প্রতিবেশীদের রক্ষণাবেক্ষণের প্লাবনে, তাঁদের শাসন ও শুশ্রূষায় বেড়ে ওঠার মজাটাই ছিল ছোটবেলায়। সে মায়া, সে মমতা বড় হবার সাথে সাথে মরে যায়নি তবে তা অন্যরকম হয়ে গেছে। অনেকটা ছোটবেলার ঈদ আর পরিণত বয়সের ঈদের মতো।
আমার ছোটবেলাটা বাংলাদেশের মিষ্টি মিষ্টি মহকুমা শহরে কেটেছে। অসাধারণ এক মফস্বলি পবিত্রতায় সে বেড়ে ওঠা। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে শুকানো ও সরু ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে এক রাস্তার শহর জলিষুষ্ণ জামালপুরের কথা। প্রায় ছ'দশক আগের গল্প। জনতা পাঠাগারের উলটো দিকেই আমাদের ছিল এক টিনশেড বাংলো মার্কা ভাড়া বাড়ি। বারান্দার কোল ঘেঁষে নীল অপরাজিতা ফুলের লতা। বাড়ির সামনেই বিশাল এক ফলবতী হিমসাগর আমগাছ। গাছের গলায় দড়ির দোলনা। মূল ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন রান্নাঘরের পেছনে সুপারি ও কাঁঠাল গাছের সারি। বড় রাস্তায় না পড়েও সেই সব গাছের ছায়া ছায়া পথ দিয়ে কাঁঠালের মুচি ছিঁড়ে লবণ ও গুঁড়ো মরিচ দিয়ে খেতে খেতে এ-বাড়ি ও-বাড়ির প্রতি প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা কয়ে পুরো পাড়াটাই ঘুরে আসা যেত। বড় রাস্তায় আর উঠতে হতো না।
ওভাবেই নিজামুদ্দিন স্যারের বাসায় অঙ্ক, ইংরেজি ও অর্থনীতি পড়তে যেতাম। যেতে হতো আমার ক্লাসের এবং আমাদের বাড়িলাগোয়া লীলাদের বাসার পেছন দিক দিয়ে, একটা বাঁশঝাড় পেরিয়ে। দিনের বেলা যেমন তেমন, সন্ধ্যে হলে ভূত আর পাগলের ভয় করত। স্যার ছিলেন একটি স্কুলের অধ্যক্ষ কিন্তু আব্বার সম্পর্কে তিনি ছিলেন 'চাচা'। আর এ কারণেই তিনি তাঁর বন্ধুদের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর বিনিময়ে কোনো অর্থ গ্রহণ করতেন না। আমি, মন্টি, মুহিত ও ইকবাল এসএসসি পরীক্ষার আগে প্রতি শুক্রবার সকালে তাঁর লাল বারান্দায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে তিনি উঠতেন। তারপর মশারি সরিয়ে সেখান থেকে প্রায় চোখ বন্ধ অবস্থায় মুখে মুখে তিনটি অঙ্ক দিতেন। আমরা বৈঠকখানে এসে অঙ্ক করতে করতে স্যার ভেতর থেকে চায়ের কাপ হাতে উঠে আসতেন।
ভোরে মসজিদের সুরেলা আজানের পরপরই শোনা যেত হারমোনিয়ামে গলা সাধার স্বর। আমিও আব্বা-আম্মার বকা খেয়ে আমার সেকেন্ড হ্যান্ড জার্মান রিডবোর্ডের হারমোনিয়াম নিয়ে ব্যর্থ সংগীতশিল্পী হলেও 'নিসাগামা পাধানিসা' করতে বসতাম। কুয়ো থেকে তোলা জলে ঝুপঝাপ স্নান করে গরম ভাতে ঘি-ডাল ফেলে মেখে খেয়ে দলে বলে স্কুলে ছুটতাম। পেছনের বাড়ি থেকে আসত লীলা ও রুবি আপা। তাদের লম্বা বাড়ির পেছনে প্রাণেশ স্যারের বাড়ির সামনে দিয়ে আসত রেবা-বেলা-ইলা তিন বোন। সবাই স্কুল ড্রেস পরে বুকের কাছে বইয়ের গুচ্ছ ধরে এসে আমাদের বাড়িতে একত্র হতো। কারণ, আমাদের গেটের বাইরেই বড় রাস্তা। সে রাস্তা ধরে সবাই মিলে গার্লস স্কুলে যেতাম।
