নবম শ্রেণিতে ওঠার মাত্র কিছুদিন আগেই এক আলো-আঁধারি ভোরবেলায় নিজের কাপড়ে প্রথম রক্ত দেখে চমকে উঠেছিল সে। ভয় পেয়েছিল খুব। দিশেহারা হয়ে ভেবেছিল কেন, কোথা থেকে হলো এই রক্তক্ষরণ? কে এসে অন্ধকারে অ-অনুভবযোগ্য আঘাতে তাকে রক্তাক্ত করে গেল? কে সেই অদৃশ্য দুরাত্মা? কী তার উদ্দেশ্য? আতঙ্কে কাঁপছিল সে। ঘাবড়ে গিয়ে কাঁদছিল। পরে, অবশ্য সব নারীর মতোই সে চিনেছিল দেহের এই রজোরহস্য, যা তাকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল যুবতী হবার পয়লা ধাপে। সেই ধাপে অনিশ্চিত হাতছানির পাশাপাশি রোমাঞ্চ ছিল, উত্তেজনা ছিল, ছিল অলীক শিহরণ। এক রাতের ব্যবধানে নিজের শরীরকে যেন নতুন করে চিনেছিল ভীত বালিকা। বর্ষার শুরুতে নদী যেমন প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন জলে ভরে ওঠে, ঠিক তেমন করেই এ সময় তার দেহমনে পরিবর্তনের জোয়ার বইছিল। আর সেই জোয়ারের জলে স্নাত হয়ে জন্ম নিচ্ছিল এক পূর্ণাঙ্গ নারী।      
এই নবম শ্রেণিতেই তো প্রথম পেয়েছিল মেঘের মতো নরম কোমল মধুর সেই প্রেমপত্র। শিহরণ লেগেছিল খুব। হূৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। কোথায় সেই পত্র লুকাবে সে, কাকে দেখাবে সেই সুগন্ধি কুসুম! আহা সেই হতচকিত বিহ্বল ক্ষণ, সেই আশ্চর্য সুখের স্রোত, সংকোচ, লজ্জা, ভয়, দ্বিধা!  প্রতিদিন একঘেয়ে স্কুল, কোচিং, পড়ার চাপ, পরীক্ষার পর পরীক্ষার মুখ ব্যাদান করা অতল গহ্বর, মায়ের শাসনভরা কঠিন চোখ আর তার মধ্যে পায়ে রিনিক ঝিনিক নূপুর পরার শখ। চোখে একটু কাজল পরা, ঠোঁটে একটু  লিপস্টিক ঘষা আর তার বুকের ভেতর একটা ছটফটে সরল স্বচ্ছ হৃদয়, তাতে কত কথার বুদ্‌বুদ ফোটে, কত গোপন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, যেন উজ্জ্বল রঙে ফুটতে চাইছে ফুল, যেন নাচের ছন্দে জাগতে চাইছে আলো। মনের ভেতর যখন তখন ষড়ঋতুর আনাগোনা, কখনও বর্ষা, কখনও গ্রীষ্ফ্ম। কখনও চোখ ছলছল, কখনও মুখে হাসি অবিরল। এই মেঘ এই সূর্য। শৈশবের দুরন্ত খেয়াল অতিক্রম করে অদ্ভুত এই নগরের অন্ধকার গলির ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে রঙিন স্বপ্নের রৌদ্র-ছায়ায় বেড়ে ওঠা। বছর বছর স্কুলের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপ পেরিয়ে সপ্তম, অষ্টম ও এক্ষণে নবম। অলস দুপুরবেলায় বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে গল্পের বইয়ের পাতায় ডুবে যাওয়া। আর তার মধ্যেই অসময়ে সবুজ পাতার আড়ালে কোকিল ডেকে ওঠে। স্যার আসেন অঙ্ক করাতে। সে অঙ্ক বোঝে না। অঙ্ক তাকে বোঝে না। জ্যামিতির আঁকাআঁকি, বাংলার কারক সমাস, ইতিহাস, পৌরনীতির জগৎ ছাপিয়ে দিগন্ত থেকে কার যেন অস্পষ্ট ডাক শোনা যায়, বাঁশির সুরের মতো, গানের কলির মতো, নদীর জলের স্রোতধ্বনির মতো সেই মোহময় ডাক শুধু তার কানেই বাজে। সে শোনে আর ভীত হরিণীর মতো লাজুক চোখে এদিক-ওদিক তাকায়। যেন কিছু খোঁজে। যেন কেউ আড়ালে আছে, মিশে আছে কুয়াশায়। হঠাৎ রোদ উঠলেই সেই ঝলকানিতে তাকে স্পষ্ট দেখা যাবে। রোদ কোথায়? কোথায় জাদুকরী আলো?
