হুমায়ুন আজাদের, শেষ দুটি কাব্যের- কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৮) ও পেরোনোর কিছু নেই (প্রথম প্রকাশ : ২০০৪)- মুখোমুখি হলে আমরা এক দ্রাবিত অভিজ্ঞানের সম্মুখীন হই। এই অভিজ্ঞানকে আমরা বলতে পারি কবির 'লেট স্টাইল', যেখানে সমাপ্তির আলো-অন্ধকার এক অনপসারণীয় ছায়া বিস্তার করে রেখেছে। আমরা দেখি মহৎ নিস্তব্ধতা আর নিবিড়তার আলিম্পন, ছেড়ে যাওয়ার এক আলম্ব নির্মোহ সুর, এক মর্মের নিভৃত উচ্চারণ। আমরা খুব দুরারোগ্যভাবে বুঝতে পারি, কবি এক নিঃসঙ্গ-মন্দ্রতায় সমারূঢ় হতে চাইছেন, এক নিরাসক্ততার উপারম্ভকে স্বাগত করতে চাইছেন। এ কোনো মিষ্টত্বের অন্বেষণ নয়, নয় কোনো বিষয়ের সংশ্নেষণ, বরং তা এক পেরিয়ে যাওয়ার প্রয়াস- অবস্থান ও অবস্থাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উড্ডয়ন, যার পর আর পেরোনোর কিছু থাকে না। এই 'লেট স্টাইলে' মৃত্যু প্রতিফলিত করে এক 'কোর শ্যাডো'- নিবিড়তম আলোছায়া।
মানব-অস্তিত্বের মৌল অবস্থাটিই একক ও অনন্য গতিময়। সে শুধু একাকার হতে ভালোবাসে নিজের ভিতর, আর তার এই অনন্যতা চূড়ান্ত হয়, যখন সে নিজেকে আবিস্কার করে নিঃসম্পর্কিত ও উৎপতিত হিসেবে। অস্তিত্বের অমোঘ সূত্রটি হুমায়ুন আজাদকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এমন এক বিন্দুতে যেখানে কথা বলে স্তব্ধতা, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সার্কাসের সেই অদৃশ্য সুতাটির ওপর, যেখানে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতায় রচিত প্রতিসাম্যে এক উদ্বাহু মনোমোহনে আমরা বিস্মিত হই। এ কোনো গোলকধাঁধা নয়, এ-এক অনন্য জীবনচেতনা, সময় যাকে নিজমতো একা করে। রোদন নেই, তাড়াহুড়া নেই, আছে এক বিভূতি যা অস্তরাগের মহিমায় স্থির এবং উন্মথিত। কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই তিনি যেন চলে এসেছেন এখানে, খোঁজ করছেন সেই কালনদীটির, যা বস্তুত জানাশোনাহীন স্রোতে ভাসিয়ে নেয় সবকিছু, আর তিনি কান পেতে শুনছেন এক অদৃশ্য ও অরব পতন-মুহূর্তের সংগীত :

ক.
কিছুই আমার নয় আজ আমিও কিছুরই নই আর,
আমাকে চেনে না ওই মেথিশাক কুমড়ো ফুল সামাজিক কাক,
কুয়াশায় মিশে যাচ্ছে দিকে দিকে শিশুর চিৎকার,
আমাকে শোনে না কেউ আমিও শুনি না মানুষ বা উদ্ভিদের ডাক।
[এমন হতো না আগে : কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু]
খ.
আমাকে ঘিরেছে আজ কাল আর কুয়াশার রীতি,
না থাকাই সত্য আজ, সত্য শুধু একে একে অনুপস্থিতি।
[রাঢ়িখাল এলে : ওই]
'কুয়াশার রীতি'কে স্মরণ করেছেন তিনি, এ এমন এক অনুপস্থিতির বাস্তবতা, যাকে স্মরণ করলে চোখের সমুদ্র স্তব্ধ হয়ে ওঠে, তার গভীরের সংগীতও থেমে যায়। আরও অনেক নম্যতা, আরও অনেক মৃদুল ভাবনার ম্রিয়মাণ উৎসার চোখে পড়ে যেখানে অবচেতনের এক আধো-অন্ধকার, এক অনতিক্রম্য 'কিয়ারসকিউরো' হাতছানি নেয়, আর আমরা সম্মোহিত হই, আত্মমুখ দেখি এক ঘনান্ধকার আয়নায় :
ক.