আমরা প্রতিবেশী মহিলাদের ডাকতাম খালাম্মা বা মাসিমা। আম্মা প্রায়ই আমাকে বা ভাইয়াকে তাঁদের বাড়ি পাঠাতেন ক্রুশ-কাঁটার নতুন ডিজাইনের জন্য। তাঁরাও দেখেছি আম্মার শাড়ি বা আমাদের জামা নিতে কাউকে না কাউকে পাঠাতেন। ওদের বাড়িতে গেলে ওরা বিস্কুট খেতে দিতেন আর আমরা তাদের পালংকে মশারি স্ট্যান্ডের পিলারের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে খেতাম। তাঁদের সন্তানেরা ছিল যেন পাড়াতুতো ভাইবোন। রুবি আপার বিয়ের সময় সে যোগ্যতাতেই সেজেগুজে গিয়ে বরকে আটকে গেট ধরার জন্য ভাগের টাকা পেয়েছিলাম আর বরের জুতো লুকিয়ে রাখতে গিয়ে একতা খালাম্মার কাছে তিরস্কৃত হয়েছিলাম।
পাড়ার ভদ্রলোকেরা সবাই আব্বার 'বন্ধু' আর আমাদের ভাইবোনদের চাচা কিংবা কাকা! সামাদ চাচা, সুরুজ চৌধুরী চাচা বা ধীরেন কাক্কা। কিন্তু সবারই সমান অভিভাবকের ভূমিকা। স্কুলের পর বিকেলে খেলতে খেলতে দেরি হলে, দীর্ঘ সময় নদীর জলে ঝাঁপালে বাচ্চাদের বকাঝকা করার অধিকার সবার। কেউ কেউ সন্ধ্যায় স্ত্রীসহ বেড়াতে আসতেন। আর সামনে পড়লেই ইংরেজি ব্যাকরণ বা মানসাঙ্ক ধরতেন। আমি অঙ্কে প্রায় বেকুবতুল্য ছিলাম। কী যা-তা এক বিব্রতকর অবস্থা! এ উপদ্রব নিয়ে কিইবা বলি? ছোটবেলা আমাদের সব দায় ছিল একগুচ্ছ লোকের ওপর। কারণ বিনেপয়সায় চোখ রাখার লোকের তো অভাব নেই।
মন্টিদের দোতলা বাড়িটি ছিল কাঠের। সামনেই জবা-টগরের ঝাড়। আমাদের রান্নাঘরের পেছনের দিকটা দিয়েই ছিল মন্টিদের বাড়ির শর্টকাট পথ। ওদের বাড়ি যেতে প্রথমেই পড়ত খোকার-মা আপাদের ছোট্ট নিকানো উঠান। নেহাতই নরম ধরনের অফিস ফেরত দুলাভাইয়ের কাজই ছিল ঘরে ফিরে খোকাকে খুঁজে বের করা। তখন সে শ্যামলা চিত্তচঞ্চল ছেলেটি হয় নদীর জলে বাইম মাছের মতো সাঁতরাচ্ছে, নয় বকুলতলায় চি বুড়ি খেলছে। কিন্তু আপার এ নিয়ে খুব একটা ভাবনা আছে মনে হতো না। তিনি তখন হয়তো আমাদের রান্নাঘরের জানালার এপাড়ে দাঁড়িয়েই আম্মার সঙ্গে তার বিবাহের গল্প করছেন। সেটা কী রকম? সেটা অনেকটা এখনকার দিনের চায়ের টেবিলে আলাপের মতো। আজ ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আমাদের দু'বাড়ির মধ্যে নিশ্চয়ই দেয়াল ছিল না। আপার ছোট্ট সংসারের রান্না চট করে শেষ হয়ে যেত। তখন আড্ডাপ্রিয় আপা তাদের দিক থেকে আমাদের রান্নাঘরের জানালায় হেলান দিয়ে সে পার থেকেই তার বিয়ের গল্প করতেন। একটি গল্প তিনি হয়তো কয়েকবারই আম্মার কাছে করেছেন। না হলে আমার কেন মুখস্থ রয়ে যাবে। আম্মা চুলোর গনগনে আগুনে রান্না করতে করতে লাল হয়ে যাওয়া কপাল মুছে মুছে সে গল্প শুনতেন।
খালাম্মা, বিয়ের দিন সন্ধ্যায় বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে আসার আগে সবাই বলল-
শেরপুর থেকে এতদূর যাবে, বউরে বাথরুম সারাইয়া দেও।
আমি তখন বাথরুমে গেলাম। লাল শাড়ি, গয়না আর নতুন স্যান্ডেল সামলাইয়া খালি বেড়ার ভিতরে ঢুকছি আর অমনি কান্দন আসতে লাগল একদম বুক ভাইঙ্গা। ভিজা বাথরুমে কাঠের পিঁড়িতে বইসাই বদনা দেইখাই সে কান্দন!
