১. আমি কথা দিচ্ছি, কাউকে কিছু বলবো না;
বলবো- এ দুঃখের জন্যে তুমি দায়ী নও।
তুমি শুধু একবার বলো- তোমাকে কেনোদিনও দুঃখ দিইনি আমি;
আর বলো- ৩৬২ দিনে এক বছর হয়েছিল ১৯৭০ সালে।

বাগানের ফুল, লতাপাতা, এমন-কি কাঁটাও
আমার কথা বিশ্বাস করো না।
আমি বারবার বলেছি-
সত্যি, আমাকে কেউ কখনো দুঃখ দেয়নি,
আমার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই
আল্লার কসম,
মিথ্যে বলার এই কষ্টটুকু ছাড়া
আমার আর কোনো দুঃখ নেই

উদ্ৃব্দত কবিতাংশে যা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটুকুই আমার সোনালি দুঃখ।
হয়তো এরই চূড়ান্ত পরিণতি 'মৃত্যুর জীবনীগ্রন্থ' কিংবা 'মৃত্যুদৃশ্য' শীর্ষক কবিতা।

২.
আমার ধারণা, দুঃখ কেবল সোনালি হয় না, অন্য রঙেরও হতে পারে। আমরা জানি, শ্বেতস্বর্ণ অর্থাৎ White gold-এর অস্তিত্বও বিদ্যমান। তখন সোনালি দুঃখ বলতে কী বুঝব?
আমার উপলব্ধি, জীবনের বিশেষ বিশেষ পর্যায়ে দুঃখের রং পাল্টে যেতে পারে। তখন তার পরিচয়ও পাল্টায়। যেমন 'রুপালি দুঃখ, সাদা দুঃখ, অথবা কালা দুঃখ। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমার মনে হচ্ছে- আমার জীবনে এখন কালো দুঃখের অধ্যায় চলছে। জানি, শিল্পতাত্ত্বিকভাবে কালো কোনো রং নয়, রঙের অনুপস্থিতি মাত্র।

৩. সেই সুবাদে রঙের অনুপস্থিতি দেখলে আমরা বলতে পারি 'কালো', কিন্তু শিল্পতত্ত্বের নির্দেশনা অতিক্রম করেও আমরা 'কালো' শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। যেমন- কালো টাকা, কালোবাজার ইত্যাদি।
যুগের পর পর যুগ ধরে আমরা প্রধানত কী রং দেখতে পাচ্ছি? বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়- রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ফলিত কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়, সামাজিক অবস্থা সুষমিত নয়, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা উদ্বেগজন। বর্ণিক-সংস্কৃতির প্রভাবে ধনীরা আরও ধনী, গরিবরা আরও গরিব হতে চলেছে। বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে, পক্ষান্তরে বাইরে থেকে আসছে মাদক আর বিলাসী পণ্য। মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই, মূল্যবোধ বলতে কিছু নেই। সংস্কৃতিচর্চাও চক্রাবদ্ধ, আত্মপরায়ণ। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা বেড়ে যাচ্ছে।
কয়েক যুগ পরে যা দেখা যাচ্ছে, এক কথায় তা দুঃখজনক। তাই যে দুঃখ, সেটা কেবল ব্যক্তিমানুষের নয়; এই দুঃখ সামষ্টিক মানুষের তথা সামাজিক।
- এই দুঃখের রং কী রকম? নিঃসন্দেহে তা কালো।

আকাশের নীল তাঁবু ফেটে যাচ্ছে লাল, আর্তনাদে
শিশুর কান্নার জলে শিউরে ওঠে নীল
তোলপাড়।
হে ধর্ম, হে রাজনীতি, আর কতো রক্তপান করা।
অস্তিত্বের কূটচক্রের ধসে যাচ্ছে বিষণ্ণ পাহাড়।

৬.
মানুষ অন্যনিরপেক্ষ অথবা অবিমিশ্র কোনো সত্তা নয়। সে গোটা সমাজেরই একটি একক বা অংশ। কখনও কখনও সবকিছু থেকে আলগা হয়ে যেতে চায়। কিন্তু সে পারে না। তখন সে আত্মবিচ্ছেদে (self-alienation) ভোগে।
ব্যথিত রেখার অর্থ ভুলে গিয়ে
জোড়া দিচ্ছ নুড়ি ও পাথর।
নেপথ্য উদ্দেশ্য আমি বুঝি-
আমি তো আমার নাম করেই রেখেছি লিখে
বিয়োগচিহ্নের ডানপাশে।

৭.
বিভিন্ন রকম সম্পর্ক সূত্রের বন্ধনে মানুষের জীবনযাপন। কখনও সে আনন্দে থাকে, কখনও সে কষ্ট পায়- প্রচণ্ড দুঃখে জর্জরিত হয়। তার দুঃখবোধ সবচেয়ে বেশি সন্তানের জন্য। বাবা-মায়ের ভুলে কিংবা তাদের কারণে সন্তান যখন কষ্ট পায়, তখন সেই দুঃখ হয়ে দাঁড়ায় অবর্ণনীয়।
তখন সেই মানুষ দেখতে পায়- সে একা এবং অসহায়- বাকরুদ্ধ। প্রতিপক্ষ, জোটবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে ধর্ম-রাজনীতি-সমাজ- সবকিছু। এ রকম দুঃসময়ে অতি আপনজনও পাশে থাকে না- অন্ধকারে নিজের ছায়ার মতো।

খুব বেশি কিছু নয়,
বাস্তুহীন একটি পাতা সামান্য আশ্রয় চেয়েছিল-
এই শীতে মাঘের নিশীথে।
স্বঘোষিত সমাজ সেবক, ঐ দ্যাখো,
তোমার আশ্বাসে ভর করে-
বিক্ষত ডানায়- ছুটে আসছে বিছানা-বালিশ।
সারাদিন দানাপানিহীন
একটি শীতার্ত দেহ ভেঙে পড়তে পারে।
এমন বিপন্ন সত্তা; তার মুখে খাদ্য নয়, গান পুঁতে দিলে!
রাজার বাড়ির গান অসহায় রাতের ক্ষুধায়।
এই তো শীতের গল্প, দেনা আর দায়,
বিবর্ণ পাতার মতো ইতিহাস অন্ধ করে যায়।

৮.
জীবনের মোহনায় উপনীত হয়ে আজ বুঝতে পারছি- দুঃখের প্রকৃত রং কী রকম। অথচ আমার বোঝা উচিত ছিল অনেক অনেক আগে, যেদিন [২৪-০৪-১৯৭৪] 'জিরাফ' নামের কবিতাটি রচনা করেছি। -জীবনের ডাকবাক্স খুলে দেখতে পেয়েছিলাম আস্ত একটি জিরাফ। সে তার গ্রীবা ক্রমশ উঁচু করছে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করছে। মনে হয়, দূরদূরান্তের কাউকে কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু সে পারে না। এও মনে হয়েছে, দূরদূরান্তের কিছু একটা দেখতে চাইছে। অথচ সে নিজেকেই ভালো করে দেখে উঠতে পারেনি। -তার প্রচ্ছদে মানে সারাগায়ে দুঃখের কালো কালো মোহরের ছাপ। এটা ছিল প্রকৃতির সংকেত। হয়তো-বা এটাই প্রকৃত বিধান।

বিষয় : প্রচ্ছদ ময়ুখ চৌধুরী

মন্তব্য করুন