সুখ এবং দুঃখ, শান্তি এবং অশান্তি, কতভাবেই, কত প্রকারেই-না অবস্থান করে, প্রবেশ করে থাকে আমাদের জীবনে। কখনওবা স্বেচ্ছায় আমরা তাকে ডেকে আনি, কখনওবা অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির মতো এসে হাজির হয় আমাদের সামনে। আমাদের হাতে করার কিছুই থাকে না। যেমন হঠাৎ করে চাকরি চলে যাওয়া, যেমন একঝলক কাউকে দেখেই প্রেমে পড়ে যাওয়া। এগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তবে কিছু কিছু জিনিস আবার থাকে। যেমন পয়সা জমিয়ে বা লোন নিয়ে নতুন একটি গাড়ি কিনতে যাওয়া, যেমন বাবা-মায়ের পছন্দ করা মানুষটিকে বিয়ে করা। এগুলো সবই মোটামুটি থাকে আমাদের আওতার ভেতরে।তাই সুখ এবং দুঃখ, শান্তি এবং অশান্তি এগুলোর একটি থেকে আরেকটিতে ডিঙিয়ে যাওয়াই হয়ে থাকে আমাদের জীবন। যেন চার রঙের চারটি সুতো দিয়ে নকশিকাঁথার মতো বোনা হয় সেই জীবন। এই মূল চারটি অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি ব্যাপারটাকে অতি সহজ করে ধরলাম- তাতে আশা করি, কেউ কিছু মনে করবেন না। তবে জানা কথা যে, এই এক-একটি মূল অনুভূতির মধ্যেই থাকে হাজারো ধরনের স্থানান্তর এবং সংমিশ্রণ। যেমন, দীর্ঘ সময় অফিসে কাটিয়ে বাড়িতে ফেরার এক ধরনের শান্তি, আবার দীর্ঘদিন মন দিয়ে পড়ালেখা করে পরীক্ষায় সফল হবার শান্তিটাও আরেক ধরনের শান্তি এবং একই সাথে সুখও বটে। ব্যাপারটি হলো কী, যে এই মূল অনুভূতির ভেতর কোনোটাই পারস্পরিক একচেটিয়া ঘটনা নয়। একই ঘটনা আমাদের একই সাথে সুখ ও শান্তি দিতে পারে- ওপরের উদাহরণটি পড়লেই তা পরিস্কার হয়ে আসে।
তাহলে সেই থেকে আসা যাক আমাদের সোনালি দুঃখের ব্যাপারে। সুখ ও শান্তি যদি করতে পারে একসাথে সহবাস, তবে সুখ আর দুঃখ কেন নয়? দুটির মধ্যে কেবল একটিই তফাত থাকে, এবং সেটি হলো সময়। সুখ এবং দুঃখ একই সাথে অনুভব করা যায় যখন তার মধ্যে থাকে সময়ের ব্যবধান। অনেকেই আজকের কালের খেয়ার প্রচ্ছদের কথা পড়ে প্রেম-ভালোবাসা সংক্রান্ত ব্যাপারের কথা ভাববেন। সেটি স্বাভাবিক। কারণ, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই সোনালি দুঃখের কথা ভাবলেই মনে আসে আমাদের কৈশোরের কোনো হারানো দিনের ভালোবাসার কথা, মনে পড়ে যায় সেই ছেলে বা সেই মেয়েটির কথা, যার একঝলক দেখার অপেক্ষায় কাটত আমাদের দিন- আমার ব্যাপারেও ঠিক তাই। তবে প্রেমের কথা লেখার সময় হাতে অনেক রয়েছে। এই সূচনাতেই না-বলা কথা রয়ে যায় অনেক।
আমাদের প্রাপ্তবয়সের সন্তানের উচ্চশিক্ষার সময় যখন হয়ে আসে, যখন দেশে-বিদেশে নানান ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক আবেদনপত্র জমা দিই, কতই-না দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয় আমাদের। আমরা পিতামাতা হয়ে কতই-না আশা করে থাকি যে সবচাইতে উত্তম প্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তির আবেদন সফল হক। এবং যখন সেই দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত হাতে পাই, তখন আমাদের সেই মনের অশান্তি কীভাবে পরিণত হয় শান্তিতে? কতই-না গর্ব- অর্থাৎ সুখ-না বোধ করি আমরা? একের পর এক আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে আমাদের সেই সুখের খবর জানাই, মিষ্টি নিয়ে যাই, ছেলেমেয়েদের সফলতা ও উজ্জ্বল জীবন পালন করি। এগুলো কি আমরা সকলেই করে থাকি না? এটি তো অতি স্বাভাবিক ব্যবহার, গর্বিত দু'জন বাবা-মায়ের কাছ থেকে। তবে সব উল্লাস ও উৎফুল্ল ভাব কাটিয়ে যখন তাদের যাবার সময় ঘনিয়ে আসে, যখন সেই ছেলেমেয়েকে হারাবার- হয়তোবা চিরকালের জন্য- বাস্তবতা আমাদের গায়ে দাঁত বসিয়ে সজোরে কামড় দিয়ে বসে, তখন আমাদের মনের সেই সুখ, সেই শান্তি কোথায় যায়? আলগোছে, আড়ালে, বেড়ালের পা ফেলবার মতো সেই সুখ যখন পরিণত হয় দুঃখে, তখনই-না সেটিকে আমরা বলি মধুর বেদনা!