কেন রে মা?
ঐটা আমার বদনা। মনে হইলো এই জলের বালতি, ঐ বেঁকা বদনা, বাঁশের বেড়া, চল্টা ওঠা দরজা তাদেরে তো আমি আর জীবনে দেখব না। তারপর বাথরুমেই ফিট হয়ে গেলাম।
সে কী?
হ খালাম্মা, অবস্থা দেখে আমার আব্বাও ফিট!
বলো কী! শুধু তা না আম্মাও।
তোমাদের কি ফিটের রোগ?
না না, ওদেরও যে আমার অবস্থা। খোকার মতোই আমি ছাড়া আর কোনো সন্তান নাই।
কোনো কোনো দিন আপা খোকাকে নিয়েও আসতেন। খুব ভালো কাঁথা বানাতে পারতেন।

শবেবরাতের সন্ধ্যায় কাঠের ট্রে করে আম্মার বানানো শর্ষে-হলুদ বুটের বরফি, ঘিয়ে ভাজা ময়দায় প্রচুর বাদাম পেস্তা দেওয়া সিলেটি 'তোফা শিন্নি'র গোল্লা ও হাতে গড়া কাগজের মতো পাতলা চালের রুটি নিয়ে সব খালাম্মার বাড়ি যেতাম। শবেবরাতে ঈদের মতো বাড়ি বাড়ি খাওয়ার রীতি ছিল না। বরং বিলি শেষে বাসায় এসে পড়শিদের দেওয়া গোলাপি, সবুজ, হলুদ সব ধরনের হালুয়া লাইন করে সাজিয়ে চিমটি দিয়ে দিয়ে চাখতাম। আর এত্তসব প্রাপ্ত হালুয়া-রুটির রেটিং দিতাম। একবার তো এত রকমের হালুয়া ও রুটির ব্যাপক টেস্টিংয়ের পর আমার অবস্থা সঙ্গিন হয়ে গেল। কী যে পেটে ব্যথা! সে ব্যথা আর থামেই না। শেষে উদ্গার তবে শান্তি হলো। কিন্তু এমন সম্ভাবনা থাকলেও সরস্বতী পূজার প্রসাদ খাবার লোভ কখনও ছাড়তে পারিনি।
পূজার ছুটিতে যখন মাইক বাজত আর লাল পেড়ে শাড়ি পরে দলে দলে মেয়েরা আমাদের আমগাছের তলা দিয়েই, প্রতিবেশী নান্নু ভাইয়ের তিলের খাজার দোকানের সামনে দিয়ে দেবী দেখতে যেত, আমরা অপেক্ষা করতাম একজন মানুষের। তিনি বাবার বন্ধু সুরেন কাকা। তিনি মেহগনিরঙা এক সুউচ্চ পুরুষ। হাসলে যুগপৎ রোশনাই ছড়াত তার সোনার বোতাম ও বাঁদিকের সোনাদাঁত থেকে। তাঁর পকেট থেকে উঁকি দিত গুঞ্জা ফুলের গোছার মতো ধূতির সোনালি পাড়। ষষ্ঠী যায়, সপ্তমী যায়, তাঁর দেখা নেই। এদিকে নদীর পাড়ে কাশফুল দোলে আর আমাদের অধীরতা বাড়তে থাকে। এমন সময় অষ্টমীর দিনে দুপুরবেলা হিমসাগর আমগাছের নিচ থেকে হঠাৎ ভেসে আসা সুরেন কাকার মায়াভরা ডাক শুনি।
কইগো মা জননী ...।
কাকা এসেছেন পূজার দাওয়াত দিতে। ব্যস, হয়ে গেল!