... শূন্যতাই পড়বে
তুমি গ্রন্থে গ্রন্থে, আর যা কিছু লিখবে
তার প্রতিটি অক্ষরে লেখা হবে শূন্যতা, শূন্যতাই
পূর্ণ করে রাখবে তোমাকে, যত দিন বেঁচে আছো।
[শূন্যতা : ওই]
খ.
আজ পেরোনোর কিছু নেই, ব'সে আছি- স্তব্ধ, শুনি শূন্য বাতাসের
শব্দ, দেখি অন্ধকার নেমে আসে মাঠে জলে শস্যে শক্তিতে।
[পেরোনোর কিছু নেই : পেরোনোর কিছু নেই]
১৯৯৮ থেকে ২০০৪, এই দীর্ঘ ছ-বছরের প্রান্তসীমায় আবদ্ধ কাব্য-দুটিতে আমরা খুঁজে পাই একটি সুর, যা ব্যাপ্ত থেকে ব্যাপ্ততর হচ্ছে ধীরে ধীরে, তিনি আবাদ করছেন শূন্যতার, স্তব্ধতার, আঁধারের, মৃত্যুর; আর কবিতার পরতে পরতে পাচ্ছি শূন্যতার রূপায়ণ, অন্ধকারের গন্ধ আর মৃত্যুর শীতল স্পর্শ। এই সেই ঋদ্ধ ও অমোঘ একাকিত্ব, রিলকের ভাষায়, 'অন্তরের অনন্তবিস্তৃত একাকিত্ব'।
জন্ম ও মৃত্যু এক একক নিঃসঙ্গ অভিজ্ঞতা যার কোনো আনুষ্ঠানিকতা হয় না, শুধু অনুভব ছাড়া। জন্মের অনুভব মানুষকে ভোরবেলার রোদ্দুরে পাখির কাকলির কথা মনে করিয়ে দেয়, সে হয়ে ওঠে অনুষঙ্গপ্রধান, সংরাগময়, আর মৃত্যুচিন্তায় সে মুখোমুখি হয় অন্ধকারের, আসে মৃতরা- স্মৃতিতে, গোধূলির ঘনরাগে। আমরা ছিলাম, আমরা থাকব না, যেমন তারা ছিল একদিন, এখন আর নেই। এ হলো জাগরণ আর নিদ্রাময়তার অভিভাব, কখনও ভাঙা আয়নায় পূর্ণায়ত অবয়ব, কখনও পুরো আয়নায় ভাঙাচোরা জীবনের ছবি। হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হন নিরর্থকতায়, এসে সটান দাঁড়িয়ে যান পিতার সমাধিতে, আর নিজেই রচনা করেন এপিটাফ : 'পিতার সমাধিলিপি' :
এখানে বিলুপ্ত যিনি ব্যর্থ ছিলেন আমার মতোই
কিছুই যায় আসে না তাঁর যদি ঝরে কবরে শিশির
নিরর্থক এইখানে সবফুল- বকুল বা গন্ধরাজ জুঁই
এখানে তাৎপর্যহীন সব ধ্বনি শব্দ বাক্য পৃথিবীর
এখানে শূন্যতা শুধু সত্য- শূন্যতাই জ্বলে অহরহ
পশুর পায়ের দাগ আর ফুল এইখানে এক অর্থবহ।
মনে পড়ে তাঁর নিজের কথাকে, 'আমার অবিশ্বাস' প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন : 'তবে মৃত্যু সাম্যবাদী, সবাইকে নামিয়ে আনে একই সমতলে; সব সোনার ছেলে অবশেষে চিমনিঝাড়ুদার বালকদের মতো ধুলোয় মেশে, এবং রাজা ও সম্রাটের হাড় প'ড়ে থাকে পাশাপাশি।' সবকিছুই পর্যবসিত চরম নিরর্থকতায়, এক শারীরিক পরিণতির মতোই তা এক মানসিক পরিণতিও। জন্ম আর মৃত্যু হলো সেই বিশাল কিয়ারসকিউরো, যা উদ্বেল করে চলে আমাদের অস্তিত্বের ক্যানভাসকে।