ঠিক সেভাবেই, যখন উন্নতমানের চাকরি পেয়ে আমাদের দেশ অথবা আমাদের শহর বদলে ফেলতে হয়? যখন বছরের পর বছর অর্জিত একে একটি বন্ধুকে ছেড়ে যেতে হয়, সেই সাথে এমনও একজন যাদের সাথে আমাদের হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক থাকে- তখন সেই ছেড়ে যাওয়াটি কি সোনালি, মধুর বেদনা বলে অবস্থান করে না আমাদের বুকের মধ্যে?
তবে দুটি দৃশ্যকল্পের মধ্যেই দুটি চিরন্তন সত্য গাঁথা এবং সেটি হলো সময়। একমাত্র সময় এবং ভালোবাসা পরিণত করতে পারে আমাদের একটি মূল অনুভূতি আরেকটিতে। এবং আমরা এটিও দেখেছি যে দুটি মূল অনুভূতি একই সাথে সহবাস করতে পারে। দেখেছি কীভাবে গর্বিত পিতামাতা, হাজারো দুঃখের সম্মুখ হয়েও তাদের ছেলেমেয়েদের হাসিমুখে পাঠাতে পারে দূর অজানায়- তাদেরই জীবনের সফলতার সম্ভাবনা বাড়াবার জন্য? সেই ছেলেমেয়েরা কি একবারও ভাববে যে, তাদের অনুপস্থিতিতে, তাদের বাবা বা মা তাদের ঘরে প্রবেশ করে তাদেরই ছোটবেলার পুতুল হাতে নিয়ে দিনের পর দিন বিষণ্ণতায় কাটাবে? না, তারা সেটি খুব সম্ভব ভাববে না। কেননা, সুখ এবং দুঃখ- এই দুটিই একান্ত গোপনীয়, একান্ত আমাদের অস্তিত্বের ভেতরে। এমনকি স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে কেউ কখনও বুঝতে পারবে না তাদের মনের প্রকৃত অনুভব। এ না হলেই না আমরা মানুষ- ঠিক যেভাবে একেকজনের চেহারায় নাই মিল, ঠিক সেভাবেই নাই তাদের মনের ভেতর।
শুরু করেছিলাম বলে যে প্রেমের কথা বেশি বলব না। দু-একটি উদাহরণও দিলাম কথাটিকে এড়িয়ে যেতে। তবে আমি লেখক, আমি একজন সাধারণ মানুষও বটে। আমাকে বলতে হয় আমার নিজের সোনালি দুঃখের কথা, যা না বললে এই লেখাটি সম্পন্ন হবে না। এত কিছু বলবার পর, আমার দুঃখটি প্রেম নিয়েই। কী জানি, হয়তোবা লেখক, কবি, নানা ধরনের শৈল্পিক মানুষের প্রেমে পড়ার প্রবণতা একটু বেশিই থাকে, নাহলে আমরা কীভাবে অন্যদের দেই সেই একই প্রান্তিক রোগে পড়ার প্রেরণা? তাই হয়তোবা আমি প্রেমে পড়লাম মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। মেয়েটির নাম ছিল লুইসা- তখন আমরা থাকি লন্ডনে। একই স্কুলে পড়ি, একই ক্লাসে। তার সাথে দেখা হওয়ামাত্র আমি তাকে ঘোষণা করে বসলাম- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে বিয়ে করব।' বেচারি মেয়েটির বয়স মাত্র ছয় কিন্তু সে এই ব্যাপারটি খুব সহজভাবেই নিল।
আমাদের স্কুলের সামনে ছিল একটি বিশাল রাস্তা, যার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত গাড়ি চলত অত্যন্ত দ্রুতবেগে। একসময় সেই একই রাস্তা সাহস করে পার হতে গিয়ে আমি গাড়িচাপা পড়ি। চোখ খুলে দেখি বাবা অঝোরে কাঁদছেন হাসপাতালে আমার বিছানার গোড়ায়, কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল, মুখে কালো চশমা আর পরনে একটি হাঁটু পর্যন্ত কালো কোট এবং আমার কপালে একটি ডিমের মতো ফোলা জায়গা। তবে এগুলোর কথা আরেক দিন বলা যাবে। আজকের বিষয়ের সাথে তার তেমন কোনো তাৎপর্য নেই। যাই হোক, সেই লুইসা আর আমি প্রায় আমাদের স্কুলে খেলার ছুটির মধ্যে আমাদের প্লেগ্রাউন্ডের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকতাম; আমি তার হাত ধরে। ধরে বলতাম বারের পর বার যে আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমার বাবা-মা মনে হয় খুব অল্প দিনের মধ্যে বাংলাদেশে চলে যাবে। তুমি আমার সাথে আসো; আমি তোমাকে ছাড়া একটি দিনও থাকতে পারব না।
সাধেই কি কবি?