কিন্তু সে পূজা শেষ হলে অপেক্ষা করতাম কবে লক্ষ্মীপূজা আসবে আর মন্টিদের বাড়ি গিয়ে মাসিমার হাতের সে আশ্চর্য স্বাদের তিলের নাড়ু খাবো।
===
জামালপুরে থাকতেই আমাদের এক পাগল প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁর কথা না বললে গল্প অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। আব্বা ছিলেন মহকুমা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আর আমাদের প্রতিবেশী প্রাণেশ স্যার ও নিজামুদ্দিন স্যারের বাসার সঙ্গেই লাগানো ছিল মিউনিসিপ্যালিটির পাবলিসিটি অফিসারের বাসা। আমরা তাকে পাবলিসিটি চাচা ডাকতাম। চাচার গায়ের রং ছিল ঘন তবে গলার স্বর ছিল তার চেয়েও ঘন। তাঁদের চা দিয়ে আসতে বা খালি কাপ উঠিয়ে নিতে যা আলাপ শুনতাম তাতে মনে হতো ওরা দু'জনই শহরের তাবৎ পাগল নিয়ে গবেষণা করছেন। চাচা চা রেখে চোখ বুজে থাকতেন। হাতের মুঠোবন্দি সিগারেট পুড়ে পুড়ে ছোট হয়ে যেত। আগুন তার হাতে ধরার আগে চোখ খুলে বলতেন-
বুঝলেন ভাইজান, এদের মধ্যেই কোনো একজনকে জামালশাহ শহর কুতুব করে রেখেছেন।
তবে আমরা সাধারণ মানুষরা তো তা চিনব না।
ওঁরা তাহলে আমাদের সামনে পাগলের ভেক ধরে আছেন। আমাদের বারান্দার তিনিও?
হ্যাঁ।
এরা প্রত্যেকেই মহা বুজুর্গ ও আধ্যাত্মিক?
আমার মনে হলো ওরা সারা শহরের পাগলদের কীভাবে সমাদর করা যায় তাই গবেষণা করছেন। পাগলদের সন্তুষ্ট রাখলে ভাগ্য মিরাকল ঘটেও যেতে পারে। সুতরাং, আমাদের প্রতি নির্দেশ হলো যে পাগলই আসুক না কেন, তাকে ভাত খাইয়ে দিতে হবে। যা আছে মিটসেফে তাই দিয়ে।
কিছুদিনের মধ্যেই এরা নিয়মিত আসা শুরু করলেন এ বাড়িতে। আসতেন প্রতিবেশী পাগল। পাকা মরিচের মতো লাল বর্ণ খড়বাবা। তাঁর বগলে খড়ের বোন্দা থাকত। তিনি হিমসাগর গাছ পেরিয়েই দিতেন এক হুংকার। তারপর নীল অপরাজিতার নিচে এসে আসন পিঁড়ি হয়ে ভাতের অপেক্ষা করতেন।

ততদিনে আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। আমাদের কাছে থাকত আমার চাচাতো বোন রাকু। সে ভাবত, তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দৈববলে বলে দিতে পারবেন। সে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে তরকারি-ভাতের সঙ্গে সুন্দর করে একটুকরো লেবু ও কাঁচামরিচ দিয়ে খাইয়ে সম্ভাব্য প্রশ্নমালা আর তাকে নিয়ে পড়ত।
-বাবা এখান থেকে খালি একটা নম্বর বলেন। এক না তিন না পাঁচ?
কিন্তু তিনি হুংকার ছাড়া আর কিছু বলতেন না।
-খড়বাবা শুধু আঙুল দিয়া দেখাইলেও হবে। তিনি আবারও হুংকার দিতেন আর আমরা কেঁপে উঠতাম। আম্মা এসে আমাদের বকে ভেতরে পাঠাতেন।
সে সময় মেয়েরা বাজারে যেত না। ক্লান্ত অবসন্ন দুপুরবেলা শোনা যেত-
ছিটকাপড় নিবেন ..., ছিট কা ... প ... ড় ...।
ছিটকাপড় ফেরিওয়ালার ডাক। ডাকটা যিনি দিতেন তিনি মালিক।
তার সামনে মাথায় মার্কিন কাপড়ে গিঁট দেওয়া কাপড়ের বোঝা নিয়ে হাঁটত মুটে। ভারবাহক। ছাতি থাকত মালিকের মাথায়। সে সময় মেয়েরা ছিটের মানে ফুল লতাপাতা প্রিন্টের এবং ছেলেরা একরঙের জামা পরত। সে কাপড় দেখতে একই সঙ্গে আসতেন পাশের বাড়ির খালাম্মা বা আপাও। নিজেরা কথাবার্তা বলে দামাদামিও করতেন।
আব্বা সামাদ চাচাসহ ঈদের বাজার করতেন। সিংহযানী স্টেশন রোড থেকে সেমাই, পোলাওর চাল কিনে মন্তাজ ভাইকে দিয়ে বাসায় পাঠাতেন। মন্তাজ ভাই সাইকেলের পেছনে সেগুলো বেঁধে বাসায় আসতেন। আমি হিমসাগর গাছের নিচে খালি পায়ে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম যতক্ষণ না আব্বার রিকশা বা ঐ সরু মন্তাজ ভাইয়ের শরীর দেখা যায়। কী যে একটা অবস্থা! ঈদ তো না, এগিয়ে আসছে প্রতিবেশীদের বাড়িতে নতুন জামা পরে ঘোরাঘুরির অনেক অনেক দম বন্ধ করা মুহূর্ত!