তিনি স্মরণ করতে থাকেন মৃতদেরও, উপলব্ধি করেন তাদের অদৃশ্য উপস্থিতি। তাঁর নিজের ভেতরও অর্গল খুলে যায়, সৃষ্টি করতে থাকেন বিক্ষিপ্ত কোনো আশ্চর্য চৌম্বক-পঙ্‌ক্তি নয়, বরং রচনা করে বসেন এক অভীপ্সিত দাঢ্য নিবিড়-আশ্রয়ের কবিতা : 'প্রিয় মৃতরা', যেখানে তিনি বলেন :
খুব প্রিয় মনে হচ্ছে মৃতদের আজ। সেই সব মৃত যাদের দেখেছি
এবং দেখিনি। তাদের হাঁটতে দেখি দূরে কাছে, একা একা, কণ্ঠস্বর
শুনি খুব কাছে থেকে বুকের ভেতরে।
'যা কিছু চুপচাপ, স্তব্ধ, স্বরহীন' অথবা 'মানুষের সঙ্গ ছাড়া' আর সবকিছু ভালো লাগা, এসব কিছু, 'একা, একলা, বিছানায়' প্রশান্তিময় ঘুম, এসব কিছু কেন আবির্ভূত হয় তাঁর কবিতায়? তাহলে কি তিনি আক্রান্ত হচ্ছেন নিরর্থকতায়? কিন্তু এই প্রতিফলন নিরর্থকতা-উদ্ভূত নয়, এ হলো তাঁর চিন্তাসূত্রের পরিণত উন্মেষ যখন ব্যক্তিক জীবনকে একা করে অনুভবে পূর্ণ করে দেন তিনি। কিন্তু যৌবনেও এই নিরর্থকতায়, এই ঝরে-পড়ার বেদনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি, ভেবেছেন আত্মহত্যা নিয়ে; লিখেছিলেন এ-সংক্রান্ত একটি কবিতা, 'ছাদ আরোহীর কাসিদা'। তিনি নিজেও হয়তো কামু-কথিত 'নিঃসঙ্গ এবং অচেনাবোধ'-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন, ফলে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার কথা বলেছেন ওই কবিতায়। কিন্তু আত্মহত্যাকে তিনি পরবর্তী সময়ে বাতিল করে দেন; বলেন, 'আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, এটি একটি আস্তিত্বিক পাপ। মানুষ তার নিজের ইচ্ছায় মরবে না, বেছে নেবে না স্বেচ্ছামৃত্যু; মানুষকে মরতে হবে মিটমাট না ক'রে।' আসলে তিনি বলতে চেয়েছেন সত্তার এক অমোঘ সংযুক্তি ও উদ্ভিন্নতার কথা, অস্তিত্ব যেখানে অনস্তিত্বের ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে প্রশান্ত কিয়ারসকিউরো সৃষ্টির মাধ্যমে।
তাঁর কবিতায় ভাবনার কগনিটিভ ও ইমোটিভ ব্যবহার লক্ষণীয়। কিছু কিছু কবিতায় আমরা পাই বক্তব্য, ক্রোধ-আহ্লাদের উৎসার, কিছু কবিতায় তিনি আমাদের আবেগকে স্পর্শ করে যান স্বমহিমায়। এ হলো এক অদ্ভুত যোগাযোগ; যখন তিনি কবিতা লেখেন আর আমরা উদ্বেলিত হই, বুঝি এই অনিবার্য বিদায়সুর বেজে উঠেছে, আমরা ঠিক বিষাদগ্রস্ত হই না, কিন্তু আনমনা হয়ে যাই। এ যেন গোধূলির কবিতা, সন্ধ্যার কবিতা, যেখানে অন্যতর বিভাবে রূপমণ্ডিত পৃথিবী; তিনি, কবি, রবার্ট ফ্রস্টের মতো ঘুমিয়ে পড়ার আগে বহুদূর যেতে চান না, এখনি ঘুমিয়ে পড়তে চান। কোনো যন্ত্রণা নয়, নয় কোনো আহাজারি, এক অভাবনীয় থেমে যাওয়ার কথা : '... আমাকে ঘিরেও নামছে ঘন অন্ধকার; নাম ধ'রে ঘুম আমাকেও ডাকে।' আলোর ভিতর অন্ধকার, বা অন্ধকারের ভিতর আলো, এই তো জীবনের 'কিয়ারসকিউরো'। অসাধারণ চিন্তানুভূতি বা থট-ফিলিংয়ের পরিচয়বাহক কবিতাগুলি, যাতে বিষয় ভাবনাকে স্পর্শ করে আবার ভাবনা বিষয়কে ভেতর থেকে রাঙা আর সন্তাড়িত করে তোলে।
