প্রতিটি বই-ই একটা না একটা সময় শেষ হয়। লেখকের দিক থেকে তামামশোধ করা হয়। পাঠকের দিক থেকেও ইতি টানতে হয়, কিন্তু মহাভারত এমন এক বই যেটি কেবল শুরু হয়, শেষ হয় না। আপাতভাবে শেষ হয়, কিন্তু সেটি তৈরি করে অসংখ্য সূচনার বৈচিত্র্যময় পথ।
মহাভারত এক অনিঃশেষ ভ্রমণ। মহাভারতের আরো মজা হলো- মহাভারতের সূচনামুখও অসংখ্য। পরীক্ষিতের মৃগয়ায় হরিণ শিকার, মৌনব্রতপালনরত শমীক মুনির গলায় মরা-সাপ ঝুলিয়ে দেওয়া, শমীক মুনির পুত্র শৃঙ্গীর অভিশাপ- এ থেকে কোথাও শুরু হয়। কোথাও শুরু উপরিচরবসুর কাহিনি দিয়ে। রূপবতী ও আবেদনময়ী স্ত্রী গিরিকার স্মরণে রেতঃপাত ঘটে। গল্পটি হলো: গিরিকা উপরিচরবসুর কাছে সহবাস আশা করেন, কিন্তু তিনি মৃগায় থাকায় তা সম্ভব হয় না। অথচ সেই স্ত্রীর স্মরণে তার রেতঃস্খলন ঘটে। সেই স্খলিত-শুক্র শ্যেনপক্ষীর একটি পাতায় করে নিয়ে যাওয়ার সময় আরেক শ্যেনপক্ষীর আক্রমণে সেটি জলে পড়ে যায়। তা খেয়ে নেয় মাছের রূপে থাকা অভিশপ্ত অপ্সরা অদ্রিকা। তার গর্ভ হয়। জন্ম হয় এক পুত্র ও এক কন্যার। এক ধীবরের জালে এই পুত্র-কন্যা ওঠে। নিয়ে যাওয়া হয় মৎস্যরাজের কাছে। অপ্সরা শাপমুক্ত হয়। পুত্রকে উপরিচরবসু গ্রহণ করেন, কিন্তু মৎস্যরাজকে কন্যাটি দান করেন। এই কন্যাই মৎস্যগন্ধ, পরে যোজনগন্ধা, পরে সত্যবতী। ঘটনাচক্রে সত্যবতীর সঙ্গে মহারাজ শান্তনুর বিয়ে হয়। এরপর... এরপর...। একথা তো সবার জানা, নানান লোকের লেখা মহাভারতে ঢুকিয়ে দিয়ে বেদব্যাসের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্নোকের সংখ্যাও এক নয়। সবচেয়ে মজার বিষয় যে, সবমিলিয়ে মহাভারত পাওয়া গেছে ১২৬৯টি। আরো মজার বিষয় হলো, মহাভারতের নাম প্রথমে মহাভারত ছিল না। প্রথমে এর নাম ছিল 'জয়'। সংস্কৃতে রচিত মহাভারত বাঙালির কাছে কয়েকটি সংস্করণ লাভ করে। কারো কাছে কাব্য, কারো কাছে তা ধর্মগ্রন্থতুল্য, কারো কাছে ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথের মতো আরো অনেকেই এটিকে ভারতবর্ষের ইতিহাস বলেছেন।
ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা দিয়ে আমরা ছোটগল্প লিখতে পারি, তা দিয়ে উপন্যাস লিখতে পারি না- এমন ছকে কোনো কিছুই বলে দেওয়া যায় না। মহাভারতের দিকে তাকালে এটা দারুণভাবে লক্ষ করা যায় যে, অসংখ্য ব্যক্তির নানান আকাঙ্ক্ষা ও সেটি পূরণ না হওয়ার বাধাই যেন মহাভারতে জালচক্রের মতো কত না আখ্যান-উপখ্যানের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, দ্রোণের বাল্যবন্ধু দ্রুপদের কথা দিয়ে কথা না রাখা থেকেই সংকটের সূচনা। কথা ছিল: দ্রুপদ রাজা হলে তিনি বন্ধু দ্রোণকে অর্ধেক রাজত্ব দেবেন। কিন্তু দ্রুপদ পাঞ্চালের রাজা হয়ে সেটি তো করলেনই না, বরং একদিন দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা ক্ষুধায় কাতর হয়ে দুধ খেতে চাইলে তিনি তাকে পিটুলি গোলা খাইয়েছিলেন। (আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'দুধভাতে উৎপাত' গল্পের কথা মনে পড়ছে কি?) এই ধোকা থেকেই মহাভারতের সংকট শুরু।
