ভান ও ভণিতার বাইরে খলবলে চারাগাছের মতো বেড়ে ওঠার যে সময় তাকে নবম শ্রেণি বলে জানি। জীবনের সমস্ত বছর থেকে আলাদা, অনন্য এক বয়স। উপচানো আবেগের পুকুরের তলদেশে গোপন সিন্দুকে না ভেজা কুণ্ঠাসমগ্র আর কোনো বয়সে কি থাকে! একই সাথে তীব্র অথচ সরল। বিপজ্জনক এবং উত্তেজনাময়, বিব্র্রতকর মুহূর্তময়, অনেক বেশি মজার আর তারও বেশি নাটকীয়তার। মানুষের মানসিক পরিস্ম্ফুটনের যে ভাষা লাগে, সে ভাষাও হাতড়ে বেড়াতে হয় এই বয়সেই। তাই এ এক অনন্য সময়।
ভেতরে নবম শ্রেণির মেয়েদের হইহুল্লোড়ের উল্লাস ভেসে আসা বিদ্যালয়ের গেটের পাশে বসে থাকা ক্লান্ত মায়েদের দেখি। একদিন তারাও তো ছিল ওই ভেতরের নবম শ্রেণির কলতানমুখর পাখি। খুব বেশিদিন আগেও হয়তো নয়। কাছের-দূরের সংসারের ভাঁজ থেকে মসলা আর রান্নার ঘ্রাণ গায়ে বয়ে আনা তাদের কি মনে পড়ে সেইসব দিন! কিংবা কারও কি অফিসের লাঞ্চ আওয়ার ভেসে যায় নবম শ্রেণির টিফিন বক্সের রং ভেবে হঠাৎ? একদিন এইসব ভাবি! আর ভাবি যে ঠিক কেমন বৈশিষ্ট্য এই নবম শ্রেণির মানুষদের, কেন তারা আলাদা! কতটা-বা আলাদা মানুষ!
বোধগম্যতার ভেজা ঘাসে কত ভুল প্রজাপতি এসে পাখা ফেলে গেল :
বুঝি যে, এ হলো ভুলের সময়। ভুল রাস্তার ঘাস মাড়ানো কিংবা আনাড়ি প্রেমপত্রের ভুল বানানগুলির মতো, যার মূলটা শুদ্ধ হলেও প্রকাশটা ভুলে ভরা। ভুল মানুষকে বিশ্বাস, বন্ধুত্বে বোঝাপড়ার ভুল, মা- বাবাকে ভুল রিডিং, প্রেমের মতো ভুল, ক্যারিয়ার বুঝে না ওঠার ভুল, এমনকি নিজে কেমন মানুষ এটা পর্যন্ত বুঝে না উঠতে পারার ভুল এ সময় সঙ্গী হতে পারে। আর কে না জানে, মানুষ মূলত ভুল থেকেই ঠিকঠাক উপযোগী শিক্ষাটা নিয়ে নিতে পারে।
ভাবনা মেলে ডানা :
এই সময়ের মানুষগুলো অর্থাৎ না পূর্ণবয়স্ক, না শিশু এই মানুষগুলো অনেক দিক থেকেই অনন্য। তাদের থাকে ভাবার মতো একটা মন। নানান চিন্তার অলিগলিতে তারা অনায়াস ছুটে বেড়ায়। কত বিচিত্র রঙ, রূপ, কৌতূহল আর স্বপ্নের বুননে ঠাসা থাকে এ সময়ের ভাবনার চাদর!