হুমায়ুন আজাদ চিন্তাকে পরিণত করেন কবিতায়, কখনও-কখনও পরিস্থিতিকেও পরিণত করেন কবিতায়। আর এই প্রক্রিয়ায় বার্তাও ঘোষিত হয়, প্যারাবলও উচ্চারিত হয়। তাঁর চিন্তা পর্যবসিত হয় না অসৌন্দর্যে, তিনি রচনা করেন উচ্চতম চিন্তার এক নিবিড় শব্দান্যাস, কিট্‌স যাকে বলেছেন এক বিশুদ্ধ স্মরণ, যেখানে কবিতা পুরোপুরিই নিবিড়তম, তার আস্থায়ী থেকে আভোগ পর্যন্ত। তাঁর শেষ জীবনের কবিতাগুলো পড়ে আমরা তাই একাকার হই, এক মানসিক প্রবাহে অনুবর্তী হই, আবার এক স্তব্ধতার সন্নিকর্ষে বিমূঢ় হয়ে পড়ি। কবিতার এই চিন্তার অভিক্রম যে এতটা অর্থকারক বা অর্থকৃত, এবং তা যে পরিশেষে এতটা বিস্ময়কর, কবিতাগুলি না পড়লে হয়তো জানাই যেত না। পাঠ-পরবর্তী প্রবুব্ধতায় আমরা স্থিতপ্রাজ্ঞ হয়ে উঠি; এক বাগ্ধময় নৈঃশব্দ্যের অন্তর্বর্তী হই :
ধ'সে পড়ছে অজেয় পর্বত, সূর্য ছুটে এসে ভেঙে পড়ছে
আমার তরল মাংসে, আগুন জ্বলছে, অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছে,
যেখানে পাখির ডাক নেই, নেই এক ফোঁটা তুচ্ছ শিশির।
অনেক অভিজ্ঞ আমি আজ, মৃতদের সমান অভিজ্ঞ।
[ভাঙন : কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু]
'মৃতদের সমান অভিজ্ঞ'- এই কূটাভাসিত পঙ্‌ক্তিটির কাছে আমরা সটান দাঁড়িয়ে যাই, আনত হতে চাই; মূল্যবিচারের জন্য নয়, প্রজ্ঞাপারমিতার সাথে অনুভূতির সম্পর্ককে স্বচ্ছ ও সহজতর করে দেখার জন্য। আমরা জানি কবিতার কোনো অর্থ হয় না, অর্থ থাকে না, থাকে শুধু অর্থাতিশায়ী অনুভবমাত্র, আর অনুভবই কবিতার অর্থ। তবুও যদি কবির চিন্ত্যপথটিকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো আমরা ধরে নেব এই অংশটিই কবিতাটির আধারসূত্র, যেখানে নানা অনুষঙ্গ ও বর্ণনাকে অনুসরণ করে পাঠক পেতে পারেন নিকষিত বার্তাটি, যা সংকেতভাষ্যের দ্যোতনায় পাঠককে দেবে স্থিতিবোধ।
'মৃতদের সমান অভিজ্ঞ'- তিনটি শব্দ, একটি বাক্য। শব্দ অনেকাংশেই বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করে, আর বাক্য ভাবকে। ফলে শব্দবাহিত যে সঞ্জননী-বাক্য তার ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয় সংবেদনের যা পাঠকের গভীরে মঞ্জরিত হয়, আর পাঠক অবশেষে দ্যোতনাদীপ্ত হয়ে পড়েন। অতএব কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ যা কবিতা করে থাকে তা সম্প্রসারিত অর্থে হয়, আবার অনেক সময় শব্দহীন যোগাযোগও স্থাপিত হয়। এই পঙ্‌ক্তিটিতে এই দু ধরনের, কগনিটিভ ও ইমোটিভ, অলোকসুন্দর প্রকাশ দেখা যায়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