কেউ বলবেন, দুর্যোধন যখন ভীমকে মিষ্টান্নের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়াল, তাকে হত্যার চেষ্টা করল- তা থেকেই মহাভারতের সংকট ঘনিয়ে উঠল। আরো অনেক অনেক আগে 'ভীস্মের প্রতিজ্ঞা'ই মহাভারতের সমস্ত জটিলতার কারণ। গঙ্গার চলে যাওয়া, সত্যবতীর হস্তিনাপুরের মহারানি হওয়াও তো এর আরেক সূচনা। ফলে মহাভারতের সংকটগুলির সূচনার এত এত দিক আছে, যা গুনে শেষ করা যাবে না। এমনকি গণেশ যখন এটিকে লিপিবদ্ধ করতে সম্মত হলেন এই শর্তে যে, ব্যাসদেব কোনোমাত্র বিরতি দিতে পারবেন না, তখন ব্যাসও গণেশকে পাল্টা একটি শর্ত দিলেন যে, গণেশ না বুঝে একটি পঙক্তিও লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না। সেখানে কত কত ধাঁধা, আর কত না ব্যাসকূট- আমরা যেটিকে হেঁয়ালি বলি, ব্যাসকূটগুলি তার চেয়েও জটিলচক্রে গণেশকে ফেলে দিয়েছিল। এভাবে মহাভারত যে-পড়ে তার জন্য তৈরি করে বিচিত্র খাত। এক দিকে গেলে আরেক দিক নয়, হাজার দিক পড়ে থাকে। আবার সব দিক, নানান ধারা থেকে উঠে এসে একটা চূড়ায় পৌঁছাতে চায়, সেই চূড়া তো স্বর্গ। ফলে সেখানে ধর্মগ্রন্থগুলির লক্ষ্য বলি, আর দান্তের 'দিব্যাভিসার'-এর কথাই বলি, সবই তো সেই স্থানে থিতু হতে চায়, যেখানে জীবন অনন্ত, যা সমস্ত ক্ষদ্রতা থেকে মুক্ত।
অন্যদিকে, ব্যক্তি-পাঠকও মহাভারতের কাছে যান নিশ্চয়ই কেবল কাহিনি জানার জন্য নয়। এমনিতে মহাভারতের মূল কাহিনি, রূপরেখা ঋদ্ধ-পাঠকেরা নানানভাবেই জানেন। তার আরো চাওয়া থাকে। সেই চাওয়ার হাজারটা স্রোত তৈরি হতে থাকে। এক কাহিনি এত বার, বার বার পড়েও কেন তল পাওয়া যায় না? বার বার মহাভারতের কাছে ফিরে যান কোন কোন পাঠক? সব পাঠকই কি মহাভারত ফিরে ফিরে পড়েন? একজন ভারতীয়র কাছে মহাভারতের আবেদন যা, অভারতীয় পাঠক বা পশ্চিমা পাঠকের কাছে কি তা অভিন্ন? ইন্দোনেশিয়ায় যে-মহাভারতের পাঠ (টেক্সট) পাওয়া যায়, তাতে প্রধান চরিত্র ঘটোৎকোচ; যুধিষ্ঠির, অর্জুন বা কৃষ্ণ কেউ নয়; এবং সেখানে দ্রৌপদীর স্বামী কেবল যুধিষ্ঠির। এছাড়াও মহাভারতের যে ১২৬৯টি মহাভারত পাওয়া গেছে, এর কোনো কোনোটিকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধটিই অনুষ্ঠিত হয়নি। তাহলে মহাভারতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যেকোনো বিষয়কে একেবারে সরিয়ে রেখে, বা বাদ দিয়ে বা গণ্য না করেও কিছু মহাভারত পাওয়া যায়। কিন্তু একটি বিষয় ধরেই নেওয়া যায় যে জীবনের অনন্ত তৃষ্ণা ছাড়া কি মহাভারতকে ভাবা যায়?