নবম শ্রেণি আহা, সেই জবুথবু বুকের ওপর ওড়না আগলে রাখার সময়। কখনও যদি বুক থেকে ওড়না একটু সরে যায় অমনি বয়স্করা চোখ রাঙায়। যেন তার বুকের মধ্যে গোপনে ফুটেছে সুগন্ধি রুমাল। বুকের মধ্যে কদম ফুলের কুঁড়ির কম্পন। সেই কম্পন ঢেকে রাখার কত আয়োজন। আড়ালে লুকিয়ে রাখার কত চেষ্টা। তবু হায় 'লাল দোপাট্টা অঙ্গে আমার থাকতে চায় নারে ...।' দুষ্ট বাতাস বারেবারে তার সাথে শত্রুতা করে ওড়না টেনে নিয়ে যায়।   
মাথার চুল দু'ভাগ করে দুই বিনুনি গাঁথার সেই নিষ্পাপ কালে চোখে জাগে সলাজ বিস্ময়, মনে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অজস্র্র কাঁপন। সেই কাঁপনে মাঝে মাঝেই সব অচেনা লাগে! মুছে যায় সব পরিচিত চেহারা, দৃশ্য, অদৃশ্য। কত অজানারে জানা হয়, কত ভুল শুদ্ধ হয়, কত সত্য মিথ্যা হয়! আগের মতো মাঠে ঘাটে ছোটাছুটি বন্ধ হয়, চঞ্চলতা কমে আসে।  
পাতারা ফিসফিস করে, বাতাসে জলের গন্ধ, আকাশে টুপ করে সূর্য ডুবে যায়। কেন, এসব হয়, আর তার বুক ভেঙে শুধু কান্না পায়। হারিয়ে যাওয়া পোষা বিড়ালের কথা মনে করে কান্না আসে, প্রিয় বন্ধুর কপটতার কথা ভেবে কান্না আসে, মা যে সেদিন অকারণে বকেছিল সেই বকার কথা ভেবেও চোখ জলে ভরে ওঠে। এত জল, এত অশ্রুর উৎস কোথায়? বুকের কোন গভীরে জমাট বেঁধে থাকে এইসব কষ্ট? এইসব বেদনা?  এইসব অভিমান? এইসব উন্মাতাল জলস্র্রোত?     
ছাদে গিয়ে শরতের নীল আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকায় সে আর দেখে সাদা মেঘের পাশে একটা রঙিন ঘুড়ি উড়ে যাচ্ছে। কী দারুণ, পাখির মতো লম্বা লেজ নেড়ে নীল আকাশে নাচতে নাচতে, খুশিতে আনন্দে ভাসতে ভাসতে ঘুড়ি উড়ে যায়, কোথায় যায়? কে তার সুতা ছাড়ে? কার হাতে নাটাই? সে যেন দেখতে পেল, লম্বা চুলের এক তরুণ যুবা ঊর্ধ্বপানে চেয়ে নাটাই ঘুরিয়ে ঘুড়ির সুতা ছাড়ছে, হ্যাঁচকা টানে আবার উড়ন্ত ঘুড়ি নামিয়ে আনছে নিচে, তার সবল বাহুতে দুরন্ত শক্তি, তার খোলা চুল উড়ছে বাতাসে যেন সে অচিন দেশের রাজপুত্র। ঘুড়ি উড়ানো শেষ হলেই ঠোঁট গোল করে শিস দেবে, আর বনজঙ্গল পেরিয়ে ছুটে আসবে তার পঙ্খিরাজ ঘোড়া। তারপর হাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে বন্দি রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে সে বেরিয়ে পড়বে। টগবগ টগবগ। খোলা প্রান্তরে ধুলা উড়িয়ে একদম সিনেমার নায়কদের মতো।
না। তাই বলে সব নায়ককেই ভালো লাগে না তার। কাউকে কাউকে ভালো লাগে। যাকে ভালো লাগে তাকে উদ্দেশ করে মনে মনে রাজ্যের কথা বলে সে। এমন সব কথা, যা অন্য কাউকে বলা যায় না। তার মনে হয় ভালো লাগার মানুষটা মনোযোগ দিয়ে সেই কথা শুনছে। মাথা ঝাঁকাচ্ছে, মাঝে মাঝে দুয়েকটা সান্ত্বনার কথাও বলছে তাকে, যেন আদর করে মনের ক্ষতে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে নরম হাতে। 
