকীর্তন। প্রাচীন মধ্যযুগীয় সমাজ পরিবেশে প্রচল বন্দনা ছিল রচয়িতা এবং গায়েন-অভিনেতার উপস্থাপন কৌশল- কিন্তু কালক্রমে তা নাট্য আঙ্গিকের অঙ্গীভূত হয়ে যায়। কৃত্যপাঁচালি (যাবতীয় মঙ্গল কাব্য), প্রণয়পাঁচালি (প্রণয়োপখ্যান সমূহ), পীরপাঁচালি, পালা (ময়মনসিংহ গীতিকা, পূর্বগীতিকা), লীলাশ্রেণির নাট্যে আসর বন্দনা আঙ্গিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রবীন্দ্র-নাটকে বন্দনা অধিকাংশ স্থলে সংগীতে রূপ পেয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকে নায়কের বা প্রধান চরিত্রের স্থান বদলের সঙ্গে নতুন স্থানের চরিত্রগণ আখ্যানে যুক্ত হয়, পূর্বের চরিত্র প্রায়শই ফিরে আসে না। রবীন্দ্র-নাটকে এই রীতি বরাবর অনুসৃত হয়েছে। আঙ্গিক ও পরিবেশনার বিচারে রবীন্দ্র-নাটক প্রকৃতই ঐতিহ্যসম্ভূত রচনা।