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে- ধ্রুপদি সাহিত্যপাঠে মেধা-বুদ্ধিমত্তা এবং আই.কিউ দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। মহাভারত পাঠে সেটি কতটা ঘটানো যায়? মহাভারতের উপযোগিতা হিসেবে মেধা বাড়ানোর জন্য এটি পড়তে হবে, তা-ই বরং মহাভারত পড়তে পড়তে এর পাঠক সবার আগে ভুলে যেতে পারে। তারপরও এই সময়ের পাঠক হিসেবে আমি ও আমরা কী চাই মহাভারতের কাছে? নিজেকেই কি দেখতে পাই এর কোনো চরিত্রের ভেতর? দেখতে পাই কি যে রাজনীতি কূটচালে রাষ্ট্র চলে, তার কেন্দ্রে বা সেন্টার পয়েন্টে যে থাকে, তাকে যেন একদম অন্ধ করে দেওয়া হয়- এমন ব্যবস্থাই কি হাজার বছর আগে থেকেই চলমান আছে? রাজা বা প্রধান নির্বাহীকে ঘিরে ফেলে এমন এক নষ্টচক্র, যার বিরুদ্ধে রাজা বা ওই প্রধান নির্বাহীর প্রায় কিছুই করার থাকে না। ক্ষমতার জালচক্র এমনই জটিল- তাতে কোনো সরল অঙ্ক চলে না। কোনো গাণিতিক সমীকরণে এর ইতি টানা যায় না। তবুও রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনীতি ও ক্ষমতার সূক্ষ্ণ সব দিকের গভীর নিবিড় পাঠে মহাভারত দারুণভাবে সহায়তা করতে পারে। দাবা খেলার চাল যেমন লিখে রাখা যায়, পরে সেমতো খেলাটা আবার খেলা যায়, তখন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে একটি চালের একাধিক ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য, তেমন করেই যেন মহাভারত একবার পুরো পড়ে আবার পড়লে বা বার বার পড়লে তেমনই কাণ্ড ঘটতে থাকে। এবং এই কাণ্ড নিরন্তর। অশেষ। জীবনের মতোই।
ব্যক্তি মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু জনগোষ্ঠীর জীবন, মানবজীবন চলতে থাকে। মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়। মহাভারতে পাঠ কোনোদিন ফুরায় না। আর কী গভীর প্রত্যয়ে মহাভারতে ঘোষণা করা হয়: এই কাব্য আগামীতে অসংখ্য লেখকের হাতে চর্চিত হতে থাকবে। আসলে জীবনকে বোঝার জন্যই এর প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। আর কী সে জীবন? যতটা সমষ্টির, ততটাই ব্যষ্টির। ফলে মহাভারত গোষ্ঠীর ইতিহাসই শুধু নয়, জগতে পথ সন্ধানী অনুসন্ধানী প্রত্যেক ব্যক্তির রূপরেখা দেখে নেওয়ার মহাকাব্য। তবে একে একটি আজগুবি ও অনৈতিক (এক নারীর পাঁচ স্বামী, ইত্যাদি) মহাকাব্য বলে আগেই ধরে নেবেন, বা খোলামনে একে পড়তে আগ্রহী হবেন না, তার মহাভারত না পড়াই উত্তম।
আরো একটি বিষয় খেয়াল করার যে বাংলা অঞ্চলে রামায়ণ যতটা জনপ্রিয়, মহাভারত ততটা আদৃত নয়, আদৃত নয় মানে ছিল না। রামায়ণে গার্হস্থ্য জীবন, পারিবারিক মূল্যবোধই প্রবল, অন্যদিকে মহাভারত পূর্ণ হয়ে আছে বিচিত্র ট্যাবুতে। এক নারীর পাঁচ স্বামীর বিষয়টি তো বটেই, অবৈধ প্রণয়, সন্তানের জন্মপরিচয়হীন দশার নানান পরিপ্রেক্ষিত ও পটভূমিতে টলে যাচ্ছে প্রচলের সমস্ত মূল্যবোধের