অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক বিল চিনতে ভুল করে না কোনো পাখিই। এক সময় শীত এলে চিকলির বিলে বসতো পাখির হাটবাজার। এদের কলকাকলি শুনতে ভিড় করতেন ভ্রমণপ্রেমী। করতেন আনন্দ, নিতেন প্রাণ খুলে নির্মল বায়ুতে শ্বাস। চিকলির বিলে মনোরম পরিবেশ তৈরি করতে প্রকৃতির ছিল না কোনো কার্পণ্য। প্রকৃতির বিশুদ্ধ রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এই বিল এখন আরও আকর্ষণীয়। বেসরকারি উদ্যোগে বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দর্শনীয় চিকলি ওয়াটার ও গার্ডেন পার্ক। হাঁটি হাঁটি করে যত দিন যাচ্ছে রংপুরের এই পার্ক হয়ে উঠছে ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে জনপ্রিয়।

শীতে পাখিরা তো বটেই; এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সময়-অসময়ে এখন আসছেন সবাই। নিচ্ছেন চিকলির বিলের সৌন্দর্যের ঘ্রাণ। স্মৃতিতে আর ফ্রেমে ধরে রাখছেন দু'মুঠো বিকেলের মিষ্টি স্মৃতি।

চিকলির বিল কোথায় :শত বছরের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিলটি রংপুর বিভাগীয় শহরের হনুমনতলা এলাকায় অবস্থিত। হালের বিখ্যাত বিলের স্থানটি এককালে সি-প্লেনের ল্যান্ডিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহূত হতো। বেসরকারি উদ্যোগে ২০১৮ সালে চিকলি ওয়াটার পার্কের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এখনও এর ৪০ শতাংশ কাজ বাকি। তবুও ভ্রমণপ্রেমী এখানে নিয়মিত ভিড় করছেন।

যা যা দেখবেন :ভ্রমণকারীদের সুবিধার জন্য চিকলির বিল ভাগ করা হয়েছে দু'ভাগে। বিলের দক্ষিণে গড়ে উঠেছে ওয়াটার পার্ক। আরও রয়েছে বিভিন্ন ওয়াটার রাইড। প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা। বিলের উত্তরে অবস্থিত চিকলি ওয়াটার গার্ডেন। প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। পার্কের পাশেই আছে রিসোর্ট।

বিল পাড়ে বসে থেকে মনোরম পরিবেশ উপভোগ করার জন্য দর্শনার্থীর জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। শিশু ও সববয়সী দর্শনার্থীর বিনোদনের জন্য স্থাপিত হয়েছে মিনি রেলগাড়ি, জেট স্কি, আর্টিফিশিয়াল ওয়াটার ফলস, টয় ট্রেন, বিশালাকার চরকিসহ আরও অনেক মজার মজার রাইড। চরকিতে চড়লেই রংপুর শহরের বার্ডস আই ভিউ পাওয়া যাবে। প্রিয় শহরকে আবিস্কার করা যাবে নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে। এখানে কয়েকটি ক্যানেল আছে। সেখানে রাখা হয়েছে দেশি-বিদেশি রঙিন মাছ। পড়ন্ত বিকেলে মাছের খেলা দেখতে কার না ভালো লাগে বলুন! মন চাইলে স্পিডবোটেও ঘুরতে পারবেন এই পার্কে।

মূলত বিলের মূল আকর্ষণ হলো কৃত্রিম ঝরনা। দিনে তো বটে, সন্ধ্যার পর এই ঝরনা দেখতে বেশি আরাম লাগে। নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে চোখ যেমন ভরে, তেমনি মনও। এ ছাড়া প্রাণ খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার জন্য চেয়ার বা বেঞ্চ তো রয়েছেই।
খাবারের ব্যবস্থা :পার্কের ভেতর আলাদা করে পাঁচটি সিটিং এরিয়ার রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া বাইরে আছে মুখরোচক খাবারের ব্যবস্থাও। চটপটি, ফুসকা থেকে শুরু করে আরও খেতে পারবেন নানা স্বাদের খাবার।

কেনাকাটা :যারা কেনাকাটা করতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য আছে সুখবর। পার্কে ঘুরতে এসে করতে পারবেন কেনাকাটাও। কারণ এর ভেতরে আছে আধুনিক পোশাকের দোকান। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীর জন্য রয়েছে নানা রঙের, নানা ঢঙের পোশাক। ছোটদের
বাহারি ডিজাইনের পোশাক, নারীর সালোয়ার-কামিজ, লেহেঙ্গাসহ পাবেন শাড়ি। আছে পুরুষের টি-শার্ট, পাঞ্জাবিও।

২০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দামের পোশাক এখানে কিনতে পাওয়া যাবে। বিলের মধ্যে কেমন না কেমন কেনাকাটা হবে- এই চিন্তা হচ্ছে! হলে ঝেড়ে ফেলুন। এখানে এত সুব্যবস্থা যে খোশ আমেজে মনমতো কেনাকাটা করতে পারবেন অনায়াসেই।

যেভাবে যাবেন :ঢাকা থেকে বাসে যেতে পারেন রংপুর। ঢাকা থেকে রংপুর এসি ও নন-এসি বাসের ভাড়া হতে পারে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ট্রেন ও লোকাল বাসে করেও যাওয়া যাবে। এতে ভাড়া তুলনামূলক কম পড়বে।

রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রেই হনুমনতলা অবস্থিত। শহর থেকে দুটি পথে এই বিলে আসা যায়। একটি পথে, বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের পাশ থেকে সাগরপাড়া হয়ে আসতে হয়। এই পথে এলে সিটি চিকলি পার্কে আসা যাবে আগে।

অন্যদিকে, শহরের পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে দিয়ে হনুমানতলা বাজার পার হয়ে একটু সামনেই হাতের বামে পড়বে চিকলি ওয়াটার পার্কে ঢোকার প্রবেশ পথ।

শহর থেকে রিকশা কিংবা অটো দিয়ে বিলে সহজেই ঘুরে আসা যায়। ভাড়া জনপ্রতি পড়বে ১০ টাকা। পার্কে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের জায়গাও রয়েছে। তাই প্রাইভেট কিংবা ভাড়া করা গাড়িও নিয়ে আসতে পারবেন।

প্রাণজুড়ানো বিলটি সাড়ে ৫ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে। ৩০ বছরের জন্য নেওয়া হয়েছে লিজ। সবশেষে জানাচ্ছি, গোধূলির সোনালি আলোয় বিলের ধারে বসে সূর্যাস্ত না দেখলে মিস করবেন অনেক কিছুই। স্বচ্ছ পানিতে পড়া সূর্যের আলোয় ডুবে অবেলায় কল্পনায় ভেসে যেতে পারেন আপনি অনেক অনেক দূর। ফুল আর সবুজ গাছগাছালির সমাহারে মনও থাকবে প্রফুল্ল।

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে একটা সুন্দর বিকেল কাটাতে চিকলি ওয়াটার পার্কই হবে যথাযথ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। চারপাশের পরিবেশ যেমন আপনার মন ছুঁবে, তেমনি কাজ করবে মুগ্ধতাও।

ছবি:হায়দার