তারা যেহেতু অন্যের বলা-কওয়ার বাইরে তাদের নিজেদের জীবনটাই যাপন করে থাকে। ফলে যাপনের সাথে চলতে থাকে তাদের নিজস্ব বোঝাপড়াও।
এ সময়ে মানুষ প্রচণ্ড ক্রিয়েটিভ থাকে। যেহেতু তারা শারীরিকভাবেও অনেকে বেশি ফিট বা সক্ষম থাকে সেহেতু নতুন চ্যালেঞ্জ নিতেও পিছপা হয় না। ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না। তারা আসলে অন্যের পরোয়াই করে না।

ভালোবাসিবারে দাও আমারে অবসর :
মানুষকে ভালোবাসতে পারা এই বয়সের অনন্য এক গুণ। শুধু মানুষ না হয়তো, প্রকৃতি, বিড়াল-কুকুর- পাখি বা অন্য যে কোনো প্রাণের প্রতি প্রচণ্ড মায়া কাজ করে। যেহেতু মন থাকে স্বচ্ছ, আর চোখের সামনে তখনও থাকে রাঙা এক চশমার কাচ। জীবনের কদর্যতা, সম্পর্কের ক্লান্তি, বিশ্বাসহীনতার বিষ তাদের অভিজ্ঞতার বাইরেই থেকে যায় বলে তাদের ভেতরটা ডাবের নরম শাঁসের মতো ভালোবাসায় তুলতুলে থাকে।
আর তারা খুব প্যাশনেটও হয়।
এই বয়সটাই যেন বন্ধুত্বের বয়স। এই বন্ধুত্ব তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিও। যেন শীতের পুষ্পবাগানে তারা বন্ধুত্বের একেকটা ফুল হয়ে আলোকিত করে রাখে চারপাশ, ঘ্রাণ ছড়ায়।
দ্বিধাথরথর চূড়ে যেইসব অমরাবতী :
শুধু ভুল নয়, সাথে দ্বিধাও তো থাকে। কী সে ভালো হবে আর কী সেই বিষয় যা মন চায় এই দ্বন্দ্বের পরিস্ম্ফুট রূপ হয়ে আসে দ্বিধা, সংশয়ের হলুদাভ বাঁশি। তার কোন ফুটোয় আঙুল রেখে আর কোন ফুটো ছেড়ে ফুঁ দিয়ে বাজাতে হবে জীবনের সুর সে দ্বিধায় কেটে যায় নবম শ্রেণি।
নতুন বিষয়গুলি তাদের সামনে অভিজ্ঞতা আকারে মিশে যেতে থাকে। কত কত নতুন জানাশোনার সম্মুখীন হয় তারা।
প্রথম প্রেমের মতো গাঢ় তার ব্যথা :
এ সময়টাতে হতে পারে কারও প্রথম প্রেম। বাইরে খলখলে উপচানো হাসির গমকের ভেতরে কোনো একজনের মুখ দেখার তৃষ্ণায় মরে যাওয়ার বোধ নিয়ে অস্থির হতে পারে কেউ কেউ। কারও কারও প্রথম চুমুও আসে এ বয়সে। কারও কারও শরীরও শরীর চিনতে শুরু করে। কীভাবে না গলেও মোমের মতো গলন্ত লাগতে থাকে নিজেকে সেও হয়তো জানা হতে থাকে। আড়ালে-আবডালে, নির্জন রাস্তায়, ক্লাসরুমের জানালার পাশে হুট করে বিদ্যুৎ চমকের মতো শিহরণ খেলে যেতে পারে কারও কারও স্পর্শমাত্র। নিজের শরীরকে তখন মনে হতে পারে বাজনারত সেতার। মনে হতে পারে ঝুমবৃষ্টির টিনের চাল। গণিত খাতায় ভুল অঙ্কের কারণ হতে পারে স্কুল-করিডোরে উড়ে আসা একলা শালিক। আয়না দেখতে দেখতে গুনগুন গান হতে পারে- 'আজ আমার মন ভালো নেই, খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সুদূর আকাশ থেকে কিছু রং এনে দাও না।'