ভূমি ও ভূমিকা। স্বজনের সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘর্ষ- ইত্যাদি কঠোরতা কোমল বাঙালি প্রাণে সয় না হয়তো। তাই মহাভারত খোলামনে পাঠ না করতে পারলে মহাভারত পড়া উপভোগ্য নাও হতে পারে। তবে মহাভারত পড়তে পড়তেই কেটে যেতে পারে সংস্কার-কুসংস্কারের অনেক জটাজট। মহাভারতের গভীর দার্শনিকতা ও প্রজ্ঞা আমাদের তো সেই স্তরে নিয়ে যায়- বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল লেভিনাস দর্শনকে যেভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন। ইউরোপে দর্শন বা ফিলোসফি অর্থ তো জ্ঞানের জন্য প্রেম। তিনি এটা উল্টে দিয়ে বললেন: প্রেমের জন্য জ্ঞানই হলো প্রকৃত দর্শন। মহাভারত দর্শনকে দিয়ে প্রজ্ঞা আর প্রেমকে নিয়ে গেছে খাঁটি বাসনার প্রকৃত প্রতীকে। এই বাসনা হলো সৃষ্টিশীলতার বাসনা। সৃষ্টির জন্য তীব্র ও সংহতশক্তি চাই। মহাভারতে দ্রৌপদী হলেন সেই সংহতশক্তি। তিনিই সংহতির কেন্দ্র আর পঞ্চ পাণ্ডব হলো পঞ্চ ইন্দ্রিয়। খোলা হাত মুঠি করলে যা হয়, তাতে হাতে ততটা শক্তি দেখা দেয় না, পাঁচ আঙুল হলো পাঁচ ইন্দ্রিয়, সেগুলি আলাদা ও বিচ্ছিন্ন থাকলে মনুষ্যত্ব লড়াইয়ে মানুষ হেরে যায়। তখন অন্যায়ই বড় হয়ে ওঠে। ফলে এদের একসঙ্গে আনতে হয়, তাদের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করতে হয়। আর হাতের তালুটিতে সব জড়ো হয়ে সংহত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এমন অসংখ্য আভাস ইঙ্গিত দিয়ে মহাভারত ভরে আছে। যেমন ভীস্ম স্বয়ং আরেকটি ইঙ্গিত দেন। আমরা বুঝতে পারি, যে-ব্যক্তি কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞানে প্রজ্ঞায় ও প্রতিজ্ঞায় অটল থাকে তাকে আসলে আর হত্যাই করা যায় না। সে অমরত্ব লাভ করে। ফলে একেকজন আইনস্টাইন, একেকজন রবীন্দ্রনাথ, একেকজন পিকাসো কি সুলতানের আর কোনো ক্ষয় নেই। এক প্রচণ্ড প্রবল বলিষ্ঠতা, জীবনাকাঙ্ক্ষার অপার শক্তি ব্যক্তি ও তার সৃষ্টিকে স্থায়ী ও চিরায়ত মূল্যে দুনিয়ার কাছে বার বার উপস্থাপন করতে থাকে। মহাভারত স্বয়ং সেই প্রতিজ্ঞার নাম।
আবার ঠিক উল্টো দিকে মহাভারত এক অন্তহীন দ্বিধা-সংশয়ের অগ্নিপথ তৈরি করে দেয়। চিরঅতৃপ্তিতে লীন করে দেয়ে মানুষকে। মহাভারতের সঙ্গে যে যুক্ত হয়, সে এত কিছুর হাত থেকে মুক্ত হতে থাকে যে জগতের কোনো প্রচল পথে আর সে নিজেকে বাঁধতে পারে না। কোনো বন্ধনই তার আর ভালো লাগবে না। সে হয়ে উঠতে পারে অরণ্যে কি জনারণ্যে সাধুসন্ত, একদম বেদব্যাস যেমন। কারোবা দেখা দিতে পারে অন্তহীন অপার সৌন্দর্যতৃষ্ণা। সেই সঙ্গে সে দেখে: জীবনের কাছে কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়, ধ্রুব নয়। ফলে নিৎসের মতো লোকদের না পড়লেও মহাভারতে পাঠক জেনে যান, উপলব্ধি করেন, নাথিং ইজ অ্যাবসলিউট। সে পাঠক ফ্রয়েড বা হ্বিটগেস্টাইন