হঠাৎ হঠাৎ তীব্র সুরে ফোন বেজে ওঠে। ল্যান্ডফোন। রিসিভার তুললেও ওপাশে কে আছে বোঝা যায় না। হ্যালো, হ্যালো, কে বলছেন? ওপাশে ঘন গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ। মা বলে দিয়েছেন, 'তুমি আর ফোন ধরবে না। খবরদার।' তবু ফোন বাজলেই তার বুক ধুকধুক করে। মনে হয় এ তারই ফোন। নির্জন দুপুর কেঁপে ওঠে। অকারণে রিনঝিন বেজে ওঠে হাতের চুড়ি। মন উতলা হয়। কে? কে ফোনে নিঃশ্বাস ফেলে দেখা দেয় না। তাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে। কেমন বয়স তার? কেমন তার কণ্ঠস্বর, মেঘের ডাকের মতো গম্ভীর? নাকি ভাঙা ভাঙা ফ্যাসফেসে? তার মাথায় কি ঘন কালো চুল নাকি টাকের আভাস? সে কি লম্বা না বেঁটে? সে কি গুছিয়ে কথা বলতে পারে নাকি কথা গুলিয়ে ফেলে? তোতলায়? কে জানে? 
নবম শ্রেণি মানেই কি সবার শাসন? একদিকে ভাইয়ার খবরদারি অন্যদিকে বাবার ধমক। চোখের সামনে আম্মুর তুলে দেওয়া বিধিনিষেধের নিরেট দেয়াল, আপুর চোখ রাঙানি, আত্মীয়স্বজনের অযাচিত উপদেশ, প্রতিবেশীদের গায়ে পড়ে পরামর্শ দেওয়া। শুধু কড়াকড়ি, শুধু বকাঝকা। একদম ভাল্লাগে না। আজকাল কিছুই ভালো লাগে না তার। কেউ যেন তাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। এমনকি প্রিয় বন্ধুরাও অল্পতেই ভুল বোঝে। তখন প্রচণ্ড অভিমান হয় তার। কারও সঙ্গে মিশতে ইচ্ছে করে না, কথা বলতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে কাউকে কিছু না বলে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে। নিরুদ্দেশে হারিয়ে যেতে। এমন জায়গায় যাবে সে, যেখানে কেউ তাকে চেনে না। যেখানে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো যায়, পাখির মতো দূরের দেশে ঘুরে বেড়ানো যায়, সবুজ দিঘিতে প্রাণ খুলে সাঁতার কাটা যায়। যেখানে মনোমালিন্য নেই, নিষেধ-বারণ নেই। শুধু খুশি আর আনন্দ, হাসি আর গান। পরীক্ষার চাপ নেই, শিক্ষকদের কঠিন চোখের তদারকি নেই। কিন্তু এমনটি শুধু তার স্বপ্নেই সম্ভব হয়। ইদানীং প্রচুর স্বপ্ন দেখে সে, জেগে জেগে দেখে আবার ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও দেখে। সেসব স্বপ্নের কত রং, কত ঢং, কত বৈভব- বৈচিত্র্য। কখনও সে স্বপ্ন দেখে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার, কখনও স্বপ্ন দেখে নায়িকা বা গায়িকা হবার। দেখে দৌড়াতে দৌড়াতে আকাশে উঠে গেছে সে। দেখে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছে এক আশ্চর্য সুন্দর ফুল বাগানে। সেখানে মাইলের পর মাইল লাল, নীল, কমলা, বেগুনি নানা রঙের ফুল উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। সব যে সুন্দর স্বপ্নই দেখে তাও তো নয়, মাঝে মাঝে ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্নও দেখে সে। দেখে এক গভীর অন্ধকার পাতালের অতলে সে গড়িয়ে পড়ছে তো পড়ছেই। যেন এই গহ্বরের কোনো শেষ নেই। পতন থেকে উদ্ধার নেই। কখনও দেখে দাঁত বের করে তাকে তাড়া করেছে একদল বুনো কুকুর। সে দৌড়ে পালাচ্ছে, কখনও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। এই বুঝি হিংস্র কুকুরের দল তাকে ধরে ফেলছে। আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলছে। তীব্র আতঙ্কে ঘুম ভাঙলে সে দেখে তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেছে। ঘামে ভিজে গেছে গা।   