মানুষ সময়ের হাত ধরে তারই ভেতর দিয়ে বাড়ে, বাড়তে বাড়তে অতিক্রম করে আত্মপরিধি, জীবনের সীমা; সে স্পর্শ করে মৃত্যুকে, তার অভিজ্ঞতা হয় তাদের সমান্তরাল যারা এরই মধ্যে মৃত্যুতে পৌঁছেছে; অর্থাৎ মৃতদের সমান অভিজ্ঞতা, এর বাইরে আর কিছু হয় না। স্মৃতি আর জীবন, একান্ত ও অনিবার, মহৎরা এ দুটিকে একাকার করে দেন : স্মৃতিকে করেন জীবনময় আর জীবনকে স্মৃতিশাসিত। স্মৃতি হলো পরাগ্ধমুখ, পুনরুদ্ধারময়, বারে বারে সে ভাবাতুর করে জীবনকে, আর জীবন স্মৃতিকে করে রাখে ল্যাপিস্‌-ল্যাজুলি। সময় রহস্য করে, স্তব্ধীভূত করে অনেক কিছুকে। জীবন এ সবের ওপর চোখ বোলায়, সে দেখে নেয় এর সম্ভাব্যতা আর অতীতক্রিয়ার পতনধ্বনি। জীবন প্রোথিত থাকে আলো-অন্ধকারে, সে শিকড় ছড়ায় দু'দিকেই; এবং এক সময়ে একটি জায়গায় আলো-অন্ধকার পরস্পর মুখ দেখাদেখি করে। আলো-অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার সেই পরামুহূর্তে জীবন আচ্ছন্নতাগ্রস্ত হয়, তার অভিজ্ঞতায় আসে এক নির্মিতির অন্তঃপুর যেখানে জীবন মৃত্যুমুখী আর মৃত্যু জীবনমুখী, সে বোঝে এই দুইয়ের রূপ এবং প্রসঙ্গ। আর ব্যক্তি এক স্মরণবিধুর আবর্তে পড়ে যান, অনুভব করেন অদৃশ্যকে, দ্যাখেন অনুপস্থিতদের। জীবন আর মৃত্যু এক অন্তহীন প্রকাশে সংলগ্ন। ব্যক্তি অনুভব করে এর অন্বিষ্ট ভিত্তি। জীবিতরা পরিসর খোঁজে মৃতদের মাঝে, মৃতরা জীবিতদের মাঝে। অদ্ভুত সামীপ্য, যখন একে অপরের মাঝে বিলীন হতে চায়। এভাবেই একাকার হয় দেখা-অদেখা, উপস্থিতি-অনুপস্থিতি, স্থান-কাল; জীবিতদের কাল মৃতদের স্থানে রূপান্তরিত হয়।
হুমায়ুন আজাদের কবিতা শুধু বোধপ্রধান নয়, মস্তিস্ক-নিয়ন্ত্রিতও। তা নয় যুক্তিবৈধতাহীন, বরং চিন্তা ও বোধ এখানে একে অপরকে এগিয়ে নিয়ে যায় কবিতার সেই পরমসীমায়, যেখানে আতশি কাচে একসাথে শরীর ফেলে আলো-আঁধার। এই একা পথে সারাজীবন হেঁটেছেন তিনি, এই একা পথে, যে পথ ধরে হাঁটতে হয় স্বতন্ত্র ও যশস্বী হতে গেলে, হাঁটতে হয় মৃত্যুর আগে ও জন্মের পরে, হাঁটতে হাঁটতে একা হয়ে যেতে হয়, একা হয়ে ঢুকতে হয় স্বপ্টেম্ন ও জীবনে, একা হেঁটেই আসতে হয় পার্থেননে। কী মারাত্মক বাচন যখন পদচিহ্ন পড়ে থাকে একা তপ্ত বালুতে, আর প্রান্তীয় এলাকায় হেঁটে যান সেই একক ব্যক্তিত্ব, আকাশই যার শেষ ঠিকানা। আমরা পড়তে পারি সেই সমাপ্তিপঙ্‌ক্তি যা বিবেচিত হতে পারে, হওয়া উচিত, প্রত্যেক কবির আরাধ্য 'প্যারাবল' হিসেবে :