না পড়লে জেনে যায়, প্রত্যেকে নিয়ত এক সূক্ষ্ণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে যেকোনো সময় পতন ঘটতে পারে। উত্থান ও পতন- কোনোটাই কারো জন্য ধ্রুব নয়। কোনো সংকট চিরস্থায়ী নয়, চিরসুখ বলে মনের কোনো অবস্থা নেই। সবই ক্ষণিকের। কিন্তু কিছুই কি স্থায়ী নয়? জগতের আরেক অসামান্য মহাকাব্য শাহনামায় ফেরদৌসী ঘোষণা করেছিলেন, একমাত্র সুকর্ম চিরস্থায়ী। তিনি বার বার বলেছেন, মানুষ এই জগতের সরাইখানায় ক্ষণিকের অতিথিমাত্র, আবর্তমান আকাশের নিচে সুকর্ম ছাড়া আর কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, তাই মঙ্গল ছাড়া অমঙ্গলের কোনো বীজ যেন কেউ বপন না করে। কারণ যে বীজ সে বপন করবে, পরিণামে কাটতে হবে তারই ফসল।- এই সহজ কথাগুলি কি জগতের মানুষ শোনেনি? কত বার শুনেছে? এর ফলে কী ঘটেছে? সাহিত্যের আবেদন ব্যক্তি মানুষের কাছে হলেও তা সেই ভাষা ও জনগোষ্ঠীর সীমা পার হয়ে যদি সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তাহলেই তার জিৎ।
ভীস্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন হস্তিনাপুরকে সুরক্ষিত করবেন। কিন্তু নিজের পরম্পরা নির্মাণ না করেই এই সুরক্ষা কতটা নির্মিত হলো? ভীষণ প্রতিজ্ঞা যে করেছিলেন, সত্য (ধর্ম) ও সামর্থ্যের সম্মেলনে এক আদর্শরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, শেষমেশ তিনি কি তা প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারলেন? শান্তনু যদি গঙ্গাকে অষ্টমপুত্রটি ফেলতে বাধা না দিতেন, তাহলেই তো মহাভারত নামের এই আখ্যান তৈরি হতো না, এই ধারায় তা নির্মিত হতো না, হতো কি? গঙ্গাপুত্র ভীস্ম, চন্দ্রবংশজাত। মহাভারতের আরেক দ্বন্দ্ব হলো চন্দ্র ও সূর্যবংশীয়দের মধ্যে। কিন্তু তা কেবল এখানেই শেষ নয়। দ্বন্দ্বের ভেতরে আরো আরো দ্বন্দ্ব আছে। তা থেকে জাত নানান সংকটের ভেতরে আছে আরো অনেক সংকট। ফলে যে-যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের ভেতরে আছে আরো অনেক যুদ্ধ।
ধর্মযুদ্ধের নামে অর্জুনকে প্ররোচিত করা কৃষ্ণ আদতে কোন সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন? কৃষ্ণ মূলত বিষ্ণুর আরেক আবর্তন, যার সঙ্গে শিবের চিরবিরোধ। আর কৌরবরা হচ্ছে মহাদেব শিবের দিকে ঝোঁকানো পক্ষ। এমন দ্বন্দ্বের ভেতরে আছে কত না ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। যেমন, কেবল দ্রোণকে ঘায়েল করার জন্য অশ্বত্থামার মৃত্যু হয়েছে 'ইতি গজ'- নামে এই একটি মিথ্যা নয়, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির আরো আরো মিথ্যা বলেছিলেন। বেদব্যাস নিজের সবচেয়ে গোপন কথা বলতেও দ্বিধান্বিত ছিলেন, না কিন্তু 'যুধিষ্ঠির যে বিদুরের পুত্র', যে বিদুর স্বয়ং 'ধর্ম', ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির বলতে একটা গভীর গোপন রহস্য খেলে গেছে মহাভারতের আখ্যানজুড়ে, যা ব্যাস স্পষ্ট উচ্চারণ করেননি, কারণ ক্ষমতা, তাও রাজ্যের ক্ষমতা বলে কথা। ফলে সবই প্রকাশযোগ্য কিন্তু ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে- তেমন কিছু নৈব নৈব চ।