আম্মার একটা সিঙ্গার সেলাই কল ছিল। দেখতে কালো রঙের হাতির শুঁড়ের মতন। তাতে আবার সোনার রঙে ডোবানো তুলি দিয়ে নকশা করে লেখা। ডানে গোল রুপালি চাকার মধ্যে কাঠের হ্যান্ডেল। হ্যান্ডেলের নিচেই আয়তক্ষেত্র আকারের কালো স্টিলের ঢাকনা দেওয়া একটা কম্পার্টমেন্ট। ওটাতে পেন্সিল, মাপার ফিতে, বাড়তি সুতোর 'ববিন'। রুপালি স্টিলের ববিনগুলোয় জামার রঙে মিলিয়ে সুতো ভরার সময় মাঝে মাঝে আমরা হ্যান্ডেল ঘোরাবার সুযোগ পেতাম। সে যে কী আনন্দ, যেন এক খেলা। আম্মার কাছে পাড়ার অনেকে জামা কাটিয়ে নিতেন।
আমার ঈদের জামার কাপড়গুলো জলে ধুয়ে শুকোতে দিলেই আমার টেনশন বেড়ে যেত।
যদি প্রতিবেশীদের কেউ দেখে ফেলে! আর কাপড় শুকানোমাত্রই তুলে নিতাম। আম্মা যখন জামাটা কাটতেন তার উচ্ছিষ্ট টুকরোগুলো নিয়ে মহা মুশকিলে পড়ে যেতাম। ভাবতাম, হায়রে এই প্রতিবেশীদের জ্বালায় একটুও প্রাইভেসি নেই আমাদের! আম্মা হাসতেন। আবার এভাবে কাছাকাছি থাকার জন্য ঈদের দিনে আনন্দের সীমাও থাকত না। দলবেঁধে পুরো পাড়া ঘুরে নিজের বাসায় এসে আর খেতে পারতাম না।
আজও মনে পড়ে লীলাদের সে লম্বা টিনশেড বাড়ি। দু'বাড়ির মধ্যে বাঁধানো কুয়োর পাড় আর তার ওপরে এক মিষ্টি বরইয়ের ঝাড়। এদিকে এই আমাদের রান্নাঘরের ডানে খোকার-মা আপার ছোট্ট দোচালা ঘর, তার উঠোনের পাশে মুরগির ঝাঁপি আর ছিল লেবু ভরা এক গাছ লাল টবের ওপর। চিনি ফুরিয়ে গেলে যে কোনো বাড়ি থেকেই একবাটি চিনি ধার নিয়ে আসা যেত আবার সে বাটি ভরাট হয়ে ওখানেই ফেরত দিতে হতো। এই আমার ছোটবেলার পড়শিদের গল্পকথা।
তারপর শুধু বড় নয়, অনেক বড় হয়ে বাংলাদেশের নানান জায়গায় গিয়ে পেয়েছি নানান পড়শি। কিন্তু যখন নিজের সন্তান ঈশিতা ও সজীবকে নিয়ে আজাদ ও আমি পরীবাগের ফ্ল্যাটে উঠে এলাম, পড়শি হয়ে গেল একদম ভিন্ন। দেখলাম ঈশিতাও ঈদের সময় দলবেঁধে লিফটে করে একতলা-তিনতলা করে। আমিও জামার ডিজাইনের জন্য ফোন করে ঈশিতাকে পাঠাই। কিন্তু পাগল আর আমাদের ফ্ল্যাট অবধি আসে না। গেটেই ওরা আটকা পড়ে যায়। ছেলেমেয়েরা স্কুল শেষে বাথটাবে প্লাস্টিক হাঁস নিয়ে নদী নদী খেলে। আমার মন খারাপ লাগে। কিন্তু এ-ও ভাবি, এটাই হয়তো একদিন ওদেরও মধুর স্মৃতি হবে!
একদিন সে ভাবনারও শেষ হলো যখন লন্ডনে চাকরি করতে চলে এলাম। এখানে শীতে প্রতিবেশীদের দেখাই যায় না। শোনা যায় না শিশুর কোলাহল। এখানে প্রতিবেশীর মুখ দেখার জন্য স্বল্পমেয়াদি গ্রীষ্ফ্মকালের জন্য চেয়ে থাকতে হয়। ভাগ্যিস, আমাদের দেশে এত শীত নেই!