এই যে এই বয়সের এত রং, ঢং এবং ওঠানামা সেটা আসলে ঘটে বয়ঃসন্ধিজনিত হরমোনের প্রভাবে। মেয়েদের হরমোন এস্ট্রোজেন আর ছেলেদের হরমোন টেস্টোস্টেরোন- যা আসলে প্রাথমিকভাবে প্রজনন হরমোন, এরাই এইসব আচরণের মূল। এ ছাড়া ছেলেমেয়ে উভয়ই অ্যান্ড্রোজেন নামে হরমোনের প্রভাবে পড়ে। তাই এই বয়সে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আচরণগত পরিবর্তন এলে একটা স্বাভাবিক ঘটনা। দ্রুত হরমোনের পরিবর্তন মস্তিস্কে প্রভাব ফেলে এবং দ্রুতই আচরণগত ইমব্যালান্স ঘটাতে পারে। মুড সুইং, হঠাৎ বিষণ্ণ লাগা, হঠাৎ খুশি হওয়া, কখনও আক্রমণাত্মক, কখনও লজ্জা পাওয়া- এইসব পরিবর্তনের মধ্যে দ্রুত ওঠানামার ফলে বাবা-মা আর পরিবারের সাথেও একটা অন্যরকম দূরত্ব আর দ্বন্দ্ব তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তারা ভাবে যে কেউ তাদের বুঝতে ঠিকমতো বুঝতে পারছে না অন্যদিকে অন্যরা তাদের আচরণের তল খুঁজে না পেয়ে খাবি খেতে থাকে। আমাদের দেশে এমনিতেই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষ সচেতন নয়। সেখানে কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তো ভাবাই হয় না। ফলে ড্রাগ, হতাশা ইত্যাদি ভুল রাস্তাগুলো টেনে নিতে পারে খুব সহজেই।
বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ের জন্য নবম শ্রেণি একটি কঠিন সময়। সমাজের শিকল-বিধিনিষেধ তার জন্য এ সময় আরও পোক্ত হয়ে ওঠে। কেউ বলে ওঠে তুমি মেয়ে বলে এটা করো না, তো কেউ আবার বলে ওখানে যেয়ো না। এ ছাড়া এভাবে চলো না, ওর সাথে মিশো না থেকে জোরে হেসো না ইত্যাদি ইত্যাদি নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া তো আছেই। রাস্তায় হয়তো কোনো ছেলে তাকে দেখে শিস বাজাল, দোষ মেয়েটার! কেউ হয়তো সাইকেল নিয়ে পিছু পিছু এলো, দোষ মেয়েটার! কেউ হয়তো প্রেম প্রস্তাব দিল, দোষ মেয়েটার! ফলে তাদের এই সুন্দর সময়টাতে মানসিক বিকাশ যেভাবে হওয়ার কথা তা বাধাগ্রস্ত হয়। যে বয়সে তাদের শরীরটাকে ভালোবাসবার কথা, বুঝে উঠবার কথা সেই বয়সেই তাদের মধ্যে শরীর নিয়ে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
আরেকটা সমস্যা হলো বাল্যবিয়ে। এখনও বাংলাদেশে হাজার হাজার মেয়ে আছে, যাদের নবম শ্রেণিতে পড়ার সৌভাগ্যই হয় না। বিয়ে হয়ে যায় আর শিশুসন্তান কোলে নিয়ে হয়তো সে রাস্তার দিকে দাঁড়িয়ে তার বন্ধুদের স্কুলে যাওয়া দেখতে থাকে একেকটা তীব্র্র দীর্ঘশ্বাস সঙ্গী করে।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়। কম বয়সে বিয়ে হয়ে সন্তানের মা হয়ে যাওয়ার দরুন কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার ও জীবনের স্বপ্ন পূরণ যেমন অধরা থেকে যায়, তেমনি সন্তান জন্মদান করতে গিয়ে শারীরিক ক্ষতি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে কারও কারও। কমবয়সী আবেগ নিয়ে সংসারের জটিলতা আর কুটিলতার ধাক্কা সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা বেছে নেওয়ার হারও অনেক বেশি। এমনকি সংসারের মতো ভারী বিষয় নয়, জামার জন্য অভিমান করে আত্মহত্যা, পরীক্ষায় খারাপ করে আত্মহত্যা, সিনেমার নায়কের জন্য বা প্রেমের কারণে আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলোতে আত্মহত্যার হারও অনেক বেশি। যার কারণ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়া।