মহাভারত মহাসমুদ্রের মতো। তীর আছে, পার নেই। মহাভারত-প্রেমও একই। শুরু আছে, শেষ নেই। কিন্তু পাঠককে মহাভারত থেকে নিজেকে তুলেও আনতে হয় বার বার। দেখে নিতে হয়, এই মহাভারত-বিচ্ছিন্নতা তাকে কী দেয়? সবচেয়ে যেটি দেয় তা হলো, প্রজ্ঞার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা। যে-বিচ্ছিন্নতা জগৎকে বুদ্ধি ও মননকে প্রধান করে তুলতে চায়। ভারতীয় সাধকরা জানেন, বুদ্ধির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো অহংকার। সেই অহংকার বিদ্যা ও বুদ্ধির সম্মেলনে উৎসারিত হতে পারে। বিদ্যা ও জ্ঞান যথাক্রমে খণ্ডিত ও সার্বিক। কিন্তু জ্ঞানের চেয়ে প্রজ্ঞা দুর্লভ। নিজের জীবনকাহিনির দিকে না তাকালে সেই প্রজ্ঞা কোথা থেকে তৈরি হবে? প্রজ্ঞা কল্পনা ত্যাগ তিতিক্ষা- ইত্যাকার অনেক কিছুকে, কেউ কেউ বুর্জুয়া, কেউবা প্রাচীন বলে গণ্য করেন। সত্য বলে কিছু নেই, যা সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে আমার পেতে পারি- তা হলো মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপ, লেখক তার সৃজনের গুণে একটি স্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেই সেটি আমাদের পাইয়ে দিতে পারেন। এছাড়া সাহিত্য থেকে এখন লেখকের কি পাঠকের আর কিছু পাওয়ার নেই।
আমরা বিস্মিত হয়ে দেখতে পাব, আমাদের ধরে নেওয়া সমস্ত কিছুতে কতভাবে উৎখাত করা হয়েছে মহাভারতে। এতে থাকা কোনো না কোনো কাহিনি সেই নিরাকরণ ঘটিয়েছে, যা কিছু নিশ্চিত, মহাভারত পাঠ সেগুলিকে অনিশ্চিত করে তোলে। আবার যা কিছু অনিশ্চিত, সেগুলিকে নিশ্চিত করে তোলে। কিন্তু এর ভেতরেই আছে সেই পরশপাথর। গল্পটা অনেকেরই জানা: পরশপাথরের খোঁজ করছিল এক ব্যক্তি, যে-পাথরের ছোঁয়ায় লোহা সোনায় পরিণত হয়। এক সাধক বলেন, সমুদ্রপাড়ে অসংখ্য পাথরের ভেতরে এটা আছে। খোঁজো। লোকটি খুঁজতে থাকে। অক্লান্ত চেষ্টা করেও পায় না। কিন্তু একসময় খেয়াল করে তার লোহার আংটিটি এর ভেতরেই সোনা হয়ে গেছে। পরশপাথরটি সে নিজের অজান্তে স্পর্শ করেছিল, কিন্তু চিনতে পারেনি। পেয়েও হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মহাভারতে পরশপাথরগুলি হলো এর পঙক্তিমালা, যা চাইলেই চোখের সামনে ফুটে উঠতে পারে। মহাভারতের অসংখ্য ঘটনা কাহিনি চরিত্র ও ভাষা-ভাষ্যের ভেতরে আছে এমন সব পরশপাথর, যা জান্তে ও অজান্তে আমাদের অনেক কিছুকে শুধু সোনায় পরিণত করাই নয়, হীরের ধার এনে দিতে পারে, যা দিয়ে আপনি আমি আমরা আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা অনেক কাচের দেওয়াল ভেদ করতে পারি।