এখন আবার একা পথে নামো,
প্রথম যেমন টলমলো দাঁড়াতে শিখেছিলে
দাঁড়াও, একা হাঁটো,
সম্পূর্ণ নতুন পথে, একা, হেঁটে যাও।
[হাঁটা :কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু]
এই একা হাঁটাই জীবনের বিবেচনা, শিল্পে পৌঁছার জীবনক্রিয়া। সবকিছুকে দেখে অবশেষে রেখে যেতে হয়, একাকিত্বকে সঙ্গী করে হাঁটতে হয় প্রতিনিয়ত একা, নতুন পথে।
এই একা-একাই পায়ে হেঁটে পথ পেরিয়েছেন তিনি, শেষ করতে চেয়েছেন অবশিষ্ট কাজ, 'গোধূলি দেখতে দেখতে' ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কাজ শেষ না হলেও দুঃখ থাকবে না, বলেছেন তিনি; বলেছেন ঘুমিয়ে পড়ার কথাও। ফ্রস্টের মতো ঘুমিয়ে পড়ার আগে দূরে যেতে চাননি তিনি, পথের ওপরই ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন : 'আমাকে ঘিরেও নামছে ঘন অন্ধকার; নাম ধ'রে ঘুম আমাকেও ডাকে।'
তিনি ছিলেন না মৃত্যুময় বা মৃত্যুআচ্ছন্ন, কিন্তু মৃত্যু নিয়ে ভেবেছেন প্রচুর; বলেছেন : 'মৃত্যু কাকে বলে? মৃত্যু হচ্ছে জীবনপ্রক্রিয়ার উল্টোনো অসম্ভব পরিসমাপ্তি; আর ফেরা নেই; আর অগ্রগতি নেই; চিরকালের জন্য থেমে যাওয়া।' ১৯৯৭ অব্দে প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ আমার অবিশ্বাস-এর শেষ প্রবন্ধটির শেষ পঙ্‌ক্তিটি ছিল এ রকম : 'একদিন নামবে অন্ধকার- মহাজগতের থেকে বিপুল, মহাকালের থেকে অনন্ত; কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমি আরও কিছুদূর যেতে চাই।' আর ২০০৪-এ বেরোনো কাব্যগ্রন্থ পেরোনোর কিছু নেই কাব্যগ্রন্থের 'ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে' কবিতায় তিনি বলছেন ঠিক বিপরীতটি : 'এক পা-ও না ফেলে এখনি আমার পথের ওপর/ ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।' তিনি আরও বলছেন : 'নাম ধ'রে ঘুম আমাকেও ডাকে।' কী বিশুদ্ধ স্ববিরোধ, কী অদ্ভুত বাসনার প্রাগল্‌ভ্য। যেতে ইচ্ছে করছে না মাইল-মাইল, পথের ওপর ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছে করে; এ হলো মহৎ কূটাভাস মৃত্যু যার দু'দিকেই টেনে ধরে আছে। এই হলো সেই লেট স্টাইল, সেই অসম্ভব কিয়ারসকিউরো, সূর্যাস্তের সেই অদ্ভুত আলো-অন্ধকার, যার মাঝ দিয়ে আমরা সবাই পথ খুঁজে খুঁজে অবশেষে পথ হারাই।