দোতারাবাদক যখন গল্গ্যাডিয়েটর আর জীবনের সাপলুডু খেলা :
আমার এক বন্ধু সরকারের উচ্চ পদে ভীষণরকম ভালো ক্যারিয়ার নিয়ে সমাজের চোখে সাফল্যের প্রথম দিকে আছে। কিন্তু আমরা যারা কাছের, তারা জানি তার ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়টি। তিনি জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন আসলে গানের মানুষ হয়ে। ফলে সফল হলেও নিজেকে তিনি কোনোভাবেই সুখী মনে করেন না। সব মা-বাবাই সন্তানের ভালো চান, কিন্তু সেই চাওয়াটাও থাকে তাদের নিজেদের মতো করে এবং সমাজের বেঁধে দেওয়া ছক অনুযায়ী। নবম শ্রেণি হলো সেই সময়টা যেখানে মানুষ পরবর্তী জীবনে সে কোন দিকে যাবে, তার প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু নবম শ্রেণির সব মানুষের চাওয়াই তো এক নয়। মানুষ হিসেবে তারা যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তাদের পরবর্তী জীবন সম্পর্কিত চাওয়াও ভিন্ন ভিন্ন। বাবা-মা হিসেবে এই সময়ে সন্তানের চাওয়ার রূপটা বুঝে উঠতে পারা জরুরি। নিজেদের ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়ার ফল হয়তো খারাপই হয় শেষ পর্যন্ত। পড়াশোনা, পেশাগত সাফল্য, স্বাস্থ্য, বিয়ে, সন্তান ইত্যাদি নিয়ে সুখী হওয়ার ফর্মুলা-বিষয়ক যে সামাজিক ন্যারেটিভ প্রচলিত আছে সে অনুযায়ী সুখী হওয়া কিছু কিছু মানুষের জন্য প্রযোজ্য হলেও সবার ক্ষেত্রে তা কাজ করবে, এমন না। সবাই একভাবে সুখীও হয় না। অর্থপূর্ণ জীবন নানা ধরনের হয়। জীবনে অর্থ খুঁজে পাওয়া, সুখী হওয়া, আনন্দে থাকার যাত্রাটা একেকজনের একেক রকম।
আমি তখন নবম শ্রেণি, আমি তখন ষোলো :
বয়স হিসেবে পনেরো বা ষোলো বছরের বয়সটাই নবম শ্রেণি যদি ধরে নিই, তাহলে দেখব যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বয়সেই প্রথম 'ভিখারিনী' নামের গল্পটি লেখেন ও প্রকাশ করেন। আবার দেখি যে অ্যারিস্টটল তার গুরু সক্রেটিসের কাছে ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকায় বলা হয় সুইট সিক্সটিন। সে দেশে ১৮ প্লাস লিগ্যাল অ্যাডাল্ট না হলেও গাড়ি চালানো শেখা, চাকরির অভিজ্ঞতা নিতে পারাসহ বড়দের অন্য দায়িত্বগুলো এ বয়সে নিতে শিখে যায়। অনেকের জন্য তাই এটি বালিকাজীবনের সমাপ্তি শেষে নারীজীবনের সূচনালগ্ন।
ব্রায়ান হোয়াইট বলেছেন- 'আমরা কেউই আসলে কখনও বড় হই না, কেবল মানুষজনের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে সেটা শিখে ফেলি।' এজন্যই আমরা যতই বয়স্ক হই না কেন, আমাদের ভেতরে ভেতরে সেই নবম শ্রেণির মানুষটা কিন্তু রয়েই যায়। কেননা, এ এক অবিস্মরণীয় সময়।
একটা লাটিমের ঘূর্ণনের মতো ঘটনাবহুল অথচ দ্রুতই যে ফুরিয়ে যায়।

বিষয় : প্রচ্ছদ সালেহীন শ্রিপা

মন্তব্য করুন