যাক, আমার সেই ভালোবাসার পাত্রের কাছ থেকে প্রতিটিবার খালি একটিই উত্তর। উত্তরে সে বলত আমাকে, ঐ যে আমাদের স্কুলের সামনে রাস্তাটা দেখছ? আমার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে। একদিন, সে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসবে আমার সাথে দেখা করতে। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করব। সে যদি অনুমতি দেয়, তাহলে আমি তোমার সাথে বাংলাদেশে যেতে রাজি। তবে সে যদি না করে, তাহলে আমি যেতে পারব না। তাই থাকলাম, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই কল্পিত বয়ফ্রেন্ডের আগমনের জন্য। রোজ, স্কুলের মাঝে ছুটির সময় বসে থাকতাম, সেই স্কুলের গেটের সামনে, সেই রাস্তার মুখে, কবে, কোনদিন তার বন্ধু এসে অনুমতি দেয় মেয়েটিকে আমার সাথে বাংলাদেশে আসতে।
বলা বাহুল্য, সেই দিন আর এলো না। বাবা-মায়ের সাথে চলে এলাম বাংলাদেশে এবং সেই থেকেই আমার প্রথম পরিচয় মধুর বেদনার সাথে; সোনালি দুঃখ, যে নামেই ডাকি না কেন তাকে, অনুভূতিটা সেই আমার প্রথম। তবে সেই যে আমার শেষ, সেটিও বলা ঠিক হবে না। বলেছি না, যে সুখ, দুঃখ, শান্তি, অশান্তি, এগুলো অনুভূতির একেকটি মিশ্রণে আমাদের জীবনের গঠন? পেয়েছি, পাই এবং পেয়ে যাই; অনুভব করি সেই প্রতিতি মুহূর্তে। যত বয়স হয়, ততই ভাবি, ততই সন্দেহ করি যে আমার এই সুখের সময় কি একসময় পরিণত হবে দুঃখে। আমি কি অজানাই উৎসব করছি যখন জানি যে এই একই কারণে আমাকে একবার কাঁদতে হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানলে তো আমাদের জীবনটাই একচেটিয়া হয়ে যেত। জীবনটি উপভোগ করিই তো আমরা এই অনিশ্চয়তার জন্য, নাহলে জীবনটাই হয়ে যায় আমাদের কাছে একটা চাকরি।
সেই সাথে, এটিও চিন্তা করতে হয় আমাদের- আমরা কি সোনালি দুঃখেও এক ধরনের সুখ পাই না? ছেলেবেলার প্রেমের চিঠি, পুরোনো একটি ফটোগ্রাফ, চলে যাওয়া কোনো বন্ধুর কথা স্মরণ করে কি আমরা পাই না এক ধরনের সুখ ও শান্তি? সেই সুখ গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো সুখ, তবে সেটিও কি আমরা উপভোগ করে থাকি না? ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন যেই মেয়ের সাথে আমি ভেবেছিলাম নির্ঘাত বিয়ে হবে- সেই ছয় বছর বয়সের লুইসাকে ছেড়ে, তার কথা মনে করলে কি আমার মনে সোনালি দুঃখ জাগে না? নজরুলের কবরস্থানে, টিএসসির প্রাঙ্গণে, ঘামতে ঘামতে বাস ধরে গুলশান থেকে জুরাইন পর্যন্ত যাওয়া? সেগুলো কি ছিল সুখের স্মৃতি? অবশ্যই? সেগুলো কি আজ বেদনার স্মৃতি? অবশ্যই? কিন্তু জীবন কখনও থেমে থাকে না। জীবন চলতে থাকে তারই গতিতে। এবং আমরা কখন, কোন ট্রেন ধরেছি, তা জানবার উপায় নাই যতক্ষণ না আমরা আমাদের গন্তব্যস্থানে পৌঁছাই।
এই হলো জীবন।
এক অনিশ্চয়তা থেকে আরেকটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে এবং তারই মধ্যে একটুখানি, এক চিলতে সুখ খুঁজে পেতে। এইটিই আমাদের বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য এবং এমন একটি জীবন পার করে আমাদের একটিই উপহার এবং তা হলো মৃত্যু। কাকে ভালোবাসলাম, কার কাছ থেকে দুঃখ বেদনা পেলাম, সেই সাথে সেই অতি স্বল্প মুহূর্তও যেগুলো আমরা বলে থাকি 'সোনালি দুঃখ', সেই মুহূর্তগুলোও। লিখতে বসি এই প্রসঙ্গেই কিন্তু 'সোনালি' এবং 'দুঃখ' এবং 'সুখ' এবং 'শান্তি' নিয়ে আলাদাভাবে লেখা অসম্ভব হয়ে যায়। জীবনের সেই নকশিকাঁথার মালার বুননের সুতো একের সাথে এক মিলে যায়, জীবনটি হয়ে যায় সেই নকশিকাঁথার বদলে এক রঙিন চিত্রশিল্প।

বিষয় : প্রচ্ছদ দ্বিতীয় সৈয়দ-হক

মন্তব্য করুন