এই টক ঝাল মিষ্টিময় নবম শ্রেণিতে হঠাৎ মুড অফ তো আবার মুড অন। কে যে আড়াল থেকে এই অফ অনের সুইচ টিপে কে জানে! মুড ভালো থাকলে স্কুল থেকে ফেরার পথে ছাতা ফেলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করে। কাদাপানি পেরিয়ে ঝালমুড়ির ঠোঙা হাতে বন্ধুদের সাথে কল কল করে গল্প করতে ভালো লাগে। ঝরনার মতো উচ্ছল হাসিতে ভেঙে পড়তে ইচ্ছা করে। মুড অন মানে মনের ভেতর সাতরঙা রংধনু পুচ্ছ মেলে। মুড অফ তো, মনের ভেতর মেঘলা আকাশ, ধূসর দিবস, রাত্রি আঁধার, ডুবে যায় পঞ্চমীর চাঁদ। তখন কিছুই ভালো লাগে না, কাউকে ভালো লাগে না। বিষণ্ণতা ভারী পাথরের মতো বুকের ওপর চেপে বসে। আবার বৃষ্টি শেষে রোদ ওঠার মতো সেই বিষণ্ণতা কীভাবে যেন এক সময় কেটেও যায়। পৃথিবীকে তখন আবার সুন্দর মনোহর মনে হয়।
আসা যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে পরপর কয়েক দিন একটা লম্বা ছেলেকে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে। যখন স্কুলে যায়, যখন স্যারের বাসায় পড়তে যায়, যখন পড়া শেষে ফিরে আসে। নন্দগোপাল দাঁড়িয়েই থাকে। তাকিয়েই থাকে। সেই তাকানোতে মুগ্ধতা ঝরে পড়ে। জোনাকের মতো আকুলতা জ্বলে ওঠে। এই আকুল ব্যাকুল নীরব পাগল প্রেমিককে চিনেছে সে। পাশের পাড়ায় গলির মুখে সাদা রঙের তিনতলা বাড়িটায় থাকে ওরা। ওর নাম জীবন। সরকারি কলেজে পড়ে। ওর কি আর অন্য কোনো কাজ নেই নাকি, সে ভ্রু কুঁচকায়। তার গা শিরশির করে। নবম শ্রেণি আয়নায় তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখে। দেখে তার ছোট্ট কপাল, গভীর কালো চোখ, চোখের পাপড়ি, গাঢ় ভ্রু, পাতলা ঠোঁট, মাঝারি নাক, মসৃণ ত্বক- সে কি তবে সুন্দরী? অন্যের চোখে কেমন দেখায় তাকে? ওই জীবন নামের ছেলেটার চোখে কি তার এই রূপ ধরা পড়েছে? আরও যেসব চোখ তাকে ঘিরে অবিরাম ঘুরপাক খায় তাদের চোখে কেমন তার রূপ? 'আয়না, আয়না, বলো তুমি, বলো সত্যি করে, আমি কি সুন্দরী, আমি কি রূপসী? আয়না তুমি কি বোঝো আমার বেদনা? তুমি কি জানো আমি কি চাই?' আয়নায় তার প্রতিবিম্ব কোনো উত্তর দেয় না। অপলক দৃষ্টিতে নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে। শান্ত, গভীর, একাকী।  
একটু দূরেই যমদূতের মতো খড়্‌গ হাতে দাঁড়িয়ে অছে ফাইনাল পরীক্ষা। ডাকছে, দরজায় কড়া নেড়ে বলছে, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নবম শ্রেণি শেষ করে এবার তুমি দশম শ্রেণি হবে।

বিষয় : প্রচ্ছদ শাহনাজ মুন্নী

মন্তব্য করুন